অনলাইন বখাটেদের উৎপাত: কীভাবে পরিত্রাণ সম্ভব?

সাবিহা শবনম:

ছেলেবেলায় দেখেছি বখাটেদের নানা উৎপাত। বাড়ির মেয়ে, ছেলে, বৃদ্ধ কেউই এদের উপদ্রব থেকে রেহাই পেতো না। টিজিং, বুলিং, বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে তাদের আনন্দ হতো। বিষয়টি আরও বুঝতে পেরেছিলাম কিছুটা বড় হয়ে। মেয়েদের স্কুল- কলেজের দেওয়ালে, টয়লেটে বিভিন্ন অরুচিকর ছবি, অশ্লীল কথা- অস্বস্তিকর অনুভূতির জন্ম দিতো। গা গুলাতো। এইগুলো লেখা হতো সব বেনামে। অন্যদের অস্বস্তিতে ফেলেই তাদের পৈশাচিক আনন্দ! আম্মুকে একদিন খুব অস্বস্তি নিয়ে বিষয়টির কারণ জানতে চেয়েছিলাম। আম্মু বুঝিয়েছিল- সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির মনস্তত্ত্ব একইভাবে তৈরি হয় না। এর পেছনে অসংখ্য কারণ থাকে। পরিবার, পরিবেশ, বন্ধু এবং স্কুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এইসব বখে যাওয়া বাচ্চারা আসলে বঞ্চনার শিকার। তারা সামাজিকভাবে অবহেলিত। এই বোধ থেকেই তারা নিজেকে জাহির করতে চায় ভিন্নভাবে। ওরা আসলে মানসিকভাবে অসুস্থ। বঞ্চনাই ওদের এই অসুস্থতার জন্ম দিয়েছে। সমাজ অথবা রাষ্ট্র চাইলেই এদেরকে সুন্দর জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে এরা সবকিছুতেই চরম আচরণ করে থাকে। এজন্য যদি এসব বখাটেরা ভুলভাবে পরিচালিত হয় তাহলে সমাজের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে। সেসময় সবটুকু না বুঝলেও এটা বুঝতাম ওরা অসুস্থ – তাই এমন আচরণ করে। ওদের জন্য করুণা হতো। কিন্তু বিশ্বাস করতাম আমাদের সমাজ এদেরকে অবশ্যই পজিটিভলি কাজে লাগেবে। পঁচিশ বছর পরে এসে আমি আর পজিটিভলি ভাবতে পারি না। কী ভীষণভাবে বদলেছে সমাজ!

সমাজ বদলেছে আর বদলেছে বখাটেপনা। যারা একদিন বেনামে টয়লেটে, দেওয়ালে লিখতো- তারাই এখন বেনামে আইডি খুলে অনলাইনে বখাটেপনা করে। অশ্লীলতার চূড়ান্ত। আমি নিশ্চিত তারা যে বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য কমেন্ট বক্সে দুর্গন্ধ ছড়ায় তাদের সে বিষয়ের ছিটেফোঁটাও ধারণা নেই। এমনকি শুদ্ধ বানানেও লিখতে জানে না। তাহলে কেন? কারণ আর কিছুই না – সমাজের অবহেলায় তৈরি হওয়া এই ঊনমানুষগুলো নিজেকে জাহির করতে চায়। আমি মাঝে মাঝে ভেবে অবাক হই – এতটা কুরুচিপূর্ণ চিন্তা মানুষের মগজে কীভাবে আসে! এবং সেটা প্রকাশে এতটুকু লজ্জা করে না! হোক না বেনামে- কিন্তু সেটা তো নিজের কুচিন্তারই বহিঃপ্রকাশ।এমনকি বিশিষ্ট গুণীজনের মৃত্যু সংবাদ প্রকাশের পোস্টেও এদের নোংরামি থেমে নেই। এদের মস্তিষ্ক দুর্গন্ধময় ডাস্টবিন হয়ে গেছে। এসব দুর্গন্ধে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে সবাই। সময় এসেছে পরিশোধনের।

