‘পরাধীনের আস্পর্ধা’

রুমা দাস:

আমি একটা অসম্পূর্ণ পারিবারিক আবহে বড়ো হয়েছি। সেজন্য কাউকে দায়ী করি না, বুঝে নিয়েছি এটাই সঠিক।
আমার মাকে বলতে শুনেছি, যে নারীর স্বামী থাকে, সে বাংলাবাজারে নেচে এলেও কিছু হয় না, কিন্তু যার স্বামী নেই তার যাবতীয় বিষয়ই পাবলিক, কিছুই তার অধীনে থাকে না। সবটাই সেই দায়িত্ব না নেয়া সমাজের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী হয়, হবে।

তো সেই জারিপত্র ঠিক করে দিয়েছিলো আমার মা কীভাবে শাড়ি পরবে?
কী কী রং পরতে পারবে?
পুরুষদের সাথে ঠিক কতোটা কথা বলবে, কীভাবে বলবে?
তার মেয়েরা কতোটুকু সময় বাইরে থাকবে, কী পোষাক পরবে?
তারা সম্পত্তির জন্য পারিবারিক অশান্তি করতে পারবে না?
মেলা জাতীয় ভিড়ে যেতে পারবে না, বাজারে যেতে পারবে না,
তাদের কোনো পুরুষ আত্মীয় এলে সমাজকে আত্মীয়তার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দিয়ে আসতে হবে।

এতোসব বিধিনিষেধ মানতে-মানতে আমরা হয়ে গেলাম অসামাজিক, পরনির্ভরশীল, যদিও মা চাকরি করতেন। এমনও হয়েছে ঘরে টাকা আছে, বাজার নেই, টাকা তো খাওয়া যায় না…।
এইসব দেখতে-দেখতে একটা সময় এসে আমার মা সিদ্ধান্ত নিলেন আমাকে সাথে নিয়ে মাসকাবারি বাজার নিজেই করবেন।
বাকি সব কাজ নিজেই করতেন, কোন পুরুষের শরণাপন্ন হবেন, আর তাকে চারিত্রিক কালিমা লেপন করা হবে, এই আতংক নিয়ে আমার মা এবং তার দুই কন্যা বেড়ে উঠেছে।

আমি নিজে জানি, একজন নারীকে নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে সস্তা পথ হচ্ছে তার চরিত্র নিয়ে কথা বলা, সেই চরিত্র আবার কেমন হবে তার রুপরেখা ঠিক করে দিবে পুরুষতন্ত্র এবং তাদের পালিত পুংনারীগণ।
পরীর বিষয়টা নিয়ে এই যে কচলাকচলি, তার হিসেব তো খুব সহজ, ওকে যার-তার সাথে শুইয়ে দাও, মদ খোর, ইয়াবাখোর, পুরুষখোর বানাও, তাহলেই তাকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করা হয়ে যাবে।
এই মেয়েটা আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে তো, বাঁচবে তো মানসিকভবে?

প্রতিটা মানুষ স্বীকার করেছে পরী খুব পেশাদার অভিনেত্রী, চৌকস অভিনেত্রী, কাজের ক্ষেত্রে সীমাহীন শৃঙ্খলতা তার।
সে মানুষকে ভালোবাসে, বিপদে পড়লে সাহায্য করে এবং যোদ্ধা।

আচ্ছা যখন যৌতুক চেয়ে তার বিয়েটা ভেঙে যায়, তখন ও আত্মহত্যা করেনি, কী সাহস মেয়েটার!
আবার ঢাকায় এসে নিজেকে দাঁড় করিয়েছে, এতো স্মার্ট হবে কেনো মেয়েরা?
ওরা পতিতাপল্লীতে বিক্রি হতে পারে, পাচার হতে পারে, গুম হতে পারে, খুন হতে পারে, ধর্ষণের শিকার হতে পারে। কিন্তু, কিন্তু ঐ শরীরটাই সে যখন তার ইচ্ছেমতো, নিজের ইচ্ছেমতো কারো সাথে টাকার বিনিময়ে বা প্রেমের বিনিময়ে নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন সে চরিত্রহীন…চরিত্র একটা জিনিস যা থাকে শুধু ‘যোনী আর স্তনে’..।
অন্য কোনকিছুই অন্যায় নয় সমাজে, শুধুই নারীর শরীরের ভার আর দায়িত্ব সে নিজে নিলেই সর্বনাশ।

সভ্যতার শুরুতে দলবেঁধে বিজিতরা পরাজিত পক্ষের নারীদের টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসতো,
একসময় দাসী হিসেবে কেনা-বেচা হতো,
একসময় হেরেমে থাকতো,
একসময় পল্লী বা পাড়ায় থাকতো বা থাকে,
সেগুলো সভ্যতার অংশ, কিন্তু নিজের অধীনে থাকে, তার উপর কারও অধীনস্থ না হলেই নারীর সুক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ চলে।

আচ্ছা একজন গৃহবধূ যদি বলে, আমি প্রতিরাতেই রেপড হই স্বামীর কাছে, আমার আরাম-আয়েশ, সামাজিক পরিচয়, সন্তানের নিরাপত্তার জন্য স্বেচ্ছায় রেপড হই, কেমন শোনাবে?
এরকম স্বামী-স্ত্রী অসংখ্য আছে আমাদের চারপাশেই।
কিন্তু ঐ যে পুরুষ গার্ডিয়ান আছে, সীল দেয়া আছে, সনদ আছে…সনদ ছাড়া হলেই সমস্যা। সনদ লাগে এই সমাজে।

এক বইমেলায় এক বিজ্ঞজন আরেক নারীর ‘মাথা চাই’ বলে চলে যাওয়া মিছিল দেখে হাসছিলেন, ঐদিন বইমেলায় গণকবর খোঁড়া হয়েছিলো, সেখানে পরেরবার ঐ বিজ্ঞের লাশ পড়ে, প্রতিনিয়ত পড়ছে লাশ।
আজ যারা নীরব দর্শক, জেনে রাখুন নারীকে পণ্য করার আধুনিকীকরণের প্রক্রিয়া চলছে, শিল্পীর দাম নটি বিনোদিনীকে সমাজ দেয়নি, আবার সেই পথেই হাঁটছে, প্রতিযোগিতায় নারীর সাথে না পারলে সমস্যা কোথায়, তাকে ‘বেশ্যা’ বানিয়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।
আপনি যে পেশায়ই থাকেন না কেনো, যখনই নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাবেন, তখনই আপনার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা, পুরুষতান্ত্রিকতার ছাঁচে তৈরি চরিত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে আপনাকে রাস্তায় শুইয়ে দেয়া হবে।

আপনার পেশাদারিত্ব, কাজ, মানবতা..কিছুই চলবে না, বিচারিক বিশ্লেষণে শুধু আঙ্গুল তুলে বলবে, ‘শরীর দিবি তো ভালো, আমাদের চাহিদামতো দিবি, এতো বড়ো সাহস তোর নিজের যৌন স্বাধীনতা চাস, আবার মুখ তুলে কথা বলিস’!
যেকোনো রকম স্বাধীনতা তা পুরুষের জন্য ন্যাচারাল, আর নারীর জন্য অর্জনাতীত কিংবা অর্জন করে নিতে হয়।

‘মেয়ে, তুই তো মেয়ে, মহিলা, নারী…
মানুষ হতে চাস কেনো’…

শেয়ার করুন:
  • 38
  •  
  •  
  •  
  •  
    38
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.