পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে আমি একা: ভাবনা

এই মুহূর্তে অনেকগুলো আলোচিত ঘটনার একটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মা দিবসে অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর মাকেসহ একটি ছবি পোস্ট করার পর সেখানে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং এর প্রতিক্রিয়া। ঠিক একইদিনে  অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনাও তার মাকে নিয়ে কেক কাটার একটি ভিডিও পোস্ট করেন। সেখানে তাকেও ভয়াবহ রকমের মন্তব্যের শিকার হতে হয় কেবলমাত্র তার মায়ের কপালে টিপ এবং মায়ের পরনে ওড়না ছিল না বলে। দুটো ঘটনাই অনাকাঙ্খিত এবং ভয়াবহ বিদ্বেষপ্রসূত।বর্তমানে যে হারে সাইবার বুলিয়িং এর ঘটনা ঘটছে, দিন দিন এসব ঘটনা স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। দিনের পর দিন এরকম ঘটনা ঘটছেই। তারকা বলুন আর সাধারণ মানুষ বলুন, কেউই বাদ যাচ্ছে না এই মোরাল পুলিসিং এর হাত থেকে। নোংরামি এবং অসম্মানজনক মন্তব্যগুলো স্বাভাবিক কোন মানুষের পক্ষেই সহ্য করা কঠিন। কোনভাবেই এগুলো থেকে মুক্তি মিলছে না।

এদিকে একটা বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়লো যে চঞ্চল চৌধুরীর ঘটনায় যেভাবে মানুষ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, ভাবনার ক্ষেত্রে তেমনটি দেখা যায়নি। অথচ দুটো ঘটনারই প্রেক্ষাপট অভিন্ন। কিন্তু দুজনের ক্ষেত্রে দুরকম প্রতিক্রিয়ার কারণটা কী? খুব বেশি নয়, হাতেগোণা কয়েকজনকে দেখা গেছে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে। তারাও এই বৈষম্যটা খেয়াল করেছেন, এবং বলেছেন, একজন নারী বলেই আজ ভাবনার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নেয়া হলো না। চোখে আঙ্গুল দিয়ে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিটা দেখিয়ে দিল সবাই।

অভিনেত্রী ভাবনা বুধবার তার ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন, যেখানে তিনি লিখেছেন, ‘I am all alone in this Patriarchal society. And it’s fine, I will fight.’ সেখানে অনেককেই দেখলাম কমেন্ট করছেন এই বলে যে তার পাশে তারা আছেন, তিনি একা নন, দিনশেষে লড়াইটা একারই করতে হয়, এরকম নানান কিছু লিখছেন সবাই। বেশিরভাগই লিখেছেন, ‘তিনি একা নন’। এই একটি কথা আশা জাগায় স্বাভাবিকভাবেই।

অভিনেত্রী ভাবনা যে এবারই প্রথম এ ধরনের অশ্লীল মন্তব্যের বা সাইবার বুলিয়িং এর শিকার হচ্ছেন, তা নয়। এই তো কিছুদিন আগেই বইমেলায় গিয়েছিলেন স্লিভলেস ব্লাউজ পরে, যেখানে তার ক্লিভেজ দেখা না গেলেও সেই বিষয়টি নিয়েও ব্যাপক নোংরামিপূর্ণ সমালোচনা হয়েছে। ভয়াবহ রকমের ট্রল করা হয়েছে। আশার বিষয় যে তিনি বরাবরই সরব এসব ক্ষেত্রে। যতবারই তিনি এরকম কোন হয়রানি বা বুলিয়িং এর শিকার হয়েছেন, ততবারই মুখ খুলেছেন, প্রতিবাদ করেছেন। শুধু নিজের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যদের বেলাতেও তিনি প্রতিবাদ করেছেন।

তাই হঠাৎ কেন তিনি নিজেকে অসহায় ভাবছেন? কেন তার একা মনে হচ্ছে নিজেকে?

জানতে চাইলে বললেন, তার কেবলই কান্না পাচ্ছে, খুব কষ্ট পাচ্ছেন। যাদের সাথে প্রতিদিন তাকে কাজ করতে হয়, উঠাবসা করতে হয়, তাদের কাউকেই তিনি পাশে পেলেন না এই মানসিক বিপর্যয়ের সময়ে। (এখানে বলে রাখা ভালো যে, একেকটি সাইবার বুলিয়িং এর ঘটনা মানুষকে প্রচণ্ড একটা মানসিক চাপের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়, যারা এমনটির শিকার হয়েছে, তারাই জানে।)

ভাবনা আরও জানালেন, সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ জানানোর জন্য বুধবার একটি দল গিয়েছিল, যেখানে চঞ্চল চৌধুরীও ছিলেন। কিন্তু একই দিনে, একই সময়ে তিনিও এরকম হয়রানির শিকার হওয়া সত্ত্বেও তাকে সেই মিটিংয়ে ডাকার প্রয়োজন কেউ বোধ করেনি। জিজ্ঞাসা করা হলে তাকে বলা হয়েছে যে, ‘আমরা তো তোমার বিষয়টা জানিয়ে এসেছি’। ভাবনার আক্ষেপের বিষয়টি হলো, ‘আমার বিষয়টি অন্য কেউ জানিয়ে আসবে কেন? আমি নিজে গিয়ে বলতে পারতাম না তাদের সাথে?’ কাউকে বড় বা ছোট করার অভিপ্রায়ে না, কিছুটা অভিমান থেকেই তার মনে হয়েছে, তার পক্ষ নিয়ে কেউ জোরালো কোন প্রতিবাদ পর্যন্ত করলো না। অথচ সমাজ একজন পুরুষ অভিনেতার পাশে ঠিকই দাঁড়িয়েছে, সবাই লিখছে তার হয়ে, প্রতিবাদ করছে। তাকে নিয়ে টকশো পর্যন্ত হচ্ছে। এমনকি নারী সহকর্মিরাও ওই পুরুষ অভিনেতার পাশেই দাঁড়িয়েছে। আজ নারী বলেই নিজেকে ‘অবহেলিত’, প্রচণ্ড ‘একা’ মনে হচ্ছে ভাবনা’র, লড়াইয়ের মাঠে নিজেকে একা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছেন না।

