কন্যা সন্তান এবং পিতামাতার মনোভাব

মেহজাবিন সিদ্দিকী:

বেশ কয়েকদিন ধরেই ভাবছিলাম কন্যাসন্তান এবং তাদের প্রতি পিতামাতার মনোভাব নিয়ে।
বাংলাদেশের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মের সুবাদে আমার নিজের অভিজ্ঞতা এবং চারপাশের সমাজ দর্শনপূর্বক কিছু উপলব্ধি আমার মনের দরজায় বার বার চপেটাঘাত করে। সেই আঘাত সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে, ক্লান্ত পরিশ্রান্ত আমি অবশেষে কিবোর্ডের শরণাপন্ন হলাম।

সে যাই হোক, আসল কথায় ফিরি। বাংলাদেশের সামাজিক পরিস্থিতিতে একটি কন্যা সন্তান যবে থেকে মায়ের গর্ভের অন্ধকার ঘরে সাঁতরে বেড়ায়, তবে থেকেই কন্যার পিতামাতার মস্তিষ্কে একটি কথাই ঘোরাফেরা করে। কন্যাকে একটি উপযুক্ত পাত্রে পাত্রস্থ করতে পারলেই জীবন সার্থক। অপরদিকে পুত্র সন্তানের বেলায় চিন্তাটা হলো, পুত্র বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হয়ে, সংসারের হাল ধরবে। তো একটি মানব শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণের সাথে সাথেই তার প্রতি, তার পিতামাতার মানসিকতা গড়ে উঠতে শুরু করে। সন্তান গর্ভে পূর্ণতা পেতে থাকে আর এদিকে সন্তানের লিঙ্গের উপর ভিত্তি করে পিতামাতার মানসিকতা আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেড়ে উঠতে থাকে।

ফলশ্রুতিতে কন্যা সন্তানটি ভূমিষ্ট হতে হতেই তার ভাগ্য আশি ভাগ নিশ্চিত হয়ে যায়, তার পিতামাতার মস্তিষ্কে। তাকে বড় করা শুরু হয় ‘সুপাত্রে’ পাত্রস্থ করার জন্য। সে লেখাপড়া, খেলাধুলা, শিল্প সংস্কৃতি সব কিছুরই চর্চা করবে, তবে সবকিছুর মধ্যেই গোপন অভিসন্ধি হলো, রূপে গুনে যোগ্য পাত্রী হয়ে গড়ে উঠা।

অনেক পিতামাতা আবার তাদের কন্যা সন্তানকে এসবের কোন কিছুতেই আগ্রহী করে না বা সাপোর্ট দেয় না। তাদের যুক্তি হলো, কন্যা সন্তানের পেছনে এত খরচ করে কি লাভ! ওরাতো একটা সময় অন্যের ঘরেই চলে যাবে। তার চেয়ে বরং ঐ টাকা সঞ্চয় করে রাখাই ভালো। বিবাহের সময় কাজে দিবে। এইসব পিতামাতারা তাদের নিজেদের কন্যা সন্তানের চেয়ে অপরিচিত একটা পরিবার এবং সেই পরিবাবের পুরুষ সন্তানের উপর বেশি আস্থাশীল। কন্যার পিতামাতারা অন্ধের মতো বিশ্বাস করে যে অজানা-অচেনা পুরুষ আর তার পরিবার, তাদের কন্যাকে সযত্নে লালন পালন করবে আজীবন! আফসোস! সত্যিকার অর্থে পিতামাতা হিসেবে তারা নিজেরাই যখন সন্তানের উপর আস্থা রাখেনি, কন্যা সন্তান বলে, সেখানে ভিন্ন পরিবারের কাছে এতটা নিশ্চিত আশা তারা কিভাবে করে! এই প্রশ্নটি আমার ছোট মস্তিষ্ককে কোন সদুত্তর দিতে পারে না!

