কারাগারে কি রোজিনা, না সাংবাদিকতা?

শান্তা মারিয়া:

নিউজ টেবিলে বসে খবরটি এডিট করছিলাম আর তাকিয়ে ছিলাম ছবিটির দিকে। রোজিনা ইসলামকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পুলিশের গাড়িতে করে। তাকে পাঠানো হচ্ছে কারাগারে। কেন? কী দোষ তার? সে কি খুন করেছে না ডাকাতি করেছে?

বস্তুত, রোজিনা যেটা করেছে সেটা এগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ ও গর্হিত। সেটা হলো সে ফাঁস করে দিয়েছে রাঘব বোয়ালদের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির খবর। আর তার কণ্ঠ চেপে ধরার যে ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে সেটা আরও ভয়াবহ। সেটা ফাঁস করে দিয়েছে রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী চেহারা।

রোজিনা ইসলাম একজন মেধাবী ও পরিশ্রমী সাংবাদিক। ইনভেসটিগেটিভ রিপোর্টিং করে তিনি বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। তিনি কাজ করছেন দেশের প্রথম শ্রেণীর দৈনিকে। ইনভেসটিগেটিভ রিপোর্টিং করতে হলে তাকে গোপন তথ্য জোগাড় করতেই হবে। কেউ নিশ্চয়ই আশা করতে পারে না যে কারও দুর্নীতির তথ্য সে নিজেই প্রেস কনফারেন্স করে সাংবাদিকের হাতে তুলে দিবে।

তথ্য জোগাড় করার জন্য সাংবাদিককে অনেক সময়ই গোয়েন্দার ভূমিকাতেও অবতীর্ণ হতে হয়। সেক্ষেত্রে রোজিনা পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন একথা সকলেই বুঝতে পারেন। কিন্তু এই পেশাগত দায়িত্ব পালনের অপরাধে তাকে পাঁচ ঘন্টা আটকে রাখা হয় সচিবালয়ে। সেখানে তার উপরে নির্যাতন চালানোর ছবিও দেখা গেছে। একজন তার কণ্ঠ চেপে ধরছেন এমন ছবি দেখে আঁতকে উঠবেন যে কোন বিবেকবান মানুষ। রোজিনার বোন অভিযোগ করেছেন যে, তাকে (রোজিনাকে) মাটিতে পুঁতে ফেলার হুমকি দেয়া হয়েছে। রোজিনা অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাকে মুক্তি দেয়া হয়নি।

শুধু আটকে রাখা বা তার উপরে মানসিক ও শারিরীক নির্যাতন চালানোই নয়। এরপর তাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে আজ কোর্টে চালান দেয়া হয়েছে। তার জামিনের আবেদনও নামঞ্জুর হয়েছে। তবে একটাই ভালো বিষয় যে তাকে রিমান্ডে নেয়ার আবেদনকে খারিজ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পুকুর চুরির খবর রোজিনা ফাঁস করে দেয়াতেই যে তার উপর এই আক্রোশ সেটা বুঝতে খুব বেশি মাথা খাটাতে হয় না। এই যদি হয় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, তাহলে এখন থেকে শুধু উন্নয়নের জোয়ারে দেশ যে ভাসতে ভাসতে একেবারে ডুবে যাচ্ছে সে খবর দেয়া ছাড়া গণমাধ্যমের আর কিছু করণীয় নেই। হ্যাঁ, আরও আছে। কে কেমন রান্না করে, ফ্যাশন হাউজের খবর, কে কীভাবে চুল বাঁধবে, কোথায় গরুর পেটে ছাগলের বাচ্চা জন্মাচ্ছে, সেসব খবরও দিতে পারা যাবে।
রোজিনাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার ছবিটা দেখে মনে হচ্ছে গণমাধ্যমকেই কারাগারে নেয়া হচ্ছে প্রিজন ভ্যানে বন্দী করে। রোজিনার গলা চেপে ধরছে যে হাতটি সেটি আসলে গণমাধ্যমের কণ্ঠই চেপে ধরছে।

রোজিনা ইসলামের মুক্তি চাই অবিলম্বে। শুধু তাই নয়, তার উপর যে নির্যাতন চালানো হলো এবং তাকে বন্দী করে যে হয়রানি করা হচ্ছে সেটার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। বিচারও চাই। চাই তো, কিন্তু কার কাছে?
রাষ্ট্রের যে ফ্যাসিবাদী চেহারা আজ দেখা গেল তাতে আর কোন চাওয়া পাওয়া রাখার আশা করি না। সাংবাদিক সমাজকে এখন একত্রিত হয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য সোচ্চার হতে হবে। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার সকল প্রকার কালা-কানুন বাতিলের দাবিতে একত্রিত হয়ে আন্দোলন করতে হবে। আর বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আছে একথা যিনি এখনও বিশ্বাস করেন তিনি যে বোকার স্বর্গে বাস করেন সেকথা আর নাই বা বললাম।

শেয়ার করুন:
  • 283
  •  
  •  
  •  
  •  
    283
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.