ভাষার যাচ্ছেতাই ব্যবহার, আমাদের দৈন্যদশা

মেহজাবিন সিদ্দিকী:

মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো..
জ্বী, ঠিক ধরতে পেরেছেন। উক্ত লাইনটি আমাদের জাতীয় সংগীত হতে আহৃত। বাংলা ভাষার ইতিহাস প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ, এ বিষয়ে কমবেশি জ্ঞান আমাদের অনেকেরই আছে বলে আমার বিশ্বাস। তাই আমি সেই জ্ঞান আর ঝালাই করতে যাচ্ছি না। আমি কথা বলবো ভাষার বর্তমান অবস্থা নিয়ে, যাকে একদা অমৃতের সাথে তুলনা করেছিলেন স্বয়ং বিশ্বকবি।

কবীর সুমন/সুমন চট্টোপাধ্যায় তাঁর একটি গানে বলেছেনে-
“যে ভাষার জন্যে এমন এমন হন্যে, এমন আকুল হলাম
সে ভাষায় আমার অধিকার
এ ভাষার বুকের কাছে মগ্ন আছে আমার অঙ্গীকার।”

সুমন এমন গভীর মমতা দিয়ে গানটি গেয়েছেন যে একবার শুনলে আত্মা প্রশমিত হয় না। আমার হয়নি, আমি পরপর কয়েকবার শুনেছি। অনেক বছর বাংলা ভাষার পরিমণ্ডলের ভাইরে থাকায় ভাষার প্রতি আমার তৃষ্ণা হয়তো একটু বাড়তি। সে যাইহোক, বাংলা ভাষা নিঃসন্দেহে বর্তমান সময়ে পৃথিবীতে প্রচলিত ভাষাসমূহের মধ্যে শ্রুতিমধুর সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই।
বরিশালের কবি কমলেশ পাল বাংলা ভাষাকে জন্মদাগের সাথে তুলনা করেছেন; “কখনো হারিয়ে গেলে জন্মদাগ দেখে চিনে নিও”। এখানে জন্ম দাগ বলতে তিনি বাংলা ভাষাকে বুঝিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষাকে মাতৃদুগ্ধের সাথে তুলনা করেছেন।

বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা না দেয়ায় রক্ত দিতেও দ্বিধা করেনি বীর বাঙালী। ভাষার প্রতি আত্মত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ ২১ এ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। এতো গেল বাংলা ভাষার মাহাত্ম্য সম্পর্কে অল্পবিস্তর আলোচনা। এবার আসি মহিমান্বিত এই ভাষার বর্তমান অবস্থা এবং অবস্থান নিয়ে। দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, একদা ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই জাতি আজ নিজেরাই সেই ভাষাকে এমনভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেছে, যেন বাংলা ভাষায় নিকৃষ্টতর গালিগালাজ ব্যাতিত শ্রুতিমধুর কোন শব্দ নেই।
সৈয়দ ওয়ালি উল্লাহ বলেছেন- “কোন জাতিকে পঙ্গু করতে হলে তার ভাষাকে পঙ্গু করতে হবে।” আমি তাঁর এই উদ্ধৃতিটির সাথে একমত। জাতি হিসেবে আমরা আজ কতটা পঙ্গু তা আমাদের ভাষার ব্যবহার শুনলেই অনুধাবন করা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কয়েকটি ঘটনার দিকে কর্ণপাত করলেই এই বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে। বেশ কয়েক মাস আগে রাজধানীর গুলশানে এক কলেজ ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায়, সেই ছাত্রীর সাথে তার তথাকথিত প্রেমিক; বিশিষ্ট শিল্পপতি, উচ্চশিক্ষিত লোকটির যে ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে তাতে স্পষ্টই শোনা যায় তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত লোকটির মুখের ভাষা কতটা উচ্চমার্গের। একজন শিক্ষিত,উঁচু তলার ব্যক্তি একজন নারীকে, যার সাথে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান; কত কুৎসিত বিশেষণে বিশেষায়িত করতে পারে তা তার কথা না শুনলে বিশ্বাস করা কষ্টকর। আবার এইতো কিছু দিন আগে ঢাকার স্বনামধন্য একটি স্কুলে/ কলেজের অধ্যক্ষের ফোনালাপ ফাঁস হলো! আশ্চর্যের বিষয় হলো সেই অধ্যক্ষও বাংলা ভাষার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে, তার ক্ষমতা আর দাপটের বর্ণনা দিয়েছেন। যে দেশের স্বনামধন্য একটি স্কুল/ কলেজের অধ্যক্ষ এমন ভাষায় কথা বলতে পারে সে দেশের ভাষা শিক্ষার অবস্থা সহজেই আঁচ করা যায়। আর সবশেষে, দুদিন আগে সিনেমার এক নায়িকা ফেসবুক লাইভে এসে সাহায্যের আহবান জানালে, তার দিকে এমন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য মানুষ করেছে যা শ্রবণ বা পাঠ যোগ্য নয়। বাঙালী পুরুষের মগজ বাঁচা মরার উপরে উঠে পর্দাকেই প্রাধান্য দিয়ে গেল আদি অন্ত।

