বিয়ে মানে তো যাবজ্জীবন শাস্তি নয়

ফারজানা নীলা:

আমির খান আর কিরণ ডিভোর্স নিচ্ছেন তাদের ১৬ বছরের সাংসারিক জীবন থেকে এবং এই খবরটি তারা জানান দেন খুব সুন্দর একটি ভিডিওর মাধ্যমে। যেখানে তারা বলেন যে ডিভোর্স নিলেও তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব থাকবে, একসাথে কাজ করা অব্যাহত থাকবে এবং যেহেতু তাদের সন্তান আছে তাই একসাথে বাবা-মা’র দায়িত্বও পালন করবেন। শুধু স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাদের সম্পর্কটা আর থাকবে না।

এতেই অনেকে রেগে-মেগে আগুন। তারা ডিভোর্স নিচ্ছেন এই কারণে ভক্তকুল কষ্ট পাচ্ছে? না। তারা স্বসম্মানে সম্পর্কের ইতি কেন টানছেন, সেই নিয়ে যত আক্ষেপ। কেন তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না এনেই আলাদা হচ্ছেন, এই জন্য রাগ! কেন তারা হাসিমুখে বিদায় নিচ্ছেন, তাই রাগ! এতোই বন্ধু হলে কেন ডিভোর্স, সেই জন্য রাগ!

তাদের মতে, যেহেতু তারা হেসে হেসে আলাদা হচ্ছে, তার মানে তারা বিয়ে শাদি তালাক ডিভোর্সকে তামাশা মনে করছেন! যদি একে অপরের বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই রকমের খারাপ অভিযোগ আনতেন, যদি কাটাকাটি, মারামারি, গালাগালি হতো, যদি পরকিয়ার আভাস পাওয়া যেত, তবে কেউ বলতো না যে ডিভোর্স নিয়ে তারা তামাশা করছেন।

আমরা কেন মনে করছি যে ইদানিং ডিভোর্স তামাশা হয়ে গেছে বা বার বার বিয়ে করা চরিত্রহীনের কাজ? তামাশা মনে করা হচ্ছে কারণ আমাদের জং ধরা মগজে গাঁথা আছে যে বিয়ে একটি সারা জীবনের সম্পর্ক। মৃত্যু ব্যতীত এই সম্পর্কের ছেদ হয় না! বা হওয়া উচিত না! আর যদি ছেদ হয়ও বা তার মানে সেখানে স্বামীটি বা স্ত্রীটি খারাপ। স্বামী স্ত্রী ভালো হলে সেখানে বিচ্ছেদ আসবে না। ডিভোর্স বলতেই আমরা বুঝি দাম্পত্য জীবনে স্বামীটি হয়তো অত্যাচারী, যৌতুকের চাহিদা, ভরণপোষণ দিতে পারে না, অথবা অন্য নারীতে/পুরুষে আসক্ত।

বর্তমানে আবার নারীদের ডিভোর্স এর জন্য দায়ী করা হয় বেশি। কারণ তারা স্বাবলম্বী হচ্ছে। স্বাবলম্বী হয়ে স্বামীর অন্যায় অত্যাচার অপমান সহ্য করার চেয়ে আলাদা হওয়াকে উচিত মনে করছে। এটা ভিন্ন আলোচনার বিষয়। সেদিকে না যাই। উপরোক্ত কারণ ব্যতিরেকে ডিভোর্স হওয়া আমরা ঠিক গ্রহণ করতে পারি না। ডিভোর্স মানেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তিক্ততা থাকবে, একে অপরকে শত্রু জ্ঞান করবে, একে অপরের চরিত্রদোষ দিবে, একে অপরের ক্ষতি কামনা করবে। তবেই সেটা আদর্শ ডিভোর্স।

