একজন গর্ভবতী মায়ের করোনাকালের অভিজ্ঞতা

উপমা মাহবুব:

পর্ব ১

২০১৯-এর ডিসেম্বর মাসের এক ঝকঝকে সকাল। সেন্টমার্টিনের নীল সমুদ্রের পানিতে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে মন চলে গেছে নয় বছর আগের ডিসেম্বর মাসে। সেবার আমরা সুন্দরবন বেড়াতে গিয়েছিলাম। জাহাজে কয়েক রাত ছিলাম। সুন্দরবনের মাঝখান দিয়ে যেতে যেতে জাহাজ থেকে ঘন বনের সৌন্দর্য উপভোগ করা, নানা প্রজাতির প্রাণী ও পাখি দেখা, কটকা বীচসহ বিভিন্ন স্পট ঘুরে বেড়ানো, দলবেঁধে আড্ডা দেওয়া আর লুডু খেলা – সব মিলিয়ে দারুণ একটা ট্যুর ছিলো। তবে সেই যাত্রাতে একটা ‘সিক্রেট’ ছিল, যা আমি, আমার বর অমিত এবং আমার ভাই ও ভাইয়ের বউ, এরা শুধু জানতাম। ঢাকা থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগের দিন বাসায় প্রেগনেন্সি টেস্ট করে জানতে পেরেছিলাম আমি এক্সপেক্টিং। গর্ভধারণের প্রাথমিক পর্যায়ে একজন মাকে অনেক সাবধানে থাকতে হয়। চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। প্রচুর বিশ্রাম নিতে হয়। অথচ ঢাকা থেকে খুলনা বাসে দশ/বারো ঘন্টার জার্নি। তার উপর সুন্দরবন ট্যুর, মানে কয়েকদিন গহীন জঙ্গলে জাহাজের মধ্যে থাকতে হবে। লোকালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে না। কোনো সমস্যা হলে ফিরে আসতেও এক/দুই দিন সময় লাগবে। কিন্তু রওনা হওয়ার আগে এতোসব জটিল চিন্তা আমাদের মাথায় আসেনি। আমার আর অমিতের বয়স ছিল খুব কম। গর্ভে প্রথম সন্তান ধারণের কথা গোপন করে আমরা দিব্যি ঘুরতে চলে গিয়েছিলাম।

সুন্দরবন ভ্রমণের পুরোটা সময় দারুণ উপভোগ করেছিলাম। শারীরিক কষ্ট আর টেনশন চেপে রেখে হাসিমুখে ছিলাম। দীর্ঘ বাস জার্নি করেছি। সুন্দরবনে বিভিন্ন স্পটে প্রজাপতির মতো ঘুরে বেড়িয়েছি। বনের ভেতর যেতে হলে প্রথমে জাহাজ থেকে ছোট একটা নৌকায় চড়তে হতো। নৌকা থেকে নামার পরও জঙ্গলের ভেতর অনেক হাঁটা লাগলো। সুন্দরবনে একটা টুরিস্ট স্পট থেকে আরেকটা টুরিস্ট স্পটের দূরত্ব অনেক। কোনো কোনো স্পটে যেতে পুরো একদিন লেগে যেত। তখন আমাদের সময় কাটতো জাহাজের ছাদে বসে প্রকৃতি দেখে আর গল্প করে। সেখানে কোনো চেয়ারের ব্যবস্থা ছিল না। আমরা সবাই ফ্লোরে বসতাম। একে তো জিন্স পরা অবস্থায় মাটিতে বসা ছিল কষ্টকর, তার উপর হেলান দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। তাই ফ্লোরে বসতে আমার বেশ কষ্ট হতো। তখন প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহ চলছিল। সারাদিন কেডস, জিন্সের প্যান্ট আর মোটা জ্যাকেটের মতো আটোসাঁটো পোশাক গায়ে দিয়ে থাকতে হতো, এটিও গর্ভধারণের কারণে আমার জন্য খুবই কষ্টকর ছিল। দীর্ঘযাত্রার ধকলে শেষের দিন অসুস্থ হয়ে পড়ি। আসলে ভাগ্য সেবার পুরোপুরি আমাদের সহায় ছিল। এ কারণেই এরকম দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর ট্যুরের পরও আমার বড় কোনো শারীরিক সমস্যা বা অ্যাবরশনের লক্ষণ দেখা যায়নি। আমরা স্বামী-স্ত্রী যে ভয়ংকর ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবন গেছি সেই তুলনায় আমাদের কন্যা প্রমিতি লেখা কোনো বড় সমস্যা ছাড়াই পরবর্তীতে পৃথিবীর আলো দেখেছিল।

