অপর্ণার জীবনে ‘নারী’-১

উইমেন চ্যাপ্টার:

ছোটবেলা থেকে বেশ কয়েক ধরনের নারী জীবন দেখে বড় হয়েছে অপর্ণা।

নারী খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠবে, বাসী কাপড় পাল্টে অথবা স্নান করে এসে রান্নাঘরে ঢুকবে। ভেজা চুলে গামছাটা তখনও পেঁচানোই থাকবে। তখন গ্যাস ছিল না বলে লাকড়ির চুলায় রান্না হতো। চুলায় নতুন লাকড়ি ঠেসে দিয়ে সেখানে খানিকটা কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে অপেক্ষা করবে ভালোমতোন জ্বলে উঠবার। ততক্ষণে স্টোভে চায়ের জল বসানো হবে। চুলায় আগুন ধরার সাথে সাথেই সেখানে গরম জল চাপানো হবে। এরই মাঝে চা হয়ে গেলে তা নামিয়ে রেখে অপেক্ষা করা হবে কখন বাড়ির সব পুরুষেরা জেগে উঠবে। চুলা থেকে গরম জল নিয়ে তাতে আটা মাখিয়ে রুটির ‘কাই’ যাকে আমরা এখন শুদ্ধ ভাষায় ‘ডো’ বলি, তা করে রেখে বটিটা টেনে নিয়ে হয় আলু ভাজি, বা সবজি কাটা হবে। তরকারি কুটে-ধুয়ে তা রান্না হবে। এরই মাঝে আটার গোলা থেকে রুটি বানানো হবে নিপূণ হাতে। সবাই ঘুম থেকে আয়েশ করে উঠে হয়তো একঝলক দেখে যাবে ‘কতদূর’ খাবার! যদি বাড়িতে ঠিকা কেউ থাকে কাজের, তাহলে তাদের দায়িত্ব রাতের বাসনকোসন কলপাড়ে বা কুয়ার পাড়ে নিয়ে ধুয়ে আনা। সকালের পর্ব শেষ হতে না হতেই যার যার গন্তব্যে ছুটছে বাড়ির লোকজন। কেউ অফিসে, কেউ অন্য কাজে, কেউবা স্কুল-কলেজে, কেউবা বাজারে। বাজার এলে শুরু হবে দুপুর পর্ব। সেই নারীটি যে কিনা সকালে ঢুকেছিল রান্নাঘরে, তার তখনও মুক্তি মিলবে না সবকিছু গোছগাছ করে উঠে আসতে। দুপুরের পর খানিক বিরতি। বিকাল বা সন্ধ্যায় চা-নাশতা পর্ব। তারপর আবার চুলা ধরাও, রাতের রান্না করো। বেড়ে খাওয়াও, এঁটো সাফ করো, রান্নাঘর গুছিয়ে অবশেষে নিজের ঘরটাতে ফেরো, যদি আদতেই নিজের বলে কোন ঘর থাকে আর কী!

