মায়েরা এবার নিজের কথাও ভাবুন

ফাহমিদা খানম:

মাতৃত্বের মহান দায় থেকে মায়েদের মুক্তি দেবার দিন এসেছে। স্ত্রী হয়ে, মা হয়ে সবার জন্যে নিজেকে বিলিয়ে দেবার মতো বোকামি এই জেনারেশন করুক, আমরাই তা চাই না। যুগ বদলেছে এখন সবাই যে যার মতো করে ব্যস্ত থাকে, আগেকার যুগের মতো করে সন্তানদের কাছে থাকার সুযোগ কম। চাকুরি হোক অথবা পড়ালেখার জন্যে বাইরে গেলে অনেকেই আর ঘরে ফেরে না। সেখানেই থিতু হয়।

আর এখন অনেকেরই এক সন্তান, তাই মা হয়েছেন বলে নিজের সবটা উজাড় করে না দিয়ে নিজের জন্যে কিছুটা রাখবেন। যে সংসার আর সন্তানের জন্যে নিজেকে উজাড় করে দেন না কেনো আপনার আবেগের মূল্য তাদের কাছে নাই। আপনি কতটা আত্মত্যাগ করেছেন, সেই গল্পে তাদের আগ্রহ নাই, আর অনেক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মা আছেন যারা ইনিয়েবিনিয়ে সন্তানকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করতে পারেও না। ফলাফল সন্তানদের কাছে এসব আত্মত্যাগ খুব সাধারণ আর স্বাভাবিক ব্যাপার বলেই মনে হয়।

কার দোষ অথবা কোন পক্ষ ভুল বুঝলো, এসবের চাইতেও ভয়ংকর বাস্তবতা হলো ব্যক্তিত্বসম্পন্না মায়েরা নিজের মধ্যে নিজেই সাংঘর্ষিক যুদ্ধে লিপ্ত থাকেন, তাই বিনিময়ের আশা করেন না কারো কাছেই। সন্তান জন্ম দিয়ে বড় করে নিজের দায়িত্ব শেষ করে খুশি এমন মায়ের সংখ্যাটাও কম না। সন্তান কোনো প্রজেক্ট নয় যে তাকে এনেছি বলে আমি আমার সকল ইচ্ছা তাকে চাপিয়ে দিবো! প্রতিটি সন্তান আলাদা সত্ত্বা। যার যার মতো করে ভালো থাকাটাই হলো আসল কথা।

এই দেশের মায়েদের একটা অংশ অলরেডি জীবিত অবস্থায়ই পুরস্কার পেতে শুরু করে দিয়েছেন, সেটা হলো মরণোত্তর। জীবিত মাকে রেখে মৃত মাকে নিয়ে আহাজারি আর কাংগালি ভোজ করে অনেকে মাকে সম্মান করেন। আমি নিজের চোখে দেখেছি কিছু সন্তানকে যারা তাদের মাকে অবহেলা আর উপেক্ষার চাদরে মুড়িয়ে রেখেছিল। এরা যখন মৃত মায়ের জন্য নাকিকান্না করে, বড় হাস্যকর লাগে তখন। কিন্তু ঐ যে ভদ্রতা, সেটার জন্য এদের মুখের উপরে বলতেও পারি না।

মায়েরা আত্মত্যাগ করবে, আর সন্তান সেই আত্মত্যাগ মানুষের কাছে বলে মাকে মহান, মহীয়সী করবে ব্যাপারটা আমার কাছে সুস্থ মনে হয় না। মা, সেও রক্তমাংসের একজন মানুষ। তার ইচ্ছে অনিচ্ছা, পছন্দ -অপছন্দ সবই আছে। কেনো বঞ্চিত হতে হয় তাকে? কতজন চাকুরি করা সন্তান মায়ের জন্যে আলাদা করে টাকাপয়সা দেন? কয়জন বলেন, এই টাকা একান্তই তোমার, যা মন চায় করো। আপনার যখন দুঃসময় ছিল, কতবার তার কাছে হাত পেতেছেন? তার জমানো টাকা সে নিজের জন্য খরচ করার বদলে আপনাদের হাতেই দিয়েছে। মৃত্যুর পর সে মহান, মহীয়সী হবার জন্য এটা করেনি। কতটুকু সময়, সম্মান দেন আপনারা?

মায়েদের আত্মত্যাগের কথা লিখতে আমি বসিনি, আমি চোখের সামনে অসংখ্য ঘটনা দেখেছি। আপনাদের পাশে যে মানুষটা আমৃত্যু আপনাদের জন্য ভেবেছে পরবর্তীতে আপনারা নিজেদের জগত নিয়ে শুধু ব্যস্তই হয়ে যান না, মায়েদের অবদানের কথা ভুলতেও দেরি হয় না।

পৃথিবীর সব ধর্মে মাকে যে সম্মান দিয়েছে, সেটা কি এমনিতেই দিয়েছে ?