সেন্টমার্টিনে ছুটি কাটাতে এসে সুন্দরবনের কথা কেন ভাবছি? ভাবছি, কারণ আমার মন কী যেন একটা ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিছু শারীরিক লক্ষণের কারণে মনে হচ্ছে আমি হয়তো আবার কনসিভ করেছি। জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা আবারও সেই বেড়াতে যাওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে গেলো, এটা কীভাবে সম্ভব? অবাক হয়ে সেটাই ভাবছিলাম। সেবার ছিল সুন্দরবন, এবার সেন্টমার্টিন। সুন্দরবন যাওয়া-আসা আর বেড়ানো মিলিয়ে বাস, জাহাজ এবং নৌকায় লম্বা জার্নি করতে হয়েছিল। আর এবার শুধু সেন্টমার্টিন আসতেই বাস এবং জাহাজে চড়া লেগেছে। ছেঁড়া দ্বীপ দেখতে গিয়ে স্টিমার ও নৌকাও চড়েছি। এখনও তো টেকনাফ আর কক্সবাজার বেড়ানো বাকি আছে! সেখানে আমাদের ঘোরাঘুরি করার জন্য গাড়ি ঠিক করে রাখা আছে। আমি মনে মনে ভাবলাম, আমার তো ভুলও হতে পারে। হাবিজাবি চিন্তা বাদ দিয়ে বরং বেড়ানোটা উপভোগ করার দিকে মন দেই।

আমাদের সেন্টমার্টিন-টেকনাফ ট্যুর ভালোভাবেই শেষ হলো। পুরোটা সময় অতিরিক্ত ক্লান্তি ছাড়া আমি আর কোনো শারীরিক সমস্যা বোধ করিনি। এক ফাঁকে অমিতকেও জানিয়েছিলাম আমার শংকার কথা। তারও প্রথম অভিব্যক্তিই ছিল – সুন্দরবনের ঘটনার আবারও পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে, কীভাবে সম্ভব? আমরা টেনশন করে বেড়ানোর আনন্দ নষ্ট করতে চাইলাম না। সম্ভাব্য গর্ভধারণের বিষয়টাকে দুজনই তাই হালকাভাবেই নিলাম। ভেবেছিলাম ট্যুর শেষে একদিন রেস্ট নিয়ে অফিসে জয়েন করবো। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। রাতের বেলা রওনা হয়ে ঢাকা-কক্সবাজার রোডে ট্রাফিক জ্যামে আটকে পরে বাসায় ঢুকতে ঢুকতে দুপুর গড়ালো। তারপর গোছগাছ করতে করতে পুরোটা দিন শেষ। এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে আম্মুর ফোন এলো – আব্বু খুবই অসুস্থ। আমার আব্বু কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত। সপ্তাহে দুদিন তাঁর ডায়ালাইসিস করা লাগে। তাই তার অসুস্থতা মানে আমাদের জন্য খুবই টেনশনের বিষয়। রাতে আব্বুর অবস্থা সংকটজনক হয়ে গেলো। তিনি চট্টগ্রামে আইসিইউতে ভর্তি হলেন। পরেরদিন সকালে আমি আর অমিত আকাশ পথে চট্টগ্রামে গেলাম। সেইদিন রাতেই আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে করে আব্বুকে ঢাকায় নিয়ে এসে হাসপাতালে ভর্তি করালাম। মাইক্রোবাস ড্রাইভার মাত্র সাড়ে চার ঘন্টায় আমাদের ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। সে এক আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা! একদিকে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খাচ্ছি, অন্যদিকে আমার কাজিন ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলেই চলেছে যেন এত প্রচন্ড গতিতে গাড়ি চালাতে চালাতে তিনি ঘুমিয়ে না পড়েন!

