অপরাধ নয়, নারীর চরিত্র বিশ্লেষণ চলছে

সাবিহা আলম মুন্নি:

ভিক্টিম ব্লেমিং এর চর্চা আমাদের দেশে আইন আদালত থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরে বলতে গেলে রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। আর সেই ভুক্তভোগী যদি হয় নারী তাহলে তো লারে লাপ্পা। নষ্টা, পতিতা, বেশ্যা এই শব্দগুলোর কোন পুরুষবাচকতা দেখি না। মানে কোনভাবে ভুক্তভোগীকে দুশ্চরিত্র প্রমাণ করতে পারলে, নামের আগে এসব শব্দ জুড়ে দিতে পারলেই অপরাধ সিদ্ধ হয়, সমাজের মুখ উজ্জ্বল হয়।

হ্যা, কোর্টে একজন অভিযুক্তের পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তিতর্ক ভাল-মন্দ উপস্থাপন করা হয়। তারও একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা আছে। কারণ Even a devil has right to get justice. মানে একজন দুশ্চরিত্রারও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধকার আছে। অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কেউই অপরাধী নয় অভিযুক্ত মাত্র। অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার সাজা হবে। কিন্তু এই যে অভিযুক্ত হওয়ার পর থেকে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা জনে জনে এজলাস খুলে বসি, আর গণহারে নারীর চরিত্র ধুয়ে দেয়। নষ্টা,পতিতা, বেশ্যা ইত্যাদি দোষবাচক শব্দ জুড়ে দিয়ে প্রকৃত অপরাধী, ধর্ষক, নারী ব্যবসায়ীকে ডিফেন্স করি। অথচ একবারও এই কমন সেন্সটুকু কাজ করে না এইসব সুন্দরী মেয়েকে কাজে লাগিয়ে কারা ব্যবসা করছে, কারা এদের পণ্য বানিয়েছে, কারা এদের ইয়াবা সুন্দরী, মাদক সম্রাজ্ঞী বানিয়েছে, এদের খদ্দের কারা? সমাজের তথা কথিত প্রভাবশালী, বিত্তশালী, যারা এক ট্রিপের বিনিময়ে একটি হ্যারিয়ার গাড়ি উপহার দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

কিন্তু কোথাও তাদের চরিত্র নিয়ে কোন সমালোচনার আচঁ পেলাম না। সবসময় নারীর চরিত্র, নারীর নারীত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠে। অথচ কিনা আমরা সকলেই জানি নিষিদ্ধ পণ্য ক্রয়-বিক্রয়, ভোগ, বাজারজাতকরণ এমনকি নিজের কাছে রাখাও অপরাধ। কিন্তু কথিত মডেল, তারকা, সুন্দরী নারীদের যারা পণ্য হিসাবে খরিদ করছে, ভোগ করছে তাদের চরিত্র বিশ্লেষন তো দূরের কথা নাম-পরিচয়ও ব্যক্তি বিশেষে অজানা। আর ফাঁকফোকর দিয়ে যাদের নাম বেড়িয়েও আসছে তারা তো আবার দুর্দান্ত মেধামী, নম্র-ভদ্র, আল্লা-অলি টাইপের লোকজন। আর মেয়েগুলো ছেলেধরা, রাক্ষসী, ডাইনি, মায়াজালে আটকে ফাঁদে ফেলেছে টাইপ কথাবার্তা। এক কথায় সব দোষ নারী চরিত্রের। আর বিচারক কারা, যারা কিনা রাতে নায়ক, তারাই দিনে বিচারপতি। অন্যভাবে কথাটি যদি ঘুরিয়ে বলি, দিনের বিচারপতিরাই রাতের নায়ক বা খদ্দের।

