ভালোবাসা খুঁজুন মনের গভীরে, বিশ্বাসে, সম্মানে

প্রিয়াঙ্কা দাস মিলা:

আমাকে অনেকেই নারীবাদী বলে ডাকেন। নিজেদের অধিকার চাইলেই বুঝি নারীবাদী হয়! সমাজের অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেয়া নিয়মনীতি না মানলেই বুঝি নারীবাদী হয়! যাই হোক, বলছিলাম যে, বন্ধুমহলে একটা কথা নিয়ে প্রায়ই হাসি ঠাট্টা চলে “পুরুষরা বেকার নারীকে বিয়ে করলেও, প্রতিষ্ঠিত নারীরা কোন বেকার পুরুষ বিয়ে করে না”। এ ব্যাপারটা নিয়ে আজকে একটু কথা বলতে চাই, আপনাদের মতামত জানাবেন।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থাটাই এমন যে, আমরা ছেলে এবং মেয়েকে একদমই ভিন্ন দুই পরিবেশে বড় করি। ছেলেদের সাত খুন মাফ হলেও মেয়েদের পান থেকে চুন খসলেই “জাত যায়, মান যায়, ভিটেমাটিও যায়!” জন্মের পর থেকেই দায়িত্বের এক বিশাল বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয় পুরুষের ঘাড়ে, আর নারীকে বানানো হয় “অবলা”। খোদ নিজের পরিবারও সমর্থন করে না। মানিয়ে নিতে বলে এমনকি মরে গেলেও কপালের দোষ দিয়ে নিজেদের সান্ত্বনা দেয়। অনেকের (পুরুষ -নারী উভয়ের) মুখেই শুনেছি বেশি শিক্ষিত হলে নাকি নারীদের শাসন করা যায় না, বশে রাখা যায় না! বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যার শুরু হয় বিয়ের পর। বিয়ের আগে যে মেয়েটা সকাল দশটা পর্যন্ত ঘুমাতো, সেই মেয়েটাই বিয়ের পর সকাল ছয়টায় উঠে পরিবারের প্রয়োজনে।

পুরুষ বাইরেটা সামলাবে, নারী সামলাবে ঘর, এইতো আপনাদের আদর্শ? তাহলে ঘরের কাজগুলোকে কেন আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে হয় না, আমার বোধগম্য নয়। অথচ বিয়ে হওয়া উচিত দু’টি নারী-পুরুষের মাঝে। সমান দায়িত্ব, সমান কর্তব্য। নতুন জন্ম। নতুন সংসার।

আমাদের সমাজে বিয়ে হয় দুই ফ্যামিলির। যাদের ঘিরে এই ফ্যামিলি আবর্তিত হবে তাদের মধ্যে ভাব- ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ আছে কিনা সেটা দেখার প্রয়োজন নেই কারও। শুধুমাত্র রাতের অন্ধকারে জৈবিক চাহিদা মেটানো আর বছর বছর বাচ্চা জন্ম দেয়াই যাদের মূল এবং প্রধান কাজ। বিবাহিত দুই নারী পুরুষ কখনও নিজেদের ভালোবাসি বলে না। রান্না ভালো হয়েছে বা বিশেষ দিনে কিছু গিফট দেয়াকেই তারা সোকল্ড ভালোবাসা ধরে নিয়ে নিজেদের বাকি জীবন চালাতে চালাতে একসময় অনেক আফসোস নিয়ে মরে যায়।

আচ্ছা, ভালোবাসাটা কেন সবসময় বয়স, ডেজিগনেশন, উপার্জনের পরিমাণের উপর সীমাবদ্ধ থাকে? কেন বয়সে বড় মেয়েটা বয়সে ছোট ছেলেটাকে ভালোবাসতে পারে না? কিংবা বয়সে ছোট ছেলে বয়সে বড় কোন মেয়েকে ভালোবাসতে পারে না? আচ্ছা, ভালোবাসা কেন শিক্ষিত চাকরিজীবী ছেলের সাথে অল্প বয়সী একটা মেয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে? কেন উঁচু পোস্টে চাকরি করা মেয়েটা তার চেয়ে নিচু পোস্টে বা একটা বেকার ছেলেকে বিয়ে করতে দ্বিধাবোধ করে? কেন একটা মেয়ে যদি তার স্বামীর তুলনায় বড় পোস্টে জব করে, তবে ছেলেটা বা তার ফ্যামিলি “বউকে বশে আনতে না পারার রোগে” নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে?

এমন অনেক মেয়েকে দেখেছি সে নিজে শিক্ষিত চাকুরিজীবী বলে তৃতীয় শ্রেণিতে চাকরি করা কোন পুরুষকে বিয়ে করতে চায় না। কিন্তু কেন তার চাওয়াটা পুরুষের ইনকাম বা ডেজিগনেশন এর উপর ডিপেন্ড করবে? ভীষণ হ্যান্ডসাম ছেলেটাকেও রিজেক্ট করে দেয় শুধুমাত্র ছেলের বাবা নিচু পোস্টে চাকরি করেছে বিধায়! কী ভীষণ অবজ্ঞা, অহংকার, তাই না? দিনশেষে উঁচু ডেজিগনেশনওয়ালা স্বামী যখন তোমাকে সময় দিতে পারবে না, তখন মেয়ে তুমিই অভিযোগের ঝাঁপি নিয়ে বসবে! ৩২ বছরের পুরুষটি বিয়ের জন্য যখন ‘কচি মেয়ে’ খোঁজে, কিন্তু কচি বউয়ের কাছে তার স্টেজের ম্যাচুরিটি আশা করে, তখন সেই পুরুষই সবচেয়ে বেশি ডিপ্রেশনে ভোগে।

আমরা আসলে কখনও ভালোবাসা খুঁজি না, আমরা খুঁজি স্ট্যাটাস, মান-সম্মান। অথচ এই আমরাই আমাদের সম্মান করতে নারাজ! কী অদ্ভুত আমাদের চাওয়া! আপনার এমডি/চেয়ারম্যানওয়ালা পুরুষটি যদি নপুংসক হয়, মেনে নিতে পারবেন তো? উঁচু মর্যাদাওয়ালা পুরুষটি যদি আপনাকে বাদ দিয়ে অন্য কোন নারীর দিকে তাকায়, মেনে নিতে পারবেন তো? তাই বলছিলাম যে ভালোবাসা খুঁজুন মনের গভীরে, সম্মানে ও বিশ্বাসে। পদমর্যাদায় কিংবা বয়সে নয়!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.