আব্বুকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে আমার শরীর খারাপ লাগার কথা ভুলেই গেছিলাম। আব্বুকে হাসপাতালে ভর্তি করে একটু স্বস্তি পেয়ে হাসপাতালেই টেস্টকিট কিনে প্রেগনেন্সি টেস্ট করলাম। রেজাল্ট পজেটিভ আসলো। আমার বয়স ৩৫ পেরিয়ে গেছে। কন্যা প্রমিতির বয়স আট বছর। তারপরও আমরা স্বামী-স্ত্রী খুবই খুশি হলাম। সেদিনই একজন গাইনোকোলজিস্টের সঙ্গে দেখা করলাম। ডাক্তার সবকিছু ঠিকঠাক আছে বলে আশ্বস্ত করায় পরের দিন অফিসে জয়েনও করলাম। কিন্তু এবার ভাগ্য সুন্দরবনের মতো সুপ্রসন্ন হলো না। অফিসে ঢোকার দুই/তিন ঘন্টার মধ্যেই আমার কয়েক ফোঁটা স্পটিং হলো। স্পটিং, অর্থাৎ প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত যাওয়া অ্যাবরশনের অন্যতম লক্ষণ। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে অফিসের ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি তক্ষুণি বাসায় ফিরে গিয়ে বেডরেস্ট নিতে বললেন। তাই করলাম এবং পরেরদিনই গাইনোকলজিস্ট দেখালাম। ডাক্তার বললেন অতিরিক্ত জার্নি এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নেওয়ায় স্পটিং হচ্ছে। এর ফলে আমার প্রেগনেন্সি একটা রিস্কি সিচুয়েশনে আছে। তিনি আমাকে পাঁচ সপ্তাহের কমপ্লিট বেডরেস্ট দিলেন।

এতদিন যে আমি শরীরের ভেতর খারাপ লাগার অনুভূতি নিয়েও বেড়ানো আর আব্বুর অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে বিরামহীমভাবে দৌড়ে বেড়াচ্ছিলাম, বেডরেস্ট শুরু হওয়ার পর সেই আমি যেন একদম ভেঙ্গে পড়লাম। পৃথিবীর সব ক্লান্তি আর অবসাদে ডুবে গেলাম। প্রথমদিকে এতটা অসুস্থবোধ করতাম যে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে যেতেও কষ্ট লাগতো। সেই সঙ্গে যুক্ত হলো গর্ভধারণের প্রথমাবস্থার লক্ষণসমূহ, যেমন, খাবারে অরুচি, তন্দ্রাচ্ছন্নতা, বমি ইত্যাদি। চোখের নিচে কালিসহ পুরো চেহারায় অসুস্থতার ছাপ পড়ে গেলো। এমনিতে আমি দৃঢ় মানসিকতার মানুষ। কোনো সংকটেই ভেঙ্গে পড়ি না। অথচ কোনো কোনদিন মনে হতো, আর কোনোদিন হয়তো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবো না। অথচ প্রমিতিকে যখন গর্ভেধারণ করি তখন প্রথম তিনমাস শারীরিকভাবে তেমন কোন সমস্যাই অনুভব করিনি। মানসিকভাবেও খুব স্ট্রং এবং ফুরফুরে মেজাজে ছিলাম। দীর্ঘ আট বছর পর দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের সময় অনেক কিছুই আগেরবারের সঙ্গে আর মিলছিলো না।

পর্ব ২

২০১৯-এর জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে আমার পাঁচ সপ্তাহের বেডরেস্ট শুরু হলো। হাসপাতাল আর আমার বাসা খুব কাছাকাছি হওয়ায় আব্বু তখনও বেশ অসুস্থ হলেও হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। আমরা বাবা ও মেয়ে নিজ নিজ রুমে দিনরাত শুয়ে থাকি। মাঝে মাঝে আব্বু এসে আমাকে দেখে যায়। আমার বিছানা থেকে উঠার শক্তি বা অনুমতি কোনটিই নেই। সংসার সামলানো, দুই বিছানাবন্দি মানুষের সেবা করা, আমাদের কন্যা প্রমিতির দেখাশোনা করা, আব্বু আর আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, সপ্তাহে দুদিন আব্বুর ডায়ালাইসিস করানো ইত্যাদি সব কাজ আম্মু আর অমিত অক্লান্তভাবে সামলালো। শেষের দুই সপ্তাহে আমি ভালো বোধ করতে শুরু করলাম। তন্দ্রাচ্ছন্নতা, অবসাদ ইত্যাদি কমে গেলো। একটু একটু বই পড়তে এবং ইউটিউবে সিনেমা দেখতে লাগলাম। আস্তে আস্তে ঘোর কেটে গিয়ে মাথাও কাজ করতে শুরু করলো। এদিকে অফিসে জয়েন করার সময়ও হয়ে এলো। ততদিনে শারীরিক এবং মানসিক – দুরকম জোরই ফিরে পেয়েছি। আয়নায় নিজের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে মনে হলো চেহারা থেকে দীর্ঘ ধকলের চিহ্ন সরানো দরকার। বেডরেস্টে থাকায় পার্লারে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই অনলাইন থেকে হোমসার্ভিস দেয় এমন একটা পার্লার খুঁজে বের করলাম। খুবই মিষ্টি দুটো মেয়ে এসে অত্যন্ত যত্ন করে চুল কেটে, ভ্রু প্লাক করে দিয়ে গেলো। আয়নায় নিজের পরিবর্তিত পরিচ্ছন্ন চেহারা দেখে মনে হলো যেন কনফিডেন্স ফিরে পেলাম!

