জনতার মনস্তত্ত্ব ও নারীর অপরাধ

রোখসানা চৌধুরী:

ফেসবুক মেমোরি না, মস্তিষ্কের মেমোরি থেকে কিছু স্মৃতি ভেসে বেড়াচ্ছে।

১. সালমান শাহের মৃত্যুর পর যতটা আলোচনা হয়েছিল তার এবং তার স্ত্রীর পরকীয়া প্রেম ছিল কিনা, ততোটাই ডিফোকাসড ছিল এফডিসির বিভিন্ন মাফিয়া দ্বারা মানসিক চাপের মুখে আগেও কয়েকবার আত্মহত্যার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল সে,সেসব ইতিহাস।তার মৃত্যুর পর বাংলা সিনেমায় কাট পিসের রমরমা ব্যবসায়ের নজির দেখে কোন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাড়াই সাদা চোখে বোঝা গিয়েছিল কারা লাভবান হয়েছিল তার মৃত্যুতে।সন্দেহভাজন আজিজ মোহাম্মদ ভাই নামের মাফিয়া ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিল দ্রুতই। কিন্তু শাবনূর আর সামিরা যতদিন জীবিত থাকবে ততোদিন পর্যন্ত সালমান ভক্তদের সান্ত্বনা দিতে তাদের বছর-দুই-বছর পরপরই জনতা আর মিডিয়ার আদালতে হাজিরা দিতে থাকতে হবে।

২. পাশের দেশের অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা প্রথমে যৌথ প্রযোজনার ছবি করতে এলেও পরে এদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে, কারণ তার প্রায় প্রতিটি ছবি সুপারহিট হতে থাকে। আমরা কতিপয় ততোদিনে সিনেমা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও এদেশে তখনও সিনেমা হলে ব্ল্যাকে টিকেট বিক্রি হতো। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের সিনেমার দশা তখন পড়তির দিকে। ঋতুপর্ণাকে নিয়ে যখন প্রযোজকরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে তখন সোহেল রানা ও তার দল ঘোষণা দিল ,অশ্লীল ঋতুপর্ণা এদেশের সিনেমার জন্য ক্যান্সার বিশেষ। অথচ সেই সব অশ্লীল দৃশ্যে হুমায়ুন ফরিদীর মতো অভিনেতারাও অংশ নিয়েছিল, সে কথা আজ আর কারো মনে থাকার কথা না।
আর সোহেল রানা স্বয়ং একজন স্ট্রাগলিং এ্যাকট্রেসের গণ ধর্ষণের সাথে জড়িত ছিল,সেই বিবৃতি দেয়ার জন্য কথিত অভিনেত্রীর নাম নিশানাসহ সে মিশে গিয়েছিল — এ কথাও কারো মনে থাকার কথা না।
ঋতুপর্ণাকে এদেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নিজের দেশে ফিরে গিয়ে প্রচুর ভালো ছবি আর প্রচুর পুরস্কারে ভূষিত হয়ে সে তার যোগ্যতার সাক্ষর রেখেছে।

৩.  একইভাবে বাংলা সিনেমা যখন একটা পর্যায়ে কাট পিসের ছড়াছড়িতে বেহাল অবস্থা পার করছে,সেই সময় বহুমুখী চাপ সামলাতে না পেরে কাট পিস ব্যবসায়ীরা মুনমুন ময়ূরীদের এফডিসিতে বয়কট ঘোষণা করে।

নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া যে তিনটি প্রসঙ্গ তুলে ধরা হলো, সেখানে সকল অঘটন ছাপিয়ে নারীই হয়ে উঠেছে মূল অপরাধী। ইতিহাস বাকিদের ক্ষমা করেছে। কারণ ইতিহাসের স্রষ্টা রাজা এবং প্রজা উভয়ই পুরুষ পক্ষ।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এখানে বিনোদনের ভোক্তা মূলত সাধারণ মানুষ। আবার যখন কর্তৃপক্ষ নানা স্বার্থে ফেইক নৈতিক অবস্থানে দাঁড়াচ্ছে তখনও সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব তাদের সমর্থন দিয়ে যায়। এদেশের মানুষ গোপনে পর্নো দেখে, ‘খারাপ জায়গা’য় যায়, যারা যেতে পারে না তারা অবদমনে ভোগে। অথচ শুক্রবার জুমার নামাজের সময় সমস্ত দেশ শুনশান হয়ে যায়। নিজেদের অপরাধবোধ বা গিল্টি ফিলিং থেকে মুক্ত হতেও তারা নারী বিষয়ক যে কোন খবরের নিচে গালিগালাজ দিয়ে যায়।