আশনা হাবিব ভাবনা এভাবেই ব্যক্ত করলেন নিজের কথাটুকু:

“রাত ১২.৩০। মনে হচ্ছে যেন আমি অনেক ভারী হয়ে আছি। তাই গোসল করলাম, এখন লিখতে বসেছি, আমার লেখা আসছে না, অনেক রাগ হচ্ছে। কেন এতো রাগ হচ্ছে আমার? কেইবা বসে আছে আমার রাগ দেখার জন্য? হয়তো কালকে আবার আমার কাক সন্তানেরা আসবে আমার কেন রাগ হয়েছে তা শুনতে! এই তো, যা মাথায় কাজ করছে তা হাতে লিখতে পারছি না আজ, ছবিও আঁকতে পারছি না বহু চেষ্টা করেও। একটা প্রতিবাদ আমাকে এতোটা থামিয়ে দিল!!

এমন প্রতিবাদ করে লাভ কী? যে প্রতিবাদে আরও দমে যেতে হয়। তার চেয়ে বরং নায়িকা হওয়ার ভান ধরে মিষ্টি মিষ্টি ছবি পোস্ট করাই ভালো। অনেক গালির সাথে সাথে অনেক লাইকও পাওয়া যায়। আসলে সব দোষ আমার বাবা – মার, কেন যে একটা ছেলে হলো না তাদের! আমরা দুই বোন, আমি আর অনন্যা, ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা হয়ে যেতো একটা ভাই থাকলে যে আমি যে সমাজে বাস করি সেখানে একজন নারীর চেয়ে একজন পুরুষ অনেক দামি। এই শিক্ষাটা আমাদের ছোটবেলা থেকেই জরুরি। আরও জরুরি চুপ থাকা শেখা, আমাকে নিয়ে লোকে যা ইচ্ছা বলুক, মাথা পেতে নেয়া শেখা আমার সাথে অন্যায় হবে চুপটি করে মিষ্টি হাসা, এই না হলে মেয়ে মানুষ!

আমি যদিও অভিনেত্রী হতে চাই, কিন্তু বাস্তবে আমি লোকের কাছে নায়িকা। আর হওয়ার কোন গুন আমার মধ্যে নেই, বড্ড বেশি প্রতিবাদী, যেখানে সেখানে সত্য বলে ফেলি। তেল মোটেও দিতে জানি না, কাজ ছাড়া আর কিছুই পারি না আলাদা করে। স্পষ্টভাষী আমি, এটা আরেকটা মাইনাস পয়েন্ট। আর সবচেয়ে বড় মাইনাস পয়েন্ট কী বলবো —-
আমি প্রেম করি প্রকাশ্যে, তাও আমার চেয়ে ১৭ বছরের বড় এক হিন্দু পুরুষের সাথে। পেশায় সে নির্মাতা। জনপ্রিয় নির্মাতা। চারুকলায় পড়াশুনা করেছে সে, তাই তো আমি ছবি আঁকলে লোকে বলে আরে সব তো অনিমেষের আঁকা। আমি লিখলে বলে অনিমেষ লিখে দেয়। ও বলা হয়নি অনিমেষ আইচ আমার একমাত্র প্রেমিকের নাম। তবে তার সাথে আমার চেহারায় মিল নেই, মুখভর্তি দাঁড়ি তার, ভাগ্যিস, তা না হলে লোকে বলে বসতো অনিমেষই আমার অভিনয় করে দেয়!

বইমেলায় গেলাম হাত কাটা ব্লাউজ পরে। এতো বড় পাপ এই সময়ে কেউ করে? পাপের শাস্তি তো পেতেই হবে আমায়, পেলামও তাই। শাস্তি পেয়েও আমার শিক্ষা হলো না। মা দিবসে আমার মায়ের সাথে কেক কাটলাম, মা টিপ পরা, গায়ে ওড়না নাই, আমার হাতা এবারও কাটা। গালি তো খেতেই হবে। অবশ্যই আমার মা মুসলিম হতে পারে না, কারণ মুসলিম মেয়েরা টিপ দেয় না, ওড়না ছাড়া থাকে না। কিন্তু আমার মা যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, কোরআন পড়ে, সেটা তো আর আমি লিখে দেইনি। টিপ পরা আর ওড়না না থাকার অপরাধে আমার মাও এবার শাস্তি পেলেন। গালি খেলেন। সমস্যাটা হলো একদিনে গালি খেলেন আরেকজন, তার মা সিঁদুর পরা ছিল, সেজন্য। আমার মা মুসলমান, তার মা হিন্দু, তবে একই গালি খেলেন দুই মা। মায়ের দুই সন্তানও গালি খেলেন। একজনের সন্তান নায়িকা, আরেক জনের সন্তান নায়ক, এই তো সবাই বাংলা সিনেমার মতো নায়কের পাশে থাকলো। নায়কই সিনেমার প্রাণ। নায়িকার কেবল যে দুই একটা দৃশ্যে থাকার কথা তাই থাকলো। নায়ক প্রধান সিনেমায় নায়িকা অপেক্ষা করছে শেষে নায়ক এসে তাকে বাঁচাবে।
এই আর কী!!”

 

শেয়ার করুন:
  • 5.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    5.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.