বিবাহ বিচ্ছেদে কারণ-অকারণসমূহ

মেহজাবিন সিদ্দিকী:

বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল বলেছিলেন,”মানুষ সামাজিক জীব”। মানুষ আদতেই তাই, সামাজিক জীব। অপরদিকে দিনশেষে সবাই একা, এ কথাটিও সত্য। আমি মনে করি মানুষ সামষ্টিক হয়েও একা হতে পারে। জীবনের প্রয়োজনে মানুষ সামষ্টিক আর নিজের বোধের জায়গায় সে একা। এই সামষ্টিকতা এবং একাকিত্ব দুটো মিলিয়েই মানব এবং মানব সভ্যতা। আর সামগ্রিক এই মানব সভ্যতার ক্ষুদ্রতম এবং প্রাচীনতম সংগঠন হলো পরিবার। পরিবার হলো মানুষের মানুষ হয়ে উঠার প্রথম ও মৌলিক প্রতিষ্ঠান। সভ্যতার ক্রমবিকাশের পথ ধরে একান্নবর্তী পরিবার পরিবর্তিত হয়ে আজ ক্ষুদ্র পরিবারে রূপান্তরিত হয়েছে।
সত্যি বলতে শুধু পরিবার নয়, বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশের সাথে সাথে জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক কিছুই আকারে দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। আমার উদ্বিগ্নতার কারণ হলো, এই ক্ষুদ্র পরিবারও আজ হুমকির সম্মুখীন। নানা কারণে ভেঙে যাচ্ছে এই পরিবার কাঠামো। আমি theindependentbd.com এর এক সমীক্ষা থেকে কিছু তথ্য প্রত্যক্ষণ পূর্বক দেখতে পাই বাংলাদেশে প্রতি ৩৭ মিনিটে একটা বিবাহ বিচ্ছেদ ফাইল করা হয়, আর প্রতিদিন ফাইল হয় ৩৯ টি। এর মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগ ডিভোর্স ফাইল হয় নারীদের পক্ষ থেকে, ৩০ ভাগ হয় পুরুষের পক্ষ থেকে। গত সাত বছরে ডিভোর্সের হার বেড়েছে শতকরা ৩৭ ভাগ। এ বছরের মে মাস পর্যন্ত ৫৯৭০ টি ডিভোর্সের আবেদন করা হয়েছে।

ভাবছেন এতো বিষয় থাকতে আমি কেন শুরু থেকেই ডিভোর্স নিয়ে কথা বলছি। কারণ নিশ্চয়ই আছে এবং কারণ অত্যন্ত গুরুতর। কারণ আমিও এরিস্টটলের কথার সুরে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, “মানুষ সামাজিক জীব”। আর এই সমাজব্যবস্থার ক্ষুদ্রতম সংগঠন হলো পরিবার, সামাজিক ব্যবস্থার প্রোটন বলতে পারেন পরিবারকে। ঠিক যেমন পদার্থের ক্ষুদ্র উপাদান অণু, আর সেই অণুর প্রধান উপাদান হলো প্রোটন (আত্মা)। আমি উদ্বিগ্ন এই কারণে যে সমাজের এই আত্মা বা পরিবার আজ ক্ষয়িষ্ণুতার মধ্য গগনে অবস্থান করছে। আর ক্ষয়িষ্ণুতার এই শিখরে আরোহন করতে পরিবার কাঠামোকে পাড়ি দিতে হয়েছে হাজার বছর। আমি চাই এবং বিশ্বাস করতে ভালোবাসি যে, সময়ের সাগর পাড়ি দিয়ে কালে কালে আমরা উন্নত হবো।

