চারপাশে কেবল প্রতারণা, অবিশ্বাস আর মনভাঙ্গার গল্প

আহমেদ মুশফিকা নাজনীন:

কলেজে পড়া মেয়েটি যখন বাবাকে জিজ্ঞেস করলো, কই, আমার আম্মুকে নিয়ে তো তুমি কখনও বাইরে ঘুরতে যাওনি, তাকে কখনই বলোনি কী লাগবে তোমার? আজ তোমাকে আমি দেখেছি এক মহিলার সাথে। যার সাথে তুমি বসে খুব হেসে হেসে কফি খাচ্ছিলে? গল্প করছিলে? কে এই মহিলা বাবা?
বাবার মাথা নিচু। উত্তর দিতে পারছেন না তিনি। ছেলে বলে ওঠলো, বাবা, তোমার সাথে আমরা আর থাকতে চাই না। তুমি মাকে, আমাদেরকে অপমান করেছো। এতোদিনের বিশ্বাস ভেঙ্গেছো। ছি: কেমন করে পারলে তুমি? ঘৃণা হচ্ছে আমার।

রাগে ফুঁসছে মাহফুজ-তমা দম্পতির দুই সন্তান তানী আর তমাল। মাহফুজ-তমা দুজনই উচ্চশিক্ষিত। দুজনই উচ্চপদে চাকরি করেন। কোনো অভাব নেই তাদের। কিছুদিন হলো হঠাৎ করে মাহফুজের পরিবর্তন সবার চোখে পড়ছিল। কেমন ছাড়া ছাড়া ভাব। সংসারে থেকেও যেন সংসারে নেই। দেরি করে ফেরেন বাসায়। প্রায়ই চলে যান ট্যুরে।

কদিন আগে কলেজ থেকে ফেরার পথে বাবাকে এক নারীর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কফি শপে বসে থাকতে দেখে মেয়ে। দূর থেকে ছবি তোলে ও। রাতে বাসায় এলে প্রথম প্রশ্নই করে, মহিলাটি কে?
ঘটনার আকস্মিতায় তমা পাথরের মতো নিশ্চুপ। বেশ কিছুদিন থেকেই কানাঘুষা শুনছিলেন তিনি। প্রথমে বিশ্বাস করেননি। জিজ্ঞেস করাতে অস্বীকার করেছিলেন মাহফুজ।
আজ মুখোশ উন্মোচিত হওয়ায় মাথা নিচু করে বসে আছে মাহফুজ। তার এমন নৈতিক স্খলনে স্তম্ভিত পুরো পরিবার। হাসিখুশি পরিবারটি রাতারাতি হয়ে পড়ে বিষন্ন, বিধস্ত।
এর ঠিক দুদিন পর মেয়ে তানী সুইসাইড করতে যায়। তার প্রিয় বাবার এমন আচরণ ও মেনে নিতে পারে না। মেয়েটি এখন হাসপাতালে। মৃত্যুর সাথে লড়ছে।

রফিক-জয়া স্বামী-স্ত্রী। দুজনই বেসরকারি চাকরি করেন। প্রেম করে বিয়ে তাদের। রফিক খুবই শান্তশিষ্ট ধরনের। কথাই বের হয় না তার মুখ দিয়ে। এ নিয়ে জয়ার খুবই মন খারাপ। বিয়ের আগে যেটুকু কথা বলতো বিয়ের পর আরও চুপ। একদিন এক কলিগ জানান তার বরকে এক মেয়ের সাথে দেখেছেন তিনি। জয়া হেসেই উড়িয়ে দেয়। রফিকের সাথে অন্য মেয়ে ঘুরছে? হতেই পারে না। বিশ্বাস তার আকাশচুম্বী। কিছুদিন পর ড্রাইভার জানায় সবকিছু। মোবাইলে রেকর্ড করে শোনায় কিছু কথা। জয়া হতভম্ব। খোঁজ নিয়ে জানতে পারে অফিসের এক ফিমেল কলিগের সাথে তার একটা সর্ম্পক গড়ে উঠেছে। সেই মেয়েটির একটা বাচ্চা আছে। বাবা-মা এর ঝগড়ায় রফিক জয়ার কিশোর ছেলেটি দিন দিন বিষন্ন হয়ে যায়। ইয়াবায় আসক্ত এখন সে। একই ছাদের নিচে থাকলেও তারা আজ আর কেউ কারও না। জয়া ডিভোর্স দেয়ার কথা ভাবছে।

