প্রসঙ্গ: মেন্সট্রুয়াল কাপ

তন্বী বড়ুয়া:

গত প্রায় একবছরের কাছাকাছি সময় ধরে প্রতিমাসে আমার নিত্যসঙ্গী এই মেন্সট্রুয়াল কাপটি। একটি লম্বা সময় ব্যবহার না করে সবাইকে এটি সম্বন্ধে জানানো উচিত হবে না ভেবেই এতোদিন কিছু লিখিনি। আজ কিছু লিখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি।

মেন্সট্রুয়াল কাপ কী জিনিস? এ নিয়ে একাধিকবার লেখা হয়েছে, তারপরও অনেকের মনে সংশয় থেকে যাওয়ার কারণেই আমি এই লেখাটি লিখছি।

এটি একটি ছোট্ট মেডিকেল গ্রেডেড সিলিকনের তৈরি নমনীয় পাত্র যা আপনার ঋতুস্রাব চলাকালীন সময়ে ভ্যাজাইনাতে ঢুকিয়ে দিতে হয় এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এতে রক্ত জমে থাকে। নির্দিষ্ট সময় পর পর জমে থাকা রক্ত ফেলে দিয়ে ধুয়ে আবার পরতে হয়।

সুবিধাসমূহ:

১. কাপ আপনি একবার কিনলে যদি হারিয়ে না ফেলেন বা কোনোভাবে নষ্ট করে না ফেলেন, তাহলে অনায়াসে আট থেকে দশ বছর ব্যবহার করতে পারবেন।
২. প্যাড, কাপড় বা টেম্পন ব্যবহারে যেমন স্যাঁতসেঁতে ভাব, র‍্যাশ, চুলকানি, সংক্রমণের ভয় থাকে, কাপের ক্ষেত্রে তার কোনো সম্ভাবনা নেই।
৩. ইনফেকশন, টক্সিক শক সিনড্রোম এইসব কাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিরল জটিলতা যা হতে পারে যদি আপনি অপরিষ্কার হাতে এবং সঠিক নিয়মে কাপ ধুয়ে ব্যবহার না করেন।
৪. কাপ একবার পরার পরে আপনি আপনার সমস্ত স্বাভাবিক কাজকর্ম তো বটেই, বরং সাঁতার হতে শুরু করে সাইকেল চালানো, ব্যায়াম করা সবকিছু অনায়াসে করতে পারবেন এবং টেরই পাবেন না যে আপনার মাসিক চলছে।
৫. প্যাড পরে থাকার ভারী ভাব তো দূরের কথা, আপনি কোনোপ্রকার অন্তর্বাস পরিধান ছাড়াই অনায়াসে মাসিক চলাকালীন সময়ে কাপ পরে চলাফেরা করতে পারবেন!
৬. কাপ পরে আপনি যেভাবে খুশি বসতে পারবেন, শুতে পারবেন। আপনার অনুভব হবে না আপনি কিছু পরে আছেন বা আপনার মাসিক চলছে।
৭. পায়খানা – প্রস্রাব করার সময় কাপ খুলতে হবে না। এক্ষেত্রে আপনি একটু ঘেঁটে দেখুন যে মেয়েদের মাসিকের রাস্তা, প্রস্রাবের রাস্তা এবং পায়খানার রাস্তা তিনটাই আলাদা।
৮. প্রতিবার মাসিকের সময় আপনাকে টাকা খরচ করে যে পরিমাণ প্যাড ব্যবহার করতে হয় এবং আবর্জনা হিসেবে যে পরিমাণ প্যাড ফেলতে হয়, (কোথায় ফেলবেন, এটাও একটা সমস্যা) তা থেকে আপনি এবং পৃথিবী বেঁচে যাবে। এটা খুব খুব জরুরি একটি বিষয়।

কাপ সম্পর্কিত কিছু ভ্রান্ত ধারণা :