কিন্তু আদতে আমরা তা পারছি কই? প্রতিনিয়ত ভাঙনের সম্মুখীন হয়ে আমরা মানসিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, একাডেমিক সমস্ত দিক হতে পিছিয়ে পড়ছি। আর এই ভাঙন সামলাতে এতো সময় আর এনার্জি ব্যয় করছি যে, সমাজ আর রাষ্ট্রকে সেরাটা দিতে পারছি না। সঙ্গত কারণেই এই সময় ব্যয় করতে হচ্ছে নিজেদের জন্য। একটি শূন্য পাত্র যেমন আরেকটি শূন্য পাত্রকে পূর্ণ করতে পারে না, তেমনি নিজেকে অসুখী রেখে সমাজ বা রাষ্ট্রকেও সুখী করা যায় না, বা সেরাটা দেয়া যায় না। আমি বিশ্বাস করি ব্যক্তিজীবনে সফল না হলে কর্মজীবনে সফল হওয়া দুষ্কর। তবে সফলতা অবশ্যই আপেক্ষিক, এ বিষয়ে আমার কোন মতবিরোধ নেই।

আমি আরও বিশ্বাস করি যে প্রায় প্রতিটি মানুষই চায় পরিবার গঠন করে সুখী জীবনযাপন করতে। এজন্য সে ভালোবেসে ঘর বাঁধে। কথায় আছে “Together we can do better.” কিন্তু আমরা আশাহত হই তখন, যখন দেখি Better তো দূরে থাক, একসাথে পাশাপাশি থাকাই অসম্ভব হয়ে উঠছে। অনেকক্ষেত্রে জীবনমরণ সমস্যা হয়ে উঠছে, অসম্ভব হয়ে উঠছে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা। আমার মতে, আত্মসম্মান যেখানে প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন সেখানে এক মুহূর্তও অবস্থান করা উচিত নয়। তবে মাথায় রাখতে হবে আত্মসম্মানবোধ আর আত্ম অহংকার এক জিনিস নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে কমদামি কাপড় পরতে রাজি, সাধারণ খাবার খেতে রাজি, সাধারণ বাড়িতে থাকতে রাজি, কিন্তু আমার সম্মান যেখানে খর্ব হয়, আমাকে যেখানে শ্রদ্ধা করা না হয়, সেখানে রাজপ্রাসাদতুল্য বিত্তবৈভব থাকলেও আমি এক মুহূর্ত অবস্থান করবো না। আমি মনে করি নারীপুরুষ নির্বিশেষে তার আত্মসম্মান এবং আত্ম অহংকার বিষয়ে সচেতন থাকা উচিত।

এবার আসি ভাঙনের কথায়, theindependentbd.com তাদের রিপোর্টে বিবাহ বিচ্ছেদের ১৮টি কারণ উল্লেখ করেছে। এই কারণের বাইরে আরও কারণ থাকতেই পারে, তবে আমি এই ১৮টি কারণ নিয়ে অল্পবিস্তর কথা বলবো। আমি খুব ভালো বুঝতে পাচ্ছি আমার এই আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে, পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি হলে কোন অভিযোগ থাকবে না।

1. At present women are too conscious about their position which hastens divorce.

এখানে বলা হয়েছে নারীরা তাদের পজিশন (জায়গা) সম্পর্কে অতি সচেতন বলে ডিভোর্স তরান্বিত হচ্ছে। এখানে কি বলা যায়, পুরুষরা তাদের পজিশন সম্পর্কে সচেতন না, অথবা তারা যোগ্যটাই পাচ্ছে? পুরুষরা সচেতন হোক বা নাই হোক বা তারা তাদের যোগ্যটাই পাক বা না পাক, এখানে নারীদেরকেই বোঝানো হয়েছে।
ধরে নিলাম এই কারণটা সত্য, নারীরা অতি সচেতন। আমার তো মনে হয় সচেতন হওয়াই উচিত। তবে আমি এখানে নারী না বলে মানুষ বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবো। মানুষ মাত্রই সচেতন থাকা উচিত সে কতটুকু পাওয়ার যোগ্য এবং কতটা সে পাচ্ছে! যদি একটি সম্পর্কে কখনও কারও মনে হয় যে, সে যা পাচ্ছে বা তাকে যেভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, আদতে সে তার চেয়ে বেশি পাবার যোগ্য, তাতে দোষ কেন হবে! আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষ যখন অনুভব করে যে সে তার যোগ্য প্রাপ্য পাচ্ছে না, সাথে সাথেই সে বিবাহ বিচ্ছেদের মতো কঠিন সিদ্ধান্তে যায় না। কারণ এই অভিজ্ঞতা কারো জন্যই সুখকর হয়। সে তার সঙ্গীর (স্বামী /স্ত্রী) সাথে এই বিষয়ে একবার দুইবার না, অসংখ্যবার বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করে। বার বার করাঘাত করেও যখন আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না, তখনই সে কেবল বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়। আর এই কারণে বিবাহবিচ্ছেদ হলে আমি বলবো নারীর আত্মসচেতনতা পুরুষ, পরিবার, সমাজ সর্বোপরি রাষ্ট্র মেনে নিতে হিমশিম খাচ্ছে। এখানে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