আমি কোন বিশেষ শ্রেণীকে প্রটেক্ট করার জন্য কথাগুলো বলছি না বা কোন অপরাধীকে জাস্টিফাইও করছি না। যে অপরাধী তার শাস্তি হোক সেটা সবার মত আমারও চাওয়া। কিন্তু যখন কথাগুলো স্রেফ লিঙ্গ বৈষম্যের তখন আর চুপ থাকা যায় না। নারী বলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে পুরুষরা ঠিকই ছাড় পাচ্ছেন। কারণ অশ্লীল স্ত্রীবাচক শব্দগুলোর কোন পুরুষবাচকতা নেই। পুরুষের চরিত্র, মোটিভ খুব একটা আলোচনায় আসেনা। অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগী এই দুই শ্রেণীর নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সমান। দুইক্ষেত্রেই নারী খারাপ চরিত্র সর্বাগ্রে প্রাধান্য পায়। কিন্তু আইনেও অভিযুক্তের চরিত্রকে প্রটেক্ট করা হয়েছে। ভিক্টিম ব্লেমিং বা অভিযুক্তের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না যদি না বিচার্য বিষয় খারাপ চরিত্র হয়। কিন্তু আমাদের দেশে একটি অপরাধ সংঘটিত হওয়া মাত্রই আমরা ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত উভয়ের ক্ষেত্রেই চরিত্র বিশ্লেষক হয়ে যায়৷ কোথাও কোন অডিও-ভিডিও, ছবি হাতে পেলেই রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যায়। তারপর আদাজল খেয়ে লেগে পড়ি চরিত্র বিশ্লেষণে। অথচ গোপনে কারও ব্যক্তিগত ছবি, অডি, ভিডিও ধারণ ও জনসম্মুখে প্রচার শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেসব ক্ষেত্রে আইনের থোরাই কেয়ার। দেখার কেউ নাই শোনারও কেউ নাই।

সাবিহা আলম মুন্নী

বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম ব্যবহার করে এসব অপরাধ, অশ্লীল আলাপচারিতা, কমেন্ট উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেলিব্রিটিদের কমেন্ট সেকশনে তাকালেই বোঝা যায় আমাদের নৈতিক অবক্ষয় কোন পর্যায়ে চলে গেছে। যে যার মতো করে লিখে যাচ্ছে। হাতে বন্দুক পেলে নিরীহ মানুষের চোখ যেমন প্রাণীর উপর পড়ে তেমন। কোন নারী সেলিব্রিটির পোস্টে সবাই ওয়াজ ফরমায়েশ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেন এখানে দু’চারটা জ্ঞানমূলক গালিগালাজ দিতে পারলেই জান্নাতের টিকিট কনফার্ম। কেউ যদি কোন অশ্লীল ভিডিও তৈরি করে বা প্রচার করে তাহলে সেই দায়ভার তার। কিন্তু সেটি ভিউ করে, শেয়ার করে, অশ্লীল কমেন্ট করে আপনি কি নিজেকে ওলি-আউলিয়া প্রামাণ করতে চাচ্ছেন? ভুল ভাবছেন, আপনিও একই দোষে দুষ্টু। নগর পুরালে দেবালয় বাদ যায়না। আপনিও এই নষ্ট সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছেন, কিন্তু আফসোস নিজের ভুল চোখে পড়েনা।

সমাজের দুর্বল শ্রেণীর উপর দোষের ভার চাপিয়ে দিয়ে, নিজে দায়মুক্ত থাকতে পারবেন হয়তো কিন্তু বেশিদিন না। আজকে যেটা অন্যদের সাথে ঘটছে কালকে সেটা আপনার কন্যা, স্ত্রী বা বোনের সাথেও ঘটতে পারে। আর অপরাধ যেই করুন না কেন, সে যেই শ্রেণী, গোত্র বা লিঙ্গেরই হোক না কেন একজন অপরাধীর পরিচয় সে অপরাধী। তবে অবশ্যই অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর, তার আগ পর্যন্ত কেবলমাত্র অভিযুক্ত ব্যক্তি। তাই কোন অভিযুক্তের চরিত্র বিশ্লেষণ না করে, কারও ব্যক্তিগত অডিও, ভিডিও ভাইরাল না করে নিজের কাজ মন দেন, আইনের কাজ আইনের হাতে তুলে দেন। নিজেরা শান্তিতে থাকুন, সমাজের শান্তি-শৃংঙ্খলা বজায় রাখুন।

লেখক: আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
  • 441
  •  
  •  
  •  
  •  
    441
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.