“ঘটনা সত্য” নাটক ও কিছু প্রশ্ন

দিনা ফেরদৌস:

“ঘটনা সত্য” নামে নাটকটি নিয়ে বেশ আলোচনা, সমালোচনা হচ্ছে দেখে মনে হলো আমারও কিছু বলার আছে এখানে। তার আগে একটু কাহিনীর বর্ণনা দেই।

একজন কাজের বুয়া ও একজন গাড়ির ড্রাইভার, দুজনেই নিজের জায়গায় অসৎ। বুয়া কখনও চুরি করে খায়, তো কখনও রেগে গিয়ে গৃহকর্ত্রীর খাবারে থুথু মিশিয়ে দেয়। এদিকে ড্রাইভার গাড়ির মালিককে না জানিয়ে অন্য যাত্রী তুলে বাড়তি টাকা কামায়, গাড়ির মালিকের অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ফাঁস করে দেয়। পরবর্তীতে এই জুটি বিয়ে করে এবং তাদের এক স্পেশাল চাইল্ড জন্ম নেয়, যার এক পায়ে সমস্যা।

নাটকটিতে মেসেজ দেয়া হচ্ছে, এটা বাপ-মায়ের পাপের ফল, যা বাচ্চাকে ভোগ করতে হচ্ছে। দেখা যায়, বাপ-মা তাদের পাপের জন্যে অনুশোচনা করছে। আমাদের অনেকেই এই বিশ্বাস করি যে পাপ করলে তার ফল ভোগ করতে হয়, ফলে কাউকে পাপ থেকে দূরে রাখতে এইসব ভয় দেখাই। কিন্তু কথা হচ্ছে আমাদের সৃষ্টিকর্তা কি এতোই নির্দয় যে নিষ্পাপ একটা বাচ্চাকে তার মা-বাবার পাপের শাস্তি দিবেন? আমরা এও বিশ্বাস করি, তিনি অসীম দয়ালু। দুটি বিষয় কি তাহলে সাংঘর্ষিক হয়ে গেলো না? এখন যদি কেউ বলেন, ভয় দেখিয়ে অন্যায়কে ঠেকানোর জন্যে ভালো কাজের উৎসাহ হিসেবে নাটকটিকে দেখলেও চলে, তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই যে এতো এতো ভয় দেখানো হয়, আমাদের সমাজ কি পাপ মুক্ত হয়েছে আজও?

এই যে করোনাকালে মানুষকে এতো ভয় দেখানো হলো যে করোনা একটি গজব। ভয়ে দলে দলে মানুষ মুমিন হচ্ছে, আমেরিকার পার্লামেন্টে তিলাওয়াত হচ্ছে, দোয়া পড়লে করোনা হবে না, মুমিনের করোনা হয় না, কেউ কেউ গোবর মাখছেন, গরুর মূত্র পান করছেন, মালা জপ করছেন। নিজের ধর্মের পথে আহবান করা পূণ্যের কাজ। ভয় দেখিয়ে যদি অন্যায় ঠেকানো যায় তো আরও ভালো। কিন্তু যখন মুমিনদের করোনা হলো, মারা যেতে লাগলো, দোয়া বা জপ দিয়ে করোনা ঠেকানো গেলো না, তখন আসল মেসেজ পরিষ্কার হয়ে গেলো। মানুষ টিকার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলো, অক্সিজেনের জন্যে হাহাকার করতে লাগলো। শেষে মসজিদ, মন্দির বন্ধ করে দিয়ে হসপিটালের দিকে দৌড়াতে শুরু করলো।

সিলেটে প্রচলিত একটি কথা আছে, “দোয়ায় পোয়া ওয় না” (মানে দোয়া করলেই পুত্র সন্তান লাভ হয় না) । ফলে মানুষ নিয়ম মেনে দোয়া করে ঠিকই, কিন্তু সন্তান পেতে হলে ডাক্তার দেখাতে হয় এটা বিশ্বাস করে। এই ব্যাপারে ধর্মকে তার জায়গায় রেখে হিন্দুদের ঘৃণা করা খাঁটি মুমিনও পারলে হিন্দু দেশ ভারতে গিয়ে হিন্দু ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়ে আসেন।

