একজন পরীমণি ও আমাদের পৈশাচিকতা

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

করোনাকাল আসার আগে আমি মাঝেমধ্যে সিনেপ্লেক্সে সিনেমা দেখতে যেতাম। বাংলা, ইংরেজি যেকোনো ছবি দেখতাম। একবার ঈদের পরে গিয়ে দেখি বাংলা দুটো ছবি চলে। একটা শাকিব খান অন্যটা পরীমণি অভিনীত।
আমি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম আমি পরীমণির সিনেমাটা দেখবো। ব্যাপারটা পরীমণির ভক্ত তেমন কিছু না। বরং অভিনয়ে তাঁকে দুর্বলই লেগেছিলো। আমার কেন যেন মনে হয়েছিলো, নতুন এসেও কোনো নায়কের ছত্রছায়ায় না থেকে নারীপ্রধান ছবিতে (হোক সে বাণিজ্যিক ছবি) অভিনয়ের চেষ্টাকে অনুপ্রাণিত করা উচিৎ।

সেদিনের সাথে আজকের পরীমণিকে নিয়ে লেখার কোনো সম্পর্ক নেই। পরীমণির গ্রেপ্তার ইস্যুতে মিডিয়া ট্রায়ালে অংশ নিতে চাইনি। নারী – পুরুষ হিসেবে বিভাজন করতে চাইনি। কেউ অপরাধী হলে নারী হিসেবে বিশেষ ছাড় পাবে এমন আশা আমি করি না।
কিন্তু একজন নারীকে ঘিরে পুরুষতান্ত্রিক অস্ত্রের যে নির্লজ্জ মহড়া চলছে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদের সামাজিক অশিক্ষা আর অসুস্থতা কী বিকট রূপ ধারণ করেছে! পরীকে দেখে আমার মনিকা বেলুচ্চি অভিনীত “মালেনা”র কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ছোট্ট শহরে বাস করা মালেনা যার স্বামী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গিয়ে নিখোঁজ। একাকিত্বের সুযোগে এবং শারীরিক সৌন্দর্যের আকর্ষণে শহরের সকল বালক থেকে পুরুষ তাকে কামনা করে। প্রভাবশালী পুরুষেরা ছুতোয়নাতায় তাকে পেতে চায়। ওদিকে নারীরা তাকে ঈর্ষা করে, আতংকে থাকে যে নিজের স্বামীটি না হাতছাড়া হয়ে যায় ‘চরিত্রহীন’ মালেনার খপ্পরে পড়ে! বাজারে খাবার কিনতে গেলে দোকানি অন্য কিছু চায়। উকিল পর্যন্ত বাড়িতে একটি কাজে এসে মালেনাকে ধর্ষণ করে। সমাজ তাকে একঘরে করে দেয়, সাথে জোটে “দুশ্চরিত্র” খেতাব।
মালেনা হোক বা “ডানাকাটা পরী”, একলা নারী এবং তার সৌন্দর্য যুগে যুগে সমাজের চক্ষুশূল।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে পরীমণি দেশের শীর্ষ অপরাধী! বিগত কয়েকদিনের টেলিভিশন এবং অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত খবর দেখে-শুনে-পড়ে পরীমণির অপরাধ সম্পর্কে যা জানতে পারলাম তা মোটামুটি এমন যে, পরীমণির বাড়িতে একটি মিনিবার আছে। সেই মিনিবার থেকে থেকে বিপুল পরিমাণ মদ এবং ভয়ংকর মাদক এলএসডি এবং আইস উদ্ধার করা হয়েছে।
এছাড়া “গ্রাম থেকে উঠে আসা”, “ক্লাসলেস,  এতিম, অশিক্ষিত” পরীমণির সাড়ে তিন কোটি টাকার গাড়িতে চড়া, ফ্ল্যাটের আলিশান ইনটেরিয়র থেকে শুরু করে, দেশে বিদেশে পরীর আমোদ – প্রমোদ – ফূর্তি, ঘন ঘন স্বামী/পুরুষসঙ্গী পরিবর্তন, ব্ল্যাকমেইল, রাঘববোয়ালদের সাথে পরীর চলাফেরা, ওঠাবসা-শোয়ার গল্পে চারপাশে কান পাতা দায়।

ইতোমধ্যে খোদ শিল্পী সমিতি পরীমণির অপরাধের দায় নেবে না বলে শিল্পী সমাজের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে পরীমণির সদস্যপদ বাতিল ঘোষণা করেছে। “অভিভাবকহীন”, “উচ্ছন্নে যাওয়া” পরীমণির বর্ণাঢ্য জন্মদিনের পার্টিতে উপস্থিত হয়ে গলাগলি করে সেল্ফি তুলতে যাদের আপত্তি ছিলো না তারাও এখন “মেয়েদের সন্ধ্যার পর ঘোরাঘুরি করা নিরাপদ না” – এই মর্মে উপদেশ বাণী বিতরণ করে বেড়াচ্ছেন। অথচ তাঁরা এই চলচ্চিত্র জগতেরই মানুষ!

