রোজিনার জামিন এবং একজন দেশবাসীর কিছু প্রশ্ন

এই সময়ে সারাবিশ্ব জুড়ে তুমুল আলোচিত সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম অবশেষে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এই জামিনের মধ্য দিয়ে সাদা চোখে দেখতে গেলে গত সাতদিন ধরে যে রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা চলছিল, তার আপাত অবসান হয়েছে। একজন সহকর্মি বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে এসেছে, একজন মা তার সন্তানকে কাছে পাবে, এর চেয়ে বড় চাওয়া আর কিছুই ছিল না মূলত। সবাই স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলছেন, তার প্রতিফলন আমরা দেখছি পুরো ফেসবুক জুড়ে। হওয়াটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু কিছু মৌলিক বিষয় আমরা ভুলে যাচ্ছি, যা কিনা বাক্ স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার দাবির পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে আমাদের দীর্ঘদিনের যে লড়াই, সেই অবস্থানটিকে সুদৃঢ় রাখতে এই বিষয়গুলো এখনই আলোচনার দাবি রাখে।

বিষয়গুলো একটু খোলাসা করি।

সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু নথি বা তথ্য চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে। তাহলে যে কথাটি এরই মধ্যে বহুল আলোচিত হয়েছে, তাহলো, এমন একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ফাইল কেন টেবিলে অসংরক্ষিত অবস্থায় পড়েছিল? যে কেউই এই ফাইল সরিয়ে ফেলতে পারতো। তাহলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যে বা যারা কিনা এরকম দায়িত্বহীন একটি কাজ করলো, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো? আদৌ নেয়া হয়েছে কিনা? নিদেনপক্ষে তাদেরকে ডেকে এর কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে কিনা? এই ‘নিষ্কর্মা’ লোকজনকে কারা এমন গুরু দায়িত্ব দিয়েছে যাদের বেতনের টাকা আসে সাধারণ জনগণের করের টাকা থেকে?এধরনের ঘটনা দেখার জন্য তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে, তারা কী করছে?

রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে যে আইনে মামলা হয়েছে তার একটি সেই কোন ব্রিটিশ আমলের। ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ ভারতে সাধারণ জনগণকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে যে আইনটি প্রণয়ন করেছিল তৎকালিন ব্রিটিশ রাজ, খোদ যুক্তরাজ্যেই সম্ভবত এই আইনটি নেই। আরও মজার বিষয় হলো, এই আইনটি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর গত পঞ্চাশ বছরে এই প্রথম আরোপ করা হলো, তাও আবার একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে, যা কিনা মূলত ছিল সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের জন্য, যারা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর চাকরির শর্ত হিসেবেই। সাংবাদিকরা এর আওতাতেই পড়ে না। বিশেষজ্ঞরা এমনটিই বলছেন।

এখন আসি কেন রোজিনাকে ছয় ঘণ্টা আটক রাখা হয়েছিল সচিবালয়ে? তিনি যদি সংশ্লিষ্টদের চোখে ‘অন্যায়’ করেই থাকেন তবে কেন দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খবর দিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলো না? উপরন্তু তার ওপর নির্যাতন চালানো হলো মানসিক এবং শারীরিক উভয়ই।
এই ঘটনা অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দেয় যে সত্যিই কী ঘটেছিল ওই সময়ে! রোজিনা কি আসলেই ‘টার্গেট’ ছিলেন? তাকে ফাঁসানোর জন্য ওইসব নথিপত্র তার ব্যাগে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে? ইচ্ছাকৃতভাবেই তার ফোনে ছবি তুলে তাকে অন্যভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে?

এটা তো সত্য যে রোজিনা ইসলাম তার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মধ্য দিয়েই দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ আরও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বহু দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে এই কোভিড ১৯ এর সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অপতৎপরতা সম্পর্কে আমরা বিশদ জানতে পেরেছি রোজিনার করা প্রতিবেদনের মাধ্যমেই। এটাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের গোস্বার কারণ। তবে সরকারের জন্য তো এসব প্রতিবেদন ‘সহায়ক’ হওয়ার কথা ছিল। হয়তো সরকার এসব দুর্নীতি বিষয়ে অবগতই ছিল না।

বিভিন্ন প্রতিবেদনের মধ্য দিয়েই আমরা জানতে পেরেছি কতোটা অদক্ষ জনবলে ঠাসা এই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন নিজেই বলেছেন যে করোনার ভ্যাকসিন পেতে দেরি হওয়ার কারণ হচ্ছে ভুল কাগজে সই করা। ইংরেজি ডকুমেন্টের বদলে চীনা ভাষায় তৈরি ডকুমেন্টে সই করেছে কর্মকর্তারা। তো, সর্বসাধারণের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই দায় কেউ নিয়েছে? এরকম একটি ভয়াবহ, অমার্জনীয় অপরাধের জন্য কারও বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ কি আদৌ নেয়া হয়েছে? আমরা জানি না।

রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্ট বা অবাধ তথ্য জানার অধিকার আইন সম্পর্কে আমরা কতটা অবগত আছি? এটা কি আদৌ কাজ করছে?

