নারীর ‘অপ’ ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে

রোখসানা চৌধুরী:

নারীর ‘অপ ক্ষমতায়ন’ বা ক্ষমতার অপপ্রয়োগ বিষয়টি নিয়ে বহুদিন থেকেই বিতর্ক চলমান। এই বিষয়ে সম্প্রতি দেখা একাডেমিক স্কলারদের ভাষ্যকে বুকিশ আর অপরিণত বলে মনে হয়েছে বিধায় কিছু লিখতে ইচ্ছা হলো। নারীবাদের বিপক্ষ দলীয় অসূয়াজনিত করতালির কথা বাদই দিলাম, সেই আসরে আমার অতি পরিচিত সংবেদনশীল মুখেদের ভিড় দেখে আহত হয়েছি, অবাক হইনি যদিও।

সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের ঘটনাটি শুরুতে সাধারণই ছিল। একজন সাংবাদিকের গোপন তথ্য আহরণ, আমলা কর্তৃক চূড়ান্ত হয়রানি, সঙ্গে আরও রাষ্ট্রীয় নানাবিধ। বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে ব্রিটিশ শাসনামলে প্রণীত সিক্রেটস এ্যাক্ট নিয়ে।
প্রথম দুদিন রোজিনা ইসলাম কিংবা জেবুন্নেসা বা তার সহকারি পলিকে নিয়ে আলাদা কোন আলাপ হয়নি।
কিন্তু যখনই সারাদেশ ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠেছিল রোজিনাকে নিয়ে, ঠিক তখনই কাদা ছোঁড়াছুড়ির মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে জানা গেল ঐ ঘটনায় একজন সাংবাদিক আর আমলাপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়নি, হয়েছে ‘দুজন নারীর মধ্যে।’ তাও ঐদিনকার কোন ঘটনা নিয়েই না। ‘আসলে তারা কেউ চায় না নারীর উন্নয়ন হোক।’ ‘কারণ নারীই নারীর শত্রু’।’নারীও হয়ে উঠতে পারে পুরুষের মতোই স্বার্থলোভী,হিংস্র।’ ‘কুটিল নারীরা পুরুষতন্ত্রের শিকার — এগুলো আপ্তবাক্য, ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মতো মূল্যহীন।’

এই বিষয়ে আমিও আংশিক একমত যে মন্দ নারীমাত্রই পুরুষতন্ত্রের শিকার বলাটা বড় ধরনের বিভ্রান্তি বটে।ঘরের ভেতরকার বউ-শাশুড়ি, গৃহকর্মী-গৃহকর্ত্রীর দ্বন্দ্বে নিশ্চিতভাবেই পুরুষের অধীনস্থ নারীর স্বকীয় কোন অস্তিত্ব অবশিষ্ট থাকে না। ঊন মানুষের আবার মন্দ-ভালো কী?
কিন্তু যে নারীটি পুরুষের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, পুরুষ নির্মিত বাধা-বিপত্তি পার হয়ে কোন একটা পদে আসীন হয়েছে, তাকে আমি পুরুষতন্ত্রের অধীনস্থ নারী হিসেবে যেমন ছাড় দিতে রাজি নই, আবার সে কেন ক্ষমতায়িত হয়েও নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল হলো না এজন্য আলাদাভাবে তাকে কেন জবাবদিহি করতে হবে সে বিষয়টি নিয়েও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছি।

নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়টি আসলে কী?
নারীর জন্য কি আলাদাভাবে কোন ক্ষমতায়নের কোটা রাখা হয়েছে? নারী বা পুরুষ কাউকে কি পদায়ন পূর্বকালে কোন শর্ত দেয়া হয় জেন্ডার সেনসেটিভ হওয়ার? এ বিষয়ে কোন শাস্তির ব্যবস্থা আছে কি? বিস্ময়ের সাথে দেখলাম, ক্ষমতায়িত নারীর প্রতি নারীর বিরুদ্ধ পক্ষ আর নারীবাদী পক্ষ এই পয়েন্টে এক হয়ে গেছেন। তারা সকলেই ক্ষমতায়িত (সামান্য পদের অধিকারী) নারীর কাছে মাতৃসুলভ আচরণ আশা করছেন। অথচ আজও দুর্বলচিত্ত বিবেচনায় নারীকে বহুমুখী সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়। দুই পক্ষের কেউই নারীকে পদ অনুযায়ী ‘ব্যক্তি’ ভাবতে নারাজ।

