পিতৃতৃন্ত্রকে না ভাঙলে নারীর প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ কখনই যাবে না

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

(১)

টেলিভিশনে কথা বলছিলেন ওরা গতরাতে, মুনিয়া নামে মেয়েটার নামে এইরকম বাজে প্রতিবেদন কেন করছে পূর্ব-পশ্চিম, দেশ রূপান্তর এরাসহ বেশ কিছু অনলাইন নিউজ পোর্টাল? শুধু মুনিয়া নয়, অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে একটি নারী বা তার পক্ষে যখন কোন অত্যাচার নির্যাতন ইত্যাদির অভিযোগ ওঠে একটি পুরুষের বিরুদ্ধে, তখন চারিদিকে সকলেই ভিক্টিম নারীটিকে মন্দ দেখানোর জন্যে উঠেপড়ে লেগে যায়, এটা কেন হয়? ভিক্টিম ব্লেইমিং বা ভিক্টিম শেইমিং কেন হয়? যারা আলোচনা করছিলেন ওরা জ্ঞানী মানুষ, সম্পাদক, অধ্যাপক এইরকম লোকজন। ওদের কথাগুলি ভুল নয়। ঠিক কথাই বলছিলেন ওরা। তবুও আমার মনে হয়েছে মূলকথাটা বা, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, মূল শব্দটা সম্ভবত আলোচকরা ঠিক সময় মনে করতে পারেননি, বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে বলেননি।

কথাটা হচ্ছে Misogyny, বাংলা করলে কথাটা হয় নারী-বিদ্বেষ বা নারীর প্রতি প্রবল ঘৃণা। নারী-বিদ্বেষ কথাটা ছোটখাটো, সেইজন্যে এই কথাটাই ইংরেজি Misogyny শব্দের বাংলা হিসাবে ব্যবহার করছি। যদিও Misogyny শব্দটার যে তীব্রতা আছে- নারীর প্রতি তীব্র ঘৃণা, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের সৈনিক যেন- সেটা আমি নারী বিদ্বেষ কথাটার মধ্যে পুরোপুরি পাই না। এই যে নারীকে কথায় কথায় হেনস্থা করা, ভিক্টিম যদি নারী হয় তাকে দোষারোপ করা, তাকে ‘চরিত্রহীনা’ বলা, তাকে সমাজের চোখে ঘৃণ্য করে তোলা- এইসবই পুরুষ করে নারী বিদ্বেষের অংশ হিসাবে।

প্রায় কোন ব্যতিক্রম ছাড়া, প্রতিটা পুরুষ মনে করে নারী অধম, পুরুষের চেয়ে অধম, নারী দুর্বল, পুরুষের চেয়ে দুর্বল, নারী পূর্ণাঙ্গ মানুষ নয়। ওরা মনে করে নারী যেহেতু পূর্ণাঙ্গ মানুষ নয়, তাইলে পৃথিবীর অন্য সকল বস্তু বা ঊন বা ইতর শ্রেণীর প্রাণীর মতো নারীরও মালিকানা থাকতে হয়। একটা গাভী কি মালিকানা ছাড়া হতে পারে? বা একটা ছাগী? অথবা একটা আম গাছ অথবা গোলাপ গাছ? অথবা ধরেন খুব মূল্যবান কিছু- মহা মূল্যবান মনিমুক্তা হীরে জহরত- যত দামিই হোক, সেতো নিজের মালিক নিজে হতে পারে না। নারীও নাকি সেইরকম- তোমাদের জন্যে ঈশ্বরের উপহার, যেন মহামূল্যবান হীরে জহরত- নারীর মালিক পুরুষ। যেদিন থেকে পিতৃতন্ত্র বা প্যাট্রিয়ার্কি হয়েছে, সেই থেকে পুরুষ এইটা প্রতিষ্ঠা করেছে; যেদিন থেকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ইত্যাদি হয়েছে, সেদিন থেকে পুরুষ এইটা প্রতিষ্ঠা করেছে যে, নারীর মালিক পুরুষ।

(২)

