‘পরি’ডক্সিক্যাল: নারীবাদ বনাম নারীত্ববাদ

প্রমা ইসরাত:

উইমেন চ্যাপ্টারের নিয়মিত লেখক, সাংবাদিকতার শিক্ষক কামরুন নাহার রুমা সম্প্রতি করোনায় নিজের প্রাণ হারিয়েছেন। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি।
আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবার বেহাল অবস্থা আমরা জানি। করোনায় উন্নত দেশগুলোতেও বেহাল অবস্থা, তারাও হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে আমরা হিমশিম খাচ্ছি, কারণ এই করোনাতে রোগী মারা যাচ্ছে ওষুধ সময়মতো পাওয়া যায়নি বলে।
কেন?
কারণ ওষুধ নিয়ে বাণিজ্য করতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওষুধটি চালান করে দেয়া হয়েছে ব্ল্যাক মার্কেটে। ওষুধটির আসল মূল্য ২১ হাজার টাকা হলেও ব্ল্যাক মার্কেটে বিভিন্ন দামে এটা বিক্রি করছে, দাম চাওয়ার ক্ষেত্রে ২১ হাজার টাকা দামের ওষুধের দাম চাচ্ছে ক্ষেত্রবিশেষে দুই লাখ টাকা। চিকিৎসাসেবা নিয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট আর কালোবাজারীদের কাছে সাধারণ মানুষ বন্দী। বেঁচে থাকা যে অধিকার এই সত্যটি মানুষ ভুলেই গেছে। বেঁচে থাকতে পারাটা এই সময় একটা সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে যারা অর্থনৈতিক দিক থেকে এগিয়ে, তারা কোনমতে বাঁচতে পারছে, যারা পিছিয়ে, তারা মরে যাচ্ছে। পরিবারসহ একসাথে মানুষ মারা যাচ্ছে, কোথাও কোথাও মাজারে শিরনি দিয়ে একা বাঁচতে শেখার পরও মরে যাচ্ছে রুমা আপারা।
এতো মৃত্যুর মিছিল চলমান, তবুও দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ হয়নি। শ্রমিক পুড়ে কয়লা হয়ে গেলো, অভিযুক্তরা দ্রুততম সময়ে বেরিয়েও গেলো জামিন নিয়ে। তাজা জীবনের পরিবর্তে পরিবারের কাছে ফিরে গেছে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া মানুষের লাশ। মানুষ আহাজারি করে কেঁদেছে। আমরা মানুষ হয়েও অবলা প্রাণীর মতো শুধু কান্না দেখেছি।

এতো এতো সমস্যা আমাদের দেশে। সেই সমস্যাগুলো নিয়ে খবর দেখতে দেখতে, পড়তে পড়তে, ভয়ে কুঁকড়ে বিষাদ আর বিবমিষা নিয়ে বাঁচতে বাঁচতে আমরা লিখছি। যেমন লিখতেন কামরুন নাহার রুমা আপা। তিনি আর লিখবেন না। কিন্তু আমার বিশ্বাস বেঁচে থাকলে তিনি এই বিষয়গুলি নিয়েই লিখতেন।
তার লিখতে চাওয়া, বলতে চাওয়াগুলো এবং তাকে অনুভব করে আজকে লিখছি।

 

মানুষ মরে যাচ্ছে, বিচারবিহীন সংস্কৃতির, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মহড়া দেখছি আমরা প্রতিনিয়ত, তবুও আমরা বারবার বলে যাচ্ছি নারীবাদের কথা। বারবার লিখে যাচ্ছি পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। বারবার প্রতিবাদ করছি বৈষম্যের বিরুদ্ধে। ঘুরে-ফিরে আলোচনায় আনছি পরীমনির নাম। কেন? আমাদের সমস্যা কী? আমাদের কি মাথা খারাপ? নাকি আমরা ভয়ংকর কোন অসুখে আক্রান্ত যেটার জন্য বারবার করে নারীবাদ নিয়ে আলোচনা করছি? ফ্রেন্ডলিস্ট ও পরিবারের মানুষরা বিব্রত হচ্ছে, বিরক্ত হচ্ছে, বলছে, “আহ ধূর, আর কত্ত এক প্যাঁচাল! থামো এইবার”, “এতো সমস্যা, তবুও নারীবাদ নিয়ে লিখতে হবে?”, “আরে ধ্যাত! বাদ দ্যান না এইসব নারীবাদী ক্যাচাল”, “বাদ দেন না পরীমনি’র ইস্যু, আর কত”, “পরীমনির ইস্যু কি আদৌ নারীবাদ? ”

