সোভিয়েত নারীর দেশে: পাঠ প্রতিক্রিয়া

লাকী আক্তার:

একটানে পড়ে শেষ করলাম সুপ্রীতি ধরের লেখা বই ‘সোভিয়েত নারীর দেশে’। মনে হলো প্রায় এক দশকে ভেসে বেড়ালাম। সাবলীল এবং সুখপাঠ্য ভঙ্গিতে লেখা তার এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে সব্যসাচী প্রকাশনী থেকে। বইয়ের প্রচ্ছদ দারুণ। তবে ছাপার ক্ষেত্রে আরও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন ছিলো।

বহুদিন পর স্মৃতি হাতড়ে লেখা সুপ্রীতি ধরের ভ্রমণালেখ্য বলা যায় এটিকে। ছোট ছোট অধ্যায়গুলোর লেখার সাবলীলতায় টেনে নিয়ে যায় পরের অধ্যায়ে। মনোযোগ থাকে টানটান। লেখার ভঙ্গিটিও দারুণ। লেখকের রসবোধও দুর্দান্ত।

সোভিয়েত নারীর দেশে লেখক যেই দশকের কথা বলেছেন, সে দশকটা নিঃসন্দেহে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে তখন একদিকে স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম, তার মধ্যে সোভিয়েত রাশিয়ার ভাঙ্গন আমাদের পার্টির ভাঙ্গন তরান্বিত করে। যারা সমাজতন্ত্রের কাণ্ডারি হিসেবে আমাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের অনেকই সমাজতন্ত্রের আশায় গুড়েবালি দেখিয়ে দলত্যাগ করেন। আমাদের পার্টি অফিসে ভাঙ্গনের দেয়াল ওঠে। তার বিপরীতে অনেক নেতাই সমাজতন্ত্রকে আঁকড়ে ধরে লাল পতাকা নিয়ে মিছিলে হাঁটেন সময় আর স্রোতের বিপরীতে। এখনও সে ইতিহাস পাঠ আমাদের মন ভারাক্রান্ত করে, পক্ষান্তরে আশাবাদীও করে। আবার ঠিক সোভিয়েত আমলের নানান বৈপ্লবিক পরিবর্তন আমাদের সমাজতন্ত্রের প্রতি অকুণ্ঠ কাজ করার স্পৃহা যোগায়। এই বইটি পাঠ করার আরেকটি কারণ সে সময়টাকে হাতড়ে বেড়ানোর জন্যও।

নিজের অধরা স্বপ্নের প্রতি তার যাত্রা, সেখানে গিয়ে আশাহত হওয়া, দীর্ঘ সাড়ে নয় মাসের আরমেনিয়ায় থাকার অভিজ্ঞতা, আবার ফেরত আসা, মাঝে দেশে এসে বিয়ে করা, (যেটাকে লেখক নিজেই অস্বীকার করতে চাইছেন বার বার তার লেখায়), মায়ের সাথে হঠাৎ দূরত্ব, হাহাকার, শারীরিক দুর্বলতা, সন্তান জন্মদান, এর মধ্যে সন্তানকে বড় করা, অর্থ উপার্জনের নানাবিধ প্রচেষ্টা, নানান জনের আচরণগত পরিবর্তন, বন্ধুদের প্রণয়, বিয়ে, নির্ভেজাল বন্ধুত্ব বহু কিছু উঠে এসেছে তার এই বইটইতে। অবশ্য প্রতিটা ক্ষেত্রেই আমি অনুভব করেছি রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো আসাটা খুব দরকার ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে উঠে এসেছে। তার একাকি সন্তান জন্মদান এবং সকলের সহযোগিতা প্রমাণ করে সেখানকার যৌথ জীবনের চর্চা। যেখানে এটাই মূলমন্ত্র যে একটা শিশুর দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাজনৈতিক টানাপড়েন, সময়কাল এর মধ্যেই আরও দারুণভাবে আসতে পারতো, সেটার ঘাটতি লক্ষ্য করেছি।

লেখক সোভিয়েত সময়ের পতনের সময় রাশিয়াতে ছাত্রদের সম্মেলনের বিষয়ে একটু বিস্তারিত বললে সেসময় সেখানকার ছাত্রদের মূল্যায়নটা বোঝা যেত। তর্ক-বিতর্কের ছোঁয়াটা দরকার ছিলো। কেননা রুশ বৃত্তি নিয়ে বহু মানুষ রাশিয়ায় গিয়েছেন, শিখেছেন, ফিরে এসে তাদের অভিজ্ঞতার গল্প আমরা আসলে খুব কমই পড়েছি।

বর্তমানে আমাদের দেশে আমরা পশ্চাদপদ সমাজে বাস করি। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, আমাদের দেশের সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবস্থানকে ক্রমাগত ডানপন্থী ঝোঁকের দিকে ধাবিত করে আরও পশ্চাদপদ অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে । কিন্তু যখনি আমরা কোথাও কোন নিরাপদ সমাজ ব্যবস্থার গল্প শুনি, তা আমাদের স্বপ্নবান করে, আশান্বিত করে। তাই লেখক যখন সোভিয়েত আমলে এবং তার পতনের সময়কালেও সেখানকার উন্নত চর্চা, নারীর মর্যাদার কথা তার লেখনীতে ফুটিয়ে তোলেন, তা আমাদেরকে আশা জাগায়।
লেখকের ভাষায়,

“আমার সাড়ে নয় বছরের সোভিয়েত জীবনে কখনো নিজের শরীর নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিনি।”