আরেক ধরনের নারী ছিল, যারা ঘরের কাজও ষোলআনা করতো, আবার চাকরিও করতো। শীত নেই, গ্রীষ্ম নেই, কাকডাকা ভোরে কোন গরম জলের বালাইও নেই, বালতির পর বালতি ঠাণ্ডা জল শরীরে ঢেলে কোনরকমে শাড়িটা দুপ্যাঁচে জড়িয়ে এসেই উনুনে লাকড়ি দিতে দিতেই বাড়ির কর্তার জন্য গরম জলের ডেকচি বসাতো। আরেক চুলায় কাঠের ভুষি ভরে সারাদিনের রান্নার বন্দোবস্ত করতো সেই নারীই। অত:পর ভাত বসানো হলো, ভাত হতে না হতেই ডাল, এদিকে সবজি কাটা, মশলা বাটা, সব আয়োজনও একা হাতেই করতো সেই নারী। সকালে সবার নাশতা হয়ে গেলেও নিজের মুখে কিছু দেবার সময়টি হতো না তার। দুপুরের রান্না বাটিতে বাটিতে আলাদা করে তুলে কোনরকমে নাকে-মুখে কিছু দিয়ে ইস্ত্রির পাটভাঙা শাড়ি পরে চাকরিতে ছুটতো। চুলের ফ্যাশন বা মুখে স্নো-পাউডার মাখার ফুরসতও থাকতো না। যখন বাচ্চা হলো, তখন আরও অনেক অনেক কাজ যুক্ত হলো আগের নৈমিত্তিক কাজগুলোর সাথে। একজন মা তার সন্তানকে একটু আহ্লাদ করারও সময় পেতো না নিত্য কাজের চাপে। বাড়ির পুরুষটি ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় আয়েশ করে বসে ‘শেভ’ সেরে গরম জলে স্নান করে এসেই টেবিলে বসে যেতো। আর অপেক্ষায় থাকতো কখন রান্নাঘর থেকে নারীটি এসে তার সামনে রাখা প্লেটে খাবার তুলে দেবে। নিজের হাত দিয়ে কখনও খাবার বেড়ে নিয়ে খেতে দেখিনি আমি। বিকেলে বা সন্ধ্যায় চাকরি থেকে ফিরেও শাড়িটি পাল্টেই আবারও সেই রান্নাঘরেই ঢোকা। হয়তো বাজার থেকে ততক্ষণে টাটকা গুড়োমাছ এসেছে, যেগুলো কেটেধুয়ে রান্না করতে হবে আজ রাতেই। কর্তার মন চেয়েছে ঝিঙে দিয়ে ছোট মাছের চচ্চড়ি খেতে। গিন্নি কি না করতে পারেন? নাকি বলতে আছে? যুগ যুগ ধরে এমনটাই তো নিয়ম হয়ে এসেছে!

ছোটবেলা থেকে আরও অসংখ্য এমন নারীর জীবনযাপন দেখে দেখে অভ্যস্ত অপর্ণা তখনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল যে আর যাই হোক, কোনদিন রান্নাঘরে সে কাটাবে না তার জীবন। কেউ যদি তাকে কোন সাহায্য করতে বলতো রান্নাঘরে, মুখের উপর বলে দিতো, ‘এসব করার জন্য আমার জন্ম হয়নি’। হুকুমদাতা হয়তো বলতো, তবে কীসের জন্য জন্ম হয়েছে তোমার? ‘কেন? বড় হয়ে চাকরি করবো, টাকা আয় করবো, সহায়তাকারী রাখবো, নয়তো প্রয়োজনে কিনে খাবো। আর যে পুরুষ মানুষ ঘরে হেল্প করবে না তাকে বিয়েই করবো না’। অপর্ণার উত্তর শুনে হাসতো সবাই।

কিন্তু সত্যি সত্যিই অপর্ণার জীবনটা এমনই হয়েছে। সেই ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় যেদিন বড়বোনকে শীতের কড়কড়ে ঠাণ্ডার রাতে স্বামীর শখ পূরণ করতে মাছ কেটে রান্না করতে দেখেছিল, সেদিনই সে ভেবে রেখেছিল, কোনদিন মাছ কাটাও শিখবে না সে। কাটতে না জানলেই তো আর আনবেও না কেউ। আসলেও তাই হয়েছে। তার জীবনে একবার তার পার্টনার শখের বশে মাছ ধরতে গিয়ে অনেকগুলো মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল। সেই রাতে মাছবাজার থেকে কাটার জন্য লোকও নিয়ে এসেছিল। ফলে সেই রাতে মাছ কাটাটা একরকম উৎসবে পরিণত হয়েছিল বাড়তি চাপের বদলে।

