পাপ-পূণ্যের হিসাব করে কারা!

শাহমিকা আগুন:

‘ল্যাংড়া, ল্যাংড়া — ঐ যে ল্যাংড়া যায়। তোমরা দেখো রে আসিয়া ল্যাংড়া হাইটা যায় ল্যাংড়াইয়া ল্যাংড়াইয়া। হা হা হা’।

অনেকেই এধরনের মন্তব্যের সঙ্গে পরিচিত। আমিও। তবে একটা পার্থক্য রয়েছে। আমরা প্রায়ই এ ধরনের কটু মন্তব্যের শিকার হতাম এবং নীরবে মাথা নিচু করে হেঁটে চলতাম মুখে একটা টুঁ শব্দ না করে। আমাদের সামনে বা পাশে বাজপড়া বটবৃক্ষটির মতো মাথাটি একেবারে বুকের সাথে ঝুলিয়ে দিয়ে না শোনার মতো করে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে চলতো আমার বাবা। আমার বাবাকেই ল্যাংড়া ডাকতো পাড়ার ছেলেরা। কারণ আমার বাবার একটা পা ছোট। সবসময় খুঁড়িয়ে হাঁটতো। এখনও।

আমাদের বাড়ি ঢাকার মুগদাতে। আমাদের পাশের বাসার বাড়িওয়ালার একটা চোখ ছোট। এলাকায় তাকে ডাকা হতো কানা বলে। পাশাপাশি দুই বাড়ির মালিক এর একজন কানা এবং একজন খোঁড়া হওয়ায় এলাকার কিছু লোক খুব মজা পেতো। এলাকায় আমাদের পরিচয় ছিল কানা-লুলাদের বাড়ি বলে। কখনও বাবার কাছের মানুষজনদের দেখিনি বাবাকে সম্মান করে কথা বলতে। বাবা সবসময় সোশাল এংজাইটিতে ভুগেছেন। আমরাও এলাকাতে থাকতাম অনেকটা না থাকার মতো করেই। বাবা নিজে কোথাও যেতেন না। আমাদেরও যেতে দিতেন না।

আমরা যত বড় হতে লাগলাম বাবাকে বিভিন্ন নামে ডাকা ছেলেগুলোর সংখ্যাও বন্ধ হতে লাগলো। টিভিতে একতা নাটক এসেছিল। মেয়েটি খুঁড়িয়ে হাঁটে। অনেক ভালো অভিনেতা অভিনেত্রী অভিনয় করেছিল। একটা দৃশ্য ছিল যে নায়ক ব্যঙ্গ করে নায়িকার খুঁড়িয়ে হাঁটা নিয়ে। পরদিন থেকে রাস্তায় আমার বাবাকে দেখলেই তার সামনে বা আশেপাশে অনেক অল্প বয়স্ক ছেলেরা সেভাবে ব্যঙ্গ করে হাঁটতো। মুখে কিছু বলতো না। আমি ভেবেছিলাম টিভিতে দেখিয়েছে, তাই ছেলেরা কপি করছে। কী আর করা যেতে পারে! আমার বাবা বছরের পর বছর খুঁড়িয়ে চলা সমাজে কিছু মানুষ নামের অমানুষদের অসুস্থ বিনোদনের খোরাক হয়েছিল। আমার দাদা- দাদির কোন না কোন পাপ এর ফলই হবে আমার বাবা! যদিও আমার দাদা মারা যাবার পর খুব অল্প বয়সে সংসারের হাল ধরেছিল। তার পা তাকে রুখতে পারেনি তখন।

আমার বাবার বড় মেয়ে আমি। আমার ঘটনা তো আরও ভয়াবহ। আমি জন্ম নেয়ার মাত্র বার ঘণ্টা পরে আগুন লেগে আমার নানাবাড়িসহ পুরো গ্রামের অর্ধেকটা জ্বলে গেল। সেই বারো ঘণ্টা বয়সী আমি তখন থেকে ‘ডাইনি’ উপাধি পেয়েছিলাম। আমার ডাক নাম হয়ে গেল ‘কুফা’। কারণ আমি পৃথিবীতে নাকি ধ্বংসের প্রতীক হয়ে এসেছিলাম। আমার মাকে ডাকা হতো ‘ডাইনির মা’ বা ‘কুফার মা’। পুরো পরিবারে, পুরো গ্রামে যা কিছু খারাপ হতো, সবকিছুর জন্য আমাকে দায়ী করা হতো। সেইসাথে মুখ ঝামটা দেয়া হতো আমার মাকে। আমার মা প্রথম সন্তান আমাকে নিয়ে তার মাতৃত্বের আনন্দ উপভোগ করতে পারলেন না।

