স্বপ্নগুলো পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে

প্রমা ইসরাত:

মরে যাওয়াটা এ দেশে খুব সহজ। মানুষ মরে যাওয়ার চাইতে শ্রমিক মরে যাওয়া আরো বেশি সহজ, আরো বেশি সস্তা।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে, হাশেম ফুডস লিমিটেডের ছয়তলা ভবনের অগ্নিকাণ্ডে স্বীকৃত মৃতের সংখ্যা ৫২। এদের মধ্যে তিনজন আগুন থেকে বাঁচতে লাফ দিয়ে পড়ে মারা গেছে। যারা মারা গেছে, পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে, তাদের লাশ দেখে চেনার উপায় নেই যে নারী না পুরুষ, কিংবা বয়স কতো। পুড়ে ছোট হয়ে গেছে শরীর। সিআইডি বলেছে, ডিএনএ বিশ্লেষণ করে লাশের পরিচয় নিশ্চিত করতে ২১ থেকে ৩০ দিন সময় লাগবে। এই ৩০ দিন বা তারও বেশি সময় ধরে সেই লাশের স্বজনদের অপেক্ষা করতে হবে।

শ্রম আইনে শিশু’র সংজ্ঞার ক্ষেত্রে ১৮ এর নিচে শিশু এই কনসেপ্ট মানা হয় না। শ্রম আইন অনুযায়ী, ১৪ বছরের বেশি এবং ১৮ বছর বয়সের কম যারা তাদের কিশোর বা adolescent হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।
এই কারখানায় সেরকম কিশোর শ্রমিকের সংখ্যা ছিলো অনেক। তাদের কেউ কেউ মারা গেছে, আহত হয়েছে অনেক। আহতদের ভবিষ্যৎ কী জানি না। তারা কি ভবিষ্যতে আবারও কাজ করতে পারবে কখনও? জানি না। যে সংসার চালানোর জন্য, ছোট ছোট হাতগুলো কাজ শুরু করেছিলো, সেই ছোট হাতগুলো পুড়ে আরও ছোট হয়ে গেছে। যারা জীবিত, তারা কি কাজ করতে পারবে আবার? তারা বাঁচবে কীভাবে? এই করোনায়, এই লকডাউনে তারা কী খাবে, তারা কীভাবে বেঁচে থাকবে? এই প্রশ্নগুলো মাথায় নিয়েই শুধু চলছি আমরা। সমাধান জানি না।

শ্রম আইন ২০০৬ এর ৬২ ধারায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে অগ্নিকান্ডের সময় সতর্কতা অবলম্বনের বিষয়টি।
৬২ ধারায় উল্লেখ করা আছে যে,
১। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান বিধি দ্বারা নির্ধারিতভাবে অগ্নিকাণ্ডের সময় প্রত্যেক তলার সাথে সংযোগ রক্ষাকারী অন্ততঃ একটি বিকল্প সিড়িসহ বহির্গমনের উপায় এবং অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামের ব্যবস্থা করতে হবে।
২। যদি কোন পরিদর্শকের কাছে মনে হয় যে উপধারা ১ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়নি তাহলে তিনি মালিকের উপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আদেশ জারী করবেন।
৩। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে কোন কক্ষ থেকে বাইরে যাওয়ার পথ তালাবদ্ধ বা আটকে রাখা যাবে না।
৪। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে সাধারণ বাইরে যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত পথ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডকালে বাইরে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা যাবে এমন জানালা, দরজা, বা অন্য কোন বাইরের পথ স্পষ্টভাবে লাল রং দ্বারা বাংলা অক্ষরে অথবা অন্য কোন সহজবোধ্য প্রকারে চিহ্নিত থাকতে হবে।
৫। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের কর্মরত শ্রমিককে অগ্নিকাণ্ডের বা বিপদের সময় সে সম্পর্কে হুঁশিয়ার করার জন্য স্পষ্টতম শ্রবণযোগ্য হুঁশিয়ারি সংকেতের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৬। প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক কক্ষে কর্মরত শ্রমিকগণের অগ্নিকাণ্ডের সময় বিভিন্ন বহির্গমনের পথে পৌঁছার সহায়ক একটি অবাধ পথের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৭। যে প্রতিষ্ঠানে নিচতলার উপরে কোন জায়গায় সাধারণভাবে দশজন বা ততোধিক শ্রমিক কর্মরত থাকেন, অথবা বিস্ফোরক বা অতিদাহ্য পদার্থ ব্যবহৃত হয় অথবা গুদামজাত করা হয়, সে প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগলে শ্রমিকরা যেন এ ব্যপারে যথেষ্ট ধারণা রাখে এবং কী কী করতে হবে সে সম্পর্কে যেন পূর্ণ প্রশিক্ষণ পায় সে ব্যপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৮। ৫০ বা ততোধিক শ্রমিক কর্মচারি সম্বলিত কারখানায় ও প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর অন্তত একবার অগ্নিনির্বাপক মহড়ার আয়োজন করতে হবে। এবং এ বিষয়ে মালিক কর্তৃক নির্ধারিত পন্থায় রেকর্ড বুক সংরক্ষণ করতে হবে।

সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল হাসেম এর এই প্রতিষ্ঠানে শ্রম আইন অনুযায়ী কিছুই মানা হয়নি। উল্টো তিনি বলছেন যে এতে নাকি তার কোন দায় নেই, শ্রমিকদের অবহেলায়ও আগুন লাগতে পারে। কার অবহেলায় আগুন লেগেছে সেটা তো পরের কথা, আগে আগুন লাগলে কী ব্যবস্থা লাগবে সেটা তো নিশ্চিত করতে হবে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বলেছেন, সেরকম কোন ব্যবস্থা এতো বড় ভবনে ছিলো না। মাত্র দুটো সংকীর্ণ সিঁড়ি ছিলো। আর সবচেয়ে বড় বিষয় যে কারখানার গেইট আটকে রাখা হয়েছিলো।
অথচ এই সবকিছুর দায় স্বীকার পর্যন্ত করতে নারাজ মালিক।
দাস প্রথা নিষিদ্ধ করা হলেও, কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মননে মগজে দাসপ্রথা লালন করে। তারা তাই শ্রমিককে মানুষ মনে করে না। দাস মনে করে। তাই তাদের জীবনের মূল্য সেই মালিকদের কাছে নেই।

এটা শুধু দুর্ঘটনা না, এটা খুন।
মাসের নয় তারিখ ছিলো, তাদের বেতন পর্যন্ত বাকি ছিলো। একেকটি লাশ, শুধু একটি জীবন নয়, একেকটি লাশের বিপরীতে রয়েছে একটি পরিবার, অনেকগুলো স্বজনহারা চোখ। সেই চোখগুলো স্বপ্ন দেখতো দুটো খেয়েপরে বেঁচে থাকার। সেই স্বপ্নগুলো পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে।

লেখক: প্রমা ইসরাত
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.