পাঠকের পর্যালোচনায় নাসরীন মুস্তাফা অনূদিত ‘দ্য ফিমেল ব্রেইন’

এবারের বইমেলায় প্রকাশিত নাসরীন মুস্তাফার অনুবাদকৃত বই ‘দ্য ফিমেল ব্রেইন’ পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখেছেন লেখক ও কবি আফসানা কিশোয়ার

লুয়ান ব্রিজেন্ডাইন, এম.ডি আমেরিকান সায়েন্টিসিট, নিউরোসাইকিয়াট্রিস্ট; তিনি একাধারে রিসার্চার, ক্লিনিসিয়ান এবং সানফ্রান্সিস্কোতে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার প্রফেসর। তিনি দ্য ফিমেল ব্রেইন এবং দ্য মেইল ব্রেইন নামক দু’টি বইয়ের লেখক। ১৯৫২ সালে আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী এ লেখকের ‘দ্য ফিমেল ব্রেইন’ বইটি প্রকাশ হয় ২০০৬ সালে। প্রকাশের পর থেকে বইটি বিশ্বের ত্রিশটি ভাষায় অনূদিত হয়। ২০২১ সালে এ বইটির বঙ্গানুবাদ করেন নাসরীন মুস্তাফা।

বইটি মূলতঃ নারীদের বিবিধ আচরণ কেন পুরুষের চাইতে আলাদা হয়, এবং সেক্ষেত্রে এস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন, টেস্টোস্টেরন, অক্সিটোসিন, ডোপামিন, সেরেটোনিন হরমোন কীভাবে প্রভাব ফেলে তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করে। একইসাথে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, হাইপোথ্যালামাস, এমিগডালা এসবের গঠন হরমোনের গড়ে উঠাতে কী ক্রিয়া করে তা নিয়ে আলোকপাত করে।

নারী কিংবা পুরুষ সে যেই হোক নিজের জীবন নিয়ন্ত্রণ ও চালিত করতে চাইলে তার দেহের এনাটমি -অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে।

ভূমিকা ও পরিশিষ্টসহ বইটি আটটি অধ্যায়ে বিভক্ত।

পাঠক হিসেবে মনে করেছিলাম গবেষক এবং সাইকিয়াট্রিস্ট যখন বিভিন্ন ফাইন্ডিংস লিপিবদ্ধ করবেন তখন নিশ্চয়ই বেশ খানিকটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিসমৃদ্ধ তথ্যপ্রমাণের মুখোমুখি হবো। যা পড়লাম তার পুরোটাই এজাম্পশন। পঞ্চাশজনের ক্ষেত্রে যে রাশিফল প্রযোজ্য সেই একই ফল একান্নতম ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে,তখন এই আনুমানিক সিদ্ধান্তের গতি কী হবে?

অক্সিটোসিনকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে এভাবে, “এটি ভালোবাসায়। ফোলাফোলা, তুলতুল বেড়ালের মতো আদুরে, যত্নশীল, বসুন্ধরার মতো মাতৃত্ব।” অর্থাৎ অক্সিটোসিন মানুষের ভেতর মায়া-মমতা-ভালোবাসা-যত্ন-প্রেম এসব মানবিক অনুভূতি জাগ্রত করতে সহায়তা করে।

বিশ শতকের বেশিরভাগ সময়জুড়ে বিজ্ঞানীরা এ ধারণা নিয়ে দিন কাটিয়েছেন যে নারী আবশ্যিকভাবেই ছোট আকারের পুরুষ মাত্র – লেখক নারী পুরুষের মস্তিষ্কের ভিন্নতা বর্ণনা করতে গিয়ে এ বাক্যটি লিখেন।

ব্রিজেন্ডাইন নারীর চরম প্রাকমাসিক পর্যায়ের ব্রেইন সিন্ড্রোম (Premenstrual Syndrome বা PMS) সম্বন্ধে ভাবা শুরু করেন।

হরমোন নারীর মস্তিষ্ককে খুব গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। হরমোনসমূহ নারীর মূল্যবোধ আর আকাঙ্ক্ষাকে গড়ে দিচ্ছে দিনকে দিন।

পাঠক হিসেবে আমি শুধু কিছু জায়গা উদ্ধৃত করছি – এগুলো আমার পর্যবেক্ষণ না। ব্রিজেন্ডাইন এও বলছেন, যৌন ভাবনা পুরুষের ব্রেনে গড়পড়তা হিসাবে দিনে বেশ অনেকবার স্রোত জাগায়, নারীর ক্ষেত্রে তা দিনে মাত্র একবার।