প্রশ্ন উঠেছে, সমাধান কোথায় তাহলে? কী হাস্যকর প্রশ্ন!
এভাবে কেন ভাবা হচ্ছে যে, নারীরা অধিক পরিমাণে পদস্থ/কর্মজীবী /অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারলেই একটি জাতির কিংবা নারীসমাজের মুক্তি ঘটবে? কিন্তু এর বিপরীতে কি আমরা চাইব নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি না ঘটুক? অধিক পরিমাণে পদস্থ না হোক? গৃহাভ্যন্তরে পুরুষের মুখাপেক্ষী হয়ে ঊন মানুষ হয়ে দিন গুজরান করুক?
সম অধিকার কেবল মজুরির প্রশ্নে চাইব? যার মজুরি সমান আছে সে কি তবে সর্বোচ্চ মানবাধিকার পেয়ে গেছে? সম দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন নেই? ওটাই যে সবার আগে দরকার তা আমাদের জানাই নেই হয়তো।

মুনিয়াকে যদি এখনও ভুলে গিয়ে না থাকেন, তার অপমৃত্যুর পর তার পরিচয় নিয়ে শুরুতেই ‘তবু,কিন্তু’ করে বলা হয়েছিল রক্ষিতা হলেও তার মৃত্যুর বিচার হওয়া দরকার। অধ্যাপক কাবেরী গায়েন ‘রক্ষিতা’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর প্রতি সহমত পোষণ করেও বলা যায়, সমাজে সমান দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিষ্ঠা ছাড়া শব্দ পরিবর্তনে কিছুই তেমন এসে যায় না। (উদাহরণ — গৃহকর্মী, যৌনকর্মী)। একবার ফেসবুকে এ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছিল, সম্ভবত সোহেল হাসান গালিবের পোস্টে। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন নারীর বেশ্যা শব্দের বিপরীতে পুরুষের জন্য কোন শব্দ নির্ধারণ করা যায় কিনা। অথচ সুপ্রাচীন কাল থেকে পুরুষ বেশ্যা,পুরুষ রক্ষিতার অস্তিত্ব ছিল। সারা পৃথিবীতেই আছে। অন্য ভাষায় যথাযথ প্রতিশব্দও রয়েছে। এখানে নেই। কারণ যে ঘৃণা আপনি উদ্গীরণ করতে পারেন নারীর জন্য, সেই সমান ঘৃণা তথা সমান দৃষ্টিভঙ্গি কার্যকর হয় না পুরুষের জন্য। শব্দ বেচারা তো আপনার মনোভঙ্গির বাহন মাত্র।

সমান দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে সমান বিচারের কাঠগড়াই বা কীভাবে বানাবেন? সেজন্য একই অপরাধে অভিযুক্ত হয়েও মিন্নীর জন্য আমরা গণ আদালত বসাই, অথচ বাবুল আক্তার ভাইরাল হন না।

কথা উঠেছে, ঐ দিন সচিবালয়ে পুরুষ আমলা হলে রোজিনার বুক চেপে ধরতেন কি না! তারা হয়তো ইতিহাস জানেন না, ইলা মিত্রকে জেলখানায় ডিম থেরাপি দেয়া হয়েছিল আর তা কোন ‘নারীর শত্রু নারী’ দেয়নি,’পুরুষ বন্ধু’রাই দিয়েছিল!

যারা সত্যি সত্যি ইতিবাচকভাবে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবেন তারা ভেবে দেখুন তো, উপমহাদেশে এখনো সত্যিকার নির্বাচিত নারী জনপ্রতিনিধির সংখ্যা শতকরা কত?ক্ষমতায়নের ইতিহাসে, ঠিক কোন পর্যায়ে সত্যিকার অর্থে নারী দাঁড়িয়ে আছে?
হাজারও পুরুষের হাজার বছরের ক্ষমতায়নের সুবিপুল ভুলের ইতিহাসের বিপরীতে নারী কোন ভুল করতে পারবে না? নারীর এই দেবীমূর্তি, মাতৃপ্রতিমার হাত থেকে তাকে কে মুক্তি দেবে?

২৩.০৫.২০২১

শেয়ার করুন:
  • 184
  •  
  •  
  •  
  •  
    184
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.