একজন কালো মেয়ে

তামান্না ইসলাম:

খাওয়ার টেবিলে কাদের সাহেব লক্ষ্য করলেন ফারিয়া আজ বেশ গম্ভীর। অন্যদিনের মতো সবার সাথে গল্প করছে না। ছোট মেয়ে নাদিয়া এমনিতেই বেশ শান্ত। মেজো মেয়ে ফারিয়াই বেশি গল্প করে বাবার সাথে। সারাদিনের অফিসের গল্প না করলে ওর যেন মন ভরে না। মাঝে মাঝেই তার স্ত্রী শাহনাজ এজন্য বাপ বেটিকে বকা দেয়। কিন্তু ফারিয়াকে এতো মন মরা লাগছে কেন? দু একবার জিজ্ঞেস করেও কোন সদুত্তর পেলেন না তিনি। মনটা খচ খচ করছে তার।

খাওয়ার পরে নিজের অফিস রুমে ফারিয়াকে ডাকলেন। বেডরুমে ডাকলে শাহনাজও থাকবে। মেয়ের সাথে তিনি একা আগে কথা বলতে চান। ফারিয়া এসে রুমের অন্য চেয়ারটায় বসলো না অন্যান্য দিনের মতো। দাঁড়িয়ে থাকলো। কাদের সাহেবের সেটা চোখ এড়ালো না। তিনি স্নেহের সুরে বললেন, ‘ বসো মা, অনেকদিন বাপ-বেটি গপ্প করা হয় না। আজ একটু গপ্প করি। ‘
ফারিয়া বসলো না। তার দিকে তাকিয়ে থাকলো, মনে হয় কিছু বলতে চায়।

‘কিছু বলবে মা?’

‘বাবা, তোমরা সবাইকে আমার যে ছবিগুলো দাও, ওগুলো এডিট করা। আমার গায়ের রঙ বোঝা যায় না। এটা আর করো না বাবা।’

কাদের সাহেব যা বোঝার বুঝে নিলেন। ওর বিয়ের একটা প্রস্তাব এসেছিলো অনেকদিন পর। ফারিয়ার ঊনত্রিশ চলছে। মেয়ের বিয়ের চিন্তায় তিনি আর শাহনাজ খুব চিন্তিত। মেয়েটা তার গায়ের রঙ পেয়েছে। বাকি দুই মেয়ে পেয়েছে মায়ের দুধে আলতা গায়ের রঙ। সবাই দেখলেই বলে ফারিয়া হয়েছে একদম দাদির মতো। অবিকল তার মায়ের মুখটা যেন বসানো ফারিয়ার মুখে। সে কারণেই ওর প্রতি কাদের সাহেবের দুর্বলতা বেশি। শুধু তাই না, ছেলে নেই বলে তার যে কোন দুশ্চিন্তা নেই, এর প্রধান কারণ এই ফারিয়া। তার কন্সট্রাকশন ফার্ম এখন ফারিয়াই দেখাশোনা করে অনেকখানি। আজকাল মাঝে সাঝে সে অফিসে না যেয়েও পারে। তার এমন গুণবতী মেয়েটার বিয়ে হচ্ছে না। অথচ রাদিয়াকে ইন্টারমিডিয়েটের পর বাসায় রাখাই কঠিন হয়ে গিয়েছিল। প্রস্তাবের পর প্রস্তাব। ঢাকা শহরে তার এতো বড় ব্যবসা, বাড়ি আর সেই সাথে সুন্দরি মেয়ে, হলোই বা সে ইন্টারমিডিয়েট পাশ।

ফারিয়া শুধু কালো নয়, বেঁটেও। ওর কোন প্রেম হয়নি। কোনদিন ওর কি কাউকে ভালো লাগেনি? হয়তো লেগেছে, বলতে পারে নাই। মেয়েটা সংসারিও। মেয়ের জন্য কাদের সাহেবের মনটা খারাপ হয়ে যায়। প্রবাল নামের যে ছেলেটার প্রস্তাব এসেছে, সে কোনভাবেই তাদের সমকক্ষ নয়। তবে ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। অন্তত শিক্ষায় ফারিয়ার যোগ্য। বাবা কলেজের শিক্ষক, মা স্কুলের। তবে কি ওরা ফারিয়ার সাথে দেখা করেছে? সেরকমই কথা ছিল অবশ্য। ফারিয়া সেটা জানেও। আজ পর্যন্ত মেয়েটা কোন বিয়ের প্রস্তাবে না করে নাই। তাদের সব কথাই শুনেছে।

মেয়ের কথা শুনে কাদের সাহেবের বুকটা মুচড়ে উঠলো। বেশি ঘাঁটাতে সাহস পাচ্ছেন না। কিন্তু জানতে তো হবে ঘটনা।

‘ওরা এসেছিলো?’
‘ হ্যাঁ বাবা, অফিসে এসেছিলো। প্রবাল সাহেব আর তার বন্ধু। এমনভাবে নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করছিলো যে আমি ভীষণ বিব্রত হয়েছি। ওনার মায়ের ফোন এসেছিলো আর উনি মাকে বেশ কটু কথা শুনিয়েছেন। সরাসরি না বললেও আমি বুঝতে পেরেছি আমাকে নিয়েই কথা হচ্ছিলো ওনাদের মাঝে।’

ফারিয়ার চোখটা টলটল করে। কাদের সাহেব এসে মেয়ের মাথায় হাত রাখতেই মেয়ে বলে, ‘থাক না বাবা, অনেক তো হলো, এইবার বাদ দাও না বাবা। তোমরা বরং নাদিয়ার বিয়ে দিয়ে দাও। ওর জন্য শাবাব কতদিন বসে থাকবে বলো!’