2. In today’s mechanical civilization, the conflict of personality between husband and wife accelerates divorce.

মেকানিক্যাল বা যান্ত্রিক সিভিলাইজেশন বলতে এখানে যদি আধুনিক সিভিলাইজেশন বুঝানো হয়, তবে আমি বলবো, সময়ের সাথে সাথে সভ্যতার পরিবর্তন হবেই, সেটা ধনাত্মক বা ঋণাত্মক যাই হোক। আর সমস্ত সভ্যতারই ভালোমন্দ দুটো দিকই থাকবে। অধিকন্তু শুধু সভ্যতার নয়, যেকোনো জিনিসেরই ভালোমন্দ দুটো দিকই থাকে। আমরা কোনটা নেবো বা কোনটার চর্চা করবো, তার দায় আমাদেরই। তাই ডিভোর্সের কারণ হিসেবে সভ্যতার ক্রমবিকাশের দিকে আঙ্গুল তোলাকে আমার যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয় না। তবে ব্যক্তিত্বের সংঘাত একটি ভ্যালিড পয়েন্ট বলে মনে হয়েছে, অধিকন্তু শুধুমাত্র এই সংঘাতকে কেন্দ্র করে বিবাহ বিচ্ছেদ সবক্ষেত্রে নাও হতে পারে। বিপরীত ব্যক্তিত্বের দুটো মানুষ সারাজীবন পাশাপাশি থাকতে পারে যদি তাদের মধ্যে বোঝাপড়াটা ভালো হয়।
আমার মতে ব্যক্তিত্বের সংঘাত তখনই বিচ্ছেদের মতো কঠিন সিদ্ধান্তের কারণ হয় যখন একজন তার ব্যক্তিত্বকে জোরপূর্বক আরেকজনের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। অনেকটা এরকম “একই আকাশ মাথার উপর এক কেন ভাবছো না?” মাথার উপরে একই আকাশ থাকলেও দুইজন মানুষ আকাশকে দুইভাবে দেখতেই পারে! এই সাদামাটা হিসেবটা সাদামাটা রাখলে অনেক সংঘাতই এড়িয়ে চলা যায় বলে আমি বিশ্বাস করি।

3. Mutual respect, trust, and love between husband and wife are disappearing day by day which is the reason for divorce.

যদি এভাবে বলি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বিশ্বাস আর ভালোবাসা দিন দিন উধাও হয়ে যাওয়া বিচ্ছেদের কারণ, তবে বলতে হয় শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস দুটো immaterial অনুভূতি, যা যেকোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রেই অতি গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্কে এদের অভাব হলে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি থেকেও দুটো মানুষ সাতসমুদ্র দূরত্বে চলে যায়। স্বামী স্ত্রী সম্পর্কের মতো অন্য সম্পর্কগুলো কাগজে কলমে দলিল করে তৈরি হয় না বলেই তাদের ভেঙে যাওয়া আমরা সেই অর্থে টের পাই না। আর ভালোবাসা, সে তো শ্রদ্ধা আর বিশ্বাসের সমন্বয় বৈ কিছু নয়। মানুষ হিসেবে আমাদের মানবিক হওয়া এবং তার প্রয়োগ বাস্তব জীবনে জরুরি।

