কেন চোখে এতো ঘৃণা?

উম্মে শায়লা রুমকী:

আমার গ্রিসের নারী কলিগ একদিন একটা প্রশ্ন করলো। মারিনা প্রায় এক বছর যাবত একটা কুয়েতের বাসায় রোগী দেখতে যায়, সেখানে রোগীর এক তরুণ আত্মীয়ও থাকে। মারিনার সাথে দেখা হলে সে এতোটা বিভৎসভাবে তাকায় যেন মারিনা একটা নর্দমার কীট, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে! মারিনার প্রশ্ন, কেন তার চোখে এতো ঘৃণা?
আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, তোমার কী মনে হয়? একটা অপরিচিত লোক তোমার দিকে ঘৃণার চোখে তাকায় কেনো? কী কারণ হতে পারে?
মারিনা বললো, আমার ধারণা, কিছু পুরুষ নারীদের ঘৃণা করে, তারা নারীদের কাজ, পোশাক, রুচি, যৌন অভ্যাস সবকিছু  নিয়ে মাথাব্যথায় ভোগে। তারা কুকুর-বেড়ালের মতন পোষ্য হিসেবে মেয়েদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, যখন তা পারে না, তখনই ভয়ানক হয়ে ওঠে। ওরা মেয়েদের হাতের মুঠোও রাখাটাই পৌরুষত্ব মনে করে। সম্ভবত লোকটা তাদের একজন। তোমার কী মনে হয়?
আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলাম, হতে পারে! মনে মনে তখন ভাবছি, মারিনার দেয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশে পুরুষের (ম্যানলি ভাবে যারা) সংখ্যা নেহাত কম নয়। এই বিপুল সংখ্যাটা টের পাওয়া যায় সহজেই।
বন্ধুদের আড্ডায়, ম্যাসেঞ্জার কিংবা হোয়াটসআপ গ্রুপে, আনলিমিটেড ফান বা মজার জোকস গ্রুপে যেসব আলাপ হয় তাতে মেয়ে মানুষ, যৌনতা ছাড়া পূর্ণতা পায় না। মদ, জুয়া, যৌনতা, পোশাক, প্রেম, পরকীয়া সবই মজাদার বিষয় যদি তাতে একটা মেয়ে থাকে! নায়িকাদের ছবি অথবা সাধারণ নারী উদ্যোক্তাদের স্নো লিপস্টিক বিক্রির লাইভে যত পুরুষ (কিছু মেয়েও আছে যারা আদতে পুরুষতন্ত্রের ধারক) কমেন্ট করে তাদের মতামত জানায়, সেসব মতামতের একটা ব্যবচ্ছেদ করলে কেবল ঘৃণাই চোখে পড়ে।
নারী উদ্যোক্তাদের ট্রেনিং করাতে গিয়ে গ্রামে ক্ষুদ্র উদ্যোগে নারীদের ত্যাগ, পরিশ্রমের যত গল্প আমার ভাণ্ডারে জমেছে তাতেও দেখেছি বেশিরভাগ পুরুষ তাদের অন্যায় অপরাধের দায় নারীদের উপরে দিয়ে বাঁচতে চায়! দেখেছি, বউ ঘাম ঝরিয়ে যে আয় করে, জামাই  মদ আর জুয়ার আসরে তা উড়িয়ে দেয়। সমাজ সেটাকে অপরাধ বলে না, পুরুষ মানুষ একটু আধটু এমন করবেই বলে মেনে নেয়। উল্টো নারীর আয়ের উৎস নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যায়! বস্তিতে থাকা পেত্নী কিংবা রাজপ্রাসাদে থাকা পরী, কোনো নারীই এ থেকে রেহাই পায় না, সবার আয়ের উৎস যেন একটাই!! পুরুষের সাথে ঢলাঢলি কিংবা বিছানায় না গেলে মেয়েদের বেশি আয়ের ব্যাপারটা সমাজ মানতেই পারে না।
কোনো মেয়ে ভালো রেজাল্ট করলে বলা হয়,  আরে কী করে ক্লাসে ফার্স্ট হলো তা আমাদের জানা! আমাদের সবচেয়ে ভালো ছাত্রটার ব্রেইন ওয়াশ করে, প্রেমের ছলে বেঁধে সব নোট নিয়েছে! সেই ভালো রেজাল্টের মেয়েটা যখন পিএইচডি করে তখন সবাই বলতে থাকে, ডাল মে কুচ কালা হ্যায়! প্রফেসরের সাথে না ঘুমালে এই সুযোগ পাওয়া যায়? এই মেয়েটা যখন কাজের যোগ্যতায় ক্যারিয়ারে ভালো করতে থাকে তখন প্রশ্ন ওঠে পোশাক, মেকাপ, প্রেম, পরকীয়, বসের সাথে কফি খাওয়া নিয়ে!!