অনেক অনেক বিরক্ত মাখা বাক্যবাণ।
খুব নম্রভাবে, ক্লান্ত গলায়, কিংবা রেগে গিয়ে চিৎকার করে, কিংবা হেসে বা নির্লিপ্তভাবে বারবার বলবো, নারীবাদ নিয়ে আলোচনা করাটা অপশনাল না, কখনও ছিল না। বৈষম্য ঘটলে তা নিয়ে প্রতিবাদ করা, আওয়াজ তোলা, অপশনাল না, কখনও ছিল না।

বিনোদন জগতের কেউ মারা গেলেও ইউটিউবে নানান ওয়াজে সেই মৃত ব্যক্তি কতটা পাপী ছিলো তা নিয়ে বয়ান দেয়া হয়। নারী “জাত” হিসেবে কত খারাপ এবং বিনোদন জগতে, বিভিন্ন মিডিয়ায় কাজ করা কিংবা যেকোনো জায়গায়ই কাজ করে চলা নারীদের কিংবা কাজ না করা নারীদেরও, মানে নারীমাত্রই তাদের নিয়ে বিষোদগার করে নানান বয়ান দেখি। যারা ধর্মীয় নেতা নন, অন্য কোন পেশায়, তারাও নারীদের প্রতি অসম্মান করে, নাক সিঁটকিয়ে মন্তব্য করেন। নারীদের কীভাবে চলতে হবে, বলতে হবে, বাঁচতে হবে বা মরে যেতে হবে, তার সবকিছু নির্ধারণ করবে তারা।
তারা কারা? তারা প্রত্যেকেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রতিনিধি।

পরীমনি উত্তরা বোট ক্লাবের ঘটনায় যখন ধর্ষণ ও হত্যা চেষ্টার অভিযোগ এনে তার পেইজ থেকে পোস্ট দিলেন, এরপর মিডিয়ার সামনে কাঁদতে কাঁদতে তার বক্তব্য বললেন, তখন সেই পোস্ট এবং সেই পোস্টসংক্রান্ত নিউজের নিচে অসংখ্য মানুষ নানান আজেবাজে মন্তব্য লিখেছে, মানুষ পরীমনির কান্না দেখে হেসেছে। কেন? কারণ পরীমনি সিনেমার নায়িকা, কারণ পরীমনি নারী। একজন মানুষ তার সাথে ঘটা অন্যায়ের কথা জানিয়েছেন, বিচার চেয়েছেন। সেই বিচার চাওয়ার অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেয়া নারীবাদ। বাংলা সিনেমার নায়িকা বলেই তিনি “বেশ্যা” এবং নাটক করছেন এবং ‘তার সাথে যা ঘটেছে তা তিনি ডিজার্ভ করেন’ এই মানসিকতার প্রতিবাদ করাই হচ্ছে নারীবাদ।

আমাদের এখানে সিংহভাগ মানুষ চিন্তায় একরৈখিক ও জাজমেন্টাল। মানে আপনি যদি সরকারের কোন কাজের সমালোচনা করেন, তবে আপনি বিরোধী দল বা রাষ্ট্রবিরোধী, আপনি যদি সরকারের কোন কাজের প্রশংসা করেন, তবে আপনি সরকারি দালাল। আপনি যদি ধর্মীয় কোন বিধানের সমালোচনা করেন, তবে আপনি নাস্তিক। আপনি আদতে কী, সেটা আপনি বলার আগেই অন্যরা বলে দেবে আপনি কী। কারণ তারা জাজমেন্টাল এবং একরৈখিকভাবে চিন্তা করে।

পরীমনি ইস্যুতে নারীবিদ্বেষী, নারীর প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য, অনবরত করে যাওয়া স্লাট শেইমিং, এই সবকিছুর বিরোধিতা করলেই আপনি পরীমনির পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন ব্যাপারটা এমন না, এর মানে হচ্ছে নারী হওয়ার জন্য যে জেন্ডার ভায়োলেন্সের শিকার তিনি হচ্ছেন আপনি সেটার বিরোধিতা করছেন। যেটা যেকোনো নারীই এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় এমন জেন্ডার ভায়োলেন্সের শিকার হয়ে থাকেন। সেই জেন্ডার ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোটাই নারীবাদ। একজন মানুষ তার লিঙ্গ পরিচয়ের জন্য, তার পেশার জন্য যদি তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হোন, সেই ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করা, তার অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করা নারীবাদ।