4. Lack of tolerance in conjugal life is taking an acute shape.

এখানে দাম্পত্য জীবনে সহ্য ক্ষমতার অভাব সংসার ভাঙ্গার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে। প্রকৃত অর্থেই কি মানুষের সহ্য ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, নাকি সাথে সাথে অত্যাচারের মাত্রাও বেড়েছে! অনেক কাল আগে যখন মেয়েরা কেবলমাত্র ঘরসংসার করতো, তখন তাদের সাথে হওয়া অনেক অন্যায়ই হয়তো মেনে নিত, কারণ সংসার ছাড়া অন্য নিরাপদ এবং উত্তম কোন উপায় তার কাছে ছিল না। এখন সমাজেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, মেয়েরা স্বাবলম্বী হয়েছে, তাই মা-নানীরা যে অত্যাচার সহ্য করেছে, সেই একই অত্যাচার মেনে নিতে এখনকার মেয়েরা রাজি নয়। কেনই বা নিবে! এখানে একটা বিষয় খেয়াল করার মতো, অত্যাচার আগেও হতো, এখনও হয়, কারণ এইরূপ ব্যবহার পরিবারের মধ্যে থেকে মানুষ বংশানুক্রমিকভাবে ইনহেরিট করছে। তফাৎ যেটা হয়েছে তা হলো, এখন মেয়েরা revolt করতে শুরু করেছে, যার যথাযথ কারণও আছে।
আরও বললে এভাবে বলা যায়, দুটো ভিন্ন পরিবেশ থেকে দুটো আলাদা মানুষ এক ছাদ আর চার দেয়ালের মাঝে যখন থাকতে শুরু করে তখন সংঘাত হওয়া অবশ্যম্ভাবী কিছু নয়। আর আমার পর্যবেক্ষণ মতে সামগ্রিকভাবেই মানুষের সহ্য ক্ষমতা কমে গেছে। এর কারণ হিসেবে, যে ধরনের পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে আমরা বেড়ে উঠি তার তীব্র প্রভাব। আমরা বড় হই তীব্র চাওয়া আর না পাওয়ার ভেতর, অনেক আশা আকাঙ্খা অবদমনের ভেতর। আমরা বড় হই অপর পক্ষের উপর দোষ চাপিয়ে এবং নিজেকে নির্দোষ একটি স্থানে দেখতে দেখতে। আমাদের সবসময়ই যুক্তি খাঁড়া থাকে নিজেকে নির্দোষ ভাববার। কারণ, এতে আমাদের মানসিক স্বস্তি আসে। আমরা কখনো শিখি না নিজের দিকে তাকাতে, আমরা ভাবি অপর পক্ষ তো মানছে না, আমি কেন মানবো! আমরা এটা খুব কম সময়েই ভাবি যে, অন্যে যা করছে করুক, আমি আমারটুকু সঠিকভাবে করি। আমরা কেবলই আমার আমার করি, আমিকে আমরা আর অপরের প্রতি আমার দায়িত্ব ও কর্তব্যকে পাশ কাটিয়ে যাই চতুরভাবে।

