চাই ইউনিফর্ম সিভিল কোড এবং ‘ধর্মমুক্ত’ আইন

সুপ্রীতি ধর:

যেকোনো দেশের যেকোনো আইনই রাষ্ট্রীয়। রাষ্ট্র যে সংবিধান দ্বারা পরিচালিত হয়, সেই সংবিধানে রাষ্ট্রের নাগরিকের জন্য যেসব নিয়মকানুন উল্লিখিত আছে, প্রতিটি নাগরিক তা পালন করতে বদ্ধপরিকর। এর অন্যথা হওয়া মানেই সংবিধান লঙ্ঘন। দেশের বিদ্যমান প্রচলিত আইনকেও সেইভাবে পরিচালিত হতে হয়, এটাই স্বাভাবিক। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে যদি আমরা তাকাই, তবে দেখবো যে সেখানে বিদ্যমান সব আইনই রাষ্ট্রীয় আইন, যা কিনা সর্বসাধারণের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, ধনী-দরিদ্র, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে। কোন উন্নত দেশেই বিশেষ কোন সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক কোন আইন কার্যকরি না। যে আইনের আওতায় সব নাগরিকের বিচারকাজ সমানভাবে সম্পন্ন হবে। এক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয় কোন অর্থই বহন করে না। তাহলে বাংলাদেশে কেন ধর্মীয় আইন বলবৎ থাকবে?

কথাগুলো বলার পিছনে কারণ একটাই এই মুহূর্তে। তাহলো হিন্দু নারীদের উত্তরাধিকার ও বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার সংক্রান্ত আইন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা মানুষ, নানা সংগঠন দাঁড়িয়ে গেছে। বিপক্ষের লোকজন একে শাস্ত্রীয় আইন লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে জল ঘোলা করার চেষ্টা করছে। প্রত্যক্ষভাবে সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার বিষয়ে বিরোধিতা করছে হিন্দু মহাজোটসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন। এই হিন্দু মহাজোট আবার প্রতিবেশি ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির বাংলাদেশ শাখা বলে পরিচিত। যদিও ভারতে হিন্দু নারীদের অধিকার নিশ্চিত করে বহু আইনের সংস্কার সাধন করা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে কিছু খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে দিনের পর দিন এই সংস্কারের পথ রুদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। এই উগ্র হিন্দু মৌলবাদী গোষ্ঠীর সাথে অন্যান্য ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের কোনোই ফারাক নেই। বিশেষ করে আন্দোলনকর্মী এবং অ্যাক্টভিস্টরা প্রতিনিয়ত এই দুই পক্ষেরই রোষানলের শিকার হচ্ছে মাঝেমধ্যেই।

বাংলাদেশে বিদ্যমান আর সব আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয় তাহলে সম্পত্তিতে যেকোনো ধর্মের নারীর অধিকারও একই আইনে প্রযোজ্য হবে। হিন্দু-মুসলমান আলাদা করে নয়। জাতিধর্ম নির্বিশেষে আমাদের দেশটার হওয়ার কথা অসাম্প্রদায়িক একটা দেশ। সেখানে ধর্মীয় আইন কেন থাকবে নারী অধিকার প্রশ্নে? কেন ধর্মের জুজু দেখিয়ে নারীদের যুগের পর যুগ ধরে বঞ্চিত করা হবে তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে? যদি কোনো আইনের সংশোধন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন বা সংস্কার হয়ই, তবে তা হওয়া উচিত সব ধর্ম নির্বিশেষে। একটা ইউনিফর্ম সিভিল কোড হোক। কেবলমাত্র হিন্দু নারীদের উত্তরাধিকার আইনই নয়, সব ধর্মের নারীদেরই সমানাধিকার নিশ্চিত করা উচিত। বলা ভালো যে ‘নিশ্চিত করতে হবে’।  ইউনিফর্ম সিভিল কোড মূলত কী? এটা এমন একটা ব্যবস্থা যা কিনা পুরো রাষ্ট্রের জন্য একক আইন নিশ্চিত করে, সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত যতো রীতিনীতি আছে, যেমন বিয়ে, বিবাহ বিচ্ছেন, উত্তরাধিকার, সন্তান দত্তক গ্রহণ, সব বিষয়েই আইন হবে অভিন্ন এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান বলে আলাদা কোনকিছু গ্রহণযোগ্য হবে না।

