আটপৌরে জীবনে একটি বৃষ্টিভেজা সকাল

নার্গিস মুননী:

রাত থেকেই ঝরছে শ্রাবণের অঝোরধারা। রাহেলা বেগমের শোবার ঘরের জানালা দিয়ে বৃষ্টির শব্দ বেশ ভালই শোনা যাচ্ছিল। একবার ভাবল একটু দেরী করে বিছানা ছাড়বে। একটু অলসতা করা, একটু শুয়ে শুয়ে একটু বর্ষার গান শুনা। কিন্তু তা হওয়ার জো নেই। একটু অলসতা মানেই সারাদিনের কাজের ছন্দপতন। এরকম ঝুম বৃষ্টি হলে রাহেলার স্বামী লতিফ সাহেব সবসময় বলবে, এরকম ঝুম বৃষ্টি মানেই তো ভুনা খিচুড়ি খাওয়া। সাথে ইলিশ ভাজা আর একটু আচার বা চাটনী হলেতো আর কথাই নেই। আরে, এটাই তো বাঙালির বাঙালিয়ানা। কথাটা মনে হতেই রাহেলা বেগম গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়লো। প্রাত্যহিক কাজ সেরে তোড়জোড় শুরু করলো ভুনা খিচুড়ী রান্নার। চালডাল চুলায় চাপিয়ে রান্নাঘরের পাশে একচিলতে খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো রাহেলা বেগম। চারদিকে কেমন নিস্তব্ধতা! কোথাও কোন শব্দ নেই শুধু শ্রাবণের অবিরাম ধারার এক মিষ্টি অনুরণন। এই নীরবতাকে ভেদ করে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে পাশের রাস্তা দিয়ে যাওয়া রিক্সার বেলের ক্রিংক্রিং বেরসিক আওয়াজ। কয়েকটি কাক ডানা ঝাপটে পাশের বারান্দার রেলিঙ্গে এসে বসলো। রাহেলা বেগম তাকিয়ে দেখে কাকগুলো ভিজে চুপসে গেছে। ডানা ঝেড়ে নিজেকে শুকানোর চেষ্টা করছে ওরা। কা-কা শব্দ নেই, তাকে দেখে পালিয়ে যাবার কোন চেষ্টা নেই শুধু বৃষ্টির হাত থেকে নিজেকে বাঁচাবার এক তীব্র আকাঙ্খা। রাহেলা বেগমের খুব মায়া হলো।
আহারে বেচারারা! কাছে আসলে হয়তো নরম কাপড় দিয়ে আলতো করে মুছে দিতো।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছটাকে মনে হচ্ছে শান্ত, স্নিগ্ধ আর পবিত্র। নারকেল পাতার আগা থেকে টুপ টুপ করে ঝরে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা, যেন সদ্য স্নাত রমণীর ভেজা চুলের পানি। শীতের শুষ্ক নিম গাছটি বসন্তে সেজেছিল কিশোরী সবুজ আর আজ বর্ষার জলে স্নাত হয়ে উন্মোচিত হলো নবযৌবনায়।
একটু আশ্রয়ের জন্য আমগাছের ঘন ডালে আকুলি বিকুলি করছে দু’ একটি পাখি। বারান্দার কোণে বেড়ে ওঠা কামিণীগাছের সাদা ফুলগুলো কেমন এক মিষ্টি গন্ধ ছড়াচ্ছে চারপাশে।
বাতাসের তোড়ে মাঝে মাঝে বৃষ্টির ঝাপটা এসে পড়ছে রাহেলা বেগমের চোখে মুখে। তাতে তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। পড়ছে তো পড়ুক না। ভালই তো লাগছে!!!
সবুজ-সতেজ এই বর্ষণমুখর পরিবেশে তার মনটা কেমন যেন কাব্যিক হয়ে উঠলো। রবীন্দ্রনাথের দু’টি লাইন মনে পড়লো –
“এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘন ঘোর বরিষায়”

কী বলা যায় তারে? কবি কিন্তু সে কথা বলেননি। কিছু বলা আর কিছু না বলার মধ্যেই কি কবিদের কাব্যিকতা? নাকি সাহিত্যে mystery সৃষ্টি করে mysterious হয়ে ওঠাই কবি-সাহিত্যিকদের ধর্ম? কি জানি! অবশ্য না বলে ভালই করেছেন। যে যে যার যার মত করে “এমন দিনে “ বলবে তার প্রিয়জনকে।

রাহেলা বেগম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবলো, আসলেই কি এমন দিনে তারে বলা যায়?
একজন মানুষের জীবনে এমন বর্ষণ মুখর দিন তো অনেক আসে। কে কতবার তার প্রিয়জনকে মনের কথা, ভাল লাগার কথা বা ভালবাসার কথা বলতে পেরেছে?