১. “এটি শুধুমাত্র বিবাহিত নারীরা ব্যবহার করতে পারবেন” — না। কাপ শুধু বিবাহিতরাই নয় কুমারী, অবিবাহিত, বিবাহিত, বাচ্চা আছে, বাচ্চা নেই, প্রথমবার মাসিক হয়েছে, এমন প্রত্যেকে ব্যবহার করতে পারবেন।
২. “কাপ ব্যবহারে সতীত্ব চলে যায়”  — এটা নিয়ে আসলে কী বলবো বা কীভাবে বলবো, আমি নিজেই বিভ্রান্ত! সতীত্ব বলতে যদি আপনি বোঝেন আপনার শারীরিক শুচিতা, সেক্ষেত্রে কারো সাথে শারীরিক সম্পর্কে না জড়ালে একটি জড়বস্তুর মাধ্যমে কীভাবে সতীত্ব চলে যায় এর সঠিক উত্তর বোধ হয় কারও কাছেই নেই। সতী পর্দা বা হাইমেন ছিঁড়ে যাওয়ার যে ব্যাপারটা, সে ব্যাপারে বলবো অনেকের ক্ষেত্রে হাইমেন জিনিসটিই অনুপস্থিত থাকে। এখন আপনি যদি আপনার ভবিষ্যত স্বামীর চিন্তা করে হাইমেন অটুট রাখতে চান, সেক্ষেত্রে বলবো এমন স্বামী কারও কপালে না জুটুক বা আপনি যদি নিজেই সতীপর্দায় বিশ্বাসী হন, তাহলে কাপ ব্যবহারের আরামটুকু থেকে বঞ্চিত হওয়াটাই আপনার জন্যে যথার্থ।
৩. “কাপ ভিতরে ঢুকে হারিয়ে যায় ”  — এই ব্যাপারটা কোনোভাবেই সম্ভব কিনা তা জানতে এবার আপনাকে নিজের শরীর এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে একটু কষ্ট করে পড়াশোনা করতে হবে। কাপ আপনার ভ্যাজাইনার রাস্তা পার করে জরায়ুতে ঢোকার কোনো সুযোগ কোথাও নেই। তাই কাপ পরলে তা হারিয়ে গিয়ে ভেতরে ঢুকে মুখ দিয়ে বের হয়ে আসবে এ জাতীয় চিন্তা নিজেও করবেন না, অন্যকেও চিন্তিত করবেন না।
৪. “কাপ পরলে ভ্যাজাইনা বড় হয়ে যায়” — না। কাপটি অত্যন্ত নমনীয় একটি সিলিকনের তৈরি জিনিস, যা আপনার ভ্যাজাইনার আকৃতি অনুযায়ী ওইভাবেই ভেতরে আটকে থাকবে।
ক্লে দিয়ে বানানো জিনিসগুলো চিন্তা করে দেখুন, কোনো ছিদ্রপথে ঢোকালে ক্লে নিজের স্থিতিস্থাপকতা গুণে পরিবর্তিত হবে, কিন্তু ছিদ্রপথটির কোনো পরিবর্তন ঘটাবে না। আর আমাদের ভ্যাজাইনার মাংসপেশীগুলোর স্থিতিস্থাপকতা অনেক বেশি, এরা প্রসারিত হয় এবং আবার আগের আকৃতিতে ফেরত আসতে পারে।

কাপ ব্যবহারের কিছু প্রাথমিক আলোচনা :

১. সবার প্রথমে আপনাকে অবশ্যই এবং অবশ্যই মেডিকেল গ্রেডেড সিলিকনের তৈরি এফডিএ অ্যাপ্রুভড কাপ ব্যবহার করতে হবে। তাহলেই কেবলমাত্র আপনি কোনোপ্রকার স্বাস্থ্যসংক্রান্ত জটিলতা ছাড়া কাপের সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। রেপ্লিকা বা নকল কাপ ব্যবহার করে যদি নিজের শরীরের ক্ষতি করেন, সেক্ষেত্রে অবশ্যই দায়ী আপনি, কাপ নয়।
২. কাপটি কোনোভাবেই সাবান বা এধরনের কিছু দিয়ে পরিষ্কার করা যাবে না। সাবান কাপের সিলিকনকে নষ্ট করে ফেলতে পারে। এবং সাবানের ক্ষার ভ্যাজাইনার যে নির্দিষ্ট পিএইচ থাকে, তার ভারসাম্য নষ্ট করে দিবে। কাপ ব্যবহারের শুরুতে একবার গরম পানিতে ফুটিয়ে নেবেন এবং একদম মাসিক শেষে আরেকবার ফুটিয়ে নেবেন। এর মাঝখানে প্রতিবার রক্ত ফেলে দেয়ার সময় স্বাভাবিক কলের পানিতে বা কুসুম গরম পানিতে ধুয়ে পুনরায় পরবেন।
৩. প্রতিবার কাপ ধরার আগে, পরার আগে এবং বের করার আগে আপনাকে সাবান দিয়ে দুহাত খুব ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে এবং হাতের নখ কেটে ফেলতে হবে। অন্যথায় আপনার অবশ্যই অবশ্যই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হবে।

কাপ ব্যবহারের অন্যান্য ব্যাপারগুলো স্বাভাবিকভাবেই এখানে বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়, তাই বিস্তারিত জানতে চাইলে আমাকে নক করতে পারেন, বা আমি যে গ্রুপ এবং পেজের মাধ্যমে এই জীবন রক্ষাকারী জিনিসের সন্ধান পেয়েছি, তার লিংক আমি কমেন্টে দিয়ে দিচ্ছি। একবার অন্তত ঘুরে আসুন।
সর্বোপরি যেখান থেকেই কিনুন মান যাচাই করে আসল পণ্যটি কিনুন।

এফডিএ অ্যাপ্রুভড কি না যাচাই করতে নিচের দেয়া লিংকটি যাচাই করবেন।
https://www.accessdata.fda.gov/…/cfdocs/cfRL/rl.cfm

আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা থেকে যা জানি তা সবার সাথে ভাগ করে নিলাম। যদি একজনেরও উপকার হয় এটাই আমার লাভ।
ধন্যবাদ।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.