“ওয়ার্ক ফ্রম হোম” কতটা নারীবান্ধব?

রোকসানা বিন্তী:

বিদ্যমান কোভিড মহামারিতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য “ওয়ার্ক ফ্রম হোম ” কনসেপ্টটির ব্যপক প্রচলন হয়েছে! সহজ ভাষায় বলা যায় বাসায় থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অফিসের সাথে যুক্ত থাকা ও দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়াই হল “ওয়ার্ক ফ্রম হোম”! করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য খুবই কার্যকর একটা পদ্ধতি, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই! কিন্তু “ওয়ার্ক ফ্রম হোম” একজন পুরুষের পক্ষে যতটা সহজ, একজন নারীর জন্য ততটা সহজ নাও হতে পারে!

একজন কর্মজীবী নারীর কাজের কোনো সীমা পরিসীমা নেই! সকালবেলা একদফা সংসার সামলে, সারাদিন অফিস শেষে বাসায় এসেও আবার রান্নাঘরে ঢুকতে হয়! পরিবারের সকলের জন্য খাবার রেডি করা, বাচ্চাকে সময় দেয়া, বাচ্চার বাবাকে সময় দেয়া, সংসারের সবকিছু ম্যানেজ করা এগুলো তো আছেই, তার উপর আরও যে কত শত দায়িত্ব, তার ইয়ত্তা নেই! ক্লান্ত হয়ে দুদণ্ড জিরানোর মতো সময় কর্মজীবী নারীরা খুব কমই পেয়ে থাকেন! একজন গৃহিণী যদি সংসারের সব কাজ করার জন্য চব্বিশ ঘণ্টা পেয়ে থাকেন তাহলে একজন কর্মজীবী নারী ঠিক একই পরিমাণ কাজ করার জন্য পেয়ে থাকেন দশ ঘন্টা বা তারও কম সময়! তাই তারা বাসায় সবসময় ব্যস্ত থাকেন, আর যতক্ষণ বাসায় থাকেন বিশ্রামের সময়টা বাদে বাকি সময়টুকুতে পরিবারের সদস্যরা তাদের গৃহস্থালি কাজকর্ম করতে দেখেই অভ্যস্ত থাকে!

কিন্তু লকডাউনে যখন বাসায় থেকে অফিসের কাজ করতে হয় তখনই বাধে বিপত্তি! ঘরের সাংসারিক কাজকর্ম বাদ দিয়ে যখন বাড়ির বউ ল্যাপটপের সামনে জুম মিটিং করছে বা অফিসের কাজে মগ্ন থাকছে, সেই দৃশ্য পরিবারের অনেকের কাছে স্বাভাবিক নাও লাগতে পারে! বিশেষ করে কোন যৌথ পরিবারে যদি একাধিক ছেলের বউ থাকে এবং তার মধ্যে একজন কর্মজীবী আর বাকিরা গৃহিণী হোন, তাহলে কী অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়! অন্য বউরা রান্নাঘরে কষ্ট করে কাজ করবে আর একজন ল্যাপটপের সামনে আরাম(!) করে বসে থাকবে, তা মেনে নেয়া অনেকের কাছেই কষ্টকর! এর মাঝে পড়ে কর্মজীবী নারী না পারেন অফিসের কাজে মনোযোগ দিতে, না পারেন ঘরের কাজ ঠিকমতো করতে! অনেক সময় দেখা যায় সেই কর্মজীবী নারীটি ঘরের সমস্ত দায়িত্ব সামলে অফিসের কাজ নিয়ে বসলেও হেনস্থা হওয়ার হাত থেকে মুক্তি পান না! সামান্য ভুলের জন্যও তিরস্কারের সম্মুখীন হন, যা হয়তো কোনো স্বাভাবিক সময়ে কারো চোখেও পড়তো না!

আবার সেই কর্মজীবী নারীর যদি ছোটো বাচ্চা থাকে তাহলেও তার ক্ষেত্রে “ওয়ার্ক ফ্রম হোম” কষ্টকর হয়ে যায়! কেননা অবুঝ বাচ্চা অফিস, মিটিং এগুলো কিছুই বোঝে না! সে কেবল বোঝে যে, মা বাসায় আছে, কিন্তু তাকে সময় দিচ্ছে না! ফলে তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং সে মায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য অনেক বেশি দুরন্তপনা করতে থাকে! যা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়! আবার বাচ্চা তার মাকে ক্রমাগত ইলেকট্রিক ডিভাইস ব্যবহার করতে দেখে অভ্যস্ত হয়ে যায়, যার ফলে বাচ্চারও মোবাইল ফোন, ল্যাপটপের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে! অনেক সময় মা যথাসময়ে ও নির্বিঘ্নে মিটিংয়ে অংশ নেয়ার জন্য বা কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার জন্য নিজেই বাচ্চাকে মোবাইলে কার্টুন বা রাইমস ছেড়ে দিয়ে ব্যস্ত রাখেন! যার ফলাফল হয় সুদূরপ্রসারী! শিশুদের ডিভাইস আসক্তির ক্ষতিকর প্রভাবের কোন ইয়ত্তা নেই! যদিও অনেক কর্মজীবী মা এইসব ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জেনেও বাধ্য হয়ে বাচ্চাকে ডিভাইস দিয়ে থাকেন অফিসের কাজটা ঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য!

এই সমস্যা সমাধানে প্রথমেই এগিয়ে আসা উচিত পরিবারকে!

দৃষ্টিভঙ্গি বদলে নারীকে ঘরে থেকে অফিসের কাজ করতে দেয়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে, আর তা করতে হবে নারীর পরিবারের অন্য সদস্যদের! কর্মজীবী নারীর স্বামী এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন! যদি স্বামী-স্ত্রী দুইজনকেই “ওয়ার্ক ফ্রম হোম” করতে হয় সেক্ষেত্রে নিজেরা আলোচনা করে পালাক্রমে কাজ করলে তা যেমন সহজ হবে, তেমনি বাচ্চাও বাবা মা দুইজনেরই সঙ্গ পাবে! বাচ্চা দেখাশোনা ছাড়া অন্যান্য গৃহস্থালি কাজেও স্বামীকে অংশ নিতে হবে! এছাড়া পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও লক্ষ্য রাখতে হবে যেন সুষ্ঠুভাবে নারী বাসায় অফিসের কাজ সম্পাদন করতে পারেন!

অন্যদিকে নারীর সহকর্মীদেরও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে! নারী সহকর্মীদের সাথে আলাপ করে তাদের সুবিধাজনক সময়ে মিটিং বা যেকোনো সেশনের সময় নির্ধারণ করার চেষ্টা করতে হবে যেন তাদের অংশগ্রহণ করতে অসুবিধা না হয়! কাজের ডেডলাইন ফিক্সড করার ক্ষেত্রেও যতটা সম্ভব ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে!

“ওয়ার্ক ফ্রম হোম” নারীদের জন্য অসুবিধাজনক হলেও অসম্ভব নয়! পরিবার ও সহকর্মীদের সাহায্য, সহানুভূতি ও আন্তরিকতা থাকলে কর্মজীবী নারীরা সহজেই ঘরে বসে অফিসের দাপ্তরিক কাজ সম্পাদন করতে সক্ষম হবে এবং নিজ ক্ষেত্রে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হবে!

শেয়ার করুন:
  • 298
  •  
  •  
  •  
  •  
    298
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.