5. Bad temper, suspicion, self-ego, indifference, impatience are the reasons for breaking up the family.

এখানে বলা হয়েছে, বদমেজাজ, সন্দেহ করা, নিজেকে সবসময় সঠিক ভাবা এবং অন্যকে ছোট ভাবা, অপরের পছন্দকে গুরুত্ব না দেয়া, অপরের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন না করা, ধৈর্যহীনতা ইত্যাদি সংসার ভাঙ্গার ক্ষেত্রে দায়ী। উপরে উল্লেখিত কোন বিশেষণকেই পজিটিভ অর্থে ব্যবহার করা যায় না এবং এগুলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করারও প্রয়োজন দেখছি না। পাশাপাশি যে মানুষটির সাথে থাকবেন তার মধ্যে যদি এতোগুলো বদগুণের সমাহার থাকে তবে কতকাল তাকে সহ্য করা যাবে! সে যতোই ভালোবাসা থাকুক না কেন!
এখন কথা হলো মানুষের মাঝে এরূপ নেতিবাচক স্বভাব কেন গড়ে উঠে? এর উত্তরে আবারও সামাজিক-পারিবারিক প্রেক্ষাপটকে দায়ী করা যায়। মানব শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে সে থাকে কাদামাটির মতো, বিভিন্ন সামাজিক এবং পারিবারিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে সে পরিণত হয় একটি মস্ত প্রস্তরখণ্ডে। এরপর যখন সে আরেকটি প্রস্তরখণ্ডের সাহচর্যে আসে তখনই শুরু হয় সংঘর্ষ। তাই আমাদের উচিত হবে নিজেদের যথাসম্ভব নমনীয় রাখা, মানে ঐ জায়গাটুকু রাখা, যাতে করে পরিবর্তন বা নতুন কিছুকে সহজে গ্রহণ করতে পারি। জীবনের কোন পর্যায়েই এটা ভাববার কোন কারণ নাই যে, আপনি সব জেনে গেছেন, সব বোঝেন, সবাই আপনার কাছ থেকে শিখবে এবং আপনি যা হুকুম করবেন তাই তামিল করতে তটস্থ থাকবে।

6. The negative effects of TV serials, Facebook, and social media are considered to be the cause of breaking-up of family.

নেতিবাচক টিভি নাটক, ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমের স্বেচ্ছাচার ব্যবহার সংসার ভাঙ্গার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে। আফসোসের বিষয় হলেও এগুলো সংসার ভাঙ্গার নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। কিছু কিছু মানুষ সামাজিক মাধ্যমকে জীবনের শোকেস হিসাবে ব্যবহার করেন, আর তাদের ফলো করতে গিয়ে অন্যরা আফসোস করতে করতে স্বামী /স্ত্রীর সাথে বিভিন্ন বিবাদে জড়ান। একজন দামি গাড়ি/ওভারসিস ট্রিপ চায়, তো আরেকজন মিয়া খলিফা চায়। আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে এই কারণটি অত্যন্ত নিম্ন মানসিকতা এবং যথাযথ জ্ঞানের অভাবের পরিচায়ক। মস্তিষ্ক নামক বাক্সে বিন্দুমাত্র ঘিলু থাকলে এই কারণটি সহজেই উপেক্ষা করা যায়।

7. Extramarital affairs, taking drugs and romance also cause divorce.

বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এই কারণটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, পরকীয়া। পশ্চিমা দেশগুলোকে যতই গালমন্দ করুন না কেন, সেখানে এ বিষয়গুলো বেশ কম। পশ্চিমা দেশগুলো যা কিছু খারাপ মনে করে ফেলে দেয়, আমরা সেটাই স্ট্যাটাস মনে করে তুলে নেই, অনেকটা ফাস্ট ফুডের জোয়ারের মতো। আর সেক্স সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ এক জাতি যখন নীল/হলুদ ছবি দেখে সঙ্গম করতে যায়, তখন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি ঠেকানো দুষ্কর হয়ে পড়ে, যার ফলাফল ভয়ংকর হতে বাধ্য। সাঁতার না শিখে যদি আপনি সার্ফিং বোর্ড নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে নামেন, ফল কী হবে, নিশ্চয়ই সুখকর কিছু নয়! সেক্স সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা এবং যথেষ্ট শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকাই এর জন্য দায়ী বলে আমার বিশ্বাস।