এর বিপরীত কেউ যদি বলে তারা একে অপরের বন্ধু থেকেও আলাদা হয়ে যাচ্ছে তবে সেটা হজমযোগ্য নয় বাঙালীর কাছে। তারা চোখ কপালে তুলে মুখটা বাঁকা করে প্রশ্ন করবে, এতোই যদি বন্ধু থাকো তাহলে বিচ্ছেদ কেন? এই প্রশ্নচিহ্ন থেকেই বোঝা যায় আমরা বিয়েতে, সংসার জীবনে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, প্রেমকে কতটা অগুরুত্বপূর্ণ মনে করি।

মনে করি দাম্পত্যজীবন মানেই সবকিছুর ঊর্দ্ধে কোনো না কোনভাবে একসাথে কাটিয়ে দেওয়া একটা সম্পর্ক। এখানে একে-অপরের প্রতি টান আকর্ষণ চাহিদা উত্তেজনা আবেগ এক্সাইটেমেন্ট কমে গেলেও স্বামী-স্ত্রী একসাথে থাকা যায় বা থাকতে হবে এমন চিন্তাধারা বা মেন্টালিটি বহন করতে হবে। এসব কারণে আলাদা হয়ে যাওয়াকে বালখিল্য আচরণ মনে করি আমরা। অর্থাৎ দাম্পত্য জীবনে আবেগ ভালোবাসা প্রেম যে কমতে পারে সেটা আমরা স্বীকার করি না, করতে চাই না। আর কমলেও আলাদা হওয়া যাবে না। কমে গিয়েও একসাথে থাকা যায়। পরিবার সন্তান সমাজের কথা ভেবে।

এবং থাকছেও অনেকে।

সম্পর্কে কী যেন নেই। আগের মতো সেই উদ্দামতা নেই? সেই উত্তেজনা নেই? সেই অভাববোধ নেই? না থাকুক। এগুলা না থাকলে কী হয়েছে? পরিবার আছে, সন্তান আছে, তাদের ভবিষ্যৎ আছে, মুরুব্বীরা আছে। এদের জন্য হলেও এক ছাদের নিচে বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। এবং মানুষ কাটাচ্ছেও। তাতে কোনো ক্ষতি নেই। যারা এভাবে থেকে যাচ্ছে, বিচ্ছেদের দিকে যাওয়া চিন্তা করে না, বা এই কারণে বিচ্ছেদকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে তারাও তাদের জায়গা থেকে ঠিক। তাদের চিন্তা অনুযায়ী তারা যৌক্তিক কাজই করছে।

কিন্তু যারা এই রীতিতে চলে না, যারা মনে করে হাসিখুশি বিদায় নিয়ে জীবনের অন্য অধ্যায় শুরু করা যায়, অহেতুক প্রেমহীন বন্ধুত্বকে বিয়ের নাম দেওয়া বন্ধ করা যায়; তাদেরকে নিয়ে হেয় করাও যৌক্তিক নয়। তাদের চিন্তা থেকে, তাদের জীবনযাপন থেকে, তাদের অবস্থান থেকে তারাই একমাত্র বুঝতে পারেন কেন তারা আর একসাথে থাকতে পারছেন না। তারা বিচ্ছেদের পরও কেন বন্ধুত্ব রাখবেন বলে অন্যদের অভিযোগ! বন্ধুত্ব কি বিয়ে বজায় রেখে রাখা যায় না?

আর সম্পর্ক যদি এতোই ভালো থাকে, তাহলে বিচ্ছেদের নাটক কেন?

সব অভিযোগের একটাই উত্তর। কারো সাথে হয়তো একসাথে কাজ করা যায়, সন্তানের দায়িত্ব সমানভাবে ভাগ করা যায়, ঘুরতে যাওয়া যায়, শিল্পচর্চা করা যায়; কিন্তু যখন জীবন ভাগাভাগির প্রশ্ন আসে তখন হয়তো সেই মানুষটার সাথে সারাজীবন থাকা যায় না। সারাজীবন একসাথে না থাকার ব্যর্থতা দুইটা মানুষকে চিরশত্রু বানায় না। এটা কেন জানি আমরা মানতে চাই না। বিচ্ছেদে দুজন দুজনকে ঘৃণা করবে এটাই যেন স্বাভাবিক! হ্যাঁ এটাই আমাদের সমাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটে। যেখানে ঘৃণাটাই কাম্য।