সুপ্রিয় পাঠক, উপরের দুটি ঘটনাই সত্যি। লেখার জন্য নামগুলো পালটে দেয়া হয়েছে শুধু। ঘরে ঘরে আজ শুধু মন ভাঙ্গা গল্প। কারোটা প্রকাশ পায়, কারোটা পায় না। কেউ চেপে যায়। কারোটা চেপে রাখা যায় না।

পরীমনির গল্প আজ আকাশে বাতাসে। কদিন আগে ছিলো মুনিয়া কাহিনী। পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, আডাডা, অফিসে, করিডরে, চায়ের দোকানে এখন একটাই প্রসঙ্গ পরীমনি, নাসির, সাকলাইন, পিয়াসা, রাজ, রাঘব বোয়াল, সায়েম সোবহান আনভীর। কেউ পক্ষে, কেউ বা বিপক্ষে। কেউ পরীমনিদের শাস্তি চায়, কেউ চায় নাসিম, সাকলাইন, আনভীরদের শাস্তি।
বাণীর পর বাণী দিয়ে যাচ্ছেন একেকজন, নানাজন।
দাঁড়ান, আপনাকে বলছি, এই আপনিই তো পাশ দিয়ে কোনো কিশোরী, তরুণী হেঁটে গেলে বিশ্রিভাবে আড়চোখে তাকান, তাই না ? (সবাই না কেউ কেউ)।
রিকশায় বউয়ের সাথে যাচ্ছেন, ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের রিকশায় থাকা কোনো নারীকে আপনি দেখেন না? অফিসে কড়া পার্সোনালটি সম্পন্ন মেয়েটির কি আপনি সমালোচনা করেন না?
আপনি তো পছন্দ করেন ন্যাকা ন্যাকা ভাইয়া বলে গায়েপড়া মেয়েটিকে। এই মেয়েগুলো আবার আপনাদের বানায় ধর্মের ভাই, বাবা, ছেলেগুলো বানায় মামা, মা কতকিছু। আপনি তো তার কাজটাই আগে করে দেন। বাসায় বউয়ের হাত কেটে গেলে আপনার চোখে পড়ে না। অফিসে ফিমেল কলিগের বাসায় নখ কাটতে যেয়ে আঁচড় লাগলে আপনার চোখ দিয়ে পানি পড়ে। এতো দরদ আপনাদের (সবার না, যারা আলগা দরদ দেখান তাদের কথা বলছি) বাইরের নারী জাতির প্রতি।

আবার বাইরের ক্ষমতাবান ভাইদের প্রতি ব্যাকুল আগ্রহ আছে এই সমাজের কিছু আপ্পিদের। তারা ধরেই নিয়েছে সাজুগুজু, একটু হাসি, একটু ঢং করলে পুরো পুরুষজাতি তাদের হাতে মুঠোয় থাকবে! তারা রাষ্ট্রে, সমাজে, কর্মক্ষেত্রে নিজের মেধাকে কাজে লাগায় না। তারা ব্যবহার করে সৌন্দর্য, ন্যাকামি। ফেসবুক মেসেঞ্জার, ইন্সটাগ্রামে চলছে তারই রকমারি আমেজ। ফলে সমাজে দুপক্ষকে ঘিরেই একধরনের বিশৃংখলা তৈরি হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন, পুরুষ ভাই আর নারী বোনদের প্রতি, আপনার কি বিবেক নেই? কেউ প্ররোচিত করলেই আপনি প্ররোচিত হবেন কেন? আপনার শিক্ষা, জ্ঞানবুদ্ধি, সব কোথায় গেলো? একটা মেয়ের ঢংঢাং আহ্লাদে আপনি প্ররোচিত হবেন কেন? বাইরে দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়া, দামি গিফট, ফ্ল্যাট এসব দিলেই আপনি মেয়েটিই বা নিজেকে অত ছোট করবেন কেন?

