প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা: চাই সচেতনতা

Adolocent pixসুচিত্রা সরকার: প্রজননতন্ত্রের সুরক্ষা মানুষের জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আমাদের দেশে প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষেরই সচেতনতার অভাব রয়েছে। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করার জন্য সরকারি পর্যায়ে খুব একটা উদ্যোগ নেই। প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন

আসমা আক্তারের বয়স ১৩ বছর। পড়ালেখায় সে মোটামুটি ভালই ছিল। গত জানুয়ারিতে সপ্তম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছিল। কিন্ত হঠাৎ বাবা আসমার বিয়ে দিলেন ত্রিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তির সঙ্গে। এখন স্বামী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কামরাঙ্গীর চরের বস্তিতে থাকে আসমা। বিয়ের কিছুদিন যেতে না-যেতেই তার শরীর খারাপ হতে শুরু করল। কিন্তু সে লজ্জায় সেই কথা কাউকে বলেনি। কিছুদিন আগে চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানালেন, আসমা পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আসমা বলল, ‘কিছুই বুঝি নাই। তয় এহন আমার শ্বশুর-শাশুড়ি খুব খুশি।’ জিজ্ঞেস করলাম, তোমার স্বামী বা তুমি জন্মনিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নাওনি? ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সে। তারপর বলে, ‘আমি ওই সব কিছু বুঝি না। স্বামী যেমনে চাইছে, তেমনেই হইছে।’ খাওয়াদাওয়া কী করছ, জিজ্ঞেস করতেই বলে, ‘কী খামু, সবাই যা খায়, তা-ই খাই।’

আমাদের দেশে আসমার মতো এ রকম বহু মেয়ের বাল্যবিবাহ হচ্ছে এবং তারা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের শিকার হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। প্রজননস্বাস্থ্য বলতে সেই স্বাস্থ্যকে বোঝায়, যার মাধ্যমে মানুষ সুস্থ ও নিরাপদভাবে শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, সুস্থভাবে সন্তান জন্ম দিতে পারে এবং তা কখন ও কীভাবে করবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অর্জন করে। এ অধিকার বলতে শুধু নারীর নয়, বরং নারী ও পুরুষ উভয়েরই শরীর ও মন নিয়ন্ত্রণের অধিকারকে বোঝায়। কিন্তু আমাদের দেশে অবস্থাটা এ রকম যে, ‘প্রজননস্বাস্থ্য’ বিষয়টি লজ্জার। এ নিয়ে তাই কেউ মুখ খোলে না। প্রজননস্বাস্থ্যের যাতে সঠিক পরিচর্যা হয়, সে জন্য সবাইকে এ সম্পর্কে জানতে হবে।

প্রজননস্বাস্থ্য পরিচর্যার উপাদানগুলো হচ্ছে:

নিরাপদ মাতৃত্ব—গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসবোত্তর সেবা এবং নিরাপদ প্রসবসেবাসহ জরুরি প্রসূতিসেবা কার্যক্রম।

পরিবার পরিকল্পনা—নিরাপদ পরিবার পরিকল্পনার পদ্ধতি সেবা ও কাউন্সেলিং সেবা।

মা ও শিশুর পুষ্টি।

অনিরাপদ গর্ভপাত প্রতিরোধ।

কিশোর-কিশোরীদের প্রজননস্বাস্থ্যের পরিচর্যা, অর্থাৎ প্রজননতন্ত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।

বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসাসেবা।

মেনোপজ সেবা।

প্রজননতন্ত্রের ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসাসেবা।

প্রজননস্বাস্থ্যের পরিচর্যার অভাবে ফিস্টুলা, জরায়ুমুখের ক্যানসার, ডিম্বাশয়ের ক্যানসার, সংক্রমণ, বিশেষ করে যৌনবাহিত রোগ ইত্যাদি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বয়ঃসন্ধিকাল থেকে শুরু হয়ে প্রজননস্বাস্থ্যের পরিচর্যা বিভিন্ন ধাপে চালাতে হবে। নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজ হওয়া পর্যন্ত আর পুরুষের ক্ষেত্রে প্রজননে শারীরিক সক্ষমতা পর্যন্ত এর সময়কাল।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ১৫-২৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠী হচ্ছে বৃহত্তম প্রজননক্ষম অংশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে এ অংশের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। এ বয়সী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন কারণে প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যা হয়।