কথা হচ্ছে, ভালোর শুরুটা যদি মিথ্যা মেসেজ দিয়ে শুরু করা হয় তার পরবর্তী রেজাল্ট ভালো হওয়ার আর কোন উপায় থাকে না। দোয়া, জপ করা ভালো কাজ। উঠতে, বসতে, খেতে, ঘুমাতে পাঠ করলে অনেক ছওয়াব বা পূণ্যি হবে। তবে এই পড়লেই এই হবে ওই হবে বলার পর যখন ফল উল্টো হয় তখন জপ ও দোয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ধর্ম আমাদের পালন করা উচিৎ, তা না করে আমরা সুবিধামতো ব্যবহার করতে গিয়ে ধর্মকে উল্টো কলুষিত করি।

নিজের ব্যক্তিগত কিছু কথা বলি।

আমার প্রথম দুটি বাচ্চা যদি রাখতে চাইতাম, তবে তারাও স্পেশাল চাইল্ড হতো। আমার হরমোনাল কিছু সমস্যা থাকায় এই অবস্থা। ডাক্তার সব পরিস্থিতি বুঝিয়ে সিদ্ধান্ত আমাদের উপর ছেড়ে দিলেন। বাচ্চার বাপ আমাকে না জানিয়েই তার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। পরেরবারও যখন একই অবস্থা, অনেক কান্নাকাটি করে বললাম, এইবার বাচ্চা রেখে দেবো যাই হোক। এইবারও বাচ্চার বাবা বললেন, ইচ্ছেমতো যেন কেঁদে নেই, ভবিষ্যতের কান্না থেকে বেঁচে যাবো। তৃতীয়বার আমার সুস্থ সুন্দর একটি মেয়ে হয়। সে সুস্থ থাকলেও আমি এতোটাই অসুস্থ ছিলাম যে ডাক্তারকে নির্ধারিত সময়ের আগেই অপারেশন করতে হয়। তারপর আরও একবার বাচ্চা নিতে গিয়ে খুবই বাজে অবস্থা। পঞ্চমবার আমেরিকার মতো জায়গাতেও ডাক্তাররা আমাকে নিয়ে ভয় পেয়েছে। অসংখ্য টেস্ট তো আছেই । মাঝখানে ডাক্তাররা বলেছিল, যদি সমস্যা হয় তো পেটে থাকা অবস্থাতেই বাচ্চাকে ইঞ্জেকশন দিবে। শেষে কিছুই লাগেনি, সব ঠিকঠাক মতোই হয়েছে বলা যায়, কিন্তু স্বাভাবিক ডেলিভারি আর হয়নি, অপারেশন লেগেছে। এই বাচ্চা হওয়ার আগেও বহুবার হসপিটালে কাটাতে হয়েছে আমাকে।

আজ আমার দুইটা ছেলে-মেয়েই সুস্থ স্বাভাবিক, এর থেকে আনন্দের আর কিছুই হতে পারে না কোন মা-বাবার জন্যে। আর যাদের বাচ্চা সুস্থ স্বাভাবিক না, তাদের কষ্টটা কী তা অন্যের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। না দেখে শুধুমাত্র পেটে বাচ্চা নিয়ে যদি সেই বাচ্চাদের কথা আমি আজও ভুলতে না পারি, তো যারা অসুস্থ বাচ্চা নিয়ে দিন রাত কাটাচ্ছেন তাদের মানসিক অবস্থা কী হতে পারে তা অন্যদের কল্পনার বাইরে।

আমি অনুরোধ করবো প্লিজ , অন্যের অসুস্থ বাচ্চাকে নিয়ে খোঁচাতে যাবেন না। পাপ পূণ্যের বিচারের ভার আপনার আমার না। বহু সুস্থ মানুষও হুট করে পড়ে গিয়ে হাত/ পা ভেঙ্গে যেতে পারে। বহু বাচ্চাই জেনেটিক কারণে মায়ের অপুষ্টি বা হরমোনাল সমস্যার কারণেও বহু প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা করালে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সারানো সম্ভব। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না, তার সাথে মা-বাবার পাপের বা কর্মের কোন যোগসূত্র নেই। এই ধরনের মেসেজ দেয়া এক ধরনের অপরাধ, দুর্বল মুহূর্তে মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

বলার জন্যে বলা যায় অনেক কিছুই ,তবে কাউকে কোন মেসেজ দিতে হলে সততার সাথে, নৈতিকতার সাথে বিবেক খাটিয়ে সঠিকটাই দিন। মিথ্যা দিয়ে সত্যকে প্রতিষ্টিত করতে গেলে পরোক্ষভাবে মিথ্যাটাই প্রতিষ্ঠিত হয়।

শেয়ার করুন:
  • 62
  •  
  •  
  •  
  •  
    62
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.