8. Husbands’ addiction to other women is considered to be a vital reason for divorce.

এই কারণের মধ্যে স্বামীর অন্য নারীর সাথে সম্পর্ককে সংসার ভাঙ্গার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে। কথা হলো স্বামীরা অন্য নারীর দিকে কেন ধাবিত হয়? আমার মতে, প্রথমত স্বামীর নৈতিক চরিত্রের দোষ; এরা জীবনেও ঠিক হবে না। এই স্বভাবের মানুষের সাথে বসবাস করা সত্যিই অসম্ভব। আর দ্বিতীয়ত স্ত্রীর অবহেলা, সন্দেহবাতিকতা, অতি মাত্রায় খিটমিট ইত্যাদি হতে পারে। এই কথাগুলো হাস্যকর মনে হলেও অতি সত্য। দিনশেষে মানুষ ঘরে ফিরে শান্তি চায়, আর তা না পেয়ে যখন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় পড়ে, তখন সে অন্য দরজা – জানালা খোঁজে নি:শ্বাস নিতে। এখানেও এসবের কারণ হিসাবে সামাজিক- পারিবারিক অবক্ষয়, যথাযথ জ্ঞানের অভাব বলে আমার মনে হয়। উপযুক্ত শিক্ষা এবং পারষ্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করা যেতে পারে।

9. Forgetting own culture and tradition and leaning towards western culture.

নিজের সংস্কৃতি ভুলে পশ্চিমা সংস্কৃতি মতে জীবনধারণ করতে চাওয়া বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে। ইন্টারনেটের বদৌলতে সমস্ত দুনিয়া আমাদের আঙ্গুলের ডগায়। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আমরা যতটুকু শিখি তার অনেকটাই পশ্চিমা দেশগুলোতে অনাদৃত। কিন্তু সেগুলো দেখেই আমরা না হই পুরোপুরি পশ্চিমা, না ছাড়ি নিজের সংস্কৃতি। অনেকটা দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার মতো। এক কথায় যদি বলি আবার বলতে হয়, পশ্চিমারা যা ফেলে দেয় আমরা তা পরম যত্নে তুলে নেই স্ট্যাটাস মনে করে এবং শেষপর্যন্ত সামলাতে না পেরে নিজের এবং অন্যের জীবনের চৌদ্দটা বাজিয়ে ছেড়ে দেই, সামগ্রিকভাবে সামাজিক অবক্ষয় ডেকে নিয়ে আসি। আবারও এর কারণ হিসেবে আমার যথাযথ শিক্ষার অভাব বলে মনে হয়।

10. Husband domineering attitude towards wife.

স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কর্তৃত্বপরায়ণতা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং পারিবারিক পরিমণ্ডল এই কারণের জন্য দায়ী বলে আমি মনে করি। আমরা কেবল পুরুষতন্ত্র এবং নারীবাদ নিয়ে কথা বলে যাই। সহাবস্থানের জায়গায় নিজেদের মানসিকতাকে ঠিকমতো মেলে ধরতে পারি না। আরও স্পষ্ট করে বলা যায় অধিকাংশ নারী এবং পুরুষ উভয়েরই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বর্তমান সামাজিক কাঠামোর মধ্যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা লালন করে। মেয়েদের আমাদের সমাজে আজ অবধি শরীরসর্বস্ব, মাথা মোটা, পরজীবী ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে শেখেনি। আর এই অবস্থা লালনপালন করতে নারী-পুরুষ উভয়ের ভূমিকাই স্বতন্ত্র।
এখানে একটা বিষয় খেয়াল করার মতো, অত্যাচার আগেও হতো, এখনও হয়, কারণ এইরূপ ব্যবহার পরিবারের মধ্যে থেকে মানুষ বংশানুক্রমিকভাবে ইনহেরিট করছে। তফাৎ যেটা হয়েছে তা হলো এখন মেয়েরা revolt করতে শুরু করেছে, যার যথাযথ কারণও আছে।

11. Breaking up of a joint family and living an isolated life.

আগেই বলেছি সব দিকের ভালো এবং মন্দ দুটো দিকই আছে। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যখন মাইক্রো পরিবার তৈরি হয় তখন সমস্ত আশা আকাঙ্খা একজনকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতে থাকে। একান্নবর্তীতে যেখানে আশা আকাঙ্খাগুলো বিভিন্ন সদস্যদের মাঝে বিভাজিত হয়ে যেত। মাইক্রো পরিমণ্ডলের ব্যস্ত পরিসরে মানুষ প্রতিনিয়ত পারিবারিক ও কর্মজীবন নিয়ে চাপের মুখে পড়ে যায়। ঘড়ির কাঁটার মতো চলতে চলতে তারও দম ফুরিয়ে আসে। সে মুক্তি খোঁজে পুনরায় বিভাজিত হয়ে।