প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে নারীরা অনেক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। কারণ, সন্তান জন্মদানের প্রক্রিয়ার সঙ্গে নারী ওতপ্রোতভাবে দীর্ঘ সময় ধরে জড়িত থাকেন। নারীর গর্ভে ভ্রূণ থেকে একটি শিশু বেড়ে ওঠে এবং জননপথ দিয়ে বেরিয়ে এসে পৃথিবীর আলো দেখে। জন্মের পর মায়ের বুকের দুধ খেয়েই তাকে জীবনধারণ করতে হয়। তাই নারীর প্রজননস্বাস্থ্য পরিচর্যার ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

বাংলাদেশ প্রজননস্বাস্থ্য জরিপে দেখা যায়, এ দেশে ৮০ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছর বা তারও কম বয়সে। এর মধ্যে ২৩ শতাংশ নারী ২০ বছর বয়সের আগেই গর্ভধারণ করেন। বিয়ে ও গর্ভধারণ—বড় দুটি বিষয় এই বয়সসীমার মধ্যে বেশি ঘটলেও এ বয়সের নারী ও পুরুষ প্রজননস্বাস্থ্যের বিষয়ে সঠিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

জরিপে দেখা গেছে, শিশু জন্ম দেওয়ার সময় প্রতি লাখে ৩২০ জন মায়ের মৃত্যু হয়। এদের বেশির ভাগেরই বয়স ১২ থেকে ১৯-এর মধ্যে। আর এই মৃত্যুর মূল কারণ প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা। বাংলাদেশের মাত্র ১৩ শতাংশ নারী প্রসবকালে দক্ষ ধাত্রীর সেবা পান। প্রাক-প্রসবকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য গর্ভবতী নারীকে এখনো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হাসপাতালে নেওয়া হয় না। গর্ভবতী নারীদের ১৪ শতাংশ গর্ভাবস্থায় স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন, যা তাঁদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে প্রতিবছর ১২ থেকে ১৫ হাজার প্রসূতির মৃত্যু হচ্ছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে শৈশব থেকে নারী স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। ছেলেশিশুর তুলনায় মেয়েশিশু এখনো ১৫-২০ শতাংশ কম পুষ্টি পায়। জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্য জটিলতায় আক্রান্ত মোট নারীর মাত্র ৫ শতাংশ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পান।

ইউএনএফপিএর ২০০৫ সালের এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৫০ শতাংশ নারী প্রজননতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যায় ভোগেন। ৭০ শতাংশ নারী অপুষ্টিতে ভোগেন। গর্ভবতী মায়েদের ৭৪ শতাংশ রক্তশূন্যতা, ৪৭ শতাংশের আয়োডিন ঘাটতি ও ৬০ শতাংশের ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি রয়েছে। গর্ভাবস্থায় সঠিক পুষ্টির অভাবে কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুর হার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ।

প্রসবকালীন বিভিন্ন জটিলতার কারণেও নারীরা প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যায় ভোগেন। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গর্ভপাত, জরায়ুমুখে আঘাত, জরায়ু ফেটে যাওয়া, জননপথের মুখ ফেটে যাওয়া ইত্যাদি। আর প্রসবকালীন জটিলতার কারণে ফিস্টুলায় আক্রান্ত হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করেন অনেকে। এসব কারণেই নারীর নিরাপদ প্রসব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রসূতি ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞ রওশন হোসনে জাহান বলেন, ‘আমরা নিরাপদ প্রসবের ব্যাপারে জোর দিচ্ছি। আমাদের দেশে এখন ৭৪ শতাংশ নারীর প্রসব বাড়িতেই হয়ে থাকে। এর ফলে প্রসবকালীন ও প্রসব-পরবর্তী বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। অদক্ষ ধাত্রী বা বাড়ির যেকোনো নারীকে দিয়ে প্রসব করানো হয়। আর তার ফলেই ঘটে নানা দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনা রোধে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ ধাত্রীর প্রয়োজন।’

প্রজননস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিবার পরিকল্পনা। আমাদের দেশে নারী ও পুরুষের স্থায়ী ও অস্থায়ী দুই ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি রয়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পুরুষেরা এ ব্যাপারে এখনো এতটা উৎসাহী নন। তাই নারীকেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।

এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে তুলতে সরকারকে আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে বলে মনে করেন রাজধানীর হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সরকার অনেক দিন ধরেই প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে বেশ কিছু উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। যেমন কিশোরী ও প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের টিকা দেওয়া হচ্ছে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দেশে বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে প্রজননস্বাস্থ্যের দিক থেকে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রান্তিক অঞ্চলের জনগণের দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে।

(প্রতিবেদনটি প্রথম আলো থেকে নেয়া)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.