দীপাদের কষ্টের শেষ থাকে না …

নুরজাহান আক্তার দিপ্তী:

দীপার বিয়ে হয়েছিল মাত্র বিশ বছর বয়সে। এই বিয়েতে দীপার যে খুব মত ছিলো তা নয়, আবার অমতও ছিলো না। মফস্বল শহরে বেড়ে ওঠা দীপার ক্লাসমেটদের অনেকেরই যখন এসএসসি পাশ করতে করতেই বিয়ে হয়ে গেল, তখন দীপার কেন বিয়ে হচ্ছিলো না তা নিয়ে নিত্য অশান্তি, নিত্য মায়ের কটু কথার হাত থেকে বাঁচতেই মূলত দীপা বিয়েতে রাজি হয়েছিল।

কার সাথে বিয়ে, পাত্র কী করে কিংবা দেখতে কেমন এর কোনটাই দীপা জানতো না, জানার আগ্রহও ছিল না। কেবল জেনেছিল পাত্রপক্ষ কোনো যৌতুক নিচ্ছে না।
দীপার সদ্য অবসরপ্রাপ্ত বাবার পক্ষে যতটুকু সম্ভব খরচ করে বিয়েটা হয়েছিল।

বিয়ে নিয়ে মেয়েদের নাকি অনেক স্বপ্ন থাকে। দীপার তেমন কোনো স্বপ্ন ছিলো না। আসলে স্বপ্ন দেখার মনই ছিলো না তার। কেবল মনে হতো যেন-তেন একটা বিয়ে হয়ে গেলেই অন্তত মা আর ভাবির নিত্য খোঁচা, অশান্তি থেকে বাঁচা যাবে।

বিয়ের দু’মাসের মাথায় দীপা প্রথম ধাক্কা খেলো যখন সে জানল যে তার স্বামী সম্পূর্ণ বেকার। দ্বিতীয় ধাক্কাটা খেল যখন তার স্বামী তাকে বললো, যেহেতু তারা বিয়েতে কোনো যৌতুক নেয়নি, তাই তারা চায় দীপার বাবা যেন তাদের জামাইকে ব্যবসা করার জন্য দশ লক্ষ টাকা দেয়।
স্বামীর এমন প্রস্তাবে দীপা দিশেহারা বোধ করে। কারণ সে জানে যে এতো টাকা দেয়ার সামর্থ্য তার বাবার নেই। তিনি অবসরে গিয়ে এককালীন কিছু টাকা পেয়েছিলেন ঠিক। তবে তা সামান্যই। তা ছাড়া যেখানে যৌতুকবিহীন বিয়ে বলে কোনো কিছু না দেখেই চোখ বন্ধ করে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, সেখানে বিয়ের পরে মেয়ের জামাইকে টাকা দেওয়া তো অসম্ভব একটা ব্যাপার।

দীপা বাবার বাড়ি থেকে কোনো টাকা আনতে পারেনি। তারপর থেকে দীপার জীবনে অত্যাচারের যে অমানিশা শুরু হয়েছে তার শেষ বুঝি আর হবার নয়। তাই এই চ্যাপ্টারটা এখানেই থাক।

বিয়ের দু বছরের মাথায় দীপা মা হতে চলেছে শুনে খুশি হবার বদলে তার শাশুড়ি ভীষণভাবে রেগে গেলেন। তক্ষুনি তাঁর বেকার ছেলেকে আলাদা করে দিলেন।

হায় আল্লাহ। দীপা খুব বোঝালো স্বামীকে যেন একটা কিছু করে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। বিয়ের সময়ে পাওয়া গয়নাগুলো একটা একটা করে বিক্রি করে খাবারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছিল। একবেলা খেলে আর একবেলা না খেয়ে থাকতে হচ্ছিল। এ অবস্থায় দীপা নিজে কিছু একটা করার খুব চেষ্টা করছিল। অনেক চেষ্টার পরে খুব সামান্য বেতনে একটা কিন্ডারগার্টেনে চাকরি পেল। এতে কোনোমতে অন্তত স্বামীর পাতে খাবার তুলে দিতে পারলেও নিজে খাবার বাঁচানোর জন্য কেবল নুন চটকে ভাত খেতো।

আধপেটা খাবার, মানসিক কষ্ট, শারীরিক নির্যাতন এ সবকিছুর প্রভাব কিনা কে জানে বিধাতার ইচ্ছায় দীপা সময়ের একমাস আগেই সন্তান জন্ম দিল। নিয়তির কী পরিহাস! সন্তানের দু’ মাস বয়সেই বোঝা গেল এ সন্তান স্বাভাবিক নয়। প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী বাচ্চা জন্ম দেয়ার অপরাধে দীপার কতখানি শাস্তি পেতে হয়েছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

দীপাকে দু’মাস বয়সী বাচ্চাসমেত ওর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা যেদিন বের করে দিয়েছিল সেদিন বাবার বাড়িতেও ওর ঠাঁই হয়নি। ওর স্কুলের প্রিন্সিপাল ম্যাডামই সেদিন এগিয়ে এসেছিলেন, আশ্রয় দিয়েছিলেন দীপাকে। এই বাচ্চা কোলে নিয়েই দীপা স্কুলে যেত, স্কুলের একটা বেঞ্চে শুইয়ে রেখে ক্লাস নিতে হতো। এ বাচ্চাকে মুখে তুলে খাইয়ে দেওয়া, তার পায়খানা প্রশ্রাব ছোটো বাবুদের মতো করে পরিস্কার করা, এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় কোলে করে নিয়ে যাওয়া এ সবই পনের বছর ধরে দীপা করে যাচ্ছে।

দীপার বাচ্চাটার বয়স এখন পনের। দীপা একাই লড়ে যাচ্ছে তার এ বাচ্চাকে নিয়ে।

##সকল অটিস্টিক সন্তানের মায়েদের জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.