সমাজের মেয়েগুলো সব অলক্ষ্মী হোক!

সাবিহা শবনম:

দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘নিরাপত্তা’ শব্দটা আজ শুধুই অভিধানবন্দী। আর নারীর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা আরোও নীরব। বিষয়টি নিয়ে ভাবার মানুষের অভাব নেই। কখনো কখনো কলমে অথবা বলনে নারীর নিরাপত্তায় বার্তায় হাঁপিয়ে ওঠা মানুষগুলিও দিনশেষে ঘাতক। এই বোধে প্রচণ্ডভাবে আটকে আছি। কোনো উপায়েই ছাড়াতে পারছি না নিজেকে।

মিতু হত্যার পর বাবুল আক্তার এবং তার সন্তানদের জন্য অসম্ভব খারাপ লাগা কাজ করতো। যে ছোট্ট শিশু সন্তান তার মায়াময়ী মাকে চোখের নিমিষেই রক্তাক্ত মৃতদেহ হতে দেখেছিলো, তার অনুভুতি অনুভব করে অনেকবার চোখের পানি মুছতে হয়েছে। সাত বছরের মাহির ঠিক কী বুঝেছিল? আর ছোট্ট টাপুর? অসহায়(!) বাবা তার সন্তানদের নিয়ে ওদের নানুর বাসায় আশ্রয় নিয়েছিল। সোস্যাল মিডিয়া জুড়ে বাচ্চাদের ছবি, পজিটিভ ভাবনা প্রায়ই শেয়ার করতো বাবুল আক্তার। কিন্তু কীভাবে? সত্যিই কীভাবে এতো নির্বিকার ভালোমানুষ মুখোশ নিয়ে বাচ্চাদের সাথে মিশতে পারতো, যে নিজেই তাদের মায়ের পরিকল্পিত হত্যাকারী!!

সমাজে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের তিনটি চিত্র দেখা যায়। প্রথমটি তাৎক্ষণিক আবেগের বহিঃপ্রকাশে খুন, যেটি কিছুক্ষণ পরেই অনুশোচনায় রূপ নেয়। দ্বিতীয়টি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড,যা সাধারণত অভ্যস্ত অপরাধীদের দ্বারা সংঘটিত হয়। আর তৃতীয়টি আত্মহত্যা। মিতু হত্যা পরিকল্পিত এবং সেটি ঘটেছে একজন উচ্চপদস্থ আইনের রক্ষকের মাধ্যমে, তার সন্তানদের পিতা- যাকে মিতু সবচেয়ে বিশ্বাস করেছিলো এবং ভালোবেসেছিলো। দিনশেষে যে বাবা, একজন আইন রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দায়িত্বশীল ব্যক্তি, যখন ঠাণ্ডা মাথার খুনী হয়ে ওঠে তখন আর কোথায় নিরাপত্তা খুঁজবো আমরা! একজন উচ্চপদস্থ আইনের সেবক যেকোনো দাগী খুনীর চেয়েও ভয়ংকর সাইকোলজি নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে। নিজের পরিকল্পনায় সন্তানদের মাকে খুন করে, মুখে ভালোমানুষ মুখোশ লাগিয়ে, সন্তান অন্তঃপ্রাণ অভিনয়ে তাক লাগানো পিতা সে। এই ঘটনায় সমাজের সন্তানদের মা এবং সন্তানের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ কেনানা খুনি শিক্ষিত এবং সে আবেগের বশে খুন করেনি। ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিত খুন!!

মেয়েরা হেনস্থার শিকার হচ্ছে রাস্তায়, বাসে, ট্রেনে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়,প্রেমিকের কাছে, স্বামীর কাছে, সন্তানের কাছে, সর্বপরি তার বাবা-মায়ের কাছে। কিন্তু কেন? ইভ-টিজিং, ধর্ষণ এবং খুন পত্রিকার বিনোদন পাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথায় নিরাপদবোধ করবে নারী? ছোটবেলা থেকে বাবা-মা মেয়েকে শাসনে বড় করতে থাকে বিয়ে দিয়ে বিদায় করে দায়িত্ব শেষ করবে সেই আশায়। পাত্রস্থ করেই দায়মুক্তি! তারপর সে স্বামীর দাসী, পরিবর্তে সন্তানের দাসী হয়ে জীবন কাটায়। এটা সাধারণ চিত্র। এই চিত্রে আঁকা থাকে অনেক না দেখা দীর্ঘশ্বাস ; প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের পেছনে নির্যাতনের নির্যাশ। যেখানে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার নিরাপত্তায় থমকে থাকে প্রতিবাদ। তবুও কি বেঁচে থাকে এই ঠুনকো জীবন!!

যারা একটু ফুঁসে উঠতে চায়, সমাজ তার অকথিত বাণে কোণঠাসা করে রাখে। নিরাপত্তার প্রত্যাশায় আকুল বিশ্বাসে হাত বাড়ায় বাবা-মায়ের কাছে। মানিয়ে নেওয়া শব্দটা আজন্ম মগজে ঠুকিয়ে দেওয়া পিতা-মাতা আবারো মগজধোলাইয়ে বিপর্যস্ত করে দেয়। মেয়ের লাশ পেতে আগ্রহী কিন্তু সংসার করতে ব্যর্থ হওয়া মেয়েকে চায় না তারা। ধর্ষিতা মেয়ের চেয়ে আত্নহত্যাকারী মেয়ের পরিচয় সমাজবান্ধব। অথচ মেয়েরা এই বাবা-মা এর জায়গাটিকেই সবচেয়ে নিরাপদ ভেবে আশায় বাঁচে!