আরও জানলাম যে তাকে মুচলেকা এবং পাসপোর্ট জমা দেয়ার শর্তে জামিন দেয়া হয়েছে। যদিও আইনজীবীরা বলছেন যে এটা খুবই ‘কমন প্রাকটিস’ বিচারের ক্ষেত্রে যে মুচলেকা নেয়া হয় জামিনের সময়। হতে পারে। কিন্তু পাসপোর্ট জমা রাখা হবে কেন? যাতে বিদেশে চলে যেতে না পারে, সেইজন্য? নাকি এর পিছনেও কোন গূঢ় রহস্য আছে? ভয়ের রাজনীতিতে বসবাস করতে করতে আমরা আম পাবলিক এখন সিঁদুরে মেঘ দেখলেই আঁতকে উঠি, কুঁকড়ে যাই ভয়ে। আর ভয় পাবোই বা না কেন, যখন দেখি একজন আস্ত মানুষকে খুন করার অভিযোগ মাথায় নিয়েও বসুন্ধরা গ্রুপের সায়েম সোবহান আনভীর প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় দেশে, প্রশাসন বা সরকার কেউ তার টিকিটিও ছুঁতে পারে না। গণমাধ্যমও কোটি টাকায় বিকিয়ে দেয় নিজেদের।
সিকদার গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর কুখ্যাত রন হক সিকদারও ব্যাংক কর্মকর্তাকে মারধর, হত্যার হুমকি এমনকি গুলি করার পরও শুধু জামিনই পায় না, নিজস্ব বিমানে করে দেশ থেকে চলেও যায়। প্রশ্ন জাগে, তাদের পাসপোর্ট কি জমা দিতে বলা হয়েছিল? অবশ্য আনভীরকে তো ধরাই হয়নি, কাকে কী প্রশ্ন করি!
এসব ঘটনা দেখে অভ্যস্ত চোখ ও মন সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের প্রতি করা অন্যায়গুলোকে মেনে নিতে পারে না।

একটা স্বাধীন দেশে, বলা ভালো যে উদ্দেশ্যে একটা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছিল সেখানে কেন প্রতিটি নাগরিকের জন্য আইন সমান হলো না? কেন প্রতিটি মানুষের ‘ন্যায়বিচার’ পাওয়ার পথ রুদ্ধ হলো? কেন সুনামগঞ্জের শাল্লার সেই ‘সংখ্যালঘু’ ঝুমন দাস এখনও কারাগারে? অথচ তাদের বাড়িঘরে যারা আগুন দিয়েছিল, তারা সবাই বাইরে ঘুরছে। দেশটা আসলে কাদের তাহলে?
পাসপোর্ট যদি জমা দিতেই হয় রোজিনা ইসলামকে তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করার কারণে, তাহলে দেশে যতসব অপরাধী, অভিযুক্তরা আছে, যারা অভিযুক্ত খুনি, ধর্ষক, হাজার কোটি টাকা লুটপাটের সাথে জড়িত দুর্নীতিবাজ, তাদের পাসপোর্টও জব্দ করা হোক। মানুষে মানুষে পার্থক্যটা খুবই পীড়াদায়ক!

রোজিনা ইসলামের ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে বেশকিছু ভিডিও এবং ফোন কল ছাড়া হয়েছে। বুঝতে বাকি থাকে না যে বড় কোন ভিডিও থেকে বা বড় কোন ফোনালাপ থেকে সামান্যতম অংশ নিয়ে তা ইনিয়েবিনিয়ে ছাড়া হয়েছে রোজিনাকে আইনিভাবে আটকানোর জন্য বা তার চরিত্রহননের উদ্দেশ্যে। এর সাথে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশ না থাকলে তো এটা করা সম্ভব ছিল না। এটা এখন কে দেখবে যে কারা করলো, কেন করলো! তাদের বিচার কে করবে?

শেষ প্রশ্নটা আমাদের সতীর্থ সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে, সম্মানের সাথেই জানতে চাই, কেন মুনিয়া হত্যার ঘটনা হুট করেই তিরোহিত হলো সব মিডিয়া থেকে? সামাজিক মাধ্যমে কিছুদিন হৈ চৈ এর পর এখন সবাই চুপ মেরে গেছে। কেন এটা হলো, এটা জানতে চাওয়া কি খুব বেশি চাওয়া হয়ে যাবে?

এটা কেবলই রোজিনা বলে নয়। এটা আমাদের বাক্ স্বাধীনতার প্রশ্ন। আমাদের মৌলিক মানবাধিকার প্রশ্ন। সবদিক থেকে একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রশ্ন। শুধুমাত্র জিডিপি বাড়লেই কোন দেশের অন্তর্গত প্রবৃদ্ধি ঘটে না, উৎকর্ষতা বাড়ে না, যদি না সেখানে আনুষঙ্গিক আরও অনেক কিছুর অর্জন হয়!

লেখক: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দেশবাসী

শেয়ার করুন:
  • 122
  •  
  •  
  •  
  •  
    122
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.