অনেকের মতো আগে আমার মনেও প্রশ্ন জাগতো, যে গর্ভবতী নারীদের মাসের পর মাস বেডরেস্টে থাকতে হয়, তারা কেমন করে সময় কাটান? তারা তো আসলে সেই অর্থে অসুস্থ নন। হাঁটাহাঁটি বা কাজ করলে মিসক্যারেজ হতে পারে, এ কারণে তাদের শুয়ে থাকতে হয়। নিজে বেডরেস্টে যাওয়ার পর উপলব্ধি করলাম কতটা কঠিন এই সময়। এ রকম পরিস্থিতিতে শারীরিক এবং মানসিকভাবে একজন নারী যে পরিমাণ ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে তা অচিন্তনীয়। গর্ভধারণ আর রোগব্যাধির মধ্যে এটাই সম্ভবত বড় পার্থক্য। মানুষ মনের জোরে রোগগ্রস্থ অবস্থায়ও অনেক কিছু করতে পারে। কিন্তু গর্ভধারণের পর একজন নারী শারীরিক কষ্টকে চেপে রেখে মনের জোড়ে অতিরিক্ত দৌড়াদৌড়ি বা শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করতে পারেন না। তাতে তার নিজের এবং গর্ভের শিশুটির ক্ষতি হতে পারে। অন্যদিকে এ সময় প্রাকৃতিকভাবে শরীরের পাশাপাশি মানসিক অবস্থারও পরিবর্তন ঘটে। এর উপরও ঐ নারীর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে বেডরেস্টে থাকা গর্ভবতী নারীর শুধু শুয়ে থাকতে ইচ্ছা হয়। ব্যক্তিগত জীবনে সাহসী মেয়েটিরও তখন জোরে শব্দ হলে ভয় লাগে। দুঃস্বপ্ন দেখেন। তার মন দুর্বল হয়ে যায়।

পাঁচ সপ্তাহ শেষে ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে অফিসে জয়েন করলাম। সতর্কতা বজায় রেখে স্বাভাবিক সময়ের মতো কাজ করতে শুরু করলাম। অফিসের প্রয়োজনে এদিক-ওদিক যাওয়া আসাও করতাম। মজার ব্যাপার হলো অফিসে থাকলে মনেই হতো না যে আমার শরীরের ভেতর একটা নতুন প্রাণ বেড়ে উঠছে। সহকর্মীদের সাহচর্যে আর কাজের আনন্দে তেমন কোন সমস্যা টের পেতাম না। শুধু খেতে অরুচি লাগতো, এই এতটুকুই। কিন্তু বাসায় ঢোকার পর রাজ্যের ক্লান্তি আর শরীর খারাপ লাগা আমাকে চেপে ধরতো। বাসায় ফেরার পর থেকে তাই যতটা সম্ভব রেস্ট নিতাম। গর্ভধারণের প্রথম পর্যায়ে অ্যাবরশনের লক্ষণ দেখা দেয়ায় ভারি কাজ করা আমার এমনিতেই নিষেধ ছিল। এর মধ্যেই প্রমিতিকে পড়ালেখায় সাহায্য করতাম। বই পড়তাম। আমার লেখালেখির অভ্যাস আছে। সেটাও টুকটাক চালিয়ে যেতে লাগলাম।

এর মধ্যেই সুখবর এলো। ২০১৯-এর একুশের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে আমার প্রথম বই -মননকথা ভ্রমণগাথা। বইটি মূলত সমাজ, আধুনিক জীবনের বৈচিত্র্য, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুর বিকাশ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও তাদের উন্নয়ন বিষয়ক আমার অনুভাবনা এবং ভ্রমণ কাহিনীর সংকলন। ভেবেছিলাম বইটা প্রকাশিত হওয়াকে কেন্দ্র করে অনেকবার বইমেলায় যাবো। বইটির প্রকাশনা সংস্থা কথাপ্রকাশের স্টলে হেবি ভাব নিয়ে বসে থাকবো। দুই/একজন বন্ধুবান্ধব আমার বইটা কিনলে অটোগ্রাফ দিবো, সেলফি তুলবো। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণের কারণে সেই ইচ্ছেয় ভাটা পড়লো। বইমেলা যাওয়া আর সেখানে অবস্থান করার যে ঝক্কি তা আমার শরীর নিতে পারবে না। তারপরও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে দুদিন বইমেলায় গেলাম। শাড়ি পরে সাজগোজও করলাম। তবে যাওয়ার আগে বইমেলা বিষয়ক এক্সপেকটেশনকে প্রায় শূন্যতে নামিয়ে আনলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম প্রতিবারের মতো পুরো বইমেলা ঘুরে দেখার চেষ্টা করবো না। বেশিক্ষণ থাকতে না পারলে বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা না হলে মন খারাপ করবো না।