অপর্ণা তাই ভাবে, কোনো কোনো নারীর জীবন হেঁশেলেই যে বন্দি হয়ে যায়, তার জন্য হয়তো কিছুটা সেই নারীও দায়ী। ইচ্ছা করলেই কিন্তু মুখের উপর নিজের মতামতটা জানানো যায়। অথচ নারীরা আজীবন ‘ভালো মানুষের বেটি’ বা তথাকথিত ‘ভালো মেয়ে’ সাজতে গিয়ে নিজের জীবনটাই বরবাদ করে দেয়। একটামাত্র জীবন, সেটাও তারা এভাবেই শেষ করে দেয় রান্নাঘরের চার দেয়ালে বন্দি থেকে। এমনটাও দেখেছে যে, সেই যাপিত জীবনের নারীদের মধ্যে কেউ কেউ শেষদিকে এসে নিজের ভার কিছুটা হলেও লাঘব করতে পেরেছে, অন্য একজন হয়তো পারেইনি। ওভাবেই রয়ে গেছে।

এইতো সেদিন কথায় কথায় তার বড়বোন বলছিল যে, সবসময় বাসী খাবারটা তাকেই খেতে হয়, জীবনভর তাই খেয়ে এসেছে। অপর্ণা সাথে সাথেই বলে উঠলো, ‘বাসী’ই বা ভাবছো কেন? আজকাল তো সব খাবারই ফ্রিজে থাকে, আগেকার মতোন তো খাবার নষ্ট হওয়ার ভয় নেই। পরদিন সবাইকে একটু একটু করে দিয়ে দিলেই খাবার শেষ হয়ে যায়, সেটা কেন এতোবড় সমস্যা মনে হচ্ছে? বোন বললো, ‘বললেই কী আর হয়? যা এতোদিন হয়নি, তা কি একদিনেই বদলায়?’ অপর্ণা বুঝতে পারে না, এই সামান্য একটা ঘটনার মীমাংসা কেন করতে পারে না তারই বড়বোন! সারাজীবন চাকরি করে আসা বড়বোন কেন সামান্য সিদ্ধান্তটুকুও নেয়া শিখলো না! অপর্ণা আসলেই অক্ষম বুঝতে।

আসলে কথা বললে অনেককিছুই বলতে হয়। অপর্ণার জীবনে অধিকাংশ নারীকেই দেখেছে পুরুষদের কথা ‘অমান্য’ না করতে, মুখের ওপর ‘না’ শব্দটা বলতে না পারতে, সংসারের যাবতীয় কথা ‘গোপন’ রাখতে, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর বাবার বাড়ির সাথে ‘যোগাযোগ’ না রাখতে, নিজে আয় করেও ইচ্ছামতো খরচ করতে না পারতে। এগুলো তারা করেনি, কারণ বাড়ির ‘পুরুষ’ তা পছন্দ করবে না। পুরুষটি খেতে বসে আগে ডাল খায়, তাই নারীরাও ডালই খায় আগে, কুটোটিও নড়ে না তাদের জীবনে। পেঁয়াজ-রসুনের জীবনে ভালোমন্দের হিসাব তারা কখনও মেলায়নি। এখন বেলাশেষে যখন পিছন ফিরে তাকায় সেই জীবনের দিকে, তখন দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। অপর্ণার কাছে তখন জানতে চায়, এমন জীবন কি চেয়েছিলাম কখনও?

অপর্ণা ভাবে তাদের নিয়ে। তার নিজের জীবনের ‘অক্ষমতা’গুলো,’অপ্রাপ্তি’গুলোকে দেখে, আর মেলায় সেইসব নারীদের জীবনের সাথে। শেষতক রিলে রেসে আসলে কে জিতলো? সেই দেখে আসা নারীরা? নাকি সে?

(ফিচারে ব্যবহৃত ছবিটি অন্তর্জাল থেকে নেয়া। যিনি এঁকেছেন তিনি দাবি করলে অবশ্যই তার নামটি আমরা উল্লেখ করবো।)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.