ধরে নিলাম আমার পাপ করা দাদা-দাদির ঘরের দ্বিতীয় সন্তান আমার বাবা, তার ঘরে আমি এলাম এবং আমার সতের বছর বয়সী মা এবং আমার বাবা যার বেশিরভাগ সময় কেটেছিল চাকরি করে তার মা এবং পাঁচ ভাইবোনের চাহিদা পূরণ করা- তারা দুজনেই নিশ্চয়ই ভয়াবহ ধরনের কোন পাপ করেছিল যার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ঘরে জন্ম নিয়েছিল আমার মতো ডাইনি কুফা এক কন্যা সন্তান। কারও গরু মারা গেছে আমার দোষ, কেউ পরীক্ষায় খারাপ করেছে, আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাই পাশ করতে পারেনি, কারও বিয়েতে গিয়েছিলাম, বেশ কয়েক বছর পর ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল, যেহেতু সেই বিয়েতে আমি উপস্থিত ছিলাম, তাই আমার দোষ ছিল। আর আমি নিজে একসময় তা বিশ্বাসও করতাম। বছরের পর বছর আমি বিশ্বাস করতাম যে আমি কোন অশুভ শক্তি। আমি মানেই দুর্ভাগ্য। আমি কোনভাবেই আয়নাতে নিজের চেহারা দেখতে চাইতাম না। নিজের দিকে তাকাতে ভয়ে বুক ধক করে উঠতো। বাথরুমে মুখ ধোয়ার সময় এক হাত কপালে দিয়ে চোখ ডেকে রাখতাম যেন নিজের চেহারা দেখতে না হয়। আমার অন্ধ বিশ্বাস ছিল নিজেকে দেখলে অশুভ কিছু হবে। আমি ক্লাস নাইন পর্যন্ত এভাবেই চলতাম। আমি আর আমার বাবা সারা পৃথিবীকে এড়িয়ে চলতে চাইতাম। শুধুমাত্র মানুষের কথার ভয়ে।

ক্লাস টেন পড়ার সময় একজন মানুষ এসেছিলেন আমার জীবনে এবং জীবনকে পাল্টে দিলেন। আমি অংকে খুব খারাপ ছিলাম। সব বিষয়ে ভাল নম্বর পেলেও গণিতে টেনেটুনে পাশ করতাম। স্কুলে প্রতিদিন মার খেতাম গণিত শিক্ষকের কাছে। আমার মা আমার জন্য একজন শিক্ষক ঠিক করলেন । আমি শিক্ষককে দেখে মূর্ছা যাবার দশা। তার নাম ছিল দত্ত। পোলিও সারভাইভার। খুঁড়িয়ে হাঁটতেন। কিন্তু পোলিও হয়ে তার চোখ-মুখ বদলে গিয়েছিল। মুখ ছিল কানের কাছে। একটা চোখ বড় , একটা চোখ ছোট। অনেকেই তার কাছে পড়তে আসতো না তার চেহারার কারণে। তাকে সবাই ভূত বলে ডাকতো। প্রতিবন্ধী ডাকতো। সেই শিক্ষক আমাকে অঙ্ক শেখালেন। আমি জেনারেল মেথ আর হায়ার মেথ এ ৯৮ করে নম্বর পেয়েছিলাম। আর সেই শিক্ষক আমায় বোঝালেন যে মানুষ কুফা হতে পারে না। আমি ধীরে ধীরে আয়নায় নিজের চেহারা দেখা শুরু করলাম।

ধরে নিলাম আমার পাপ করা দাদাদাদির ঘরের দ্বিতীয় সন্তান আমার খোঁড়া বাবা আর আমার সতের বছর বয়সী মা, যারা জীবনে তখন অনেক পাপ করে ফেলেছিলেন যে তাদের ঘরে আমি এলাম এবং আমি বড় হয়ে যখন বিয়ে করলাম এবং আমার সন্তান হলো অটিস্টিক এবং এপিলেপটিক —তো আমি এবং আমার সন্তানের বাবার তো পাপের কোন শেষ নেই! তাই আমাদেরকে শাস্তিস্বরূপ এরকম সন্তান দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমার আর আমার সন্তানের ক্ষেত্রে এসে ঘটনা হয়ে গেলো উল্টা। আমার সন্তানের কারণে আমি এখন পৃথিবীতে আমার সেক্টরে একটি পরিচিত নাম । আমার ছেলে এগারো বছর বয়সে বই লিখেছে এবং তা প্রকাশিত হয়েছে এমাজন থেকে। আমেরিকার বিখ্যাত একটি প্রতিষ্ঠান আমাদের সঙ্গে কাজ শুরু করেছে যেন আমার তৈরি করা পদ্ধতি ব্যবহার করে পৃথিবীর লক্ষ অটিস্টিক বাচ্চা এবং পরিবারকে সাহায্য করতে পারা যায়। সময় এলে সবই প্রকাশ করা হবে।