12. Being too busy at the office/workplace and not giving time to family.

উপরের কারণের সাথে এই কারণের সম্পর্ক ঘনিষ্ট।
মাইক্রো পারিবারিক কাঠামোয় সঙ্গীর নিকট হতে সবকিছু প্রত্যাশা করা এবং পারিবারিক জীবন আর কর্মজীবনের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারা এখানে সংসার ভাঙ্গার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে। আমাদের সামাজিক কাঠামো, পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার অভাব, সময়ের সুষম বণ্টনের অপারদর্শিতা, সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় অদক্ষতা সমস্ত কিছুই এর জন্য দায়ী।

13. Working women cannot spend much time in the family which is seen by many as the reason for divorce.

আমার মতে, কর্মজীবী নারীদের সাথে তাদের সঙ্গীদের বোঝাপড়া ঠিকঠাক নয় বলে এটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। আপনি কর্মজীবী নারী বিবাহ করবেন, আশা করবেন সে সংসারে অর্থনৈতিকভাবে কনট্রিবিউট করবে, আবার একইসাথে চাইবেন আপনাকে রেঁধে খাওয়াবে বা আপনার সবরকম পারিবারিক আচার অনুষ্ঠানে সে উপস্থিত থাকবে, সেটা তো সম্ভব নয়। আপনি নিজেও একসাথে সবদিক সামলাতে পারবেন না। আগে নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়াটা ঠিকমতো করুন।

14. Not having the tendency to accept the little mistakes of conjugal life.

এবারেও বলতে হয় দোষ-গুণ মিলিয়েই মানুষ। অন্য সবার মতো আপনিও পার্ফেক্ট নন। মানুষ প্রতিনিয়ত ভুল করে এবং শিখে। আপনার সঙ্গীর ছোট ছোট ভুলগুলো মেনে নিতে শিখুন। তবে অবশ্যই নজরে রাখতে হবে কোনটা ইচ্ছাকৃত ভুল এবং পুনরাবৃত্তি। একই ভুল বারবার করলে তা আর ভুল থাকে না, তা হয়ে যায় অভ্যাস। আর খারাপ অভ্যাস প্রয়োগ করে ভালো ফল আশা করলে তো হবে না। নিজের বোধের জায়গায়টা পরিষ্কার করা জরুরি। যথাযথ মানবিক শিক্ষার ঘাটতি এবং মেনে নেবার প্রবনতার উপর গুরুত্বারোপ করা উচিত।

15. Social pressure on continuing conjugal life is vanishing gradually and it is a cause of divorce.

প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সামাজিক চাপ দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটাতে প্রভাব রাখে। আমার কাছে বিষয়টি যথাযথ মনে হয়নি।

16. Not giving proper maintenance to the wife.

আপনি যদি বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিয়ে করেন তবে জেনে রাখবেন, নিকাহনামায় যে কয়টি ডট পয়েন্ট আছে তার মধ্যে একটি হলো স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে হবে। স্ত্রী উপার্জনক্ষম হলেও এর কোন হেরফের হবে না। আমার বিশ্বাস অধিকাংশ স্বামী নিকাহনামার ডট পয়েন্টে কী কী সম্পর্কে বলা আছে তা জানেন না। এক্ষেত্রে আবারও আমি অসচেতনতা, অজ্ঞতা এবং সর্বোপরি পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাধারার দিকে ইঙ্গিত করবো।

17. Torture to wife for dowry.

যৌতুক, বিবাহ বিচ্ছেদের আদিম কারণের মধ্যে একটি, এখানেও সামাজিক, পারিবারিক অবক্ষয়, অশিক্ষা, নারীর পশ্চাৎপদতা গভীরভাবে প্রভাব রাখে।

