আপনারা দুপক্ষই সরে দাঁড়ান

সুচিত্রা সরকার:

কয়েকটা বিবৃতি দেখলাম। তারপর একটা ভিডিও। বর্তমান সভাপতি অর্ধনগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। তার বুকে আঁচড়ের দাগ। ইশ! বেশ লালচে।
ফোনে কথা বলছিল। একজন পাশ থেকে বলল, বাটপার সেলিমের সঙ্গে কি কথা! একজন সভাপতির ক্ষত স্থানে কিছু একটা মেখে দিচ্ছিল। ধারণা করি অ্যান্টিসেপটিক গোছের হবে।
একজন বলল, কিছু লাগাইও না। থাক এরকম।
ব্যস!

দৃশ্যপটের পেছনে কতটা বিষবাষ্প থাকলে, ক্ষতটা রেখে দিতে হয়, ক্ষতের মত? আজকের ভিডিও, আক্রমণ, আর যতকিছু ,এসব আজকের নয়। দিনে দিনে তিল তিল করে এসব তৈরি হয়েছে।
আবার কয়েক মাস আগের অনশন, সেটাও পূর্ববর্তী অনেক অনেক বিষের ফোঁড়া বিশেষ। কাল বা পরশু যদি দুটো চারটা লাশ পড়ে থাকে অফিসের সামনে, অবাক হবো না।
অথচ আমার জীবনের সবচে মূল্যবান সময় আমি দিয়ে দিয়েছি এই পার্টিটার জন্য।

ফেসবুক জুড়ে কেবল কাঁদা ছেটানোর প্রকল্প। দুপক্ষই হাতে নিয়েছে।
প্রত্যেকের কমেন্ট পড়লে মনে হচ্ছে, সবার ভেতরে একজন করে সিনেমার ‘ডিপজল’ বাসা বেঁধেছে। খিস্তি, খেউর আর বিশ্রি ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য।

না, কেউ ধোঁয়া তুলসিপাতা নয়। কোনো পক্ষই নয়।
পার্টিটাকে দুপক্ষই রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে। কারণ কি ক্ষমতাসীন পক্ষের অনাচার?
কারণ কি ক্ষমতাহীন অথচ ক্ষমতায় যেতে চাওয়া পক্ষের প্রতি অবিচার?
কমিউনিস্ট পচে গেলে নাকি কোনো কাজেই লাগে না। যারা আজ পক্ষে বিপক্ষে লড়াই করছে, তারা বিপ্লব করবে? নাকি কংগ্রেসে পদ নেয়া আর টিকিয়ে রাখাটাই সব?

কী হবে এসব দিয়ে?
তারচে আপনারা একটা কাজ করেন।
দয়া করে দেশের আনাচে কানাচে প্রান্তিক যে মানুষগুলো আছে, যারা লাল পতাকা দেখলে কেঁদে দেয়, তাদের প্রতি একটু সুবিচার করেন।
সঞ্চয় তলাপাত্রের শহীদ দিবস, আমার রিক্রুটমেন্ট দিবস। সো, মৃত্যুটা সিগনিফিকেন্ট।
বিপ্রদাসের মা শ্মশানে বসে থাকতো সন্ধ্যায়, কুপি নিয়ে। অন্ধকার ভয় পায় বিপ্রদাস। ওই যে বোমা হামলায় প্রাণটা তার…!
আমার নরসিংদীর বাদল ভাই! ‘পার্টির একটা পতাকা আইনা দিবা সুচিত্রা?’ ক্রনিক হাঁপানী রোগীটা নীল পতাকার সভ্য করে যেত ছেলেদের। মেয়েদের।
আমার বাবা, গরিবের ছেলে। ছাত্র ইউনিয়ন থেকে নির্বাচন করার জন্য কুমিল্লার ঈশ্বর পাঠশালার ‘থাকা খাওয়ার’ ব্যবস্থা হারিয়েছিল। মেধাবী ছেলেটা রাজনীতি না করে জীবনটা গুছিয়ে নিলে আমার অল্প বয়সে টিউশনি করতে হয় না!

জসিম মণ্ডল, মোটা আতশ কাঁচের মতো চশমা। জ্বলজ্বলে চোখে, দৃঢ়তায়, ‘এ সমাজ ভাঙিতেই হইবে’ কোন পার্টিকে বলেছিলো?
এই পার্টি, সেই পার্টি?

আমার দেখাশোনা, আপনাদের থেকে কম। তবু দুটো কংগ্রেস দেখেছি। কী পরম মততায় সরল মুখ নিয়ে, বিপ্লবের একপ্রস্থ পাড়ি দিতে তারা ঢাকা আসে।
‘গাও ইন্টারন্যাশনাল, … শেষ যুদ্ধ শুরু আজ কমরেড, মেলাও এ মানবজাত’!
কতজনকে গাইতে গাইতে কাঁপতে দেখেছি, কাঁদতে দেখেছি। নুন আনতে পান্তা ফুড়ানো, সেই কমরেডদের নিঃশ্বাসের কিরা লাগে, আপনারা ছাড়ান দ্যান!
আপনারা দুই পক্ষ, সরে দাঁড়ান। প্রান্তিক কমরেডদের বিশ্বাসটা ভাইঙ্গা দিয়েন না। তাইলে তারা কেউ বাঁচবো না।
ভয় পায়েন না। পার্টি কিছুদিন বিশ্রাম নিক। ভয় পায়েন না। পার্টিকে আইএমএফ, র, বিশ্বব্যাংক, সাদা দল, সাম্রাজ্যবাদী— কেউ গিলে খাবে না।
ওরা গিলে খেতে চায় বিপ্লবকে।

এখানে বিপ্লব নেই। পালিয়ে গেছে। তাই পার্টিটা কিছুদিন নিজে নিজে ‘অ্যানার্জি গ্রো’ করুক নিজের ভেতরে। যেমন ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটা নগরে, একটা বীজ ধান বা একটা পাখির মুখে করে আনে কোনো শস্যদানা, সৃষ্টি হয় আবার সভ্যতার।
তেমনি হবে।
আপনারা গেলেই, ফিরবে বিপ্লব।
ফিরতে দিন। ফিরতে দিন। প্লিজ!

শেয়ার করুন:
  • 32
  •  
  •  
  •  
  •  
    32
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.