একজন ‘শিক্ষক’, ‘বন্ধু’ কিংবা ‘মা’ ছিলেন রুমা ম্যাম

তাইমুর হাসান:

যতটুকু মনে পড়ছে, ২০০৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে কামরুন নাহার রুমা ম্যাম ও রাশেদুল হাসান স্যার ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করেন। প্রথম ক্লাসেই রুমা ম্যাম বাজিমাত করে ফেলেন। আমাদের ব্যাচের ছাত্রদের ইভ্যালুয়েশনে হাইয়েস্ট রেসপন্স পেয়ে রুমা ম্যাম আমাদের শিক্ষক হিসেবে জয়েন করেন। মাত্র দুই বছর আমরা তাকে ক্লাসে পেয়েছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে দেখেছি, কোন ছাত্র যদি দুপুরে অভুক্ত থাকতেন তাহলে রুমা ম্যামের মাথা খারাপ হয়ে যেত। অভুক্ত শিক্ষার্থীদের নিজের লাঞ্চের ভাগ দিয়ে, বেতনের টাকা দিয়ে খাবার কিনে তাকে খাওয়াতেন। অনেকদিন দেখেছি তিনি না খেয়ে ক্লাস নিচ্ছেন। কারণ তাঁর খাবার তিনি কোন শিক্ষার্থীকে মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছেন। কোন শিক্ষার্থী যদি সময়মতো টিউশন ফি দিতে না পারতেন, তাহলে তিনি তাঁর বেতন থেকে সেই টিউশন ফি পরিশোধ করতেন। তবুও যেন কোন শিক্ষার্থীর পড়ালেখা বন্ধ না হয়, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই চেষ্টাটাই করেছেন।

মনে পড়ছে, প্রথম ব্যাচের ছাত্র Mabud Azmi কে তিনি ছেলে হিসেবে গ্রহণ করেন। আজমীও তাকে ‘মা’ বলে ডাকতো। শতাধিক শিক্ষার্থী ম্যামকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নন, আড়ালে তাকে ‘মা’ বলেই ডাকতো। শুধু তাই নয়, কারো পরিবারের কেউ অসুস্থ হলো, ম্যাম তার পুরো পরিবারকে আগলে ধরে রাখতো। কখনো অর্থ, মানসিকভাবে সাপোর্ট দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতেন।

তাঁর ভালোবাসা এতোটাই তীব্র ছিলো, যে তার ভালোবাসাকে উপেক্ষা করার মতো কোন মানুষ পৃথিবীতে থাকতে পারে এমনটা বিশ্বাস হতো না। কোন শিক্ষার্থীর জন্মদিনে ম্যাম একাই সব আয়োজন করে ফেলতেন। আমরা ছিলাম শুধু দাওয়াতি। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে এমন কোন ছাত্র কিংবা ছাত্রী পাওয়া যাবে না, যার জন্মদিন ম্যাম পালন করেননি। ঘরে বাইরে যে যেখানেই থাকুক না কেন ম্যাম তার জন্মদিন যেভাবেই হোক পালন করতেন। আমাদের অনিক মৃধা ওরফে শান্ত মহাসেনের কাছে ম্যামের ব্যাংকের ডেবিট কার্ড পর্যন্ত দিনের পর দিন পড়ে থাকতো। এমনটাও হয়েছে আমাদের কারো টাকা দরকার, ম্যামকে না জানিয়ে টাকা তুলে ফেলতাম। পরে অবশ্য ম্যামকে বলা হলে তিনি শুধু হাসতেন। আমরা বুঝতে পেতাম তিনি খুব খুশি হয়েছেন। তিনি এমন একজন মানুষ, যার পুরো শরীরই ছিলো একটা হৃদয়। ট্যুর করতে মন চাইলেই ম্যাম যেন আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু হয়ে উঠতেন। ছাত্রদের ডাকে সাড়া দিয়ে শুধু বান্দরবানেই ২৭ বারের বেশি ট্যুর করেছেন ম্যাম। অন্য জেলার কথা বাদই থাকলো।

