ডিভোর্স হয়ে উঠুক নাগরিকের প্রাপ্য অধিকার, ট্যাবু নয়

জিনাত নেছা:

আজ প্রায় আট বছর যাবত আমার প্রাক্তন স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়েছে। ডিভোর্স আমাদের সমাজে অনেকটা ট্যাবুর মতো কাজ করে। খবরে জানলাম সাবেক এএসপি বাবুল আক্তার এর স্ত্রী মিতু হত্যার অভিযোগ গঠনে বাবুল আক্তারই প্রধান আসামি। অর্থাৎ তিনি নিজ স্ত্রী হত্যার সাথে সরাসরি যুক্ত। এই খবর দেখার পর থেকে কিছু ভাবনা কেবলই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তার একটি হলো- খুন করা সহজ, নাকি ডিভোর্স দেয়া সহজ?

বাংলাদেশে আইনত স্বামী এবং স্ত্রী যে কেউ তাদের দাম্পত্য জীবনে বনিবনা না হলে তালাকের জন্য আবেদন করতে পারবে। এমনকি পেতেও পারে। ইসলাম ধর্মে তালাক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত একটা বিষয়। যদিও অন্যান্য ধর্মে বিবাহবিচ্ছেদ ধর্মীয় এবং আইনত স্বত:সিদ্ধ নয়। তবে তালাক/বিবাহবিচ্ছেদ আমাদের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে একটা ট্যাবু,অনেকটা অলিখিত নিষেধাজ্ঞার মতো। যেটি কিনা নারীর ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কাজ করে।

বিবাহ হলো একধরনের সামাজিক চুক্তি। দু’জন মানুষ কিছু নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে একটা চুক্তি বন্ধনে আবদ্ধ হয়। একসাথে থাকতে শুরু করে। তাদের দৈনন্দিন জৈবিক চাহিদা পূরণের মধ্য দিয়ে সন্তান উৎপাদন ও লালন পালন করে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে ঘরে আবদ্ধ রাখার এটা একটা মোক্ষম হাতিয়ার বলা যায়। যদিও শিক্ষিত এবং সচেতন নারীরা এই বলয় ভাঙতে শুরু করেছে অনেকাংশেই। আর তাই তালাকের সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে হু হু করে।

পরিবার, বিবাহ এইগুলো একধরনের সামাজিক এজেন্সি। যেখানে নারী- পুরুষ সকলে মিলে যে যার মতো ভূমিকা পালন করে চলছে। যেগুলোর কোন একটার ব্যত্যয় হলেই বিবাহ বিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, গত সাত বছরে তালাকের প্রবণতা ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। শিক্ষিত স্বামী-স্ত্রীদের মধ্যে তালাক বেশি হচ্ছে। গত জুন মাসে প্রকাশিত বিবিএসের দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকসের ফলাফলে এ চিত্র পাওয়া গেছে। এতে দেখা গেছে, গত বছর ১৫ বছরের বেশি বয়সী প্রতি এক হাজার নারী-পুরুষের মধ্যে গড়ে ১ দশমিক ৪টি তালাকের ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালে যা ছিল ১ দশমিক ৫। বর্তমানে বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে বেশি তালাক হয় (২ দশমিক ৭)। আর সবচেয়ে কম চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে (দশমিক ৬)।

বিবাহ বিচ্ছেদের হার বেড়ে গেলেও মূলত একে আমাদের সমাজে নেতিবাচকভাবেই উপস্থাপন করা হয়। একটা ঘটনা বলি: ২০১৪ সাল। দুজন নারী – পুরুষের সুন্দর দাম্পত্য জীবনে হঠাৎ করেই নেমে আসে ঝড়। স্বামী পরকিয়ায় জড়িয়ে পড়ে, এমনকি দ্বিতীয় বিয়েও করে ফেলে। কিন্তু প্রথম বউ মেনে না নিয়ে সেই অবস্থায় স্বামীকে ডিভোর্স দেয়। কিন্তু সেই নারীকে আজও শুনতে হয় কেন সতিনের সংসার সে করলো না! বাবা- মায়ের সম্মান রক্ষা করলো না! ডিভোর্সকে আমাদের সমাজে অনেক বেশি সম্মান হানিকর একটা ব্যাপার হিসেবে দেখা হয় বলেই কোন পিতামাতা মানতেই চান না তাদের ছেলে বা মেয়ে ডিভোর্সি হোক।

নিম্নবিত্তের মধ্যে ডিভোর্সের প্রবণতা বেশি থাকলেও সেটা নিয়ে আলোচনা কম। অনেকের মুখেই বলতে শোনা যায়, “হ, ওদের আবার মান- সম্মান আছে, এই ছাড়তেছে, এই ধরতেছে।” অর্থাৎ নিম্নবিত্তের মানুষদের মধ্যে ডিভোর্স মামুলি ব্যাপার। কিন্তু মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্তদের মধ্যে ডিভোর্স ভীষণ রকম সম্মানহানিকর। এমন অনেক পরিবারের গল্প শুনি যাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর কোনরকম সম্পর্ক নাই। শুধু এক ছাদের নিচে বসবাস করে। নারী-পুরুষ দুজনই পরকীয়া করছে, কিন্তু পরিবার, সন্তান, সমাজের মুখের দিকে তাকিয়ে রাতে এক ছাদের তলায় ঘুমায়।

