লেডিস এন্ড জেন্টলম্যান: নারী বিচার চাইলেই কি সমস্যা?

রোকসানা বিন্তী:

ধরা যাক, আপনার পনেরো বছর বয়সী মেয়ের সাথে তার গৃহশিক্ষক যৌন হয়রানিমূলক আচরণ করেছেন! মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে আপনার সাথে বিষয়টা শেয়ার করলো! আপনি তখন কি করবেন?
প্রথমত: আপনি মেয়েকে অবিশ্বাস করলেন এবং শিক্ষক পড়াশোনায় বেশি চাপ দেয় বলে মেয়ে এমন উল্টাপাল্টা কথা বলছে ভেবে মেয়েকে ওই শিক্ষকের কাছেই পুনরায় পড়তে পাঠালেন! এবং শিক্ষক তার অপকর্ম চালিয়ে যেতে থাকলেন!

দ্বিতীয়ত: যা আপনি করতে পারেন তা হলো মেয়েকে বিশ্বাস করলেন, কিন্তু কোনো ঝামেলায় যেতে রাজি হলেন না! অর্থাৎ গৃহশিক্ষককে মাসের বেতন দিয়ে বিদায় দিলেন! গৃহশিক্ষক এই বাসায় কৃতকার্য হতে পারলেন না, কিন্তু অন্যান্য বাসায় তা ঠিকঠাক মতোই চালিয়ে যেতে লাগলেন!

তৃতীয়ত: আপনি কিছুতেই আপনার মেয়ের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায় মেনে নিতে পারলেন না! তাই এর প্রতিকার ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করলেন এবং সমস্যা শুরু হলো এখানেই! আপনি প্রথমেই জানালেন আপনার স্বামীকে কিন্তু তিনি উল্টো আপনাকে আর আপনার মেয়েকেই বকাবকি করতে লাগলেন! ভিকটিম ব্লেইমটাই সবচেয়ে সহজ কিনা!
তারপর আপনারা গেলেন থানায় ডায়েরি করতে! সেখানে গিয়ে থানাওয়ালাদের অদ্ভূত চাহনি ও মেয়েকে কুচরিত্র প্রমাণ করার প্রচেষ্টায় আপনি আহত হলেও বিচারের দাবিতে মেনে নিলেন!
ইতোমধ্যে সেই গৃহশিক্ষকও বসে নেই! তিনি আপনার ও আপনার মেয়ের নামে যা যা কুৎসা রটনা করা যায় তা করে চলছে! ফলে পাড়া প্রতিবেশীদের কাছেও আর ঘটনা গোপন নেই! এককান দুইকান করে পৌঁছে যায় পুরো এলাকায়! এরই মাঝে এক অনলাইন পোর্টাল কীভাবে যেন খবর পেয়ে কোনো প্রকার কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করে খবর ছেপে দিলো যা মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল! এইসব দেখে আপনার স্বামী পুরো ঘটনার জন্য আপনাকেই দায়ী করতে থাকলেন, কেননা আপনি বিচার চেয়েছেন বলেই এতোকিছু! বিচার না চেয়ে চুপ করে থাকলে এসবের কিছুই হতো না! সব দেখেশুনে আপনারও এরকমই মনে হতে থাকলো, কারণ এতোসব ডামাডোলের মাঝে বিচারটা যে কোথায় হবে আর কীভাবে হবে, তা আপনার মাথায় ঢুকে না! সেই গৃহশিক্ষক বহাল তবিয়তে টিউশনি করে যেতে থাকলেন বরং কোনো অন্যায় না করেও আপনার মেয়ে, আপনার পরিবার এলাকায় প্রায় একঘরে! সব সমস্যার সূত্রপাত যেন সেই যৌন হয়রানি নয়, বরং যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে করা প্রতিবাদের মাধ্যমেই ঘটনার শুরু!

ঠিক এরকমই একটা প্রেক্ষাপট তৈরি করেছেন মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী তার “লেডিস এন্ড জেন্টেলম্যান” সিরিজের মাধ্যমে! মূল চরিত্র সাবিলা যে কয়দিন যৌন হয়রানি চুপচাপ সহ্য করে যাচ্ছিলো ততদিন পর্যন্ত তার কোন সমস্যা তো ছিলোই না, বরং ছিলো সোনালি সুদিনের হাতছানি! কিন্তু যেই না সে অন্যায়ের বিচার চাইতে গেলো তখনই পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার জীবন যাঁতাকলে পিষ্ট হতে লাগলো! ন্যায়বিচার পাওয়ার বদলে সারা পৃথিবী তাকে এককোনায় ঠেলে দিলে বরং তাকেই অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিলো! সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো – এমনটা যে হতে পারে তা খুব সহজেই অনুমেয়, তাই এরকম কঠিন পরিস্থিতি অনেক মেয়েই মোকাবেলা করতে চায় না! তার চাইতে চেপে যাওয়া বা ফিরে আসাকেই সহজ মনে করে সে পথেই হাঁটতে থাকে!

“লেডিস এন্ড জেন্টেলম্যান” এর পর্দায় একজন সাবিলাকে দেখা গিয়েছে! এমন হাজার সাবিলা কেউ গুমরে গুমরে কাঁদছে, কেউ ফ্যানের সাথে ওড়না বেঁধে চেয়ারটা লাথি দিয়ে ফেলে দিচ্ছে, আর কেউ প্রতিবাদ করতে গিয়ে সমাজ সংসার সব হারিয়ে একাকী জীবন যাপন করছে!
অথচ সাবিলারা ভিনগ্রহ থেকে টুপ করে পরা কোনো প্রাণী নয়! সাবিলারা সমাজেরই কোনো না কোনো চরিত্রে অভিনয় করছে! মা, বোন, স্ত্রী, ভাবি, বান্ধবী, গার্লফ্রেন্ড এরকম আরো নানা চরিত্র! এই চরিত্র রূপায়নে সাবিলারা যত মেনে নেবে, ততই সকলের ভালোবাসার পাত্রী হয়ে থাকবে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে গুমড়ে মরবে! অন্যদিকে যখনই প্রতিবাদে তাদের কণ্ঠ মুখরিত হবে, তখনই জীবন তাদের হাজারও জটিলতার সম্মুখীন করে তুলবে! যেন বিচার চাইলেই নারীর যত সমস্যা!

পরিচালক মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীকে ধন্যবাদ সমাজের এতো বড় একটা ত্রুটি খুব সহজভাবে উপস্থাপন করার জন্য!

শেয়ার করুন:
  • 144
  •  
  •  
  •  
  •  
    144
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.