সোভিয়েত আমলে যে শৃংখলা আর নিরাপত্তার মধ্যে সমাজের মানুষ ছিলো। আকশচুম্বী চাহিদার বদলে নূন্যতম চাহিদা, জানার প্রতি অদম্য আগ্রহ আর মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই। সে সমাজব্যবস্থাকে এখনো আমরা মনে করি পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিশাল বড় বিপ্লবী অধ্যায়। ৭০ বছরের সময়কালে আমলাতন্ত্র সহ বহু সমালোচনা ঠিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাপক ভাবে আলোচনা হয়। সেসময় লেখক এবং তার বন্ধুরা বিষয়গুলোকে কিভাবে দেখতেন, তা জানার একটা আগ্রহ তৈরি হয়ে যায় বইটই পড়তে পড়তেই।

মশিউল আলমের উপন্যাস ‘তনুশ্রীর সাথে দ্বিতীয় রাত’ বইটা পড়েছিলাম। সেখানের সাথে এই বইটার বেশকিছু ক্ষেত্রে মিল পাওয়া যায়। যেহেতু তারা একই সময়ে সেখানে ছিলেন, অভিজ্ঞতার মিল আছে। তবে একজন নারীর দেখা আর একজন পুরুষের দেখা সময়ের মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারা যায়। মশিউল আলম যেভাবে তার উপন্যাসের নায়িকাকে দেখেন, সুপ্রীতি ধরের চোখে তা ভিন্নভাবে ধরা পড়ে। সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার পতনের বিরূপ প্রভাব কীভাবে নারীর উপর পরে তা লেখকের সেসময়কার স্মৃতি থেকে এই বইয়ে কিছুটা পাওয়া যায়। সমাজব্যবস্থার বদল পাল্টে দেয় বহু মানুষের জীবনের মানচিত্র। অভাব, অনটন আর চাহিদার আতিশয্যে বদলে যাওয়া রূপ। রুশ ইহুদিদের পুনরুত্থান, আদম ব্যবসাসহ বহু কিছুর অনুসন্ধান দিয়েছেন এই বইয়ে লেখক।

আরমেনিয়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি আর জীবন নিয়ে অধ্যায়টাও দারুণ। সেখানকার অনেক ইতিহাস ফুটে উঠেছে তাছাড়া মস্কোতে সেসময়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমরেড যারা ছিলেন, তাদের সম্পর্কে আরও কিছু জানার ইচ্ছা ছিলো। কিছু বিষয়ে আলোকপাত করা হলেও লেখক পরবর্তীতে আর বিষয়গুলো নিয়ে এগোয়নি। সেখানে কিছু বিষয় খাপছাড়া মনে হয়েছে।

তবে অনেকের প্রেম, বিয়ে নিয়ে অনেক ডিটেইলস থাকলেও লেখকের প্রেমের, প্রণয়ের আর বিয়ের বিষয়গুলো কিছুটা ধোঁয়াশা থেকে গেছে। পড়তে পড়তেই এটা নিয়ে আগ্রহ জন্মায়, কিন্তু লেখক এটাকে ছোটগল্পের মতোই ‘শেষ হয়েও হইলো না শেষ’ এভাবে রেখে দেন। এজন্য অবশ্য লেখক নিজেই লিখেছেন,
“কিছু বিষয় নাহয় একান্তই আমার থাক”।

শিশুদের বেড়ে উঠা, সেখানকার চাইল্ড কেয়ার নিয়ে কিছু বর্ণনা থাকলে ভালো হতো। ছাত্রাবস্থাতেই অর্থ রোজগার একটা সময় এমেচার হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, অর্থাভাব, ক্ষুধার জ্বালা, মানুষের হঠাৎ দুর্দশার চিত্র পেলাম। আরও পেলাম পরবর্তী সময়ে নারীদের, বহু শিক্ষার্থীদের কষ্টকর আখ্যানের কথাও। আবার এই কষ্টের মধ্যেই সোভিয়েত রাশিয়ার মানবিকতার অনেক স্বরূপ লেখক তার বইতে দিয়েছেন।

একটি ছোট্ট মফস্বল শহর থেকে ঢাকায় আসা, দুর্দান্ত ফলাফল, আর বইয়ের মধ্যে চেনা রাশিয়ায় যাওয়ার স্বপ্ন কিশোরীর চঞ্চলতা সবকিছুরই একটা ছোঁয়া সোভিয়েত নারীর দেশে বইটি। আবার জীবনের নানান চড়াই উৎরাই, মান-অভিমান, আক্ষেপের সাথে সাথে এখনও সেই সময়ের নস্টালজিয়ায় লেখক যখন ভাসেন, তখন সাথে সাথে পড়তে গিয়ে আমরাও যেন ভাসি। সোভিয়েত সময় এবং তার পতনের সময়কালকে স্মৃতি থেকে লেখা এই বইটিতে আরও রাজনৈতিক পটভূমির প্রত্যাশা ছিলো আমার কাছে। রাশিয়ার ক্রান্তিকালের সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে জানার প্রতি যাদের আগ্রহ নিঃসন্দেহে তাদের কাছে এ বইটি ভালো লাগবে। সবাইকে পড়ার আমন্ত্রণ।

লেখক: লাকী আক্তার, নির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি।

(বইটি প্রকাশ করেছে সব্যসাচী প্রকাশনী। তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেইজ ছাড়াও বইটি পাওয়া যাচ্ছে ‘বাতিঘর’ এর সব কয়টি শাখায়। অনলাইনে বইটি অর্ডার করতে পারুন।) 

শেয়ার করুন:
  • 144
  •  
  •  
  •  
  •  
    144
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.