কাদের সাহেবের এতো কষ্ট হয়। কী নেই তার এই আদরের মেয়ের? রাজার হালে বড় করেছেন। শিক্ষা, গুণে কোন কিছুতেই কমতি নেই। ওর খুব বিদেশে থাকার শখ। মেয়ের এই শখটা তিনি পূরণ করতে পারছেন না। আশা করেছিলেন ইঞ্জিনিয়ার জামাই হলে মেয়েকে নিয়ে বিদেশে চলে যেতে পারবে সহজে। অসহায় বাবা মেয়েকে কিছুই বলতে পারলেন না।

দুদিন পর অফিসের ঠিকানায় একটা চিঠি এলো। ব্যক্তিগত চিঠি। তাকে ব্যক্তিগত চিঠি লেখার কেউ নেই। তিনি বেশ অবাক হলেন। মেয়েলি হাতের লেখা দেখে আরও অবাক হলেন।

লেখক: তামান্না ইসলাম

“কাদের সাহেব,
আপনি নিশ্চয়ই আমার এই চিঠি পেয়ে বেশ অবাক হয়েছেন। আমি শাম্মি। নাম শুনে চিনতে পারবেন আশা করছি না। আমি কিন্তু আপনার নাম শুনে ঠিকই চিনতে পেরেছি আপনাকে। আপনার মনে আছে অনেক বছর আগে কুমিল্লার শহরতলীতে আপনাদের পাশে নতুন প্রতিবেশী এসেছিলো? তাদের সাথে আপনার খুব একটা বেশি আসা যাওয়া হয়নি, কারণ আপনি তখন ভার্সিটিতে হলে থাকতেন। আপনার মা আমাকে বেশ আদর করতেন আর আমার মায়ের সাথে গড়ে উঠেছিলো ওনার ভীষণ সখ্যতা। আর আমি আপনাকে তেমন একটা না দেখেই আপনার গুণপনা শুনতে শুনতেই এক ধরনের ভালো লাগায় আবিষ্ট হয়েছিলাম। তারপর একদিন আপনার মা-ই আপনার সাথে আমার বিয়ের কথাটা উঠিয়েছিলেন। আমি কালো, কুৎসিত। তাই এতো বড় আশা আমরা করিনি। কিন্তু স্বপ্নটা দেখিয়েছিলো আপনার মা। ছেলের উপরে তাঁর অগাধ বিশ্বাস। ছেলে গুণের কদর করবে। আপনার মা সেদিন আপনাকে চিনে নাই। আপনি সেদিন একদম বেঁকে বসেছিলেন। আপনার ফর্সা মেয়ে লাগবে। এতো যোগ্য পাত্র আপনি। কেন আপনি অসুন্দর কোন মেয়েকে বিয়ে করবেন? কালো মেয়ে তো অসুন্দরই। সেদিনের সেই অপমানে আমি আর আমার বিধবা মা একজন আরেকজনের কাছে কুঁকড়ে গিয়েছিলাম। তাঁর চেয়েও বেশি কুঁকড়ে গিয়েছিলেন আপনার মা।

আপনার মেয়ের বায়োডাটা পেয়ে সব মনে পড়ে গেলো। কতো আগের কথা। ছেলেকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পাঠিয়েছিলাম এই আশায় যে তাকে আমি মানুষ করতে পেরেছি, আপনার সামনে মাথা উঁচু করে দেখাবো যে আমি একজন মানুষ তৈরি করতে পেরেছি। কিন্তু দেখা গেলো আমার ছেলে প্রবালও আপনার মতোই হয়েছে। সে অবশ্য এই ঘটনা কিছুই জানতো না। আজ আমি আপনার মায়ের কষ্টটা কিছুটা বুঝতে পারছি। একজন কালো মেয়েই পারে আরেকজন কালো মেয়ের কষ্ট বুঝতে। আমার ছেলের হয়ে ফারিয়ার কাছে আমি করজোড়ে ক্ষমা চাইছি। ওর জন্য দোয়া করি, ও যেন এমন মানুষের সন্ধান পায় যে ওর অন্তরের সৌন্দর্যের সন্ধান পায়।
‘একজন কালো মেয়ে’

শাম্মি ”

কাদের সাহেবের চোখটা ঝাপসা হয়ে যায়। অন্তত তিরিশটা মেয়ে দেখার পর তিনি শাহনাজকে বিয়ে করেছিলেন, দুধে আলতায় রঙ। লম্বায় পাঁচ ফিট চার। মাকে তিনি একটা যুক্তিই দিতেন, তিনি নিজে কালো, বউ ফর্সা না হলে ছেলেমেয়েরাও কালো হবে। তাঁর কালো মা এই যুক্তিতে পেরে উঠতেন না, গায়ের রঙ নিয়ে জীবনে কম কষ্ট সহ্য করেননি তিনিও।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.