‘ব্যাটসম্যান’ থেকে ‘ব্যাটার’ এবং ভাষার জেন্ডার নিরপেক্ষতা

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল:

গোটা বিশ্বব্যাপী না হলেও, অন্তত আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে, অসম্ভব জনপ্রিয় একটি খেলা হলো ক্রিকেট। তবে এই খেলার মাঝেই শত বছর ধরে ঘাপটি মেরে আছে একটি ভয়াবহ জেন্ডার পক্ষপাতদুষ্ট টার্ম। সেটি হলো ‘ব্যাটসম্যান’।

যে ব্যাট করে, তাকে বলা হয় ‘ব্যাটসম্যান’। কিন্তু ক্রিকেট তো আর শুধু পুরুষের খেলা নয়। নারীরাও খেলে ক্রিকেট। আর তখনই বাঁধে ঝামেলা। নারীদেরকে তো আর ‘ব্যাটসম্যান’ ডাকা যায় না। তাদেরকে ডাকতে হয় ‘ব্যাটসউওম্যান’ অথবা ‘ব্যাটার’ হিসেবে।

তবে সম্প্রতি ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফো এনেছে তাদের সম্পাদকীয় নীতিমালায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা আর ব্যবহার করবে না ‘ব্যাটসম্যান’ টার্মটি। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই তারা ব্যবহার করবে ‘ব্যাটার’।

প্রথমে শুনে হয়তো অনেকেই ঠোঁট বাঁকাচ্ছেন। ভাবছেন, এগুলো একেবারে ‘অহেতুক’ কাজ, ‘অ্যাটেনশন সিকিং’ এর ধান্দা! চারিদিকে আরো কতশত সমস্যা আছে, সেগুলো বাদ দিয়ে এসব কাজ করা নিতান্তই অনর্থক! এসব কাজে বাস্তব পরিসরে নারীদের দুর্দশার বিন্দুমাত্র সমাধানই হয় না।

যদি তা-ই ভেবে থাকেন, তাহলে চলুন জেনে নেয়া, যাক এ ব্যাপারে ক্রিকইনফোর এডিটর-ইন-চিফ সাম্বিত বাল কী যুক্তি দিচ্ছেন।

“শব্দ মানে কেবল আক্ষরিক অর্থই নয়, বরং সেটি কী বোঝাতে চাইছে, তা-ও। যখন কোনো নারী একটি কাজ করে, তখন সেই কাজের পদবী বা ভূমিকার শেষে নারীবাচক প্রত্যয় যোগ করে দেয়া, ওই কাজে পুরুষের প্রাথমিকতাকেই নির্দেশ করে। এ কারণেই বিশ্বব্যাপী এখন এমন সব টার্ম ব্যবহারের চল শুরু হয়েছে, যেগুলো জেন্ডার-নির্দিষ্ট নয়। যেমন : ‘স্টুয়ার্ড’ ও ‘স্টুয়ার্ডেস’ এর পরিবর্তে ‘ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট’, ‘পুলিসম্যান’ ও ‘পুলিসউওম্যান’ এর পরিবর্তে ‘পুলিস অফিসার’, ‘অ্যাক্ট্রেস’ ও ‘অথরেস’ এর পরিবর্তে যথাক্রমে ‘অ্যাক্টর’ ও ‘অথর’, ‘চেয়ারম্যান’ এর পরিবর্তে ‘চেয়ারপার্সন’ অথবা কেবলই ‘চেয়ার’ ইত্যাদি। ক্রিকেটেও প্রধান খেলোয়াড়ি ভূমিকাগুলো যেমন ‘বোলার’, ‘ফিল্ডার’ ও ‘উইকেটকিপার’ থেকে ‘ব্যাটসম্যান’ টার্মটি ব্যতিক্রম। ‘বোলার’, ‘ফিল্ডার’, ‘উইকেটকিপার’ টার্মগুলো কিন্তু সবই জেন্ডার-নিরপেক্ষ।

“একটি আদর্শ হিসেবে জেন্ডার সমতা এমন একটি লক্ষ্য যা অর্জন করতে আমাদের কয়েক প্রজন্ম ধরে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। কিন্তু ভাষা ব্যবহারে জেন্ডার নিরপেক্ষতা অর্জন সহজেই সম্ভব। আমরা জানি, এই লক্ষ্য অর্জনে কনটেন্টের দিক থেকে আমাদের আরো অনেক কাজ করার আছে, আরো কিছু টার্ম নিয়েও ভাববার আছে। কিন্তু শুরুতে একটি সহজ বলকে সীমানা ছাড়া করতে দোষ কী!”

