কেন হিন্দু নারীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে?

সাজু বিশ্বাস:

ঋগ্বেদের যে শ্লোকটিকে দেখিয়ে সনাতন হিন্দুইজম পিতার সম্পত্তিতে ছেলেমেয়েদের সমান অধিকারের কথা বলছে এবং যে শ্লোক থেকে পরবর্তীকালে অপুত্রক পিতার সম্পত্তির উপর কন্যার অধিকার সংক্রান্ত আইন তৈরি হয়েছে সেই শ্লোকটি এইরকম,
–“শাসদ্বহ্নির্দুহিতুর্নপ্ত্যং গাদ্বিদ্বাঁ ঋতস্য দীধিতিং সপর্ষন্|
পিতা,যত্র দুহিতুঃ,সেকমৃঞ্জন্ত সং শগ্মেন মনসা দধন্বে||”
ঋগ্বেদ, তৃতীয় মণ্ডল, সূক্ত- ৩১, শ্লোক-১. ৩|৩১|১.
অনুবাদ: পুত্রহীন পিতা সমর্থ জামাতাকে সম্মানিত করে শাস্ত্র অনুশাসনক্রমে দুহিতাজাত পৌত্র প্রাপ্ত হন।
অপুত্র পিতা দুহিতার গর্ভ হতে বিশ্বাস করে প্রসন্নমনে শরীর ধারণ করেন।

এখানে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে, পুত্র উৎপাদনে সক্ষম জামাতার সাথে সদ্ভাব রেখে অপুত্রক মেয়ের বাবা তার মেয়ের পুত্র সন্তানকেই তার সমস্ত সম্পদের পরবর্তী উত্তরাধিকারী মনোনীত করবেন। তিনি নিজের মেয়ের গর্ভজাত সন্তানকেই নিজের অংশ বলে মনে করবেন।
কোথাও কিন্তু নেই যে তিনি নিজের মেয়েকেই নিজের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী মনোনীত করবেন। এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে মেয়ে কীভাবে পিতার সম্পত্তির ভাগ পেলো? এই নিয়মকে যারা যারা ছেলেমেয়ের সমান অধিকার বলতে চান, তারা কি নিজের অজান্তেই সমাজকে ঠকাতে চাইছেন না! জামাতাকে তোয়াজ করে তার ছেলেকে যদি পুত্রহীন শশ্বর নিজের সম্পদ দিয়ে যায়, তার মেয়ে ঐ সম্পত্তির কতটুকু নিজের প্রয়োজন মতো ভোগ দখল করতে পারবে?

অথচ, আপনারা বলবেন,– এটা সমানাধিকার। মেয়েকে দেওয়া আর মেয়ের ছেলেকে দেওয়া তো একই হল, তাই না!…… না, তা নয়। তাই যদি হতো তাহলে পারিবারিক আইন, দেওয়ানি আইন, উত্তরাধিকার আইন, দত্তক আইন, এসবের সমতা করার দরকার পড়তো না।
খেয়াল করে দেখুন, এই একটিই মাত্র জায়গা যেক্ষেত্রে বাবার ছেলে সন্তান নেই, সেইক্ষেত্রেই কেবল মেয়ের জন্য সম্পত্তির কথা বলা হচ্ছে। তাও আবার মেয়ের জন্য নয়,– মেয়ের ছেলের জন্য! আচ্ছা, যাদের পুত্র সন্তান আছে, তাদের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী কে? এ ও আবার বলতে হয়! পুত্র সন্তানই একমাত্র উত্তরাধিকারী আবার কে! তাহলে পুত্র না থাকলে মেয়ের সন্তানকে পুত্রসম মনে করা, আর পুত্র থাকলে মেয়ের সন্তান কেউ নয়,…….. এটি কি একধরনের বড় দ্বিচারিতা নয়?

এই জন্যই বার বার ধর্মের সমস্ত জায়গা জুড়ে কেবল ছেলে সন্তানের জন্য প্রার্থনার ছড়াছড়ি। এবং যেমন যেমন করেই হোক না কেন, ছেলে সন্তানই হবে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। মেয়ে নয়। একমাত্র ব্যতিক্রম অবিবাহিতা মেয়ের ক্ষেত্রে। অবিবাহিতাকে হিন্দু সমাজে অরক্ষণীয়া ধরা হয়। এমনকি উপযুক্ত সময়ে কন্যা বিয়ে দিতে না পারলে সেই পিতাকে কন্যাদায়ও নিতে হয়। যা সমাজে নিন্দনীয়। কাজেই অবিবাহিতা মেয়ে সমাজে কোনো সমাদর পায় না। শুধুমাত্র তার রক্ষণাবেক্ষণ ও ভরণপোষণের চিন্তা করেই হয়তো অবিবাহিতার জন্য পিতার সম্পদের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কিন্তু এটি আসলে প্রকৃতিবিরুদ্ধ, বিশেষ করে হিন্দু সমাজে। কয়টি মেয়ে অবিবাহিত জীবন কাটায়?

বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মের কর্ণধার হিসেবে যারা নিজেদের উপস্থাপন করেন, তারা বুক ঠুকে ঠুকে বলছেন, — আমাদের মা-বোনদেরকে আমরাই রক্ষা করবো, আমরা তাদের স্বামী-বাপ-ভাইরা রয়েছি কোন কাজে! মেয়েদের সম্পত্তির ভাগ দিলে পারিবারিক অশান্তি বাড়বে, ভাইবোনের সম্পর্কের অবনতি ঘটবে। ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলি হলো শুভংকরের ফাঁকি। বড় বড় ফাঁপা কথা। ইন্ডিয়া পৃথিবীর বৃহত্তর হিন্দু অধ্যুষিত দেশ। আর্যরা প্রথমে এসে থিতু হয় হিমালয়ের পাদদেশের এই সমতল ভূমিতে। বৈদিক আচার এবং নিয়মনীতি সবচেয়ে বেশি পালিত হয় ইন্ডিয়ায়। তো সেই ইন্ডিয়ার সংবিধানেই যদি ১৯৫৬ সাল থেকে নারীর অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশের মতন একটি গণতান্ত্রিক দেশে কেন হিন্দু নারীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে? বাংলাদেশের সংবিধানকে পৃথিবীর অন্যতম সুলিখিত সংবিধান বলা হয়, সেই সংবিধানের মধ্যে কেন হিন্দু নারীর জন্য কোনোও উত্তরাধিকারের কথা থাকবে না!

এখনো যারা এই দেশে বৈদিক অনুশাসন মেনে ধর্মের স্তম্ভ অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য হিন্দু মেয়েদের পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চান, তারা কি কোনোদিনও অপুত্রক বিধবার কথা ভেবে দেখেছেন? পিতাহারা এবং স্বামীহারা মেয়েটির কথা ভেবে দেখেছেন? তাকে কে আশ্রয় দেয়! ভাইয়ের গলগ্রহ হয়ে না হলে শ্বশুরঘরের বাকি মানুষদের লাথিঝাঁটা খেয়ে জীবন পার করে দেয় সে। সংবিধান দেশের এই ক্ষুদ্রতম নারীগোষ্ঠীটির জন্য কি কিছুই করবে না! শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্য রক্ষার দোহাই দিয়ে! কেন, ইন্ডিয়ায় ২০০৫ সাল থেকে যে পিতার সম্পত্তির উপর পাকাপাকিভাবে নারীদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাতে কি সেখানে হিন্দুধর্মের ঐতিহ্য নষ্ট হয়ে গেছে! নাকি তারা যথেষ্ট ধার্মিক নেই আর!

অনেকেই হিন্দু নারীদের উত্তরাধিকারের ব্যাপারে সিভিল কোডের দাবি করছেন। সিভিল কোড হলো, উত্তরাধিকার, পারিবারিক এবং দত্তক বিষয়ে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকার বিষয়ক দেওয়ানি আইন। অর্থাৎ ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানবাধিকারের ভিত্তিতে নারী- পুরুষ সকলের ক্ষেত্রে অধিকার বিষয়ে একই নিয়ম পালিত হবে।
এতোদূর স্বপ্ন এখনও দেখি না। তবে হিন্দু নারীরা যে পুরোপুরিভাবে বঞ্চিত হয়ে এসেছে এতোদিন ধরে, সেই জায়গায় দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের সম্মানজনক বেঁচে থাকা ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নে পৈতৃক সম্পত্তির উপর তাদের ন্যুনতম অধিকার এবং নিজের ইচ্ছেমতোন সেই সম্পত্তি তাদের ভোগ- দখল করার অধিকার যাতে থাকে, রাষ্ট্রের কাছে সেই প্রত্যাশা করি।

ধর্মান্তরিত হলে পৈতৃক সম্পত্তি পাওয়া উচিৎ কি উচিৎ না, এটি একটি অতিরিক্ত প্রশ্ন হিন্দু মেয়ের উত্তরাধিকারের প্রশ্নে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেন এ যাবতকালে কোনো হিন্দু ছেলে ধর্মান্তরিত হয়নি? ছেলেদের উত্তরাধিকার প্রশ্নে সেখানে কী করা হয়েছে? সেগুলি যেভাবে সমাধান হয় বা হয়েছে, মেয়েদের ক্ষেত্রেও ধর্ম সেই নিয়ম হয়তো করবে। সেটি পরের বিষয়। তাই বলে মেয়ে ধর্মান্তরিত হতে পারে… মেয়ে দুর্বল বলে সম্পত্তি রক্ষা করতে পারবে না এরকম অজুহাত তুলে মেয়েদের প্রাপ্য অধিকার থেকে তাকে সর্বৈবভাবে বঞ্চিত করা কোনো ন্যায়সঙ্গত কাজ হতে পারে না। সেটা হতে দেওয়া যাবেও না।

শেয়ার করুন:
  • 244
  •  
  •  
  •  
  •  
    244
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.