18. Drug addiction, impotence and infertility.

মাদক দ্রব্যের অপব্যবহার, শারীরিক অক্ষমতা; মানে সঙ্গী/সঙ্গিনীর শারীরিক চাহিদা মেটাতে সমর্থ না হওয়া এবং সন্তান জন্মদানে অক্ষমতা।
মাদক গ্রহণ করার ফলে সংসারে অর্থনৈতিক সমস্যা শুরু হতে পারে, মাদক নেয়ার কারণে সঙ্গী/সঙ্গিনীর উপর বিভিন্নভাবে শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার হতে পারে। মাদকের ভয়াবহ দিক সম্পর্কে আমাদের কারোরই অজানা নাই। মাদক মানুষকে অন্যকিছুতে রূপান্তরিত করে ফেলে। তার হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। নিজের জন্মদাত্রী বা সন্তানদেরও হত্যা করার ক্ষমতাও তখন সে রাখে। মাদকাসক্তের সাথে সংসার হয় না। শারীরিক অক্ষমতা বিষয়ে বিশেষ কিছু বলার প্রয়োজন নেই। আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে বিবাহ শারীরিক চাহিদা মেটানোর একমাত্র উপায়। এই চাহিদা মৌলিক চাহিদার চেয়ে কোন অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই শারীরিকভাবে মানুষ বঞ্চিত হলে বিবাহ বিচ্ছেদের মতো সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। নিকাহ নামায়ও উল্লেখ আছে সঙ্গী/সঙ্গিনী শারীরিক চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে বিচ্ছেদের ব্যবস্থা নেয়া যাবে। সন্তান ধারণের অক্ষমতা হিসেবে বিবাহ বিচ্ছেদ দেখানো হয়েছে। এই কারণটিও একান্ত ব্যক্তিগত এবং বোঝাপড়ার বিষয়। আমি অনেক স্বামী স্ত্রী দেখেছি নিঃসন্তান, পাশাপাশি সুখে আছে আবার ডজনখানেক সন্তানও বিবাহ বিচ্ছেদ ঠেকাতে পারেনি।

বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে উপরে উল্লেখিত যে পয়েন্টগুলোকে হাইলাইট করা হয়েছে তার অধিকাংশই এলিমিনেট করা যায় যথাযথ শিক্ষা (জীবনভিত্তিক শিক্ষা), পারিবারিক – সামাজিক কাঠামোর উন্নয়ন, আর্থসামাজিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ইত্যাদির মাধ্যমে। জীবন একটা জার্নি। পথের যেমন বাঁক আছে, জীবনেরও তেমন! আপনি যেমন পুরো পথ সরলরেখায় গাড়ি চালাতে পারবেন না, পথের বাঁক অনুযায়ী আপনাকে স্টিয়ারিং ঘোরাতে হবে, না হলে সংঘর্ষ অনিবার্য। জীবনও তেমন, পরিবর্তন ও চাহিদা অনুযায়ী মানসিকতাকে পরিবর্তন, পরিবর্ধন করতে না পারলে জীবন আপনার হয়ে থাকবে না, আপনাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে না।

বিবাহ বিচ্ছেদ যে পথে আগাচ্ছে আজকের সমাজে তা আদতেই শুভকর কিছু নয়। একা জীবন কষ্টের এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও হুমকিস্বরূপ। গবেষণায় প্রমাণিত, একা থাকলে মানুষের আয়ু কমে যাওয়া, কর্মক্ষমতা হ্রাস পাওয়াসহ অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির দিকে ধাবিত করে। একা থাকা কোন আইডিয়াল জীবনব্যবস্থা নয়। তবে সর্বোপরি এটাও সত্য পাশাপাশি থেকে প্রতিনিয়ত অসুখী, অপমানিত, অবহেলিত হবার চেয়ে একা থাকা ঢের উত্তম।

শেয়ার করুন:
  • 228
  •  
  •  
  •  
  •  
    228
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.