রাহেলা বেগমের ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসি!
বৈতরণী ভাসায় তার সোনালী অতীতে –

সেই কিশোরী বয়স। বয়স তখন কত? ১২ কী ১৩। কী দুরন্তপনা! এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি, ঝোপ –ঝাড়, বাড়ির পিছনের বাগান কোথায় না পদচারণা তার! আম, পেয়ারা, জামরুল কিছুই তার নজর থেকে বাদ পড়তো না। মধুফুল থেকে মধু খাওয়া, খড়ের গাদায় শুয়ে জোসনা দেখা, পুকর পাড়ে বসে পোনা মাছের লুকোচুরি খেলা দেখা, নারকেল গাছের ডগায় ঝুলে পুকুর পাড়ে দোল খাওয়া। আহা কী দস্যিপণা সময়!

ক্লাস নাইনে ওঠার পর হঠাৎ করেই সে যেন অনেক বড় হয়ে গেল। পাশের বাড়ির আকাশকে দেখলেই কেন জানি বুকের ভেতরটায় ধুক করে উঠতো। চোখে চোখ পড়লে লজ্জায় চোখ ফিরিয়ে নিত রাহেলা। আকাশ তখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। লম্বা, চওড়া, সুঠাম দেহের উদ্যমী এক ছেলে। খেলাধুলা, হৈ-হুল্লোড়, পাড়ার ছেলেদের সাথে আড্ডা দেয়াতে যেমন সেরা ছিল, তেমনি কলেজেরও সেরা ছাত্র ছিল। স্কুলে যাওয়ার সময় প্রায় আকাশের সাথে রাহেলার দেখা হতো। দেখা হলেই রাহেলা বেগমের হাঁটার গতি যেন বেড়ে যেত শতগুণ। দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে যেত। কপালটা কেন জানি অকারণেই ঘেমে উঠতো। স্কুলে গিয়ে কিছুক্ষণ আনমনা হয়ে বসে থাকতো। মনের ভিতর তখন কী যে চলতো রাহেলা নিজেও জানতো না।

সব ঋতু যেমন তেমন, ভরা বরষায় রাহেলার মন উতলা হয়ে উঠতো। যুগে যুগে কবিরা তো এমনই ব্যাখ্যা করেছেন। সময়ের কী অনুকূল স্রোত নিজেকে প্রকাশ করার! হৃদয়ের মাঝে যার বসবাস, যে কথা এখনও কাউকে বলা হয়নি, আজ এই বর্ষণ বেলায় নিজেকে উন্মুক্ত করার যেন এইতো সময়!

জানালার সাথে হেলে থাকা কামিনী গাছটা রাহেলার সাথে সাথে কেমন জানি বেসামাল হয়ে পড়তো। ছোট ছোট সাদা ফুলের পাপড়িগুলো চারপাশে গন্ধ ছড়িয়ে লুটিয়ে দেয় বৃষ্টির জলে। চারপাশে ছড়িয়ে পড়া ওর এই সুবাস কার মনে কি সুর বাজায় তারা কি সেটা বোঝে? বোঝে না। আর পুকুরপাড়ের কদম গাছটা? রাহেলা ভেবে পায় না বর্ষা এলে কেন এই বিশাল গাছটায় এত ফুলের সমাহার ঘটে? কেনই বা তার এতো সৌরভ? যে সৌরভ তার কোমল পরশে প্রকৃতিতে বর্ষার আগমনী বার্তার সাথে সাথে মনেও যেন কীসের এক বার্তা পৌঁছে দেয়!
রাহেলা বেগম জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতো আনমনে। কিশোরী রাহেলার মন প্রায় পাগলপারা। চঞ্চলা কিশোরী মনে রাজ্যের আকুলতা।

