নষ্ট মেয়ের বিচার

তাহা ইয়াসিন:

গ্রামে এক নষ্ট মেয়ে ধরা পড়েছে। গ্রামে যার সাথে রাতের আঁধারে বাঁশঝাড়ের তলায় নষ্টামি করছিল সে দৌড়ে পালিয়ে যায়। ধরা পড়ে মেয়েটি। সারারাত মাতব্বরের বাড়ির আঙ্গিনায় খুঁটির সাথে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয় মেয়েটিকে। গ্রামের চৌকিদার, দফাদার সারারাত আধো ঘুমে আধো জেগে মশা মেরে মেয়েটিকে পাহারা দেয়।

সকালে সবাই তাড়াহুড়ো করে নাস্তা খেয়ে আঙ্গিনা ভর্তি হয়ে কেউ চেয়ারে, কেউ চট বিছিয়ে, কেউ খড় বিছিয়ে, কেউ পায়ের স্যান্ডেল বিছিয়ে, কেউ কেউ খালি মাটিতে লেপ্টে বসে পড়ে, নষ্ট মেয়ের বিচার বলে কথা!

বিচার শুরু হয় মসজিদের ইমাম সাহেবের মাধ্যমে। তিনি হাদিস বের করে কয়েক পাতা পড়ে শোনান। মেয়েটি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।
ইমাম সাহেব যা জানান তার সারমর্ম মেয়েটিকে খোলা মাঠে কোমর অবধি পুঁতে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলতে হবে।
মাতব্বর এবং মেম্বার সাব ইমাম সাহেবের বক্তব্য শুনে একটু থ মেরে যায়। কেননা দু’জনের সাথে থানা কর্মকর্তার পরিচয় আছে। ইমাম সাহেবও চেনে, তারপরও তার লিখিত জিনিসের উপর ভরসা রেখে বক্তব্য উপস্থাপন করে। মাতব্বর এবং মেম্বার সাব একজন আরেক জনের দিকে চেয়ে দেখে।

প্রথমে মেম্বার সাব একটা কথা বলে, তাকে ৫০ ঘা বেত মারা হোক।
মেয়েটির চোখে একটু শান্তির আভাস ফুটে ওঠে এই ভেবে যে অন্তত জীবনটা রক্ষা পেল।
মেম্বার সাবের কথায় কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করে মাতব্বর। কেননা উভয়ের মনে থানাকে এ ব্যাপারে জড়ানোর ইচ্ছে ছিল না। থানা কর্মকর্তা স্থানীয় লোক না। মায়াদয়া কম। মাতব্বর, মেম্বারের কোমরেও দড়ি দিতে পারে।
মাতব্বর সাব বিচারের রায়ে আর ১০ বেত যুক্ত করে দেয়।

চাবুক মারার যে চাকর সে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে হুকুমের প্রত্যাশায়। মেম্বার বা মাতব্বর হুকুম দিলেই সে বেত মারবে, আর উপস্থিত জনতা জোরে জোরে বলবে এক, দুই, তিন, ঊনপঞ্চাশ, পঞ্চাশ।
মেয়েটি লুটিয়ে পড়বে মাটিতে।

কিন্তু কেউই হুকুম আর দিচ্ছে না। মেম্বার সাবের তাবেদার চিন্তা করছিল সে কোনো কথাই যদি এই বিচারে না বলে তাহলে মেম্বার সাব মাইন্ড করতে পারে। তাই কাঁচুমাচু স্বরে গতরাতে এই মেয়ে কার সাথে নষ্টামি করেছিল সেটা তার কাছে শুনতে চায়!

মেম্বার সাব চুপচাপ। মাতব্বরের হাতের বিড়ি প্রায় শেষ। বিড়িটা ফেলে জানতে চায়, বলো, কে দৌড়ে পালিয়ে গেছে?
মেয়েটি অস্ফুটস্বরে যে নামটি বলে তা শুনে অনেকেই ঝিম মেরে যায়। নামটি মাতব্বরের ভাতিজার।
মাতব্বরের তাবেদার অনেকক্ষণ ধরেই চুপচাপ ছিল। এবার সেও নিজের অবস্থান তুলে ধরার জন্য জানান দেয়, সে মিথ্যা বলছে। আরও চাবুক বাড়ানো হোক।

তাহা ইয়াসিন

মাতব্বরের বড় ভাইয়ের ছেলের নাম বলায় সে জানতে চায় এই মেয়ে কি গতরাতেই নষ্টামি করেছে, নাকি এর আগেও করেছে?
অনেকেই তার কথায় সায় দিয়ে সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে এবং জানতে চায়।
মেয়েটি বেত কমার আশায় আগের কয়েক রাতের আরও কয়েকজনের নাম বলে। এতে মেম্বারের ছেলে, তার বন্ধু, মাতব্বরের ছেলে এবং তার বন্ধুর নামও চলে আসে।

বিচারের পরিবেশ থমথমে হয়ে যায়। মাতব্বরের পরে মাতব্বর হবে এরকম এক সম্ভাবনাময় তরুণ নতুন রায় ঘোষণা করে, ‘এই মেয়েকে গ্রাম থেকে বিতাড়িত করা হউক।’
মেয়েটি এই গ্রামে তার পিতামাতা, দাদা-দাদী, ভাইবোন, ফুফু (যিনি মেম্বারের চাচাতো ভাইয়ের ছেলের স্ত্রী ) সবাইকে ছেড়ে অন্য গ্রামে গিয়ে একা বেঁচে থাকার কষ্টের কথা ভেবে গলা ছেড়ে কাঁদতে থাকে।

বিচার সভা শেষ। মেয়েটির সমবয়সী দুই তরুণ যেতে যেতে স্বগতোক্তি করে, ‘মেয়ে হয়ে জন্মেছে হুঁশ নেই, নষ্টামি করে, সব্বাই তো তার কাছে যায় , কে যায় না? সমাজ বুঝস না, এখন আরেক গ্রামে যা, বুঝবি কত ধানে কত চাল!

শেয়ার করুন:
  • 160
  •  
  •  
  •  
  •  
    160
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.