কিন্তু নারীও তো মানুষ। নারী তো গাই গরু নয়। গাই গরুও তো মাঝে মাঝে শিং নাড়া দেয়। নারীরাও মাঝে মাঝে নড়েচড়ে উঠতে পারে- এমন সব কাণ্ড করে যাতে পুরুষের সুশোভন বাগান কেঁপে ওঠে। পুরুষ সেটা মানবে কেন? পুরুষ তো জানে নারীকে পুরুষের অধিনস্ত করা হয়েছে, নারী হচ্ছে পুরুষের ধন। এমনকি ঈশ্বরও বলে দিয়েছেন স্পষ্ট করে এই কথা- পুরুষ উত্তম, নারী অধম। এইজন্যে পুরুষ পোষণ করে তীব্র ক্রোধ নারীর বিপরীতে। বেয়াদব নারী কেন পুরুষের ইচ্ছার অবাধ্য হবে? নারী কেন ভঙ্গ করবে পুরুষের বেঁধে দেওয়া কোড অব কন্ডাক্ট। নারী কেন ডিঙিয়ে যাবে পুরুষের এঁকে দেওয়া লক্ষণরেখা? ক্রোধ, ঘৃণা। এইটাই মিসোজিনি।
গরু পেটানোর জন্যে চাষার যেরকম থাকে পাচন (কোথাও কোথাও এটাকে বলে পাজন- পুরো বাঁশ দিয়ে তৈরি এক বা দেড় ইঞ্চি ব্যাসের দেড় হাত লম্বা শক্ত লাঠি), নারীকে দোষারোপ করা বা কলঙ্কিত করা বা সামাজিকভাবে নিচু করা সেটাও হচ্ছে এইরকম একটা হাতিয়ার, যেটা দিয়ে পুরুষ শায়েস্তা করে নারীকে। এই যে এখন ওরা মুনিয়া মেয়েটাকে নিয়ে নানারকম আজেবাজে ফিচার করছে নানা অনলাইন পোর্টালে কাগজে, এইগুলি হচ্ছে সেই চিরাচরিত নারী বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। এইটা সবসময় হয়ে এসেছে- শুধু মুনিয়া একা নয়, দেশে দেশে যুগে যুগে পৃথিবীর সর্বত্র এটা হয়ে এসেছে।

নারী যখন একজন পুরুষের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করে, তখন সকল পুরুষ গর্জে উঠে- না, এটা হতেই পারে না, আমার ভাই এরকম করতেই পারে না, দোষ ঐ নারীটারই, হয় তার স্বভাবে দোষ আছে, নাইলে তার পোশাকে দোষ আছে, নাইলে তার আচরণে দোষ আছে। মোট কথা পুরুষের কোন দোষ নাই, দোষ হচ্ছে নারীটিরই সেই ঐ নির্যাতন ডেকে এনেছে, ওর সেটাই প্রাপ্য ছিল। আপনি হয়তো বলবেন যে না, কেন, সে যদি মন্দও হয় তবুও তাকে নির্যাতন করা বা হত্যা করা তো জাস্টিফাই হয়ে যায় না। তখন আসে সেই অনুক্ত কিন্তু ওদের কাছে যেটা আমোঘ, সেই যুক্তি- নারীটি তো দাসী অবস্থা মেনে না নিয়ে সামাজিক বিধিবিধান ভঙ্গ করেছে।

(৩)

শুধু মুনিয়ার ক্ষেত্রে যে এটা হয়েছে বা পুরুষের হাতে নির্যাতনের শিকার নারীদের ক্ষেত্রেই এটা হয়েছে সেরকম তো নয়। নারীকে দোষারোপ করে তাকে গালাগালি করা এটা তো একটা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। আপনি কি দেখেননি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা খবরের কাগজের অনলাইন সংস্করণে খবরের নিচে নারী বিদ্বেষের নানাপ্রকার বহিঃপ্রকাশ?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইত্যাদিতে নারী বিদ্বেষমূলক গালাগালিগুলির একটা সাধারণ প্রবণতা লক্ষ্য করবেন, আমাদের দেশের বেশিরভাগ পুরুষই নারীর সম্মতি ব্যাপারটার কোন গুরুত্বই দেয় না। নারীর সম্মতি বা নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা এটা আবার কী জিনিস? বস্ত্র বা পোশাক নিয়ে বাঙালি পুরুষের মন্তব্যগুলি লক্ষ্য করেছেন? পোশাক ছোট হলে বা নারীর শরীরের কোন অংশ দৃশ্যমান হলে নাকি পুরুষ উত্তেজত হবে। তো ভাই, পুরুষ উত্তেজিত হলে হবে, তাতে মেয়েটার কী দোষ? না, উত্তেজিত হয়ে পুরুষটি নারীটিকে খেয়ে ফেলতে পারে। উদাহরণ দিবে ঢাকনাবিহীন খাবার ও মাছি ইত্যাদি।

ও ভাই, নারী তো খাবার না, আর পোশাকের সংক্ষিপ্ততা সেটা সম্মতি না। এইটা আপনি মেরে কেটেও বুঝাতে পারবেন না। ওরা আপনাকে বলবে, ওড়না ছাড়া ওর পিতা মেয়েটাকে রাস্তায় বের করে দিয়েছে কেন? বা ছোট পোশাকে নারীটির স্বামী নারীটিকে ওখানে যেতে দিয়েছে কেন? ইত্যাদি। অর্থাৎ নারীর ইচ্ছা নারীর সম্মতি এইসবের যেন অস্তিত্বই নাই। আর ধর্মগুলিও যুগে যুগে এই পিতৃতান্ত্রিক ধারণাকেই বৈধতা দিয়েছে। দেখবেন যে বড় ধর্মগুলির কয়েকটাতে নারী-পুরুষের বিবাহ-বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্কের জন্যে শাস্তির বিধানটি বড় স্পষ্ট বটে, কিন্তু ধর্ষণের জন্যে শাস্তির বিধান খুব স্পষ্ট নয়। কারণটা ঐখানে, নারীর সম্মতিকে গুরুত্ব না দেওয়া।

