ধর্মীয় নিয়মে নারীর ‘সম্মানজনক’ জায়গাগুলো চিনতে পারেন তো?

সাজু বিশ্বাস:

একজন লোক চিরকুমার। বিয়ে করেননি। তিনি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে রিটায়ার করেছেন বারো বছর আগে। তার সঞ্চয়ে প্রায় এক কোটি টাকা জমেছে। এতো টাকা দিয়ে কী করবেন? এই প্রশ্ন করতেই তিনি উত্তর দিলেন, এই টাকা কত মানুষের কাজে লাগবে জানেন! আমি বেশ কৌতুহলি হলাম, তাই? কী কী কাজ আপনি করেছেন এখন পর্যন্ত?
তিনি বললেন, এখনও শুরু করতে পারিনি। একটা হাসপাতাল আর একটা স্কুল করবো। কিন্তু প্রবলেম হলো, আমার পৈতৃক সম্পত্তি যেখানে এই কাজগুলো করবো, তার অর্ধেক আমার ছোট ভাইয়ের। সে থাকে লন্ডন। কিন্তু সে ঐ জায়গা দিতে চাইছে না…”।
আর বোন? বোন নেই আপনার?
আছে, দুইবোন। কিন্তু তাদের এখানে কিছুই বলার নেই।
তারপর মুখ নিচু করে একটু ফিসফিস করে পরামর্শের সুরে বললেন, আমাদের মধ্যে জানেন তো বোনেরা কোনো পৈতৃকসম্পত্তি পায় না।
কেন জানি, আমি খুবই আশাহত হলাম।
জীবনের বাহাত্তর বছর পার করা সর্বোচ্চ শিক্ষিত একজন লোক, তিনি এখনোও প্রজেক্টই শুরু করতে পারেননি! টাকা আর প্ল্যানই শুধু জমিয়ে চলেছেন!
কিন্তু তার চেয়েও করুণ অবস্হা হলো, তিনি মানুষের কল্যাণের জন্য বড় বড় প্ল্যান করছেন, অথচ তার একই মায়ের গর্ভজাত দুই বোনকে ঠকানো নিয়ে তার মনে কোনো বিচারবোধ নেই।

এইদিনই দ্বিতীয় কাহিনীটি চোখে পড়লো। দুইজন হিন্দু মেয়ে দুইটি ব্যানার টাঙিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করছেন। তারা বলছেন, — আমরা আমাদের ধর্মীয় নিয়মের কোনো রকম পরিবর্তন চাই না।
রিটায়ার প্রিন্সিপ্যাল ভদ্রলোকটি নিজের অজান্তেই ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজের দুই বোনের গালে যে থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছিলেন, — আমার মনে হলো, এই মেয়ে দুইটি নিজেদের গালে নিজেরাই তার চেয়ে বেশি জোরে থাপ্পড় কষিয়ে দিল!
ইনারা ধর্মীয় নিয়মের কোনো পরিবর্তন চান না। ধর্মীয় নিয়ম বলতে বোধহয় পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকার পাবার বিষয়টিই এখানে মানবাধিকারের ভিত্তিতে পরিবর্তনের দরকার পড়ে। তা না হলে বাকি সব পুজাআচ্চা মন্তর তন্তর তো একচেটিয়া পুজারি ব্রাহ্মণ ঠাকুরদের নিয়মেই চলে।
তা ধর্মের পুরাতন নিয়মে মেয়েদের জন্য কত কত সম্মানজনক জায়গা রাখা হয়েছে, যার পরিবর্তন আপনারা চান না, দেবীগণ!

বৈদিক ধর্মের সবচেয়ে পুরনো গ্রন্থ ঋগ্বেদ।
বেদ নিয়ে বহু অন্ধ বিশ্বাস আছে মানুষের মনে।
স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার মুখের বাণী বেদ। অপার্থিব জিনিস বেদ… সাধারণ মানুষের অগম্য বেদ…এইরকম।
এইসব অন্ধ বিশ্বাস জমা হতে হতে বেদ ক্রমেই মানুষের জানার বাইরে চলে গেছে।

বেদ নিছক, নেহায়েতই মানুষের বেঁচে বর্তে থাকার জন্য, সুখ শান্তির জন্য প্রার্থনা। বেদ সৃষ্টিকর্তার মুখ থেকে খসে পড়া কোনো বাণী নয়, বরং তখনকার মুনিঋষিরা জীবনের প্রয়োজন এবং সমাজ নিয়ে যা যা ভাবতেন এবং যা যা দেবতাদের কাছে চাইতেন, তার একটা খসড়া ডিমান্ড নোট বলা যায় ঋগ্বেদকে। এইভাবে ইন্দ্র বরুণ ও অগ্নির কাছে গরু জব মধু শত্রু নিধন ইত্যাদি চাইতে চাইতে একসময় মানুষ ঋগ্বেদের সময় পার করে এসে সামবেদ যজু এবং অথর্ব বেদের পর্যায়ে যেতে যেতে অনুভব করতে লাগলো যে কেবল ক্ষুধা, কেবল গো-ধন বা কেবল জাগতিক সম্পদ চাওয়ার মধ্যে কোনো সুখ নেই, বরং আত্মার শান্তি এবং আত্মার সাথে ঈশ্বরের সম্পর্ক স্হাপন করতে পারাটা জীবনের একটা উদ্দেশ্য।