যদি ধরে নেই, কোন কারণে সেই ব্যক্তি মিথ্যে নাটক সাজাচ্ছে, বানিয়ে নিজের অভিযোগ বলেছে, সেইক্ষেত্রেও এই প্রতিবাদ, আন্দোলন মিথ্যে হয়ে যায় না। নারীবাদ ব্যর্থ হয়ে যায় না। কারণ নারীবাদ কোন একক ব্যক্তির জন্য নয়, নারীবাদ শুধুমাত্র কোন একক ব্যক্তির ফায়দার জন্য নয়।

যারা নারীবিদ্বেষী বা এমনিতেই যাদের দিন শুরু হয় নারীদের গালি দিয়ে, তাদেরকে মার্জিনের বাইরে রেখে কিছু আলোচনা যদি করি, তখন দেখি যে পরীমনির ইস্যুতে অনেকেই তার পাশে থাকবেন কিনা সেটা নিয়ে দ্বিধায় আছেন। অনেকেই বলছেন জেন্ডার পলিটিক্স এর কথা, অনেকেই বারবার করে বলছেন, পরীমণির ইস্যু নারীবাদী ইস্যু না, অনেকেই পরীমনির পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে তাকে নিয়ে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, তাদের ভেতরের পুরুষবিদ্বেষ ফুটিয়ে তুলে, পুরুষদের পায়ের নিচে রাখার জন্য পরীমনিকে বাহবা দিচ্ছেন।
একটিই ঘটনা, একজনকে নিয়েই ঘটনা, কিন্তু তার মধ্যে কোনটা নারীবাদ এবং কোনটা নারীত্ববাদ, তা নিয়ে তর্ক বিতর্ক। পেঁয়াজের মতো একটার পর একটা লেয়ার বেরিয়ে আসছে।

দেলোয়ার জাহান ঝন্টুকে একজন সাংবাদিক উত্তরা বোট ক্লাব ইস্যুতে জিজ্ঞেস করলে তিনি যা বলেন সেটার মূল বক্তব্য দাঁড়ায়, সে একটা মেয়ে, সে এতো রাতে মদ খেতে বাইরে যায় কেন, তার এই ঝামেলার জন্য সে নিজেই দায়ী, তার দোষ না থাকলেও তারই দোষ। অঞ্জনা বলেছেন, সন্ধ্যার পর মেয়েদের বাড়ির বাইরে যাওয়া বিপজ্জনক, উচিৎ না। জায়েদ খান বলেছেন, মেয়েরা একটু নরম থাকবে, মেয়েদের নম্র ভদ্র ও হিসেব করে চলতে হবে। এই যে নানান বক্তব্য তারা দিয়েছেন, প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীকে কীভাবে চলতে হবে এই দিকনির্দেশনার কথাই তারা বললেন। এই বক্তব্যগুলো পুরুষতান্ত্রিক এবং লিঙ্গ বৈষম্যমূলক। এর বিরোধিতা করা নারীবাদ।

আর পরীমনি দেখতে কত সুন্দর, কেমন করে রোম্যান্টিক ভঙ্গিতে হাসে, এতো সুন্দর একটা মেয়ে কীভাবে অপরাধ করে, মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেন এমন একটা মেয়ে অপরাধ করতে পারে কিনা, এইভাবে ভাবা এবং এই অনুযায়ী তার সাপোর্টে দাঁড়ানো, সেটা নারীত্ববাদের মধ্যে পড়ে। নারীত্ববাদ পুরুষতন্ত্রেরই আরেকটি শাখা। এই নারীত্বকে ব্যবহার করে অনেক নারীই সমাজে জীবনযাপন করেন, কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বেঁচে থাকার জন্য, টিকে থাকার জন্য, নিজের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এইটাই তখন তার স্ট্র্যাটেজি।

একই অফিসে দুজন নারী একই পোস্টে কাজ করেন, ক আর খ। ক তার সুপারভাইজার বা অন্যান্য পুরুষ কলিগের কাছ থেকে নিজের নারী পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে বা নারীত্বের চার্ম (charm) দেখিয়ে নিজের কিছু কাজ করিয়ে নেন। ক এর এই ব্যাপারটিতে একই সাথে নারীবাদ ও নারীত্ববাদ আছে। পড়ালেখা করে নিজে উপার্জন করার জন্য তিনি চাকরি করছেন, নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছেন, এখানে নারীবাদ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আর তিনি নারী হিসেবে নিজের নারীত্বকে তুলে ধরে যখন কোন এডভান্টেজ নিচ্ছেন তখন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে নারীত্ববাদ।

