দীর্ঘসময় ধরে নারীরা ক্ষমতায়, খুব বেশি পরিবর্তন এলো কি?

নাহিদা নিশি:

বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, “মাননীয় স্পিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর ক্ষমতায়ন বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন আসলে কোথায়?” সেসময় সংসদে উপস্থিত থাকা প্রধানমন্ত্রী নিজেকে, স্পিকারকে এবং বিরোধী দলীয় নেতাকে ইঙ্গিত করে নারীর ক্ষমতায়ন দেখান। এতে করে বিরাট হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। আমাদের আশেপাশেও এরকম অনেকে আছেন যাদের সাথে নারী অধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলেই তারা বলে বসেন, ‘দেশটা তো চালাচ্ছেই নারীরা, আর কীসের অধিকার চান আপনারা?’

হ্যাঁ, প্রায় ত্রিশ বছর অর্থাৎ আড়াই যুগ ধরে দু’জন নারী পালাক্রমে দেশ পরিচালনা করছেন। ২০২১ সালে এসেও যখন আমেরিকার মতো উন্নত একটি দেশ নারী প্রেসিডেন্টের জন্য প্রস্তুত হতে পারেনি, সেখানে আমরা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম কোনো নারীকে পাই ১৯৯১ সালে। এক বছরের একটা বাচ্চা থেকে শুরু করে আমাদের যাদের বয়স ২৫-৩৫, তারা এদেশে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্যুট-বুট পরা কোনো পুরুষকে কল্পনাও করতে পারি না। রাষ্ট্রপ্রধান পুরুষ হলে নারীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা কেমন হয়, সেই সম্পর্কিত কোনো অভিজ্ঞতা আমাদের নাই।

বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের সমঅধিকারের কথা বলা আছে। নারীর অধিকার রক্ষায় এবং সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এখানে নির্দিষ্ট কিছু আইনও রয়েছে। বাল্যবিবাহ বিরোধী আইন, যৌতুক নিরোধ আইন, নারী নির্যাতন দমন আইন, পারিবারিক সহিংসতা বিরোধী আইন, এসিড অপরাধ দমন আইন, ধর্ষণ বিরোধী আইন, সর্বোপরি নারীর শারীরিক এবং মানসিক নিরাপত্তার লক্ষ্যে রাষ্ট্র কর্তৃক সবরকম পদক্ষেপই গ্রহণ করা হয়েছে। তারপরও এদেশে নারীদের কীসের সাথে এতো যুদ্ধ করতে হয়? কেনো করতে হয়? নারীর অধিকার এখানে কতোটুকু নিশ্চিত হয়েছে? চলুন দেখা যাক, আর্থ-সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশী নারীদের অবস্থা-

জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি: সমতা অর্জনের দিক থেকে প্রথম সারিতে অবস্থানরত তিনটি দেশ হলো আইসল্যান্ড, নরওয়ে এবং ফিনল্যান্ড। তিনটি দেশেরই সরকারপ্রধান কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান হলো নারী। বাংলাদেশের অবস্থান সেখানে ৬৫ তম। যদিও পরিসংখ্যান বলছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে তুলনা করলে বাংলাদেশ ইক্যুয়ালিটি অর্জনে অনেকটা এগিয়ে আছে, কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। এতো দীর্ঘ সময় ধরে নারীরা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার পরও সাধারণ নারীদের ভাগ্যের বিশেষ পরিবর্তন ঘটেনি। সত্যিকারের সমতা আসেনি কোনো সেক্টরেই।

রাজনীতি: প্রধানমন্ত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা এবং স্পীকার সকলে নারী হলেও এদেশে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যহারে কম। ৪৮ সদস্যের মন্ত্রীসভায় প্রধানমন্ত্রীসহ নারী মন্ত্রীর সংখ্যা মাত্র পাঁচজন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২২ জন নারী সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে সংসদে মোট ৭২ জন নারী সাংসদ রয়েছেন। সবমিলিয়ে জাতীয় সংসদে অংশগ্রহনকারী নারীর পরিমাণ ২০.৭ শতাংশ। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের দিক থেকে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৫ তম। এগিয়ে আছে কেনিয়া, জিম্বাবুয়ে, সুদান, উগান্ডা, আফগানিস্তানের মতো দেশগুলো। লোকাল গভর্নমেন্টে নারীদের অবস্থা আরও শোচনীয়। টর্চ জ্বালিয়ে খুঁজলেও হাজারে একজন নারী ইউপি চেয়ারম্যান খুঁজে পাওয়া যায় না। বাধ্যবাধকতা আছে বিধায় নারীরা মেম্বার হিসেবে ইউপি নির্বাচনে দাঁড়ায়, তবে তাদের অধিকাংশেরই রাজনীতি সম্পর্কে কোনো জ্ঞান থাকে না। বাবা, ভাই কিংবা স্বামীর কথায় তারা প্রার্থী হন। আমাদের ইউনিয়নের নির্বাচিত নারী সদস্যকে দেখতাম, সমস্ত কাজ তার স্বামী করতেন, তিনি শুধু কাগজপত্রে সই করার কাজে লাগতেন।