ম্যামকে নিয়ে আমার নানান স্মৃতি রয়েছে। ম্যাম আমার তোলা ছবি খুব পছন্দ করতেন। একটা ক্যামেরা কিনেছিলাম। ল্যান্স কেনার পয়সা ছিলো না। ম্যাম একদিন তার বাসায় ডেকে একটা খামের ভেতরে ল্যান্স কেনার পয়সা দিয়ে দিলেন। ম্যাম শুধু বলেছিলেন, ভালো ভালো ছবি তুলবে। পরে ক্যামেরাটি ছিনতাই হয়ে যায়। আমার ক্যামেরার শোক দেখে খুব দুঃখ পেয়েছিলেন ম্যাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পার হবার পরেও ডিপার্টমেন্টের কোন শিক্ষার্থীর কোন খারাপ সংবাদ থাকলে প্রথমেই তাকে ফোন দিয়েছি। বলেছি তার সমস্যার কথা। জানতাম, ম্যাম থাকলে জীবনে কোন সমস্যাই সমস্যা বলে মনে হতো না। ম্যাম আমাদের শিক্ষার্থীদের যতবার কৃতজ্ঞ করেছেন, সেই তালিকাটা আসলে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। তাকে নিয়ে পুরোদস্তুর একটা উপন্যাস লিখে ফেলা যাবে।

এরপর দিন চলে গেছে খুব দ্রুত। চাকরি জীবন শুরু করার পর যোগাযোগ যে খুব হতো সেটা বলা সমীচিন হবে না। ম্যামই ফোন দিয়ে খোঁজ রাখতেন সবার। দুই মাস আগেও ম্যাম ফোন দিয়ে রাগ ঝাড়লেন, কেন তার খবর নিচ্ছি না। অন্য ছাত্রদের কথা তুলেও আক্ষেপ করেছেন। তাঁর খোঁজ নিচ্ছেনা কেউ। বাসায় যাওয়ার দাওয়াত দিলেন। মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই ফোন দিয়ে শ্রীমঙ্গলে তাঁকে কবে নিয়ে যাবো, সেই কথা আদায় করে নিলেন। নিজ উদ্যোগে ম্যাসেঞ্জারে শ্রীঙ্গলে যেতে আগ্রহীদের নিয়ে একটা গ্রুপ খুললেন। এটাই ছিলো আমাদের রুমা ম্যাম।

এক জীবনে তার ভালোবাসা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি। ধন্য হয়েছি এমন মানুষের সংস্পর্শে আসতে পেরে। অথচ মাত্র ছয়দিন করোনার সঙ্গে লড়াই করে না ফেরার দেশে চলে গেছেন আমাদের রুমা ম্যাম। ভয়াবহ রকমের মানসিক শক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি। এই চরম আকালের সময় তিনি একজন সত্যিকার মানুষ ছিলেন। কিন্তু তার মতো ভালো মানুষও বাংলাদেশের ভঙ্গুর করোনা চিকিৎসা ব্যবস্থার কাছে হেরে গেলেন।

ম্যামের হেরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও হেরে গেছি। একজন কামরুন নাহার ম্যাম মৃত্যুর কাছে হেরে যাবেন ভাবতেই প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে। তাঁর এই প্রস্থান কোনভাবেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।

আজ ৯ আগস্ট ২০২১। এই দিনটির পর কোনদিন আর ম্যামের ফোন পাওয়া হবে না, দেখা হবে না এটাও মেনে নেয়ার নয়। আমরা ড্যাফোডিলের সাংবাদিকতা বিভাগের পুরো পরিবার ভীষণভাবে শোকগ্রস্ত। একজন ‘শিক্ষক’, ‘বন্ধু’ কিংবা ‘মা’ রুমা ম্যামের এই চলে যাওয়া আমরা ভুলবো কীভাবে বলেন?

সকলের কাছে তার জন্য দোয়ার আর্জি করছি। আপনাদের ভালোবাসায় যেন রুমা ম্যাম বেঁচে থাকেন অনন্তকাল সেই কামনা প্রকাশ করছি।

শেয়ার করুন:
  • 273
  •  
  •  
  •  
  •  
    273
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.