এই আকুল করা মনে গুনগুনিয়ে গাইতো-
এই মেঘলা দিনে একলা
ঘরে থাকেনা তো মন
কাছে যাবো কবে পাবো
ও গো তোমার নিমন্ত্রণ।

ইচ্ছে করতো মনের সব কথা, সব কথা খুলে বলতে কাউকে। কিন্তু কাকে বলবে? বলার জন্য তো সেরকম মনের মানুষ চাই। সে মানুষটা কোথায়? আকাশের কথা ভাবতেই গা শিউরে উঠতো রাহেলার। চৌদ্দ বছরের কিশোরী রাহেলা পারিবারিক শাষন, লোকভয় আর সামাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মনের কথা আকাশকে বলার মত দু:সাহস দেখাতে পারেনি। মনের কথা মনেই থেকে গেছে। কোন দিন আকাশকে বলা হয়নি।

তার কয়েক বছর পর রাহেলা জানতে পারে আকাশের সাথে তার বান্ধবী সোনালীর বিয়ে। রাহেলার মনে জিইয়ে রাখা নীল ভালবাসা ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। উচাটন মন তখন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে যায়। আর কোন ছেলেকে রাহেলা বেগমের ভালও লাগেনি। ভালও বাসেনি।

ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরপরই রাহেলা বেগমের বিয়ে হয়ে যায়। ছাত্রী হিসেবে তো সে ভালো ছিলই, তার পাশাপাশি সে ভালো কবিতা আবৃত্তি করতো। কবিতা, গল্প, উপন্যাস পড়ার প্রতিও খুব ঝোঁক ছিল। অবসরে আপনমনে আবৃত্তি করতো। আরও পড়াশুনা করার ইচ্ছে থাকলেও তার বাবা ভালো ঘর, ভালো পাত্র হাতছাড়া করতে চায়নি। বনেদি পরিবার, বড় সংসার, অনেক নিয়ম-কানুন, অনেক দায়িত্ব।

স্বামীটি বেশ রাশভারী, কাজপাগল একজন মানুষ। কথা কম বলতে পছন্দ করলেও বেশ দায়িত্ববান। সংসারের খুঁটিনাটি বিষয়ে তার বেশ নজর। পারিবারিক ব্যবসাকে আরও প্রসারিত করার অদম্য ইচ্ছের কাছে সবকিছু ছিল তুচ্ছ। শুধু কাজ আর কাজ। ব্যবসার কাজে প্রায় বাইরে চলে যেতে হতো। রাহেলা বেগমও সংসার, ছেলেমেয়ে, ননদ-দেবর, শ্বশুর-শ্বাশুড়ী সবার দায়িত্ব পালন করতে করতে কখন শীত, বসন্ত চলে যেত টেরও পেতো না। তবে বর্ষায় মনটা একটু ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতো। ইচ্ছের ডানাগুলো যেন খুলো যেত ময়ূরপঙ্খী হয়ে। সেই ময়ুরপঙ্খীতে করে পাড়ি দিতে চাইতো অজানা দূর সমুদ্রে!

ভরা বর্ষায় মাধবীলতার ডালগুলো যখন ভিজে জড়িয়ে থাকতো এক অন্যের অবলম্বন হয়ে। বৃষ্টিতে ভেজা ফুলগুলো ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে যখন মিষ্টি করে চেয়ে থাকতো, টিনের চালে যখন ঝমঝম বৃষ্টি পড়তো অবিরাম, রাহেলা বেগমের মন তখন উচাটন হয়ে উঠতো। নিজের অজান্তেই হয়তো গেয়ে উঠতো-

“বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান
আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান।”

ইচ্ছে করতো স্বামীর হাত ধরে একটু বৃষ্টিতে ভিজতে। পুকুর পাড়ে বসে দেখতে ইচ্ছে করতো বৃষ্টির ফোঁটায় পুকুরের পানি কেমন করে শরীর দোলায়! কেমন করে হাঁসা আর হাঁসী খেলে জলকেলি!! কেমন করে কলমির লতায় ভর করে বেগুনি ফুলেরা বাতাসে ভাসে!!!