এতো ভালো কিছু যখন হচ্ছে তখন ‘পাপ’ শব্দটি কেন বারবার ব্যবহার করে যাচ্ছি? কেননা বাংলাদেশের একটি নাটকে খুব সুন্দর করে মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে সন্তান অসুস্থ হয় বাবা-মায়ের কর্মফলের কারণে। ইনকিবিউটরে রাখা শিশুদের ছবি দেখিয়ে ঘোষণা করা হয়েছে যে পাপ কাউকে ছাড়ে না। পাপ করলে শাস্তি পেতে হয়। নাটকে বাবা-মা চুরি করেছে, তাই তাদের সন্তান জন্মেছে স্পেশাল নিড বাচ্চা হিসেবে, যে ডান পা নিয়ে কখনও হাঁটতে পারবে না। বাংলাদেশ, ইন্ডিয়ার নাটক-সিনেমাতে ডিসেবল মানুষ নিয়ে যে পরিমাণে তামাশা করা হয়েছে , ব্যঙ্গ করা হয়েছে, তা অমানবিকতার সকল সীমা পার করে ফেলেছে বছরের পর বছর। মানুষকে সহজেই বয়রা, কানা, বামন, লুলা, — এধরনের জঘন্য নামে ডেকে টেলিভিশনে এবং বড় পর্দাতে তাদেরকে হেয় করা হয়েছে। একবারের জন্যও ভাবা হয়নি এ মানুষগুলোর মনগুলো কত ছোট হয়ে যাবে!

বাবার কারণে, আমার নিজের কারণে, আমার ছেলের কারণে আমার পথ চলা তা অন্য সবার চেয়ে অনেক ভিন্ন। নির্যাতিত মানুষদের নিয়েই কাজ করা হয়েছে জীবনের বেশির ভাগ সময়। পৃথিবীর একটি আদিম এবং সহজ খেলা হলো কাউকে পাপী হিসেবে অপবাদ দেয়া। পাপ কী? পূণ্য কী ? খুন করা, ধর্ষণ করা, জুয়া খেলা, অন্যের হক মেরে খাওয়া। তো স্পেশাল নিডস বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা কতজন খুনি বা ধর্ষক বা জুয়াড়ি? আপনাদের কাছে গবেষণার কোন ফল আছে ? থাকলে জানাবেন দয়া করে।

পৃথিবীর প্রতিটি সক্ষম মানুষ কোথাও না কোথাও অসক্ষম, আবার প্রতিটি অসক্ষম মানুষ কোথাও না কথাও সক্ষম। আপনি আমি যতই বড়াই করে বলি যে আমরা দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন, আলো না থাকলে এই শক্তি কোথায়? অথচ যে অন্ধ শিশুগুলো আমার ক্লায়েন্ট তাদের বাবা -মা বলে যে তারা অন্ধকারে এমনভাবে ঘুরে বেড়ায় যে মনে হয় যেন সব দেখছে। এটাই তাদের সক্ষমতা।

আপনার সক্ষমতা আছে ভালো কথা। অন্য মানুষের কম আছে বলে তাকে শুলে চড়াতে হবে কেন আপনার?

২০১৯ সালে আমার একজন অটিস্টিক শিশুর বাবা তার শিশুর ব্যর্থতা, অন্ধকার ভবিষ্যৎ ইত্যাদি নিয়ে তার সহকর্মীর টিপ্পনী সইতে না পেরে সেই রাতে ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। একজন বাবাকে এতোটা ট্রিগার করে, অপমান করে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়ে কী মজা পেলো তার কলিগ?

মায়েদের কথা আর নাই বা বললাম। ঘুঁটে কুড়ানো দাসীর মতো জীবনযাপন করছেন। শুধুমাত্র সন্তান নিয়ে টিকে থাকার জন্য পৃথিবীর সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছেন। তাদের এই চেষ্টা, নিজেকে প্রতিনিয়ত আপগ্রেড করার প্রবল চেষ্টাকে পাপ বলে তা নষ্ট করে দেয়ার কোন অধিকার আপনাদের নেই। আমার বাবা, আমার প্রতিবেশী, আমার ছোটবেলা অনেক সুন্দর হতে পারতো। আমার বাবার বাড়ি, প্রতিবেশীর বাড়ি কানা-লুলার বাড়ি না হয়ে পরিচিত হতে পারতো চৌধুরী বাড়ি বা ভুঁইয়া বাড়ি নামে, কিংবা বাশার সাহেবের বাড়ি নামে। আমার বাবা একটা সম্মানিত জীবন কি ডিসার্ভ করতো না?

আমি জোর দাবি জানাচ্ছি সরকার যেন কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে বুলিং বন্ধ করে। মানুষকে তার খুব দুর্বলতা দিয়ে বিচার করা যাবে না। আঘাত করা যাবে না।
নাটকে বা বড় পর্দায় প্রতিবন্ধী শব্দ ব্যবহার বন্ধ করে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শব্দটি ব্যবহার শুরু করার আবেদন জানাচ্ছি। পাপ-পূণ্য দিয়ে বিচার না করে মানবিকতা নিয়ে দেখার চেষ্টা করবেন।

শেয়ার করুন:
  • 257
  •  
  •  
  •  
  •  
    257
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.