এইসব কন্যার পিতামাতারা কোন দিন ভাবেও না যে অন্যের সন্তানের উপর এতোটা বিশ্বাস না করে নিজের কন্যা সন্তানটিকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুললে, আখেরে কন্যা এবং তার পিতামাতা হিসেবে তাদেরই লাভ বেশি। আমি অবাক হই এই ভেবে যে, নিজের সন্তানের (কন্যা) উপর পিতামাতার এহেন অবিশ্বাস/অনিশ্চয়তা আর অপরিচিত জনের সন্তানের উপর এরূপ দৃঢ় বিশ্বাস/নিশ্চয়তা, কবে -কিভাবে পাকা পোক্ত হয়ে কন্যার পিতামাতার মস্তিষ্কে জেঁকে বসলো!

একবারও কি পিতামাতা হিসেবে তারা ভাবেন না যে, এত কষ্ট আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে সন্তানকে (কন্যা) পৃথিবীর আলো দেখালেন, এতোটা বড় করলেন, তাকে কি করে এতোটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ছেড়ে দিবেন! সে যদি প্রকৃত কোন মানুষকে সঙ্গী হিসেবে পায়, তবে অবশ্যই ভালো। এখানে পরিষ্কার করে বলি, প্রকৃত সঙ্গী বলতে কন্যা ও তার সঙ্গীকে কম্পাটেবল বুঝাতে চেয়েছি। কিন্তু যদি আপনার কন্যা প্রকৃত মানুষকে সঙ্গী হিসেবে না পায়, তবে কন্যার জন্য কী ভয়াবহ দূর্বিষহ জীবন অপেক্ষা করছে, তা আপনি দুঃস্বপ্নেও দেখতে চাইবেন না। আর এহেন পরিস্থিতিতে কন্যাটির যদি শিক্ষাগত যোগ্যতা, মানসিক আত্মনির্ভরশীলতা, আত্মসম্মানবোধ আর চারিত্রিক দৃঢ়তা না থাকে, তবে এই স্বার্থপর পৃথিবীতে কিভাবে মাথা উঁচু করে টিকে থাকবে সে!

সবচেয়ে বড় কথা হলো, জীবন একটি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলা যান, সে ছুটে চলেছে ওয়ান ওয়ে রাস্তায়। প্রত্যেকের জীবন তার নিজেকেই চালাতে হবে। অন্যের উপর ভরসা করে পরজীবী বৃক্ষের মতো বা অন্যের গাড়িতে যাত্রী হয়ে তাকে জীবন কাটাতে হবে না! বরং প্রয়োজনে যেন সে, নিজেই অন্যের বোঝা কিছুটা হালকা করতে পারে, সেভাবেই তাকে গড়ে উঠা উচিৎ।

আর কন্যার পিতামাতারা, বর্তমান যুগ ও সমাজের দিকে দৃষ্টিপাত করে দেখুন। সন্তানকে কন্যা বা পুত্র নয়, মানুষ হিসেবে দেখুন এবং গড়ে তুলুন। আমি সেই সমাজের স্বপ্ন দেখি যেখানে পিতামাতা তাদের কন্যা সন্তানটিকে বড় করবে মানুষের মতো। শিক্ষিত, চৌকস, আত্মবিশ্বাসী, মানবিক, সব পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার দৃঢ়তা, পরোপকারী, মানসিক এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে।

আমি সমস্ত পিতামাতার সন্তানদের দেখতে চাই আদর্শ মানুষ হিসেবে। আমি চাই পিতামাতারা তাদের সন্তানদের উপর রাখুক অপার আস্থা, অন্ধ বিশ্বাস নয়। পৃথিবীর কেউ যদি আপনার কন্যার পাশে না থাকে তবু্ও যেন সে ভেঙ্গে না পড়ে, এই শিক্ষা আর আত্মবিশ্বাস তার মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিন প্রথম দিন থেকেই। সে নিজেই তার জন্য যথেষ্ট এই বিশ্বাস তার মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিন জীবনের শুরুতে। সবার আগে সে মানুষ, এই বিষয়টি তার মনে যেন সর্বদা জেগে থাকে অন্ধকার সমাজের প্রদীপ হয়ে, পিতামাতা হিসেবে আপনাদের দায়িত্ব হচ্ছে এই দিক্ষায় সন্তানদের আলোকিত করা। যোগ্য সন্তান পেতে হলে যোগ্য পিতামাতা হওয়া অত্যাবশকীয়।

শেয়ার করুন:
  • 369
  •  
  •  
  •  
  •  
    369
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.