“জৈবিক শরীর কেবলমাত্র আমাদের ব্যক্তিত্ব আর আচরণগত প্রবণতার ভিত্তিকে প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু যদি স্বাধীন ইচ্ছার কথা বলি, রাজনৈতিক বিশুদ্ধবাদিতার কথা বলি, মস্তিষ্ক জৈবিক শরীরের যে প্রভাব, তাকে আমরা অস্বীকার করতে চাই, তাহলে আমরা আসলে আমাদের নিজেদের স্বভাবের সাথেই যুদ্ধ শুরু করি। ”
এতোগুলো বাক্য পড়ে আপনি বা আমি কী বুঝি? বুঝি যে এ শব্দবন্ধ অন্যভাবে লেখার সুযোগ ছিল। ‘মস্তিষ্ক জৈবিক শরীরের উপর যে প্রভাব ফেলে, তা সহজে অস্বীকার করার পথ থাকে না, কারণ এই প্রভাব অস্বীকার করলে মানুষ হিসেবে আমরা আমাদের স্বভাবের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।’

মাতৃত্ব বদলে দেয়, কেননা এটি আক্ষরিক অর্থেই নারীর মস্তিষ্ককে বদলে দেয় কাঠামোগতভাবে, কাজ করার ক্ষমতার দিক থেকেও স্থায়ীভাবে এই পরিবর্তন ঘটে যায়।

মূল বিষয় হচ্ছে, নারীর প্রতি কাজের বিপরীতে আছে হরমোন। তার মানে পরিবেশ, প্রতিবেশ, পারিবারিক সামাজিক কাঠামো, সংস্কৃতি কোনকিছুই কাজে আসবে না আপনার নারী মস্তিষ্কে থাকা হরমোন বা কেমিক্যাল লোচার কারণে।

আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে বইটি এই ভেবে যে আমাদের আমজনতা নিজের দেহ সম্পর্কে, রিপ্রোডাক্টিভ অর্গ্যান সম্বন্ধে একদম ওয়াকিবহাল নয়।

বই পড়তে গিয়ে প্রতিপদে হোঁচট খেয়েছি অসামঞ্জস্যপূর্ণ অনুবাদের কারণে। বইটি পাঠকের কাছে বোধগম্য করতে হলে পুরো বইটি রিরাইট করতে হবে বাংলাতে। কারণ আক্ষরিক অনুবাদ গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে করলে কোন বাক্যেরই কোন অর্থ থাকে না।

“আমি মনে করতে পারি, যখন আমার ছেলেটার বয়স পাঁচ মাস হলো, তখন আমি কাজে ফিরেছিলাম। আমার সাথে রাখতাম ‘বুকের দুধ গেলে’ দেওয়ার যন্ত্রটা।”

আমি এই বাক্যগুলো কয়েকবার পড়েছি। সত্যি সত্যি একজন অনুবাদক ব্রেস্টমিল্ক পাম্প করার মেশিনকে ‘দুধ গেলে দেওয়ার যন্ত্র’ হিসেবে লিখেছেন!

পাঠক হিসেবে আমার একান্ত অনুরোধ পরবর্তী সংস্করণে হলেও বইটি অনুবাদক আবার রিরাইট করবেন।

কী কষ্ট হয়েছে বাক্যের সাথে বাক্য মিলিয়ে পড়তে তা বলে বুঝানো যাবে না। কেউ যদি অকুণ্ঠ প্রশংসা করে থাকেন তাহলে বলবো সে পাঠক বইটি পূর্ণ পাঠ করেননি। যে কিশোরীদের মস্তিষ্ক নিয়ে বলা হচ্ছে সে কিশোরীদের পক্ষে এর পাঠোদ্ধার করা এককথায় অসম্ভব এর অবিন্যস্ত বাক্যগঠনের জন্য।

মূল লেখক পাঁচশ জনকে (কথার কথা) পর্যবেক্ষণ করে যেসব মতামত জ্ঞাপন করেছেন তা এমন কোন ওজন বহন করে না। হরমোন অবশ্যই মানব শরীরের আচরণের অনেক কিছুর পরিচালক, তার মানে এই না যে অন্যসব ফ্যাক্টর মুখ্য নয়। শুধু হরমোনকে বেইজ করে মানুষের আচরণ ব্যাখ্যা করলে তো খুনিও বলে বসবে সেদিন তার মস্তিষ্কে হরমোন বেশি ছিল বিধায় সে খুন করেছে, ধর্ষক বলবে যেহেতু নারীর তুলনায় তার যৌন ইচ্ছা দশগুণ বেশি তাই সে ধর্ষণ করতে বাধ্য হয়েছে।

আমাকে ১০ স্কেলে বইটিকে রেটিং করতে দিলে আমি ৫ দেবো, আর অনুবাদকে দেবো ৩।

বইপড়া চলুক, প্রাথমিক ধারণার জন্য হলেও একবার চোখ বুলানো যেতেই পারে ‘দ্য ফিমেল ব্রেইন’ অনুবাদে। নাসরীন মুস্তাফার করা অনুবাদ বইটি বের হয়েছে সাহিত্যপ্রকাশ থেকে, যার মূল্য রাখা হয়েছে ৫০০ টাকা।

শেয়ার করুন:
  • 22
  •  
  •  
  •  
  •  
    22
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.