আম্মু বলেছিলো যদি এসব বখাটেরা ভুল ব্যক্তি অথবা বিশ্বাস দিয়ে পরিচালিত হয়- তাহলে সেটা সমাজের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর হবে। এটা আমাকে এখন ভীষণ ভাবায় কোনো বিষয়েই এদের বেসিক জ্ঞান নেই। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী অথবা সংগঠন তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য এদেরকে ব্যবহার করছে। এরা শুধুমাত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই শুনেছি বিভিন্ন ধর্মীয় গল্প। পড়েছি বিভিন্ন মনীষীদের জীবনী। ‘কথার’ ব্যাপারে পরিবার থেকে জেনেছি, আমাদের প্রতিটি কথা এবং কাজ রেকর্ড করার জন্য সর্বদা প্রহরী রয়েছে। অবশ্যই হিসেব করে কথা বলতে হবে।
“মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে (তা লিপিবদ্ধ করার জন্য) তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। (সূরা ক্বাফ ১৮)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে; নচেৎ চুপ থাকে। (বুখারী ৬০১৮, মুসলিম ১৮২)”।
ইচ্ছা করেই আল-কোরানের বাণী এবং হাদিস যোগ করলাম। আমাদের দেশ মুসলিম প্রধান। কমেন্ট বক্সের দুর্গন্ধ ছড়ানো অনেকেই নিজেকে মুসলিম হিসেবে দাবি করে। কোনো মুসলিম জেনেবুঝে নিশ্চয়ই এমন দুর্গন্ধ ছড়াবে না। অবশ্যই না। মুসলিম নীরবতাকে শ্রেয় মনে করে, কেননা তার প্রতিটি বিষয়ের হিসেব দিতে হবে বলে সে বিশ্বাস করে। তাহলে মুসলিম পরিচয়ে নিজেকে মস্তিষ্কহীন পরিচয়ের এরা কারা? আসলে এরাই সমজের আপদ- যাদের জন্য আইন এসেছে। এরা বখাটে!

সাবিহা শবনম

এক্ষেত্রে বুলিং এর শিকার হচ্ছেন বিভিন্ন পাবলিক ফিগার। এবং তারা যদি অমুসলিম হয় তাহলে তো কথায় নেই। কুৎসিত বাণে একেবারে কোনঠাসা! অথচ একজন মুসলিম অমুসলিমদের জন্য আশীর্বাদ হওয়ার কথা যাতে অমুসলিম ব্যক্তি বলতে পারে আমার মুসলিম ভাই অথবা বোন আমার পাশে রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভয়াবহ।
“কোনো মুসলমান যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুন্ন করে কিংবা তাদের ওপর জুলুম করে, তবে কেয়ামতের দিন আমি মুহাম্মদ ওই মুসলমানের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে লড়াই করব। ’ –সুনানে আবু দাউদ : ৩০৫২”
অথচ হেটার্স গ্রুপের বেশিরভাগ স্পিচ থাকে অমুসলিমদের নিয়ে। এই চক্র নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। যারা সামান্য লিখতে পারে তারা কমেন্ট বক্স নোংরা করে। আর যাদের সে অবস্থা নেই- তারা গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে হা হা রিয়্যাক্ট দেয়।

আরও মজার বিষয় হচ্ছে ‘ডিভোর্সি নারী’ শুনলে এসব বখাটে শ্রেণির মধ্যে কোনো কোনো পুরুষ হয়তো নিজেকে তার যোগ্য ভেবে বসে থাকে। তাদের এই বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ আমাকে এমনটা ভাবতে বাধ্য করেছে। কিন্তু তাদের আকাশকুসুম স্বপ্নভঙ্গ হয়ে যায় যখন সেই ডিভোর্সি নারী অন্য কারোর সাথে সংসার শুরু করে। এবং তখনই তারা পরাজয়ের নোংরা বাণ ছুঁড়তে থাকে। ব্যাপারটা হাস্যকর হলেও আমি ডিভোর্স ইস্যুতে এতো আস্ফালনের অন্য কারণ খুঁজে পাই না।

আমি প্রায় দশ বছর আরবের একটি দেশে থাকি। এখানে ডিভোর্স একটি নরমাল ব্যাপার। এরাবিয়ান একটা স্কুলে পড়ানোর সময় আমার এক মেয়ে কলিগের সাথে খুব ঘনিষ্ঠতা হয়েছিলো। যখন তার সাথে আমার পরিচয় তখন সে তৃতীয় বিয়েতে টিকে ছিলো। আমি প্রায় দুই বছর মতো সেখানে কাজ করেছিলাম। দেড় বছরের মাথায় সে আমার জন্য একটা গিফট-বক্স নিয়ে হাজির। চকলেট, পারফিউম, জুয়েলারি। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম- হঠাৎ গিফট কেন? সে জানায় চতুর্থবারের মতো সে বিয়ে করেছে। তাড়াহুড়ায় আমাকে জানাতে পারেনি। তাই আমার জন্য গিফট এনেছে। আমি আগের বরের কথা জিজ্ঞেস করতেই বলেছিল, “খাল্লিবাল্লি”। এটার অর্থ আমার কাছে পরিষ্কার না, কিন্তু মনে হয়েছিল আই ডোন্ট কেয়ার টাইপের কিছু। এদের মধ্যে বিয়ে – ডিভোর্স হরহামেশাই হচ্ছে। কেউ এই বিষয় নিয়ে চিন্তিত নয়। অর্থাৎ সমাজের অন্য কেউ কারও ব্যক্তিজীবন নিয়ে অতি উৎসাহী নয়। কেউ কারও বেডরুম নিয়ে মাথা ঘামায় না। এটা একান্তই পার্সোনাল। অথচ আমাদের চিন্তার শেষ নেই, যতটা চিন্তা সেই ব্যক্তি নিজেও করে না! এটি উল্লেখের বিশেষ কারণ – ডিভোর্স ইস্যুতে কমেন্ট বক্স আমোদের জায়গা হয়ে ওঠে। যে সমাজে সুস্থ বিনোদনের অভাব থাকে সে সমাজে এধরনের মানুষেরা এরকমের অসুস্থ এবং বিকৃত পথে বিনোদনের ব্যবস্থা করে নেবে – সেটা স্বাভাবিক।