আমরা জানি ভাষা হচ্ছে প্রতিবাদের মাধ্যম বা হাতিয়ার এবং ভাষা সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। এও জানি যুগের সাথে সাথে ভাষা এবং সংস্কৃতি নিয়ত পরিবর্তনশীল। দুদিন আগের ঘটনায় আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, একজন মহিলার প্রতি আমাদের পুরুষ সমাজের মনোভাব! অনেক কাল আগে যেমন যেনার দায়ে মহিলাদেরকে বুক অব্দি মাটিতে পুঁতে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা হতো, অনেককাল পার হয়ে এসেও আমরা এখনো সেই জাহেলিয়াতের যুগেই আছি। সেইকালে সত্যি পাথর মারতো আর এই যুগে পাথর স্বরূপ শব্দ ছুড়ে মারছে। এক একজন যে শব্দগুলো ব্যবহার করে সেই নায়িকাকে গালিগালাজ করেছে, তাতে সেই নায়িকার কতটা ক্ষতি বা লাভ হয়েছে তা জানিনা, তবে ভাষার যাচ্ছেতাই ব্যবহারে আমরা প্রাণের ভাষাকে যে নিকৃষ্ট চেহারা দিয়েছি তা সহজেই দৃষ্টি গ্রাহ্য হয়। আমার শংকা এখানেই শেষ নয়, আমি ভাবছি যে লোকগুলো এরকম একটি জাতীয় মাধ্যমে এসে অন্যকে এমন কুৎসিত গালিগালাজ করে তারা চার দেয়ালের ভেতরে তাদের পরিজনদের কিভাবে সম্বোধন করে, তারা নিত্যদিনে কি ধরনের ভাষার চর্চা করে! আর আমার শংকা যদি সত্যি হয় তবে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে আমরা কী ধরনের ভাষা প্রত্যাশা করবো!

মেহজাবিন সিদ্দিকী

খুব ভালো করে খেয়াল করবেন, আমি এখানে কোন ঘটনাকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছি না, আমি কেবল বলতে চাচ্ছি ঘটনাগুলোকে আমরা যে ভাষায় বর্ণনা করছি সেই বিষয়ে।

একটি দেশে যেমন শিক্ষানীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি প্রভৃতি নীতি থাকে তেমন ভাষা নীতি ও থাকে, দুঃখের বিষয় হলো আমাদের বাংলা অভিধান আছে, বাংলা একাডেমি মানে একটি জড় একাডেমি আছে, যেখানে ভাষা চর্চার কোন সুযোগ নাই। আমাদের সমাজের জন্য কোন ভাষা নীতি এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। বরং বাংলা ভাষা আজ নিজদেশে দ্বিতীয় শ্রেণীর ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। এ ভাষায় কেবল মন খুলে গালিগালাজ করা যায়। নিজেদের ভাষা সম্পর্কে আমাদের ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ অবশিষ্ট নেই। ব্যক্তিগত হতে শুরু করে সামগ্রিক যে কোন স্বার্থেই বাংলা ভাষাকে বঙ্গোপসাগরে বিসর্জন দিতে দ্বিতীয়বার ভেবে দেখবে না এই জাতি। আমি মনে করি ভাষার এই বিপর্যয় সর্বোপরি জাতীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে অতিদ্রুত এবং শুধুমাত্র ভালোবাসা আর দেশপ্রেম দিয়ে এই অবস্থা থেকে উত্তরণ করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন ভাষা নীতি প্রণয়ন করা।

শেয়ার করুন:
  • 238
  •  
  •  
  •  
  •  
    238
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.