‘স্বামী কতৃক স্ত্রী খুন!’ এই শিরোনাম পড়া হাজার হাজার মেয়ে বিয়ে করতে ভয় পায় নিশ্চিত। যেমনটি আমি ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। প্রত্যেকদিনের সাধারণ খবরে স্বামী, শ্বশুরালয়ের লোকেদের নৃশংস লেখা ছাপা হয়। এসব জেনে বুঝে অথবা না জেনেই পা দিতে হয় অসম্ভব অনিশ্চয়তায়। কজন মেয়ে বিদায়ে শুনতে পায়- ‘নিজের জন্য বাঁচবি; আমরা আছি তোর সাথে’। বরং শুনতে হয়-‘সবাইকে ভালো রাখবি’। নিজের জীবন খরচ করে অন্যের মতো করে বাঁচে সংসারের লক্ষ্মীরা। কিন্তু এই লক্ষ্মীদের জীবনই বা কতোটুকু নিরাপদ? সন্তান আর সংসারের জন্য বেঁচে থাকা মিতু পেরেছে কি বাঁচতে? মিতুর বাবা-মা বাবুল আক্তারের পরকিয়ার কথা জানতেন। তাহলে? ‘ওই যে মানিয়ে নে মা!’ এজন্য মিতুরা মানিয়ে নেয়। নিতে হয়। নিরাপত্তার চেয়ে সমাজের কটুকথা বড় হয়ে দাঁড়ায়! তারপর একসময় হয়তো জীবনটাও দিয়ে দিতে হয়!

বিবাহিত জীবন শুরু হয় ভালোবাসার মুগ্ধতায়। পরম বিশ্বাসে পরস্পর পরস্পরের বুকে তৃপ্তির আশ্রয় খোঁজে। সেই বুকেই কীভাবে জন্ম নেয় পরিকল্পিত হত্যার আগুন! ভুলে যায় সে সহধর্মিণী, ভুলে যায় সে তার সন্তানের মা, সর্বপরি মানুষ – একটি জীবন! জীবনের এক পর্যায়ে মতের অমিল হতেই পারে। সেক্ষেত্রে আলাদা হতে পারে জীবন। মিতু বিচ্ছেদের পথে হাঁটতে পারেনি কারণ সমাজের বিচ্ছেদ পরবর্তী নিরাপত্তার আশংকায়। সমাজ দেখানো নিরাপত্তার আশায় বেছে নিয়েছিলো অনিরাপদ জীবন! আর অপরপক্ষ বিচ্ছেদের ছক এঁকেছিলো বটে। কিন্তু তাই বলে খুন! কী ভয়াবহ! সমাজের সকলের নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত সেই ব্যক্তিটির কাছে তার পরিবার সবচেয়ে অনিরাপদ! সে তার সন্তানদের মায়ের জীবন হরণকারী। না প্রেয়সী, না সন্তানের মা, একজন মানুষ হিসেবেও মিতু রক্ষা পাইনি সমাজের সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষটির কাছে।

ভীষণ ভাবাচ্ছে বিষয়টি। আমি নারী। প্রতি মুহূর্ত আমার নিরাপত্তা অনিশ্চয়তায় বন্দী। আমার বেঁচে থাকা নিরাপদ নয়; আমার মৃত্যুও নিরাপদ নয়। অনেকেই হয়তো গলা উঁচিয়ে বলবে পুরুষেরাও সমাজে অনিরাপদ। কিন্তু আমি বলতে চাই, আমাদের সমাজে নারীর নিরাপত্তাহীনতা এবং পুরুষদের নিরাপত্তাহীনতার দৃশ্যপট ভিন্ন। যেখানে দিনশেষে নারী নির্যাতনবন্দী এবং আশ্রয়হীন।

কিন্তু এই অনিশ্চয়তার জন্য নারী নিজের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে অপ্রস্তুত কেন? কেন শক্তি অর্জন করে প্রতিবাদ করছে না? কেন বাবা-মা সমাজের চেয়ে তার মেয়ের জীবনকে বড় করে দেখছে না? আমি ঠিক বুঝতে পারি না অধিকার আদায়ের বোধের চেয়ে নিরাপত্তা বোধ কি বেশি জরুরী নয়! অধিকার ঠিক কতটা আদায় করে নেওয়া যায়? কিন্ত নিজের নিরাপত্তার বলয় শক্তিশালী করতে পারলে অধিকার প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। আর এই বলয় শক্ত করার জন্য প্রতিটি মেয়েকে নিজ অবস্থানে দৃঢ়, শক্তিশালী এবং সাহসী হয়ে উঠতে হবে। লক্ষ্মীমন্ত মিতুরাও রক্ষা পাচ্ছে না এসব বুনোদের কাছে। তারচেয়ে প্রতিটি মেয়ে অলক্ষ্মী হয়ে উঠুক। সমস্ত অসুরদের টুটি চেপে ধরতে হবে। ধরতেই হবে। সকাল যে আনতেই হবে।

শেয়ার করুন:
  • 304
  •  
  •  
  •  
  •  
    304
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.