(৪)

পরে যখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এসেছে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তো নারী পণ্য ছাড়া আর কিছুই নয়। সুতরাং পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতেও নারীর অবস্থান যে খুব একটা মৌলিক পরিবর্তন হবে সেটা ভাবারও তো কোন কারণ নাই। কমিউনিস্টরা যখন দুনিয়াব্যাপী বিপ্লব করবে বলে নেমেছে, তার আগে পর্যন্ত তো নারীদেরকে একরকম আনুষ্ঠানিকভাবেই বা আইনগতভাবেই পুরুষের তুলনায় অধম বিবেচনা করা হতো। পুঁজিবাদী ব্যাবস্থার অধীনেও নারীদের যাই সামান্যটুকু আইনগত বা রাজনৈতিক অধিকার অর্জিত হয়েছে, ভোটাধিকার ইত্যাদি, সেটাও দেখবেন মূলত ২০১৭ সনে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরই হয়েছে এবং নারীদের আন্দোলনগুলিও সেইভাবেই বেগবান হয়েছে।

পিতৃতন্ত্র বা প্যাট্রিয়ার্কি যতদিন না ভাঙতে পারবেন, নারী বিদ্বেষ বা মিসোজিনি ব্যাপারটা সমাজে থেকে যাবে। পিতৃতন্ত্র ভাঙবেন কীভাবে? খোঁজ নিন পিতৃতন্ত্রের উদ্ভব কবে হয়েছে, কীভাবে হয়েছে, কীভাবে সেটা এইরকম জাঁকিয়ে বসেছে ইত্যাদি। ঐটা জানলেই দেখবেন যে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎপত্তির সাথে পিতৃতন্ত্রের সম্পর্ক। উপাদন যন্ত্রের মালিকানার সাথে পিতৃতন্ত্রের সম্পর্ক। সেইখানে যদি আঘাত করতে না পারেন, তাহলে তো পিতৃতন্ত্র থেকেই যাবে অটুট। আর পিতৃতন্ত্র থাকলে মিসোজিনিও থাকবে। আর এই যে সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ মেয়েটাকে নিয়ে এরা এইসব করছে, এইগুলি তো নিতান্তই মিসোজিনি বা নারী বিদ্বেষ।

না, তার মানে এই না যে যততদিন বিপ্লব না হবে ততদিন পর্যন্ত আপনি অত্যাচার নির্যাতনের বিচার চাইবেন না। প্রচলিত যে সব আইন আছে সেগুলির অধীনেও সীমিত হলেও বিচারের সুযোগ আছে। সেইটাও আপনি এমনি এমনি পাবেন না। আপনার স্মৃতি ঘেঁটে দেখুন, যে হত্যাকাণ্ডটি হয়ে আন্দোলন হয় নাই, সেইসব ক্ষেত্রে অপরাধীরা তাইরে নাইরে করে পার পেয়ে যায়। এই মুনিয়ার ক্ষেত্রেও বিচারের দাবিটা যদি তীব্র না হয় তাইলে ঘাতকেরা যে পার পেয়ে যাবে সেটা তো আমরা বুঝতেই পারছি।

(৫)

এইখানে আরেকটা ব্যাপার বলার দরকার- বসুন্ধরার এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে মুনিয়াকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার যে অভিযোগ, এটা আসলে একটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়। এটি একটি ফেমিসাইড বা নারীহত্যা। এমনিই হত্যাকাণ্ড আর ফেমিসাইডের বা নারীহত্যার মধ্যে পার্থক্য কী? ফেমিসাইড হচ্ছে সেইসব হত্যাকাণ্ড, যেখানে একটি নারীকে কেবল নারী হওয়ার কারণেই হত্যা করা হয়। বিশেষ করে সেইসব হত্যাকাণ্ড যেখানে ইন্টিমেট পার্টনার বা স্বামী বা প্রেমিকের হাতে নারীটি খুন হয় বা পুরুষটি নারীটিকে নিজের আধিপত্য ঊর্ধ্বে তুলে রাখার জন্যে হত্যা করে।
ফেমিসাইড ব্যাপারটা আমাদের আইন ব্যবস্থায় সেইভাবে স্বীকৃত না- পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই (সম্ভবত কোন দেশেই) এটা পুরোপুরি আইনের বিধানাবলির অন্তর্ভুক্ত না। কিন্তু বিষয়টা আলোচনায় আছে, আন্দোলনে আছে।

লেখক পরিচিতি: আইনজীবী

শেয়ার করুন:
  • 623
  •  
  •  
  •  
  •  
    623
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.