একসময় বখাটেদের জ্বালাতনে আত্নহত্যার মতো ঘটনা খুব কমন ছিলো। এখনো হচ্ছে। কখনো কখনো তাদের উৎপীড়ন মারাত্মক অপরাধের মধ্যে পড়তো। এসিড নিক্ষেপ, হাইজ্যাকিং, মাদকপাচার ইত্যাদি। এর মধ্যে এসিড নিক্ষেপ মারাত্মক আকার ধারণ করেছিলো।কী অসহায় ভাবে মেয়েরা চলাফেরা করেছে সেসময়। কত মেয়েকে সারাজীবনের দাগ বয়ে নিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এরপর এসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২ প্রণয়ন করা হয় এসিড অপরাধসমূহ দমন করার লক্ষ্যে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড (ধারা ৪)। এই আইনের কঠোরতায় এসিড নিক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে। সেক্ষেত্রে অনলাইন বুলিং নিয়ন্ত্রণে আমি ভীষণ আশাবাদী- কেননা অনলাইন ট্র‍্যাকিং আরো সহজ এবং অপরাধ প্রমাণ করা অনেকটা সহজ হয়ে যায়। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩)-এর ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে কোনো মিথ্যা বা অশ্লীল কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করে, যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয় অথবা রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে এগুলো হবে অপরাধ। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা। বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে এই ৫৭ ধারার অপব্যবহার না করে বরং সময়োপযোগী আইনের সংস্কার করে শাস্তির কঠোরতা এবং তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রয়োগের সময় এসেছে। কেননা এটি মহামারীর চেয়ে কম নয়। সময় এসেছে নিয়ন্ত্রণের। কতো মানুষ মানসিক পীড়নের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ আত্নহত্যাও করছে। অনেকেরই মিথ্যা সম্মানহানীতে কোনঠাসা হয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। এই অসুস্থ অবস্থার জরুরি সমাধান আবশ্যক।

কমেন্ট বক্স যদি আমাদের সমাজকে রিপ্রেজেন্ট করে তাহলে সেটি কী ভয়ানক অপমানকর এই জাতির জন্য। অনেকেই ইন্টারনেট ব্যবহারের সঠিক নিয়ম জানে না। খুব সহজলভ্য এন্ড্রয়েড ফোন সহজেই অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। এক্ষেত্রে অবশ্যই এন্ড্রয়েডের ব্যবহার এবং ইন্টারনেট সার্ফিং এর ব্যাপারে প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিৎ। পরিবার এবং স্কুল এক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে পারে। অথবা স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন বিভিন্ন স্থানে ইন্টারনেট ব্যবহারের ভদ্রতা বিষয়ে কাউন্সিলিং করতে পারে৷ অপরাধ এবং শাস্তি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে অনেকেই সাবধান হতে পারে। ফেইক আইডির ব্যাপারে আইনগত কঠোরতা জরুরি। যেক্ষেত্রে জীবন ইন্টারনেট নির্ভর হয়ে উঠছে এবং ভবিষ্যত এটি ছাড়া অকল্পনীয় সেক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পর্কে রাষ্ট্রের ভাবনা অতি আবশ্যক।

প্রতিবাদের পাশাপাশি প্রতিরোধ অপরিহার্য। প্রতিরোধের সবগুলো উপায় ভাবা উচিত। বিভিন্ন সেন্সরের মাধ্যমে ফিল্টারিং থেকে শুরু করে আচরণ অনুযায়ী ব্লক করা যেতে পারে। বখে যাওয়া মস্তিষ্ক আমাদের এই সমাজেরই অংশ। এরা আমাদের জন্য হতে পারতো অথবা হতে পারে আশীর্বাদ। আমরা সবাই মিলে তৈরি করতে চাই একটা সুস্থ সমাজ। যেখানে সবাই স্বাধীন চিন্তা এবং স্বাধীন মতামতের চর্চা করতে পারবে। তবে সেটা কোনোভাবেই অসুস্থ উপায়ে না।

শেয়ার করুন:
  • 151
  •  
  •  
  •  
  •  
    151
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.