তো সে যাক গে। কথা হলো নারীর জায়গা নিয়ে। ঋগ্বেদে কন্যা সন্তান চেয়ে একটি প্রার্থনাও নেই। কিন্তু পাশাপাশি পুত্রের জন্য পিতার জন্য বারবার পুত্রপৌত্রাদিসহ ভালো থাকার প্রার্থনা আছে। পাশাপাশি নারীর কাজ নির্দ্দিষ্ট করে যদি বলতে হয়, তাহলে প্রধানত পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়াকেই নারী জীবনের উদ্দেশ্য ধরা হয়েছে।

নারীকে বারবনিতা হিসেবেও দেখানো হয়েছে।
মেয়েদের সতীন থাকবে এটাই স্বাভাবিক এবং সেই সতীনকে যে ধ্বংস করতে পারে, তাকে বীর নারী বলা হয়েছে। নারীর স্বামী মারা গেলে দেবরকে পুনরায় বিয়ে করার কথা আছে ঋগ্বেদে। এই বিষয়টিকে অনেকেই পজিটিভ হিসেবে দেখেছেন, বিশেষ করে সুকুমারী ভট্টাচার্য আরো অনেকে এর উচ্ছসিত প্রশংসা করেছেন যে সহমরণের চেয়ে ভালো এই জিনিসকে জীবনের পথে আহ্বান বলা যায়। কিন্তু মনে একটা সন্দেহ খচখচ করে, দেবরের সাথেই কেন! কেন আর কেউ নয়!
সহজ উত্তর মেলে, সম্পত্তি বা পুত্র সন্তান যাতে হাত ছাড়া না হয়ে যায়, সেইজন্য এই ব্যবস্থা।

পুরুষের পাশাপাশি নারীর যজ্ঞে বসার কথা আছে ঋগ্বেদে। তবে এটাকে সমান অধিকার বলতে নারাজ অনেকেই। সমান অধিকারই যদি হতো, তাহলে ঘরে সতীন আসতো কোন দুঃখে! এটা কেবল নারীর ঘটের মতো বসে থাকা ছাড়া আর কোনো কাজ ছিল না। সেইজন্য তো রামচন্দ্র যজ্ঞের সময় পাশে সোনার সীতা বানিয়ে বসিয়ে রেখেছিলেন। বাস্তবের সীতাকে বনবাস থেকে আনানোর দরকার মনে করেননি…।

ঋগ্বেদের ষষ্ঠ মণ্ডলের বেশিরভাগ সুক্তগুলি মহর্ষি বিশ্বামিত্র ও তার পুত্রের লেখা। এই বিশ্বামিত্র যৌবনে কী করেছিলেন? তিনি উর্বশীর সাথে মিলিত হয়ে এক কন্যা সন্তান জন্ম দিয়ে সেইখানেই দুইজনে সেই কন্যা শিশুকে ত্যাগ করেছিলেন। সেই কন্যাটির নাম বিখ্যাত শকুন্তলা। মহাভারতের সবচেয়ে শক্তিশালিনী নারী চরিত্র হলো সত্যবতী। রাজা উপরিচরবসু অদ্রিকা নামের এক অপ্সরার গর্ভে দুই যমজ ছেলেমেয়ের জন্ম দেন। একইসাথে জন্ম হলেও মেয়ে হবার কারণে সত্যবতীকে সেই জায়গাতেই ত্যাগ করে তার জন্মদাতা মা-বাবা। আর ছেলে সন্তান হবার কারণে তার যমজ ভাই মৎসরাজকে নিয়ে একেবারে রাজকুমার বানিয়ে দেয় তার রাজা বাবা। সত্যবতীকে কুড়িয়ে নেয় জেলেরা।
ঘৃতাচী বলে এক অপ্সরার গর্ভে ব্যাসদেব জন্ম দেয় শুকদেবের। ছেলে সন্তান হবার কারণে বাবা তাকে কাছে রাখে। মেয়ে হলে হয়তো পরিত্যাগই করতেন।

এই রকম আরো আরো উদাহরণ আছে পুরাতন শাস্ত্রে। শুধুমাত্র মেয়ে হবার কারণে এমনকি পিতৃপরিচয় থেকেও তাদের বঞ্চিত এবং পরিত্যাগ করা হয়েছে।

পাণ্ডবদের মাতা কুন্তি, জনকের মেয়ে সীতা, এমনকি রামচন্দ্রর একমাত্র বোন এরা সবাই নিজের জন্মদাতা বাপ দ্বারা পরিত্যক্তা হয়ে অন্যের ঘরে পালিত হয়েছেন।

ঋগ্বেদে একমাত্র অবিবাহিতা মেয়ের পিতার সম্পত্তিতে পূর্ণ অধিকার স্বীকার করা হয়েছে। তবে উল্টোদিকে কন্যার বয়স হয়ে গেলে তাকে বিয়ে দিতে না পারলে বাবাকে কন্যা দায়গ্রস্ত বলে অপরাধী করা হয়েছে। তাহলে দাঁড়ালো কী শেষকালে!
আমি জানি না। আপনারা যারা পুরনো নিয়ম অক্ষুণ্ণ রাখতে চান, তারা চিন্তা করেন।

শেয়ার করুন:
  • 128
  •  
  •  
  •  
  •  
    128
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.