পরীমনি সিনেমা করে। কী হয়েছে তাতে? সিনেমা, নাটক সব সৃজনশীল পেশা। এই পেশায় আসতে হলে মেয়েটির যোগ্যতা দেখেন। তার অভিনয় যোগ্যতাকে কাজে লাগান। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তা না দেখে মেয়েটিকে বাধ্য করে তাদের মতো করে গড়তে। আপনারা তাকে নিয়ে ক্লাবে গেছেন, পার্টি করছেন। এখন সব দোষ তার! যারা তাকে নিয়ে গেছেন, যারা তাকে আজকের পরীমনি বানিয়েছেন তাদের কি দোষ নেই?
অনেক আডডায় শুনি, মেয়েটিই খারাপ। কেন গেলো? আরে, তার সাথে যে আরও কজন পুরুষ গেলো, তাদের কথা কেন বলছেন না?

সচেতন হোন। যা ন্যায় তার পক্ষে থাকুন। ভালো-মন্দ বিচার করতে শিখুন। তা সে ছেলেই হোক আর মেয়েই হোক। যারাই অপরাধ করুক না কেন তাদের সবারই শাস্তি হওয়া উচিত। আর তাই চাইছে সচেতন মানুষ। তবে কোনটা অপরাধ, আর কোনটা অপরাধ না, সেটাও বিবেচনায় থাকতে হবে।

যারা পঙ্কিলতায় ডুবে যান তাদের বলছি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছে সাকলাইনের ছোট্ট মেয়েটির হাসির ছবি। বাবার সাথে কী নিষ্পাপ তার হাসি। এই হাসি কি কদিনেই মুছে যায়নি তার?
যতই পরিবারকে জীবন থেকে সরিয়ে রাখুন, এই পরিবারই কিন্তু থাকে শেষ পর্যন্ত। পরীমনির পাশে আজ আর কেউ নেই। সুসময়ের বন্ধুরা সব চলে গেছে। বৃদ্ধ নানাই কিন্তু ছুটে এসেছেন ওর পাশে।

সাকলাইনের শিশুটির কথা ভাবুন। তার মা যখন বিষয়টি নিয়ে হাজারও কথা, হাজারও সমালোচনা শুনছেন, শিশুটি কি দেখছে না মায়ের বিষন্ন, অপমানিত মুখ? আরেকটু বড় হয়ে ও কি জানবে না তার বাবার কুকর্মের কথা? ও কি শুনবে না যে তার বাবা ডিভোর্স না দিয়েও সবাইকে বলেছে সে ডিভোর্সি? ওর মনে কি বাবার জন্য থাকবে কোনো ভালোবাসা? সাকলাইন তো সবচেয়ে বেশি অন্যায় করেছে তার বিবাহিত স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি।
বাবা-মা এর নৈতিক স্খলনের জন্য ঘরে ঘরে কত শিশু-কিশোররা যে গুমড়ে কাঁদছে, ঘৃণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে, কেউ কেউ বেছে নিচ্ছে নেশার জগত, কে তার খবর রাখে!
এসব বোঝে শুধু ক্ষরণে পুড়ে যাওয়া ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। সমাজে এসব সন্তানরা বাঁচে মাথা নিচু করে। বাবা-মায়ের কৃতকর্মের ফল ভোগ করে সন্তানেরা। এভাবেই গড়ে উঠছে এক অসুস্থ প্রজন্ম।

তাই অনুরোধ রইলো, সৎ হোন আচরণে, কর্মে, মনে ও বিশ্বাসে। সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সাথে আর সংসার করতে না চাইলে সম্মানজনকভাবে, মিউচুয়ালি সম্পর্ক ছিন্ন করুন। কিন্তু প্রতারণা করবেন না। বিশ্বাস ভাঙবেন না।
বাইরে বলবেন, আমার স্ত্রী/ স্বামী স্মার্ট না, সুন্দর না। আমার কেয়ার করে না। বাসায় গিয়ে বলবেন, জানু, সারাদিন তোমার কথাই ভাবছিলাম। এমন ভণ্ডামি বাদ দিন। দয়া করে সৎ থাকুন সম্পর্কে, পরিবারে। এমন জীবন বেছে নেবেন না যাতে করে সারাজীবন প্রিয় মানুষদের ঘৃণা নিয়ে, অশ্রদ্ধা নিয়ে বাঁচতে হয় আপনাকে। আমাদের হাজার বছরের পরিবারের যে সুদৃঢ় বন্ধন তা আজ আলগা হতে বসেছে। এটা রক্ষা করতে হবে আমাদেরকেই।

লেখক: সাংবাদিক, একুশে টেলিভিশন

শেয়ার করুন:
  • 506
  •  
  •  
  •  
  •  
    506
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.