চারদিনের রিমান্ড শেষে আবারও রিমান্ডে নেয়া হয়েছে অভিনয়শিল্পী পরীমণিকে। যদিও বাসা থেকে মদ, মাদক উদ্ধার হওয়া ছাড়া আর কী কী অপরাধ তিনি করেছেন তা জানতে পারিনি। এই দেশে একা পরীমণিই মদ্যপান করেন এবং একমাত্র তাঁর বাড়িতেই মিনিবার আছে – এই তথ্য বোধহয় কারোই জানা ছিলো না এতোদিন! যেমন জানা ছিলো না একমাত্র পরীমণিই গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন!
শামসুন্নাহার স্মৃতি কীভাবে পরীমণি হলো তা নিয়েও গবেষণার শেষ নেই। উত্তম কুমার থেকে রাজ্জাক, সালমান শাহ, সুচিত্রা সেন থেকে শাবানা, শাবনূর – অভিনয় জগতে এসে অনেক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীরই নাম বদলানোর উদাহরণ মিলবে। তবে কেন স্মৃতি থেকে পরীমণি হওয়াতে এতো বিপত্তি?

খবরে প্রকাশ, পরীমণির সাড়ে তিন কোটি টাকার মাসেরাতি গাড়ি উপহার পাওয়ার বিষয়টি নাকি সঠিক নয়। গাড়ির শোরুম থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে গাড়িটি পরীমণি একদিনের ট্রায়ালে নিয়ে গিয়ে আবার ফেরতও দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, উপহারদাতা হিসেবে যার নাম শোনা গিয়েছিলো, সিটি ব্যাংকের এমডি মাশরুর আরেফিন পরীর সাথে চেনাজানা এবং গাড়ি উপহার দেবার বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, “পরীমণিকে নিয়ে যা হচ্ছে তা রীতিমতো সার্কাস।” সিটি ব্যাংকের পক্ষ থেকে জিডি করা হয়েছে থানায়।
ওদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বলছে, ব্ল্যাকমেইলের বিষয়ে তথ্য থাকলেও কোনো ব্যবসায়ী এখনও অভিযোগ বা মামলা করেনি। অনেক ব্যবসায়ী নাকি লজ্জায় অভিযোগ জানাতে পারছেন না! অজানা রয়ে গেলো, অন্যায়ের সাথে জড়িত না থাকলে লজ্জাটা আসলে কীসের?

পরীমণির সাথে বিসিএস ক্যাডার, ডিবি কর্মকর্তা সাকলাইনের প্রেমের সম্পর্ক এবং জন্মদিন পালনের ব্যক্তিগত “ভিডিও ফাঁসে” যে বিকৃত উল্লাসে ফেটে পড়ছে আমজনতা – সেই বিকৃতিই আমাদের সমাজের প্রকৃত চিত্র। শিল্পী থেকে সাধারণ মানুষ কারো কোনো privacy বলে কিছু নেই। কার কী ধর্ম, কার কয়টা বিয়ে, প্রেম,বন্ধুত্ব, ডিভোর্স, মা দিবসে ছবি পোস্ট করলেও অশ্লীল মন্তব্যের ছড়াছড়ি – ধর্ম, পোশাক, মায়ের বুকের ওড়না কেন নেই, কে হাতাকাটা ব্লাউজ পরলো – এই বিকৃতির যেন কোথাও কোনো শেষ নেই।

পরীমণি একজন অভিনয়শিল্পী। এর বাইরে তিনি একজন মানুষ। একজন শিল্পীর অবশ্যই সমাজের প্রতি কিছু নৈতিক দায়িত্ববোধ থাকা উচিৎ। সেই সাথে এও সত্যি যে, ব্যক্তিগত জীবনে কে মদ্যপান করবে বা করবে না, কে কার সাথে সম্পর্কে জড়াবে বা জড়াবে না, কার কয়জন বন্ধু বা সঙ্গী থাকবে, দেশে যেহেতু মেয়েদের জন্য সূর্যাস্ত আইন চলে না কাজেই সন্ধ্যার পর বাইরে থাকা না থাকা তা একান্তই মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত যতক্ষণ না তা আইনত কোনো অপরাধের পর্যায়ে না পড়ে।

পরীমণি যদি হত্যা, ধর্ষণ, প্রতারণা, জালিয়াতি, ব্যাংক লুট, ঋণ খেলাপ, চোরাচালান, অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়া বা অন্য কোনো অপরাধের সাথে জড়িত থাকে তা আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হোক। “গ্রাম থেকে আসা” পরীমণিদের জন্য কারা মাদক আর অনৈতিক, অবৈধ ব্যবসার ফাঁদ তৈরি করে রাখে? সেইসব সুবোধ পৃষ্ঠপোষকদের আড়ালে রেখে শুধু পরীমণির বিচার কীভাবে হয়? অপরাধী হলে আইন আছে, পরীমণির অপরাধ কী এবং তা অ-জামিনযোগ্য কি না তা স্পষ্ট করা হোক। কিন্তু তাঁর ব্যক্তি জীবনের কোষ্ঠিবিচারের অধিকার কারো থাকতে পারে না। দিনরাত সাইবার হয়রানি থেকে, মানসিক ধর্ষণের কবল থেকে, অদৃশ্য পাথর নিক্ষেপ থেকে তাঁকে মুক্তি দেয়া হোক।
Slut Shaming বন্ধ হোক। আর “জনৈক প্রভাবশালী” পুরুষসমাজের প্রভাব হতে মুক্তি লাভ করুক পরীমণিদের জীবন।

শেয়ার করুন:
  • 3.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.