এদেশে কাউকে স্বৈরাচার বলে গালি দিলেও জনতাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, কী কারণে অমুককে স্বৈরাচার বলা হয়, কেউ বলতে পারবে না। কিন্তু ক’জন নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল তা সবার নখদর্পণে থাকে। শুধু তাই না, একজন রাষ্ট্র প্রধান কিংবা মাওলানার বহুগামিতা জনতার মনে সরস ভঙ্গিমায় অবস্থান করে, যে অনুভূতিতে বেশির ভাগটুকুই থাকে সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ।
কে বলেছে জনতার হাতে ক্ষমতা নেই, জনতাই শেষ পর্যন্ত সকল নৈতিক মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেয়। জনতাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে। স্বাস্থ্য খাতের দুর্দশা,তীব্র বেকারত্ব, নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে নীরব দুর্ভিক্ষ, সর্বোপরি করোনার আতংক উপেক্ষা করে নায়িকার খবর নিতে ভিড় করে মিডিয়া। কারণ মিডিয়া জানে জনগণ কোন খবরটি কিনবে এবং গোগ্রাসে খেয়ে নেবে।
জনগণের মতামতের নিরিখেই অপরাধী মামুনুল জামিন পায়, ঝুমন দাস আটকে থাকে ফাটকে, অনির্দিষ্টকালের জন্য।

জনতার মনস্তত্ত্বই দেশ ও জাতির ভবিষ্যত নির্ধারণ করে। এটা সবচেয়ে ভালো বুঝেছিল রবার্ট ক্লাইভ।জনতার মনস্তত্ত্বকে শেকড় থেকে পরিবর্তন করতে হলে আগে ভাবতে হবে আমরা নিজেরাও সেই পরিবর্তনে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছি কিনা — পরীমনি প্রমুখকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করছি, নাকি ‘চরিত্রহীন নারী’ হিসেবে।

আমার এক ছাত্র প্রশ্ন করেছে, ‘মামুনুল তার স্ত্রী নিয়ে রিসোর্টে গেলে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হলো, অথচ পরীমনি গভীর রাতে বোট ক্লাবে স্বামী ছাড়া গেল, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল না কেন?’
এরকম প্রশ্ন নিশ্চয়ই লক্ষ লক্ষ মানুষের মাথায় ঘুরপাক খেয়ে চলে, একনিষ্ঠ ঐক্যের সাথে। আর যারা সমঝদার তারা দ্বিধা বিভক্ত থাকে প্রতিটি বিষয়ে। হিজাব প্রসঙ্গে সুশীল শ্রেণীভুক্ত একটি মহল বেশ সোচ্চার এবং নমনীয়। অবদমিত জনতার মনস্তত্ত্বের নিরিখে তারাও ‘ভালো-মেয়ে’, ‘মন্দ-মেয়ে’র সীমানা নির্ধারণে অংশ নিয়ে নিচ্ছেন, হয়তো নিজেরই অজান্তে। তারা দয়া করে মডেল সুজানার গতকালের পেইজটি ঘুরে আসুন। পর্দা করার জন্য সে নাকি এখন সর্বত্র সম্মান পাচ্ছে। একই খবর নায়িকা সানাইকে নিয়েও। ক্লাইভের মতো ওরাও বাঙালি জনতার মনস্তত্ত্ব বুঝে গেছে। শুধু প্রশ্নবিদ্ধ রয়ে যায় সুশীল, প্রগতিশীল হিসেবে চিহ্নিত কতিপয় মুখ। যাদের চেনা বলে ভাবা হয়েছিল এতদিন, এখন নারী ক্রমশ লাইমলাইটে আসায় তাদের অবস্থান পরিষ্কার হচ্ছে।

আসুন আমরাও নির্ধারণ করি, আমাদের গন্তব্য কতদূর? আমরা কী বলতে এসেছিলাম, কতটুকুই বা এগোতে পারলাম! পথ বড় বেশি বন্ধুর যে!
মনে রাখা অতীব জরুরি, ঐক্য যাদের, জয় তাদের সুনিশ্চিত।

শেয়ার করুন:
  • 258
  •  
  •  
  •  
  •  
    258
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.