স্বামী বেচারা হয়তো তখন ব্যবসার কাজে বাড়ির বাইরে অথবা পাশে থাকলেও নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে অথবা ব্যবসার হিসাব নিকাশ নিয়ে ব্যস্ত। কিংবা সংসারে কোন খুঁটিনাটি বিষয়ে ঝগড়া করে পাশ ফিরে শুয়ে আছে।

রাহেলা বেগম মনের গভীরে লুকিয়ে রাখা ইচ্ছের ডানাগুলো গুটিয়ে আবার সেই সংসারের বৈতরণী পার। ব্যস্ত হতো বৃষ্টির দিনের জন্য দুপুরের শ্রেষ্ঠ খাবার তৈরিতে কিংবা বৈকালিক নাস্তার বিশেষ আয়োজনে।

সংসারের কাজে ব্যস্ত রাহেলা হঠাৎ হঠাৎ আনমনা হয়ে যায়। জীবনের এই সময়টা কি কেবল সংসারের সাথে ব্যালেন্স করে চলার জন্য? সবাই কেন একই যন্ত্রণায় ভোগে- “কী চেয়েছি আর কী পেয়েছি” কিংবা “যা চেয়েছি তা পেলাম না কেন” ? এই হিসেব কষতে কষতেই কি এই জীবন পার হয়ে যাবে? এভাবেই কি মনের সব কথা হারিয়ে যাবে? তাহলে এতো কাব্য, এতো কবিতা কেন লেখা? কবিদের কেন এতো মিথ্যা প্রলোভন?

অনেকটা সময় পেরিয়ে রাহেলা বেগমদের যখন ব্যালেন্স করা যখন শেষ হয়, উপলব্ধি তখন ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছায়। অনেক ধৈর্য, অনেক কষ্ট করে সংসারের সবকিছু যখন সমতায় নিয়ে আসে, সংসারের সবার চাওয়াকে পাওয়ায় পরিণত করে, সংসারের সব জটিলতা-কুটিলতাকে পা’য়ে মাড়িয়ে নিজের স্বকীয়তাকে প্রকাশ করে, নিজেকে সকলের কাছে বিজয়ী করে তখন রাহেলা বেগমদের উপলব্ধি হয় তারা যেন রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট কেতকী, নিত্যদিনের প্রয়োজনে ব্যবহার্য ‘ঘড়ায় তোলা জল’।
‘এমন দিনে’ কিছু বলার জন্য জীবনসঙ্গীদের মন খুঁজে ফিরে ‘দীঘির জলের মত লাবণ্যকে।
রাহেলা বেগম আরেকবার হাসে। এবার তার তিক্ত অভিজ্ঞতার হাসি। এ হাসির পিছনে অনেক গূঢ় অর্থ লুকিয়ে আছে যা সে কোনদিন কাউকে বোঝাতে পারবে না।

রাহেলা বেগমের বয়স এখন ষাট পেরিয়ে গেছে। স্বামীরও অনেক বয়স হয়েছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য অনেক আগেই গ্রামের বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় একটা ফ্ল্যাটে উঠেছে। ব্যবসায় আজ সে একজন সফল মানুষ। ব্যবসার কাজকর্ম অনেকটা বড় ছেলেকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। এই বয়সটাতে একটু ধর্মকর্ম করে কাটাতে চায়। বেশিরভাগ সময় বাসায়ই থাকে। সুগারটা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিন সকালে একটু হাঁটতে বের হয়। সকালে হেঁটে এসে রুটিনমাফিক কাজ সেরে টিভির রিমোট হাতে নিয়ে বসে। এরপর এ চ্যানেল ও চ্যানেল করে হাঁক দেয় আমাকে আরেক এক কাপ চা দেয়া যাবে? রান্নার সময় এই চায়ের অর্ডারটা রাহেলা বেগমের কাছে খুবই বিরক্তির ব্যাপার। তবুও স্বামীকে অসম্ভব ভালবাসে বলে তাঁর কোন চাওয়াই সে অপূর্ণ রাখতে চায় না। একটু ঘ্যান ঘ্যান করে ঠিকই, কিন্তু সাজিয়ে গুছিয়ে চা-টা দিয়ে যায়। স্ত্রীর প্রতিও লতিফ সাহেবের বেশ টান। কিন্তু ব্যক্তিত্ব ক্ষুণ্ণ হবার ভয়ে তা প্রকাশে সবসময়ই তার আপত্তি।

