মহারাজ তোমরা সাধু আছো রোজ, মুনিয়ারা ‘রক্ষিতা’ বটে!

কাবেরী গায়েন:

এক.

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শীর্ষ শিক্ষাঙ্গনসন্ত্রাসী, খুনি গোলাম ফারুক অভিকে নিয়ে হলের মেয়েদের ভেতর বেশ উত্তেজনা টের পেতাম। তখন বলা হতো অভি ক্যাম্পাসসন্ত্রাসকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। সন্ধ্যায় হলে ঢোকার পরে ক্যান্টিনে কিংবা টিভি রুমে কিংবা রুমে ঢুকেও অভিকে নিয়ে গল্প শেষ হতো না। ছাত্রদলের অভি পরে ছাত্রলীগে যোগদান করে জগন্নাথ হলে থাকতেন, এবং সেই সুবাদে শামসুন নাহার হলের মেয়েদের তাকে মাঝেমধ্যে দেখা হবার সুযোগ হতো। গল্প হতো অভিকে কোথায় কোন ভঙ্গিমায় দেখা গেছে, কোন দোকানদারকে কী বলে গালি দিয়েছেন, কোন রঙের জামা পরেছেন, কোন টেবিলের উপর অস্ত্র রেখেছেন, কোন এনকাউন্টারের সময়ে কোন মেয়েকে সামনে রেখে গুলি চালিয়েছেন, অথচ ওইসব মেয়েদের কিছু হয়নি ইত্যাদি।

সেইসব গল্পে অভি একজন সুদর্শন মেধাবী অতিনায়ক। আমার যে বন্ধুরা সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের হয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ‘অভিশালা নিরুশালা, রওশন মাগীর জাউরা পোলা’ বলে শ্লোগান ধরতো হলের ভেতর এবং আমি এই বিষয়ে আপত্তি করলে আমাকে ‘নান্দনিক সাহিত্য সম্পাদক’ বলে ব্যঙ্গ করতো, তাদেরকেই কয়েকদিন পরে দেখলাম অভি এবং তার দলবলকে সেবা করতে ব্যস্ত জগন্নাথ হলে গিয়ে। অভির সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে তাদের কারও কারও প্রেমও হয়ে গেল, বিশেষ করে যে সবচেয়ে জোরে রওশন এরশাদের অবৈধ ছেলে হিসেবে গালি দিত অভিকে, একদিন শুনলাম তার উইকেট পতন হয়ে গেছে অভির সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের সাথে। হৃদয়ের ব্যাপার নিয়ে টিপ্পনী কাটতে পারিনি লজ্জায়। আমরা ভিন্ন সংগঠনের হলেও সম্পর্ক চমৎকার ছিলো, এখনও আছে। আমাদের বিভাগের এক/দুই ব্যাচ জুনিয়র জয়দীপ তো একদিন আমাকে হলের সামনে চেপে ধরলো, ‘অভি নয়, অভি ভাই বলুন দিদি।’ আহা, জয়দীপ! প্রাণ দিয়ে ছাত্রলীগ করতো। অন্তর্দলীয় কোন্দলে ছেলেটাকে মেরে ফেলা হয়েছে। সেইসব দিন পেরিয়ে পাশ করার পর পরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলাম। ওখানে আমাদের রবীন্দ্র গ্রুপের বিখ্যাত প্রফেসরদের কাছেও অভির গল্প শুনতে পেতাম। ইতিমধ্যে অভি সম্ভবত জাতীয় পার্টির টিকেটে বরিশাল-২ আসনে সাংসদ হয়েছেন ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। কীসের ডাঃ মিলন হত্যা মামলা! সংসদের সর্বকনিষ্ঠ সাংসদ তিনি। অভির এলাকার দু’জন বিখ্যাত প্রফেসর জানালেন তারা খুব খুশি এই বিজয়ে। অভির ক্যারিশমা, তার পরিবার, বিশেষ করে অভির শিক্ষক বাবার অবদান, ইত্যাকার নানা কারণে তাঁরা অভির বিজয়ে দারুণ খুশি।