আর যখন কোনো সফল নারীর এসব কোনো কিছুই বলার  থাকে না, তখন সবাই বলতে থাকে, “আরে বুঝলে না! এসবে মেয়েটার কোনো হাত নেই! ওর বাবার ছিলো বা জামাই মহা ধনী, তার অবদান।” আমার নিজের তিল তিল করে গড়ে তোলা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে এরকম প্রায়ই শুনতে হয়। বেশিরভাগ লোকের ধারণা, আমি মেয়ে মানুষ, তেমন কিছু করার যোগ্যতা রাখি না, জামাই একটা ফিজিওথেরাপি সেন্টার করে দিয়েছে, তারই দেখাশুনা করি। আমার এসব শুনলে শুরুতে মন খারাপ হতো, এখন আর পাত্তা দেই না, নিজের কাজটাই মন দিয়ে করি!  কিন্তু এই যে, কিছু লোকের  মেয়েদের প্রতি রাগ ঘৃণা, তার আসল কারণ কী?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যে কোনো মানুষের নারী বা পুরুষ হবার পেছনে তার বড় হবার প্রক্রিয়াটি গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকালে সবাই আসলে একতাল নরম কাদামাটির মতোন থাকে। তাকে মানুষ করে তুলতে পরিবার আর সমাজকে দায়িত্ব নিতে হয়। যদি ছোটবেলা থেকেই ছেলেরা শক্তিশালী, বলবান, ক্ষমতাধর, সবল হিসাবে নিজেকে মনে করতে শেখে তাহলে সহজাত কারণেই সে দুর্বলের উপর অত্যাচার, নিজেকে শো অফ করা, দাপট প্রকাশ করাকে দাযিত্ব মনে করবে। অন্যদিকে মেয়েরা নিজেকে যতটা দুর্বল ভাবতে শুরু করবে, যত বেশি ভয়ে, আতংকে কুঁকড়ে যেতে থাকবে, সমাজে ততই অসঙ্গতি, অব্যবস্থাপনা বাড়বে। আমাদের জীবনে ছোটবেলাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ!  এই সময়ে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের ভিত্তি তৈরি হয়।
একটা উদাহরণ মনে পড়ছে। একজন মায়ের দুটো সন্তান, একটি ছেলে, অন্যটি মেয়ে। দুজনের বয়স চার বছর। একটা মাকড়সা দেখে দুজনই ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলো। মা দৌড়ে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ” তুমি না পুরুষ মানুষ! মাকড়শা দেখে ভয় পেতে হয়? ” এই ছোট ছেলেটির মাথায় তখন পুরুষ মানেই ক্ষমতা আর ক্ষমতা মানেই সহজাত অপব্যবহার। অন্যদিকে ভীত মেয়েটিকে মা  চড় মেরে বলে, ” তোকে কতবার বলেছি চিৎকার করবি না, মেয়েদের জোরে শব্দ করতে হয় না, মাকড়শার কাছে কেনো এলি?” এই মেয়েটা বড় হতে হতে জেনে যায়, আতংকে ভয়ে চুপ করে থাকতে হয়। চিৎকার করা যায় না, প্রতিবাদ করতে নেই।
এখনও আমাদের সমাজ মেয়েদের যোগ্যতাকে সম্মান দিতে চায় না। গায়ের রঙ, চোখের ধরন, হাসির মাপ দিয়ে বিচার করে। যে যত কথিত সুন্দরী তার বদনাম তত বেশি। আর যদি কেউ তথাকথিত সুন্দরী না হয় তবু তার যোগত্যাকে আমলে আনার কোনো ইতিহাস পাওয়া যায় না। “মেয়েদের যোগ্যতা কেবল দেহ। যত নরম, কোমল আর আবেদনময়ী ততই আয় বরকত ভালো।” এই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে সমাজ ও সমাজের মানুষগুলো যত দ্রুত বের হবে ততই মঙ্গল। এই বস্তাপচা ভাঙ্গা রেকর্ড আর কত বাজাবে?
মেয়েদের এখন সময়, এসব পাত্তা না দিয়ে কাজে ফোকাস করা, সততা, পরিশ্রমে যে অর্জন সেটাই আমাদের সৌন্দর্য। আর পুরুষদের বলি, আপনারা মেয়েদের মমতা, ভালোবাসা, প্রেমে, গুণে মুগ্ধ হতে শুরু করুন। যত বেশি শরীর আর যৌনতায় প্রাধান্য দিবেন তত বেশি অপূর্ণতা আর ঘৃণাই জন্ম নেবে।
শেয়ার করুন:
  • 162
  •  
  •  
  •  
  •  
    162
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.