পরীমনির লাইফস্টাইল, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দ্বারা সংজ্ঞায়িত নারীর যে জীবন, সেটাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে চাওয়া, নিজের উপার্জিত অর্থ স্বাধীনভাবে ব্যয় করা, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়া এই প্রতিটা বিষয় নারীবাদ এর অংশ। কিন্তু তার নারীত্বকে ব্যবহার করে বাড়তি সুবিধা আদায়, অন্য কোন ব্যক্তিকে ম্যানুপুলেট করা, উদ্দেশ্য হাসিল করা সেটা নারীবাদ নয়।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পুরুষ আকাঙ্ক্ষা করে নারীর নারীত্বকে। কবি সাহিত্যিক নাট্যকার, সিনেমার পরিচালক সর্বক্ষেত্রে তুলে ধরে নারীর নারীত্বকে। মহিমান্বিত করে নারীর নারীত্বকে। অর্থাৎ প্রচলিত চিন্তা ধারায় নারীত্বের যে কুসুম কোমল, পুরুষের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার যে রূপটি আছে, বেশিরভাগ পুরুষ সেই রূপটিকে চায়। ফলে পুরুষতান্ত্রিক চিন্তায় প্রবৃত্তি দ্বারা তাড়িত পুরুষ নারীর নারীত্বকে কামনা করতে গিয়ে কখনও যদি প্রতারণার শিকার হন, তাহলে তখন দোষ দেন নারী জাতিকে, প্রচার করে বলতে থাকেন ‘নারী ছলনাময়ী’।

ছলাকলায় পারদর্শী হয়ে মন ভোলানো ম্যানুপুলেশন এর একটি অংশ। সাইকিয়াক্ট্রিস্ট ডক্টর এরিক বার্ন এর ভাষায়, এটা সাইকোলজিক্যাল সেক্সুয়াল গেইম। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের সবক্ষেত্রে এইটি ব্যবহার করতে হয় না। কারণ এই সমাজব্যবস্থায় পুরুষ এমনিতেই সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, কিছু জায়গায় শুধু পুরুষ বলেই ব্যক্তির জন্য উদ্দেশ্য হাসিল করা সহজ হয়ে যায়। এই সেক্সুয়াল গেইম পুরুষ শুধু ব্যবহার করে কোন নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য। সেটারও পুরুষের কিছুক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় না এই সমাজব্যবস্থায়।

কিন্তু প্রায় বেশিরভাগ নারীকেই এই সেক্সুয়াল গেইম প্লে করে কোন না কোনভাবে সুবিধা আদায় করতে হয়। দোকানদার মামা থেকে শুরু করে বাসের ড্রাইভার, অফিসের বস সকল জায়গায় নিজের নারীত্বকে এগিয়ে দিয়ে টিকে থাকার জন্য বা বাড়তি সুবিধা আদায়ের জন্য এই ছলাকলাটুকু করতে হয় বা অনেকে এটাই নিয়মিত করে থাকেন। কারণ তারা মনে করেন এইটাই নিয়ম, পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে হলে, এইভাবেই চলতে হবে। কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ অনুযায়ী “ইটস এ মেন্স ওয়ার্ল্ড”।

পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ নারীর এই নারীত্ব এগিয়ে দিয়ে সুবিধা আদায়ের কৌশলটুকুও মেনে নেয় ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই নারীত্ববাদ তাদের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে অনেকেই নারীর এই নারীত্ববাদকে নারী যদি টিকে থাকার জন্য ব্যবহার করে, তবে মেনে নেয়, কিন্তু যদি শাসন করার জন্য ব্যবহার করে, তবে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না।

অর্থাৎ পেট চালানোর জন্য যৌনতা ব্যবহার করে যৌনকর্মী হলে সমস্যা নাই, গালি দিবে, অচ্ছুৎ বলবে, কিন্তু হুমকি মনে করবে না। কিন্তু যৌনতা ব্যবহার করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করবে, ক্ষমতা দেখাবে, মর্যাদা চাইবে, খ্যাতি চাইবে, তখন সেটা হুমকি মনে করবে।
নারীবাদ, তথা ফেমিনিজম বা ফেমিনিজমস অনেক জটিল বিষয়। বাংলাদেশে পরীমনির জীবন সংগ্রাম, আর সংখ্যালঘু পরিবারে জন্ম নেয়া কোন হিন্দু নারীর সংগ্রাম এক না। মুসলমান ঘরে, দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়ে থিয়েটার করা নারীর চ্যালেঞ্জ আর শিল্পপতির ঘরে জন্ম নিয়ে থিয়েটার করতে আসা নারীর চ্যালেঞ্জ এক না। উচ্চবিত্ত পরিবারে, ধনী ঘরে গৃহিনী হয়ে থাকা নারীর জীবন সংগ্রাম আর একজন আদিবাসী নারীর জীবন সংগ্রাম এক না। একজন নারী মহাকাশযানে করে তার অন্যান্য নভোচারী পুরুষ কলিগদের সাথে যাওয়ার সময় যদি যৌন আক্রমণের শিকার হোন, সেখানেও নারীবাদকে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। যদিও তার জীবন, তার স্ট্যাটাস, সমুদ্র পাড়ে জীবনযাপন করা কোন জেলের বউ এর স্ট্যাটাসের মতো না। কিন্তু সেই জেলে বউ যদি স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হোন, সেখানেও নারীবাদকে দাঁড়াতে হবে।