কিন্তু ব্যতিক্রমও ঘটে। ব্যতিক্রম বলে সেটা যে ঠাট্টার বিষয় হবে সেটা ভাবা উচিত না। চাওয়া-পাওয়ার ভিন্নতা আসতে পারে দশ বছর একসাথে থাকার পরও। এই ভিন্নতা ঘৃণার পর্যায়ে নাও যেতে পারে। এই ভিন্নতার মানে এই না যে দুটি মানুষ খারাপ। তারা আলাদা আলাদা ভালো থাকে, শুধু একত্রে তারা অসুখী। যে সুখের জন্য একসাথে থাকা, সেটাই যদি না পায় তাহলে কি আলাদা থেকে ভালো থাকা ভালো নয়? আলাদা থেকে মাঝে মাঝে একে অপরের খোঁজ নেওয়া, বিপদে আপদে পাশে থাকা, সন্তান নিয়ে সময় কাটানো কিছু ভাল মুহূর্ত সৃষ্টি করা কি খুব খারাপ, দৃষ্টিকটু?

হয়তো আপনাদের চোখে এগুলো ন্যাকামো। তারা বিয়েশাদিকে ছেলেখেলা মনে করে ভাবেন, ডিভোর্সকে রং তামাশা মনে করে বলে ব্যঙ্গ করেন। কিন্তু বিয়ে শাদি আজীবনের কোনো শাস্তি নয় যে বহন করতেই হবে। বিয়ে করে সুখে থাকার জন্য। কোনো কারণে যদি সুখটাই হারিয়ে যায় তবে মিথ্যে সুখী দম্পতি সেজে থাকার কী দরকার? দুজন আলাদা হয়ে যদি সুখ খুঁজে পায় তবে সেটা কেন কেউ করতে পারবে না? যারা প্রেম শেষ হলে আলাদা হয়ে যেতে চায় তারা আর যাই করুক না কেন অন্তত ভন্ডামি করে না। এই ভণ্ডামি না করার জন্য একটা সাধুবাদ তো তারা পেতেই পারে।

শুধু আমির-কিরণ না, বলিউডের ঋত্তিক রোশন ও তার স্ত্রী সুজানা খান বিচ্ছেদের পরও বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সন্তানদের নিয়ে তারা একসাথে সময় কাটায়, একে অপরের বাড়িতে যায়, একসাথে সন্তানসহ বেড়াতেও যায়। তারা স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক শেষ করেছে। কিন্তু বন্ধুত্ব শেষ করেনি। তারা স্বামী-স্ত্রী না হয়েও পারিবারিকভাবে কী চমৎকারভাবে আবদ্ধ।

যে সন্তানের জন্য মানুষ ডিভোর্স করতে চায় না হাজারও সমস্যা থাকা সত্ত্বেও, সেই সন্তানরাই বরং অসুখী জীবন পায় বাবা-মায়ের মধ্যে তিক্ত সম্পর্কের কারণে। আর তিক্ততাবিহীন আলাদা আলাদা জীবন সন্তানদের জীবনেও ভালো ভালো স্মৃতি তৈরি করতে পারে যদি বাবা-মা একসাথে বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন করেন হাসিমুখে। বন্ধুত্ব নিয়েও সংসার করা যায় বলে যারা বলছেন তারা হয়তো পারবেন প্রেমহীন দাম্পত্য বজায় রাখতে। কিন্তু যারা পারে না বা পারতে চায় না তাদের অহেতুক বিদ্রূপ না করি।

তারা তাদের মতো সোজা সুন্দর সুখি স্বচ্ছ জীবন চায়। তাদের সেটা করতে দেই বরং। এই অসৎ আর মুখোশে ভরা দুনিয়ায় কেউ ভণ্ডামিমুক্ত থাকতে চাইলে তাকে পারলে উৎসাহ দেই। না পারলে চুপ থাকি।

শেয়ার করুন:
  • 470
  •  
  •  
  •  
  •  
    470
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.