এরই মধ্যে পড়াশুনার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ায় অভির পরবর্তী বিজয়যাত্রা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল থাকা সম্ভব না হলেও ২০০২ সালের অক্টোবরে ফিল্ডওয়ার্কের জন্য দেশে আসার কিছুদিনের মধ্যেই শুনলাম এক মডেলকে খুন করেছেন অভি। ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর রাতে। ঢাকার কেরানীগঞ্জের ১ নম্বর চীন মৈত্রী সেতুর ১১ নম্বর পিলারের পাশে তিন্নির মরদেহ পাওয়া গেছে। তখনও ফেসবুকের আত্মবিকাশ ঘটেনি, মূলধারার পত্রিকায় পড়েই জানলাম তিন্নিকে তার বাবার সামনেই জামা ছিঁড়ে বেধড়ক মারপিট করেছেন, ‘বেশ্যা, মাগী’ বলে খিস্তি করেছেন। এসব প্রতিবেদনের পরেও দেশের মানুষকে দুভাগে বিভক্ত হয়ে যেতে দেখেছি তখন – অভি দোষী না নির্দোষ সেই আলোচনায়। কিন্ত জাতি প্রায় অবিভক্ত তিন্নির নষ্ট চরিত্র এবং তিন্নির পরিবারের লোভের বিষয়ে। ধরাধাম থেকে বিদায় নেবার পরেও তিন্নি ‘বেশ্যা, মাগী, লোভী, নষ্টা’ এসব গালিতেই তলিয়ে গেলেন। অন্যদিকে অভি কখনও সিঙ্গাপুর, কখনওবা কানাডা থেকে ফোন করেছেন কোন পত্রিকায় বা কোন সাংবাদিককে, কিংবা দেশে ফেরার জন্য মরীয়া অভি রাজনৈতিক লেনদেন চালাচ্ছেন- এসব খবরের শিরোনাম হয়ে দিব্যি মহারাজ হয়েই টিকে আছেন। নানান নারীর সাথে তার সম্পর্ক, ডা. মিলন হত্যা, অস্ত্র মামলার আসামী হওয়া- সবই তার ‘শৌর্যবীর্যবান’ জীবনের এক একটা অলংকার হয়ে আজও ঝংকৃত হয়ে চলেছে। কেউ তার টিকি বা টাক অবধি পৌঁছাতে পারেনি। তিন্নি হত্যা মামলা মর্গে চলে গেছে।

দুই.

২০১৭ সালের ২৮ মার্চ। তিন্নি হ্ত্যাকাণ্ডের ১৫ বছর পরে ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ বনানীর ‘দ্য রেইন ট্রি’ হোটেলে ধর্ষণ করা হলো দুই তরুণীকে। দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বন্ধুদের আমন্ত্রণে জন্মদিনের পার্টিতে গিয়ে পরিবেশ পছন্দ না হলে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের ফিরতে বাধা দিয়ে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। ওই ঘটনার ৪০ দিন পরে আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন এক তরুণী। ২০০২ সালে তিন্নি হত্যাকাণ্ডের সময়ের সাপেক্ষে দেশে একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটে গেছে ততদিনে। সামাজিক মাধ্যম এবং অনলাইন পোর্টাল নামের নয়া মিডিয়ার আবির্ভাব হয়েছে, যেখানে নারী বিষয়ের যে কোন সংবাদের নিচে যে কোন কুৎসিত খিস্তি-খেউড় করা পুরুষ এবং পুরুষতন্ত্রের অনুগামী নারীর পবিত্র দায়িত্ব। নারী বিষয়ে যেকোনো অশ্লীল মন্তব্য করার, খবর রটানোর প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে এই দুই মাধ্যম। তাই আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করার পরেই সামাজিক মাধ্যম এবং কিছু অনলাইন পোর্টালে শুরু হয় এই দুই তরুণীর চরিত্র সার্টিফিকেট দেবার পালা। রাতে গেছে, কত রাতে, কী পোষাকে ছিল ইত্যাদি হয়ে এসব মেয়ে নষ্ট মেয়ে, মাগী, বেশ্যা, এবং বেশ্যাগিরি করেও এরা আবার নালিশ করে, কতবড় আস্পর্ধা! রাষ্ট্রপক্ষ মামলা করেছিল এই পাঁচজনের বিরুদ্ধে। চার্জশিট দেয়া হয়েছিল। আপন জুয়েলার্সের মালিকের টাকা থাকলেও মিডিয়া হাতে ছিলো না, ফলে সাফাত আহমেদকে বছর দেড়েকের মতো কারাগারে থাকতে হয়েছে। এবং ২০১৯ সালের ৯ই নভেম্বর হাইকোর্ট তাকে দেশত্যাগের উপরে যে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিলো সেটা তুলে নেন। ফলে সাফাকাত এখন আরেকজন সফল প্রবাসী। মেয়ে দু’টোর কী হয়েছে? তারা এই বিচার ব্যবস্থায় বেঁচে আছেন। তাদের কলঙ্কের এবং শাস্তির উদাহরণ দেখিয়ে মেয়েদের ঘরে আটকে রাখার শক্তি জোরদার হয়েছে মাত্র।