আমি বুঝি সহজ কথা, সন্তান দুনিয়াতে এনেছি তাই তাকে সঠিক শিক্ষা দেবার দায়িত্বটা মা-বাবা দুজনেরই। আবার সন্তানের মাঝে যারা পার্থক্য করে, সেই  মায়েদের আমি মা বলিও না, কারণ আমি মনে করি মা হওয়া এতোটা সহজ ব্যাপার না। আমাদের দেশের অধিকাংশ মায়েরা মা হয় মা ডাক শোনার জন্যে, তাই নিজের সন্তানের মা হয়েই তারা ব্যাপক খুশি থাকে। অথচ নিজেদের পরিধিটা বড় করলে ছেলের বউদের আর্তনাদ শোনা যেতো না। ছেলের বউ আমার ছেলের আজীবনের সঙ্গী, আমৃত্যু আমার ছেলের পাশে থাকবে,  অবশ্যই সে ছেলের জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ, অথচ এই শিক্ষাটা আমরা ছেলেদেরকে শেখাই না। কিছু মা বিয়ে করিয়ে বউদের পদে পদে মনে করিয়ে দেয় ছেলে আমার! কী হাস্যকর কথা! একেক বয়সের ধর্ম একেক, এই সহজ বুদ্ধি না থাকলে মা হতে পারেননি, পেটে ধরা জননী হয়েছেন মাত্র ! আবার কিছু মহিয়সী বিয়ে করে স্বামীকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেন, মনে হয় সে একাই স্বামীর মালিক বটে, এরাও পরিবার থেকে সঠিকভাবে শিক্ষা পায়নি। সবকিছুর মধ্যে একটা ব্যালেন্স জানাটা অপরিহার্য।

কিছু মা একাই যুদ্ধ করে সন্তান বড়ো করেন, বাবারা দ্বিতীয় বিয়ে করে সন্তানের খবর রাখেন না। এই মায়েদের সাথে সন্তান ব্লেমিং খেলা খেলে, মানে কিছু হলে মায়ের দিকে আঙ্গুল তুলে, মায়ের সংগ্রামী জীবন অথবা আদর্শিক কাজের প্রতি সামান্য সম্মান জানায় না, বরং ছাড় না দিয়ে মায়ের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও নিজের স্বার্থ কিন্তু ঠিকই বুঝে, আর নিজে বিয়ে অথবা বাবা হলে ভুলতে দেরি করে না। আজকের আমিটা কোথা থেকে এসেছি এই প্রশ্ন এখন আর অনেকেই নিজের দিকে তাকিয়ে করে না। বুঝি স্নেহ নিম্নগামী, তাই বলে অকৃতজ্ঞ সন্তানের মা হওয়া বড়ো লজ্জার ব্যাপার। সব মা টাকাপয়সার জন্যে লালায়িত না, কেউ কেউ আজীবন সম্মান চান -কয়টা সন্তান বুঝে এটা?

আজকাল সবাই-ই চায় প্রাইভেসি নিয়ে চলতে, সেখানে মায়ের জন্য জায়গা কই? আমি তুমিময় জগতে মা মানেই আত্মত্যাগ করে মহিয়সী হবার এই ধারণা এই প্রজন্মের একটা অংশ ধরেই নিয়েছে। বন্ধু বান্ধব আর নিজেদের জগতে ব্যস্ত থাকা সন্তানেরা অসুস্থ হলে বন্ধুদেরকে খবর দেয়, মায়ের জগতের পরিধি দিনে দিনে সংকুচিত করেছে তারা। হায়রে মা!

মহান, মহিয়সী হবার ইচ্ছা থাকলে সন্তানের অনুকম্পার উপরে বাঁচতে হবে, অথচ একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মা’য়ের জন্যে সেটা চরম অপমানিত ব্যাপার, তার চাইতে দায়িত্ব শেষ করে বৃদ্ধাশ্রমে থাকাটা অনেক সম্মানীয়। কারও আজীবন করুণাতে প্রবল আপত্তি, কারও করুণায় বেঁচে থাকতে চায় না, হোক সে সন্তান নিজেরই। সন্তানের মনের ভাষা যদি মা পড়তে পারেন, সন্তানেরা কেনো বড় হয়ে মায়ের মনের কথা বুঝতে পারে না? এই একটা জায়গায় হেরে গেলে সেই মায়েদের যুদ্ধটা নিজের সাথে নিজেরই চলে আমৃত্যু।

মায়েদের বলি যে অনেক হয়েছে, এবার অন্তত নিজেকে নিয়ে ভাবুন। সংসার আর সবার জন্যে উজাড় করতে গিয়ে নিজেদের অনেক ঠকিয়েছেন, এবার থেকে নিজেকে সময় দিতে ভাবুন, দিনশেষে আসলে কেউ-ই আর আপনার পাশে থাকবে এই ধারণা বদলে স্বনির্ভর হতে শিখুন। মহান আর মহীয়সী হবার চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে নিজের নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

২৩/৫/২০২১

শেয়ার করুন:
  • 943
  •  
  •  
  •  
  •  
    943
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.