আমেরিকায় বসবাস করা আমেরিকান নাগরিক নারীর নারীবাদ, আর আফগানিস্তানে বসবাস করা নারীর নারীবাদ কখনও এক হবে না। কিন্তু সমতার লক্ষ্যে, লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে, মর্যাদার জন্য, অধিকারের জন্য যখনই আওয়াজ তোলা হবে, সেটা নারীবাদ।

আমাদের দেশের শিল্পীসমাজ পরীমনির বিষয়ে মুখ বুঁজে আছে, চলচ্চিত্র সমিতি তার সদস্যপদ স্থগিত করেছে, নাট্যজনেরা নানান নেতিবাচক মন্তব্য করছে। যে অপরাধ তিনি করেছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে, সেই তুলনায় তাকে অপরাধী সাজানো হচ্ছে অনেকগুণ বেশি। শুধুমাত্র নারী বলেই এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক ক্ষমতাধর পুরুষের নাম জড়িয়ে আছে বলেই তার সাথে এটা ঘটছে, আবার নারী বলেই তার নারীত্বকে তুলে ধরে সমস্ত মিডিয়া তার নিউজ ফলাও করে প্রচার করছে, ইউটিউবে তার ব্যক্তিগত ভিডিও ভাইরাল করছে কিছু অসভ্য লোক। পরীর জায়গায় একজন পুরুষ হলে মানুষের এত্ত আগ্রহ কাজ করতো না, মিডিয়ারও অত তাগিদ থাকতো না।

নারীবাদ ও নারীত্ববাদের প্যারাডক্সে এটা এক অভিনব পরি-ডক্সিক্যাল হলেও একজন মানুষ হিসেবে তার পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে। ভয়ংকর অপরাধীরা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পায়, জনগণের কোটি কোটি টাকা মেরে দেয়া দুর্নীতিবাজরা পার পেয়ে যায়, শ্রমিক পুড়িয়ে মেরে ফেলা কারখানার মালিকরা জামিন পেয়ে বেরিয়ে যায়। আর সেই তুলনায় লঘু অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে পরীমনিকে প্রমাণ হওয়ার আগেই পাপী বানিয়ে, ভয়ংকর অপরাধীর মতো হাত পিছমোড়া করে বেঁধে নিয়ে আগেই দোষীসাব্যস্ত করে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। কেন? ব্রাদারহুডের খাতিরে একজন “মাইয়া মানুষ” কে উচিৎ শিক্ষা দেয়ার জন্য?

যদি পৌরুষত্বে আঘাত দেয়ার জন্য পরীমনিকে শায়েস্তা করতে ক্ষমতাধরেরা একজোট হয় তবে তার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। সম্পৃক্ত থাকার পরও নিজেদের ইমেইজ বাঁচাতে শুধু এককভাবে পরীমনিকে দোষী বানিয়ে তাকে যদি ‘বেশ্যা’ ডাকা হয়, তবে পরীমনির পক্ষে দাঁড়াতে হবে। প্রশাসনিক দায়িত্ব ভুলে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য যদি শুধু পরীমনিকে দায়ী করা হয়, তবে তার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। এই পক্ষে দাঁড়ানো মানেই তার সকল কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করা নয়। এই পক্ষে দাঁড়ানো মানেই অন্ধভাবে তার গুণগান করা নয়। এই পক্ষে দাঁড়ানো মানে তার নারীত্ব ব্যবহার করে সুবিধা আদায়কে সমর্থন জানানো নয়। এই পক্ষে দাঁড়ানো মানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। এই পক্ষে দাঁড়ানো মানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীকে বেশ্যা বানিয়ে পুরুষের সাধু সাজার খেলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

লেখক, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী।

শেয়ার করুন:
  • 2.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.