তিন.

আসি সাম্প্রতিকতম ঘটনায়। মোসারাত জাহান মুনিয়া হত্যাকাণ্ডে। এই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃতদেহ উদ্ধার করলেন তার বড়বোন গুলশানের এক বাড়ি থেকে গত ২৬শে এপ্রিল। আত্মহত্যা বলেই চালিয়ে দেয়া যেত যদি না মুনিয়া এবং বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের মধ্যে মোবাইলে কথোপকথনের এক অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়তো, এবং মুনিয়া ইতিমধ্যে তার বোনকে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে মর্মে খবর জানিয়ে দ্রুত তাকে ঢাকায় আসতে বলতো। মুনিয়ার বড়বোন আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেছেন। আমার মনে হয় এটি একটা ভুল পদক্ষেপ। হওয়া উচিত ছিল হত্যা মামলা।

এই ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড় চলছে। আমরা মুনিয়ার চেহারা তো বটেই, জেনে ফেলেছি সে কী করতো, কোথায় থাকতো, বাড়ি কোথায়, দেখতে কেমন, কী রঙের জামা পরে ছিল, বাবার নাম কী- একেবারে সব। জেনে ফেলেছি তার চরিত্র খারাপ, জেনেছি সে একজন ‘মাগীর বাচ্চা মাগী’, ‘খানকির বাচ্চা খানকি’, ‘চোর’, ‘রক্ষিতা’, ‘গোল্ড ডিগার’, ‘লোভী’, ‘পরিবার লোভী’, ‘মাগীগিরি’ করা নষ্ট চরিত্র- অর্থাৎ যা যা জানা সম্ভব। এইসব আলোচনা এবং দোষারোপে অবাক হইনি। এমনই হবার কথা। দেখে ফেলেছি সায়েম সোবহান আনভীরের সাথে তার ছবিতে আনভীর সাহেবের ঝাপ্সা করে দেয়া মুখ, পাশে মুনিয়ার জ্বলজ্বলে সদ্য কৈশোরোর্ত্তীণ মুখ। অনেকেই অবাক হয়েছেন, আমি হইনি। এমনকি মূলধারার গণমাধ্যমের অন্তত নব্বই শতাংশ অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম ছাপেনি অন্তত দুইদিন। তার পরিচয় দেয়া হয়েছে “দেশের একটি নামকরা শিল্পগ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তা”, কিংবা খুব বেশি হলে “দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপের এমডি”। আনভীর নামটি উচ্চারণ করা হয়নি। শোনা যাচ্ছে জনাব আনভী ইতিমধ্যে দেশত্যাগ করেছেন, এবং তার দেশত্যাগের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করার আগেই। আবার শোনা যাচ্ছে তার স্ত্রী এবং সন্তানরা বিদেশে চলে গেছেন।