এই এক দোষ পুরুষ মানুষদের! এই নিয়ে রাহেলা বেগমের খুব আক্ষেপ। বিবাহিত জীবনের এই ৪৫ বছরে কখনও কোন ম্যারেজ ডে কিংবা জন্মদিনে লতিফ সাহেব ভালোবাসার প্রকাশ দেখায়নি। বিবাহ বার্ষিকীতে কদাচিৎ একটা শাড়ি হাতে করে এনেছে। তাও সেটা লুকিয়ে। যেন এটা একটা মহাপাপ। লতিফ সাহেবের মতে ভালবাসা, অনুরাগ এসব নাকি হৃদয়ের গহীনে লুকিয়ে রাখার জিনিস। প্রকাশ করাটা কাপুরুষের লক্ষণ। এমনকি বেহায়াপনাও। রাহেলা বেগমও সব মেনে নিয়েছে। প্রথম প্রথম আক্ষেপ থাকলেও এখন আর কোন অভিযোগ নেই।

কলেজ জীবনে গান, আবৃত্তি করা, গল্পের বই পড়ার নেশা ছিল বলে জীবনান্দ দাশ, রবীন্দ্রনাথ, আজও রয়ে গেছে তার মনের গহীনে। উপযুক্ত পরিবেশ পেলেই সেগুলো যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আপন মনে দুচার লাইন আবৃত্তিও করে। ছেলেমেয়েরা শুনে অবাক হয়! সংসারের খুঁটিনাটি সব কাজ, এতো দায়িত্ব পালন, এতো কাজ করেও আবৃত্তির মতো এই সুকুমার বৃত্তি তার মননে কী করে রয়ে গেছে! উৎসাহ দিয়ে বলে মা, এখনও ইচ্ছে করলে তোমার এই প্রতিভা প্রকাশ করতে পারো। রাহেলা বেগম শুধু হাসে।

জীবনের শেষবেলায় এসে পারিবারিক সব ঝুটঝামেলা এখন আর নেই। সবকিছুই যেন শান্ত। চাওয়া পাওয়ার হিসাব-নিকাষে কে জয়ী কে বিজয়ী তার হিসেব করা খুব কঠিণ। তবে একে অন্যের প্রতি এখন যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। ছেলেমেয়ে নিয়ে তারা বেশ সুখী। সেই সুখ যেন প্রকাশ হতে চায় বর্ষা এলে। রাহেলা বেগমের মন একটু আধটু উদ্বেলিত হয়।

বর্ষণমুখর পরিবেশে বারান্দায় বসে স্বামীর হাতে হাত রেখে বৃষ্টি দেখতে ইচ্ছে করে। ফেলে আসা দিনগুলোর কথা, রাগ-অভিমান, ভাললাগা, ভালবাসার কথা, ফেলে আসা ৪৫টি বছরে অনেক পাওয়া-না পাওয়ার কথা বলতে বলতে এক কাপ চা খাওয়ার কথা ভাবা যায়। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর সবুজ যৌবনা পাতায় নিজেদের চোখ স্নিগ্ধতায় ভরাতে চায়। বৃষ্টির ঝাপটায় স্বামীর কপালের পানিগুলো শাড়ীর আঁচল দিয়ে মুছে দিতে চায়।

কিন্তু সবই কেবল ভাবনা। ভেবে ভেবে নিজেই যেন লজ্জিত হয়।
জীবন থেকে পেরিয়ে যাওয়া বারো আনা সময় যেন পিছন থেকে টেনে ধরে।
রাহেলা বেগমের ঠোঁটের কোণে আবারও এক চিলতে হাসি। এ হাসি এক বিদ্রুপের হাসি।

এটাই তো মানুষের জীবন! আর এই জীবনের জন্যই বুঝি আকাশ এমন কেঁদে কেঁদে পৃথিবী ভাসায়!!

ভিতর থেকে হাঁক এলো, কই গো! কী পোড়া যাচ্ছে??

স্বামীর ডাকে রাহেলা বেগমের ঘোর কাটে। নাকে আসে খিচুড়ির লেগে ধরা গন্ধ।
উদাসী মন আবার মনোযোগী হলো ভুনা খিচুড়িতে। কাব্যময়তা শিকেয় উঠে খিচুড়ি পরিবেশনের শৈল্পিকতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে।

হাঁড়ি-খুন্তি, বাসন-কোসনের টুংটাং শব্দের সাথে মিলে মিশে একাকার হয় আকাশের কান্না!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.