শিক্ষা: যদিও পূর্বের তুলনায় বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, ৫৪% নারী তাদের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে। খুব একটা খারাপ না, তাই না? তবে পাকিস্তানে এই হার ৭৪%, নেপালে ৯২%। যেসব মেয়েরা প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়, তাদের মধ্যে আবার ৪২% মাধ্যমিকের আগেই ঝরে পড়ে। কলেজশিক্ষায় নারীর ভাগ ৪৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গিয়ে নারী শিক্ষার্থীর হার কমে ৩৮ শতাংশে নেমে আসে।

কর্মক্ষেত্র: আমাদের দেশের নারীরা বাইরে কাজে গেলে পরিবারের লোকজন চিন্তায় পড়ে যায়। নারী যদি বাইরে কাজ করে, তবে ঘরের কাজ করবে কে? সন্তান লালন-পালনই বা করবে কে? রান্নাবান্না করবে কে? এরকম অসংখ্য প্রশ্ন ঘোরাঘুরি করে নারীর আশেপাশে। যার ফলে এখানে নারীর বেকারত্বের হার পুরুষের চারগুণ। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৪। ভাবা যায়! শ্রমবাজারের সাথে যুক্ত আছেন মাত্র ৩৬.৩৭ শতাংশ নারী। আবার তাদের বড় অংশই যুক্ত কৃষিকাজের সাথে। নেপালে এই হার ৮১.৫২ শতাংশ। শ্রমবাজারে নারীর অনুপস্থিতি অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য: নারীর স্বাস্থ্য এখনো অবহেলিত রয়ে গেছে। ৮০ শতাংশের বেশি নারী এখনো পিরিয়ডকালীন সময়ে কাপড় ব্যবহার করেন। গ্রামাঞ্চলের বেশিরভাগ নারীরই কোনোরকম যৌনশিক্ষা নেই , সন্তান গর্ভধারণ থেকে গর্ভপাত পর্যন্ত, কোনোটা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান নেই। মাতৃমৃত্যুর হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৩ তম। বছরে প্রতি লাখে ১৬৫-১৭৩ জন নারী মারা যায় সন্তান জন্মদান সম্পর্কিত জটিলতায়। তালিকার শেষের দিকে থাকা নরওয়ে, আইসল্যান্ড কিংবা ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে এই সংখ্যা ২-৪ জন মাত্র।

নিরাপত্তা: অসংখ্য পলিসি তৈরি করেও এখানে এখনো নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। গত পাঁচ বছরে ধর্ষণের মামলা করা হয়েছে ২৬ হাজার ৭০০ এর বেশি। প্রতিদিন গড়ে তিনটিরও বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মোট ১৭১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ম্যারিটাল রেপের হিসাবে আর গেলাম না। গ্রাম-গঞ্জে, আনাচে-কানাচে কতো নারী ফিজিক্যাল অ্যাবিউজ, সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট, কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়, তার সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব হয় না। সারাবিশ্বে নারীর জন্য বিপজ্জনক শহরগুলোর তালিকায় ৭ম অবস্থানে আছে ঢাকা শহর। ভিক্টিম ব্লেমিং এর দিক থেকেও আমরা পিছিয়ে নেই।

নাহিদা নিশি

ক্ষমতার শীর্ষে থাকা নারীরা চাইলে বাংলাদেশও আইসল্যান্ড কিংবা নরওয়ের মতো জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি অর্জন করতে পারতো। নারীরা ইচ্ছানুযায়ী সব রকম পেশার সাথে যুক্ত হতে পারতো, রাত-বিরাতে নিশ্চিন্তে ঘরের বাইরে যেতে পারতো, পরতে পারতো নিজের পছন্দানুযায়ী পোশাক। সরকার চাইলেই রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সকলক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। কিন্তু হয়েছে উল্টো, বারবার আমাদের নারী নেতৃরা পিতৃতন্ত্র এবং মৌলবাদের সাথে আপোষ করে গেছে, ‘নারী নেতৃত্ব হারাম’ বলা পুরুষদের সাথে এক টেবিলে বসেছে, পিতৃতন্ত্রকে গেড়ে বসতে সহায়তা করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে পুরুষের নিয়মে, পিতৃতন্ত্রের স্বার্থে। নারীবাদী লেখকদের দিয়েছে নির্বাসন। যার ফলে এখানে ‘নারীবাদ’ সন্মানের সাথে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বদলে হয়েছে ঘৃণিত।

বৈষম্যবিহীন রাষ্ট্র গড়তে হলে, নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে, কেবল আইন তৈরিই নয়, আইনের যথাযথ ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রপ্রধানকে নারী নয়, অবশ্যই নারীবাদী হতে হবে।

শেয়ার করুন:
  • 73
  •  
  •  
  •  
  •  
    73
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.