আশা করি এই ব্যাখ্যা থেকে অনেকেই এখন বুঝতে পেরেছেন, কেন ভাষা ব্যবহারে জেন্ডার নিরপেক্ষতা জরুরি, আর কেন এক্ষেত্রে ‘ব্যাটসম্যান’ টার্মের বদলে সার্বজনীন ‘ব্যাটার’ টার্মটি নিয়ে আসাতেও অনেক কিছু ‘ম্যাটার’ করে।

যদি না বুঝে থাকেন, তাহলে সাম্বিত বালের বলা ‘কিছু কাজে পুরুষের প্রাথমিকতা’ বিষয়টি নিয়ে আরেকবার ভাবুন। এই যে আমাদের নিজেদের দেশেও পুলিশ, ডাক্তার থেকে শুরু করে চোরছ্যাঁচড়, সব পেশার নাম শুনলে শুরুতে কোনো পুরুষের কথাই আমাদের চোখে ভাসে, যেজন্য পেশাগুলোতে কোনো নারী যুক্ত থাকলে, নারী পুলিশ, নারী ডাক্তার, নারী অপরাধী টার্মগুলো ব্যবহার করতে হয়; এর মাধ্যমে কি আমাদের মনে যুগ যুগ ধরে লুকিয়ে থাকা সেই প্রাচীন ধ্যানধারণাই প্রতিফলিত হয় না যে ঘরের বাইরের কাজগুলো সব পুরুষেরই, নারীরা সেখানে ‘বহিরাগত’, তাই তাদেরকে আলাদা করে বিশেষায়িত করা প্রয়োজন?

সুতরাং বছরের পর বছর, দশকের পর দশক, শতকের পর শতক ধরে একেকটি জেন্ডার-পক্ষপাতদুষ্ট টার্ম ব্যবহৃত হয়ে এসেছে বলেই কেবল ‘ঐতিহ্যরক্ষার স্বার্থে’ সেগুলো ব্যবহার করে যেতে হবে, এর কোনো মানে হয় না। বরং আমাদের যে চূড়ান্ত লক্ষ্য তথা সমাজে জেন্ডার সমতা অর্জন করা, সেটিরই একটি ঢাল হিসেবে ভাষা ব্যবহারে জেন্ডার-নিরপেক্ষতার গুরুত্ব অপরিসীম।

আর এক্ষেত্রে ক্রিকইনফোর এই আপাত ‘ছোট পদক্ষেপ’-ও রাখতে পারে বিশাল ভূমিকা। শুরুতে হয়তো সিংহভাগ মানুষই তাদের এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করছে, হাসাহাসি ও রঙ্গ-রসিকতা করছে, তারপরও।

কারণ এই উপমহাদেশে ক্রিকেট খেলাটির রয়েছে কোটি কোটি অনুসারী। ক্রিকইনফোর এই পরিবর্তনটির কথা আজ তারা জানলো। আর তারই সূত্র ধরে, ভাষার জেন্ডার-নিরপেক্ষতা বলেও যে কিছু একটার অস্তিত্ব আছে, তা-ও হয়তো অনেকে প্রথমবার জানলো। এই জানাটাই তো অনেক বড় ব্যাপার। এর ফলে একটি ‘কনভার্সেশন’ অন্তত শুরু হলো। বারবার জেন্ডার-নিরপেক্ষ টার্ম হিসেবে ‘ব্যাটসম্যান’-এর পরিবর্তে ‘ব্যাটার’ ব্যবহার দেখতে দেখতে অনেকের কাছেই বিষয়টি ‘নরমালাইজড’-ও হয়তো হয়ে যাবে।

মোদ্দা কথা, পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব না। এটি একটি লম্বা ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। ক্রিকেটের মতো একটি ‘পপ-কালচার’ এর হাত ধরে সেই পরিবর্তনের পালে হাওয়া লাগল, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়।

জানিয়ে রাখা ভালো, ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডও তাদের আসন্ন ‘দ্য হান্ড্রেড’ টুর্নামেন্টে ‘ব্যাটসম্যান’ এর বদলে ‘ব্যাটার’ টার্মটির প্রচলন ঘটাবার কথা ভাবছে। এভাবে একে একে যদি ক্রিকেট নিয়ে কাজ করা সকল গণমাধ্যম, সকল বোর্ড, এবং ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলও একসময় জেন্ডার-নিরপেক্ষ টার্ম ব্যবহারের দিকে হাঁটে, তাহলে একটা জোর ধাক্কা তো লাগবেই!

আশা করি এভাবেই ধীরে ধীরে আসতে থাকবে ভাষার জেন্ডার-নিরপেক্ষতা, এবং তারই হাত ধরে একদিন আসবে সমাজে সত্যিকারের জেন্ডার সমতাও!

লেখক: শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
  • 78
  •  
  •  
  •  
  •  
    78
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.