নাগরিক টেলিভিশন একমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল যেটি শুরু থেকেই ফলাও করে আনভীর নাম, পরিচয় বিস্তারিত জানিয়েছে। নাগরিককে ধন্যবাদ জানানোই যেত, কিন্তু ধারণা করি একটু খোঁজ-খবর করলেই জানা যাবে বসুন্ধরা গ্রুপের সাথে ব্যবসায়িক কোন সমস্যা থেকেই নাগরিকের এই অবস্থান। কেন বলছি? মুনিয়ার প্রতি দরদ থেকে যে এই রিপোর্ট নয়, সেটি বোঝা যায় তাদের প্রথম দিনের বিশেষ প্রতিবেদনের ভাষা থেকে:

“বাংলাদেশের বৃহত্তম শিল্পগ্রুপ বসুন্ধরার মালিক শাহ আলমের ছেলে ও বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ সায়েম সোবহান আনভীরের বান্ধবী বা রক্ষিতা হিসেবে পরিচিত মোসারাত জাহান মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে”। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, একটি মূলধারার গণমাধ্যমে একজন সদ্যমৃত কোন মেয়ের পরিচয় দেয়া হচ্ছে কারও ‘রক্ষিতা’ হিসেবে। আর মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমে, গজিয়ে ওঠা অনলাইন পোর্টালগুলোতে এই পরিচয়ই ছড়িয়ে পড়েছে।

ভাষার রাজনীতিটা একটু বুঝি তাহলে। আনভীরের পরিচয় নির্মাণ করা হলো দেশের সবচেয়ে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের এমডি হিসেবে, আর মুনিয়ার পরিচয় নির্মাণ করা হলো সেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ‘রক্ষিতা’ হিসেবে। কোন কোন গণমাধ্যম সংবাদ শিরোনাম করলো, লাখ টাকার বাড়িতে কলেজছাত্রীর মৃতদেহ উদ্ধার।
অতএব যাদের ক্ষমতা আছে, টাকা আছে তারা ধর্ষণ, খুন, বা আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়া যাই-ই করুন না কেনো, তাদের চরিত্রে কোন কালি লাগে না বা তাদের চরিত্র বর্ণনার কোন শব্দ নেই বাংলা ভাষায়। আইন তাদের ছুঁতে পারে না। গণমাধ্যমে তাদের নামও উচ্চারণ করা যায় না। বিশেষ করে জনাব আনভীরের নাম না নিয়ে সংবাদ করার যে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটালো এবার গণমাধ্যমগুলো, এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের বর্তমান পলিটিক্যাল ইকনমির পাঠের মূর্তমান উদাহরণ হয়ে রইলো। তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো, এদেশের মানুষ নিহত তিন্নি কিংবা মুনিয়াদের গালি দিয়েই তৃপ্ত রইলো। গত ১৯ বছরে নির্যাতনের বহরের সাথে গালির বহরও বেড়েছে পরিমাণে, পার্থক্য এইটুকুই।

চার.

‘রক্ষিতা’ শব্দটি বিলোপের ডাক দিয়ে যাই

যাকে ভরণ-পোষণ-নিরাপত্তা দিয়ে রক্ষা করা হয় সেই-ই রক্ষিত বা রক্ষিতা হবার কথা। যেমন আমাদের সবার রাষ্ট্র দ্বারা রক্ষিত হবার কথা কিংবা যে যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, সেই সেই প্রতিষ্ঠানের দ্বারা। কিন্তু বাংলা ভাষায় রক্ষিত শব্দটি পুরুষদের জন্য ব্যবহৃত হয় না এবং রক্ষিত শব্দের নারীবাচক প্রতিশব্দ ‘রক্ষিতা’ নারীর জন্য এক নিহিতার্থে ব্যবহৃত হয়। নির্মিত অর্থ হলো, বিয়ে বহির্ভূত যৌনসম্পর্কে নিয়োজিত হবার বিনিময়ে কোন ব্যক্তির দ্বারা অর্থনৈতিক ও নানাভাবে ‘রক্ষিত’ হন যে নারী, তিনি ‘রক্ষিতা’। এই অর্থ পুরুষতন্ত্র নির্মাণ করেছে। যেমন বীর শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ বীরাঙ্গনা বাংলাদেশের জন্য যে অর্থ নির্মাণ করেছে, তাহলো মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত, ধর্ষিত, পতিত নারী।