দেখুন, যখন আমরা নারীদের সমানাধিকারের দাবি তুলছি, তখন আমরা কোন বিশেষ ধর্মের নারীদের কথা বলছি না, দলমত-ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে সকল নারীর সমানাধিকারের কথা বলছি। তাহলে কেন আমরা এখন কেবলমাত্র হিন্দু নারীদের উত্তরাধিকার এবং বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার নিয়ে কথা বলছি? এর একটা কারণ অবশ্যই আছে। কারণ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৫০ বছরেও হিন্দু নারীদের সম্পত্তিতে কোন অধিকার নেই। আবার একেবারেই যে নেই, তা নয়। আছে কিছু প্রচ্ছন্ন আইন। এর মাঝে একটি হলো ভোগস্বত্ব আইন। এটি কী? ভোগস্বত্ব আইনের আওতায় স্ত্রী স্বামীর বাড়িতে থাকা-খাওয়া-পরার নিশ্চয়তা পান, স্বামীর বিয়োগ ঘটলে বা অন্য কোন কারণে স্বামীর অবর্তমানে স্ত্রী সেটা ভোগদখল করতে পারবেন, এই সম্পত্তি সন্তানের কল্যাণে ব্যবহার করতে পারবেন, কিন্তু তারপরও এটা তার নিজস্ব সম্পত্তি নয়। নিজের কোন প্রয়োজনে তিনি তা বিক্রি করতে পারবেন না।

তাহলে কী দাঁড়ালো? দাঁড়ালো এটাই যে, একই পরিবারে একই বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নেয়া সত্ত্বেও কন্যাশিশুটি তার সহোদর ভাইয়ের মতো অধিকার প্রাপ্ত নয়। বাবার বাড়িতেও সে ছোট থেকে বড় হয়, খায়-দায়, পড়াশোনা করে, বাবা-মা একসময় বিয়েও দিয়ে দেয় যথাসম্ভব সামর্থ্য অনুযায়ী খরচাদি করে। তারপর তার স্বামীর বাড়িতে গমন। সেখানে তার ভাগ্যে যা লেখা আছে তার সাথেই আপোস করে চলতে হয়, কারণ তার ফেরার পথ ততদিনে বন্ধ। স্বামী যদি উন্মাদ, শারীরিকভাবে অক্ষম, নেশাগ্রস্ত, পরনারীতে আসক্তও হয়, অধিকাংশ মেয়ের ফেরার সেই পথ থাকে না। ব্যতিক্রম সবসময়ই ব্যতিক্রম। তা নিয়ে বলছি না। কিন্তু এই যে একটা মেয়ে আজন্ম লালিত-পালিত হয় অন্যের দয়া-দাক্ষিণ্যে, তার নিজস্ব বোধবুদ্ধিরও তো বিকাশ ঘটে না সেইভাবে। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনের দ্বারস্থ সে হয় না। তার ওপর আছে সমাজে লোকলজ্জার ভয়। বাংলাদেশে এমনিতেই সংখ্যালঘুরা নানাভাবে কোণঠাসা হয়ে থাকেন, সেখানে সংখ্যালঘু পরিবারের এসব মেয়ে বা নারীরা আরও অধিকতর সংখ্যালঘু।

বার বার হিন্দু উত্তরাধিকার আইন সংশোধনের সুপারিশ আসে, সেটা নিয়ে কদিন বেশ আলোচনা হয়, তারপর আবার যেইকে সেই তিমিরেই তলিয়ে যায়। কোন সমাধান হয় না। আশা করবো এবার এর একটা সমাধান হবে। সুপারিশগুলো বিবেচনায় আনার পাশাপাশি সরকারের উচিত এই একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে প্রতিটা নারীর অধিকার নিশ্চিত করা। আর তা করতে ইউনিফর্ম সিভিল কোডের বিকল্প নেই। মুসলিম পারিবারিক আইনেও হাত দিতে হবে। সেখানে বিদ্যমান অসামঞ্জস্যতা যেগুলো রয়েছে তা সংশোধন করতে হবে। তবেই না বাংলাদেশের প্রতিটা নাগরিক অর্থাৎ প্রতিটা নারীর প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত হবে।

শেয়ার করুন:
  • 172
  •  
  •  
  •  
  •  
    172
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.