আমাদের সমাজে ডিভোর্স এরকমই একটা ঘটনা যা একজন নারীর জন্য অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ একটা পথ। একজন ডিভোর্সি নারীর প্রতি পদে পদে বাধা। পরিবার,সমাজ,আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, অফিসের সহকর্মী সকলক্ষেত্রেই এক ধরনের বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয় ডিভোর্সি নারীকে। তাকে অপয়া থেকে শুরু করে পুরুষখেকো, সংসার খেকো সকল তকমা বয়ে বেড়াতে হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের আইনে তালাক পাবার অধিকার নারী পুরুষ সকলেরই আছে। ব্যক্তি আমি আমার ডিভোর্সের পর প্রায় এক বছর আমার প্রাক্তন স্বামী আমায় নানান অপবাদ দিয়েছে। নানানভাবে হেনস্থা করার চেষ্টা করেছে, হুমকি দিয়েছে, চরিত্র নিয়ে কথা বলেছে। আমাকে বলা হয়েছে আমি চরিত্রহীন, আমি এখন কী করে চলবো, কী করে উপার্জন করবো, আমাকে নাকি বেশ্যা হয়ে যেতে হবে! কিন্তু মজার বিষয় হলো ছাত্রাবস্থায় বিয়ে হয়ে নিজেই ঢাকা শহরে চারটা টিউশনি করে পড়ার খরচ, ছেলের দুধ, খাবার, সব চালিয়েছি। সেটা “পুরুষ” কিন্তু বেমালুম ভুলে গেছে।

ডিভোর্স শুধুমাত্র দুজনের কলমের খোঁচা হলেও এর সামাজিক প্রভাব ব্যাপক। তাই হয়তো সাবেক দাপুটে এএসপি বাবুল আক্তার এই সম্মানহানিকর কাজটি না করে তার স্ত্রীকে খুন করাটাই শ্রেয় মনে করেছেন। ভেবেছিলেন তিনি একজন বিসিএসধারী চৌকষ অফিসার, এতো বড় বড় অপারেশন করেছেন, এই আর এমনকি, বড়ই মামুলি অপারেশন! খুব অবাক করা বিষয় হলো এএসপিদের অভিনয় প্রশিক্ষণ দেয়া হয় কিনা জানি না! তিনি সেসময় (মিতু হত্যার ঘটনার সময়) যে নিপুণ অভিনয় করেছিলেন, তা কিন্তু প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু তিনি ভাবেননি তার যে রেপুটেশন ছিলো তার কর্মস্থলে, সেটিই তার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার স্ত্রীর খুনের আরও জোরদার ইনভেস্টিগেশন হয়েছে। যেখানে নিজেই ফেঁসে গেছেন।

এতো সহজে একজন মানুষকে খুন করা যায়, কিন্তু নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য অধিকার ডিভোর্স দেয়া যায় না, কী অদ্ভুত রাষ্ট্রের জনগণ আমরা তাই না! ডিভোর্সের চাইতে খুনই সহজ। আহা! বাংলাদেশ!!

সত্যিই তো এদেশে মুড়িমুড়কির মতো মানুষ খুন করা হচ্ছে, ক্রসফায়ার হচ্ছে, পুলিশ কাস্টডিতে মেরে ফেলা হচ্ছে, মিছিল মিটিং এ গুলি করা হচ্ছে। কই কোনটার তো বিচার হয় না! বিশ্বজিৎ হত্যার বিচার আজো হয়নি, সাগর- রুনি হত্যাকাণ্ডের চার্জশিটই দেয়া হয়নি। আবরার হত্যার বিচার হয়নি। তনু হত্যার বিচার হয়নি। এরকম হাজারও হত্যার বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদছে। সেখানে এরকম ক্ষমতাধর সাবেক এএসপি বাবুল আক্তার তো ভাবতেই পারেন ডিভোর্স এর চাইতে খুনই সহজ।।

দুজন মানুষের বনিবনা না হলে আলাদা থাকতে পারে, ডিভোর্স হতে পারে। এটা খুব সহজ একটা বিষয়,স্বাভাবিক ঘটনা।এটা নিয়ে নিজেকে ছোটভাবা সম্মান গেল গেল এরকম ভাবার কিছুই নাই।প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে,ঝগড়া করে সমাজের ভয়ে এক ছাদের নিচে থাকার অভিনয় করে গেলে মিতুর মতই জীবন দিতে হবে।যদি ও মিতু একা নয়।হাজারো মিতু আছে আমাদের সমাজে লোকলজ্জার ভয়ে, পরিবারের চাপে, সন্তানের দোহায় দিয়ে অকালে জীবন হারাচ্ছেন। নারীদের বলবো প্রতিনিয়ত নিজের আত্নসম্মান বলিদানের চাইতে ডিভোর্স শ্রেয়।।
পরিশেষে বলতে চাই ডিভোর্স নিয়ে অধিকতর গবেষণার প্রয়োজন। এর ইতিবাচক দিকগুলো তুলে আনা জরুরি। সমাজে ডিভোর্সকে একজন নাগরিক হিসেবে তার প্রাপ্য অধিকার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করার এটাই বোধহয় উপযুক্ত সময়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.