ব্যাকরণ যে শব্দের অর্থ প্রদান করে, মানুষের ব্যবহারে সেই অর্থের পরিবর্তন হয়, অনেক শব্দ বাদ পড়ে। এতোকাল চলে আসা ‘রক্ষিতা’ শব্দটি যে অর্থে ব্যবহার করা হয়ে আসছে, সেই শব্দটিই ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি। মুনিয়া যদি ‘রক্ষিতা’ হয়, তবে এই গ্রুপের নানা মিডিয়ায় চাকরি করে যে বড় বড় সাংবাদিকরা জনাব আনভীরের শরীরে শুধু হৃদয় বা কলিজা দেখেছেন, নিশ্চিতভাবে জেনেও তার সব কর্মকাণ্ড, তারাও তো মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে রক্ষিত বা প্রতিপালিত।

একইভাবে, এই যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমডি সাহেবের নামটি উচ্চারণ করা হলো না, সেও তো মোটা বিজ্ঞাপন যার উপরে হাউসের কর্মীদের বেতন এবং জৌলুস নির্ভর করে, সেই বিজ্ঞাপনে রক্ষিত হবার কারণেই। এভাবে এই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষিত হয়ে আছে বিজ্ঞাপনদাতাদের বদান্যতায়। সরকারি বিজ্ঞাপনের টাকা পেয়ে কিংবা না পেয়ে সরকারের সমালোচনা করলেও করতে পারে গণমাধ্যমগুলো, কিন্তু ব্যবসাকংগ্লোমারেটগুলোকে নয়। তাহলে কী দাঁড়ালো? যে যেখানে চাকরি করি, যে রাষ্ট্রে বসবাস করি, যেসব সম্পর্কে থাকি, সবক্ষেত্রেই আমরা রক্ষিত থাকতে চাই। তবে কেন ‘রক্ষিতা’ শব্দের এই বিশেষ ব্যবহার?

এমডি আনভীর, এমপি অভি, স্বর্ণ ব্যবসায়ীর পুত্র সাফাতের মতো ব্যক্তিরা টাকা আর ক্ষমতায় নিজেরা রক্ষিত হয়ে নারীকে ধর্ষণ করে, খুন করে, আত্মহত্যার প্ররোচনা দিয়ে তাদেরকেই ‘রক্ষিতা’ বলে নিজেরা থাকতে পারেন সাফসুতরো দেশি বা প্রবাসী মহারাজ হয়ে, আমার ভাষার পুরুষতান্ত্রিক হেজিমনিও তাদের এই সুযোগ দিয়েছে। কারও নামের সাথে রক্ষিতা, পতিতা, মাগী, বেশ্যা শব্দগুলো জুড়ে দিতে পারলেই তাদের খুন করা পর্যন্ত সমাজসিদ্ধ হয়ে যায়। আইনি সুরক্ষা সহজ হয়ে যায়।

আমার অভিধান থেকে ‘রক্ষিতা’ শব্দটি মুছে দিলাম আজ, ব্যবহার করিনি যদিও কোনদিন। মেয়েটি ‘মাগীগিরি’ করেছে বলে খুন হয়নি, কেউ তাকে খুন করেছে বা আত্মহত্যা করার পর্যায়ে নিয়ে গেছে বলেই সে মারা গেছে। এই ধরনের আত্মহত্যার প্রত্যেকটিই আসলে খুন। এক তরুণ প্রাণের এই অপচয় এবং খুনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের দৃশ্যমান বিচার চাই। গণমাধ্যমের নজরদারি চাই সেই বিচার নিশ্চিত করার জন্য। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে নারীর প্রতি অবমাননামূলক শব্দ, বাক্য ব্যবহার বন্ধের জন্য দেশজুড়ে এসব মাধ্যম ব্যবহারের জেন্ডারবান্ধব লিটারেসি প্রোগ্রাম দাবি করছি সরকার, এনজিও, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং অবশ্যই সচেতন সকলের কাছে।

আসুন, যে যেভাবে পারি, লড়ে যাই আমাদের অংশটুকু।

লেখক: চেয়ারপার্সন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
  • 10K
  •  
  •  
  •  
  •  
    10K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.