প্রথম দিন শাহবাগ যেতে উবারে সময় লাগলো প্রায় তিনঘন্টা। সেখানে দেখলাম বিশাল জ্যাম। গাড়ি নিয়ে টিএসসি পর্যন্ত যেতে গেলে আরও কয় ঘন্টা লাগবে কে জানে! উবার ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘপথ আস্তে আস্তে হেঁটে বইমেলায় গিয়ে পৌঁছালাম। বইমেলা বন্ধ হওয়ার তখন আর মাত্র আধঘন্টা বাকি। গাড়িতে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা এবং এতটা পথ হাঁটা – দুটোই আমার জন্য বেশ কঠিন কাজ ছিল। তারপরও নিজের লেখা বই হাতে নিতে পেরে সব কষ্ট ভুলে গেলাম। ভীষণ ভালো লাগছিলো। দ্বিতীয়বার অবশ্য বইমেলা যেতে সময় কম লেগেছিল। ঘোরার জন্য যথেষ্ট সময়ও পেয়েছিলাম। কিন্তু বইমেলার কোথাও বসে একটু রেস্ট নিবো এ রকমর কোন সুবিধাজনক জায়গা পাইনি। দুই/একটা জায়গা যাও ছিল, সেখানে অসংখ্য মানুষ ঠেলাঠেলি করে বসে আছেন। অন্যদিকে বইমেলায় টয়লেটের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু সংখ্যায় খুবই কম। লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয়। টয়লেটগুলো মোটেও শিশু, নতুন মা গর্ভবতীদের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য নয়। সামগ্রিকভাবে বলা যায় যে একুশের বইমেলার আয়োজন এখন অনেক গোছানো হয়েছে বটে, কিন্তু সেখানে গর্ভবতীদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা নেই। শারীরিকভাবে স্টেবল, নিজের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন এবং আত্মবিশ্বাসী না হলে গর্ভাবস্থায় একুশের বইমেলায় যাওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
তারপরও যতটুকু সময় বইমেলায় থাকতে পেরেছি তা নিয়ে আমি সন্তুষ্ট। বইমেলায় আমার একটা বই বেরিয়েছে, কিছু মানুষ ভালোবেসে নিজে থেকেই বইটি কিনেছেন এটা আমার মতো ক্ষুদ্র একজন লেখকের জন্য অনেক বড় পাওয়া।

পর্ব ৩

জানুয়ারি মাসের ৩১ তারিখ আমার ভারতে যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে তৃণমূলে কাজ করা ভারতীয় এনজিওদের একটি সম্মেলনে কীনোট প্রেজেন্টেশন দেওয়ার জন্য অফিসের হায়ার ম্যানেজমেন্ট আমাকে র্নিবাচিত করেছে। আমি একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বেসরকারি সংস্থায় কাজ করি। কোনো সম্মেলনে এই সংস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করা নিঃসন্দেহে অনেক বড় সুযোগ। কিন্তু গর্ভধারণ এবং বেডরেস্টে থাকার কারণে সুযোগটা এক সহকর্মীর কাছে হ্যান্ডওভার করতে হয়েছিল। তবে দুঃখ পাইনি। মনে মনে ভেবেছি সামনে নিশ্চয় এ রকম আরও সুযোগ পাবো। অনাগত সন্তানকে পৃথিবীতে সুস্থভাবে আনতে পারাই এখন আমার অন্যতম দায়িত্ব। মেয়েদের ক্যারিয়ারের পথে আস্তে আস্তে হাঁটতে হয়, এটাই নিয়ম। এটা পেলাম না, ওটা হলো না – এভাবে আফসোস করে মনের উপর চাপই শুধু বাড়ে, শান্তি নষ্ট হয়। বরং পথের বন্ধুরতা মেনে নিয়ে এগোতে থাকলে এক সময় অর্জনের মুকুটে নিশ্চয় অনেক পালক যুক্ত হবে।

এদিকে জানুয়ারি মাসে সারা বিশ্ব জুড়ে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়। ৮ই মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয়। আমি গর্ভবতী। শুরুর দিকে স্পটিং হওয়ায় এমনিতেই সাবধানে থাকতে হয়। তাছাড়া চট্টগ্রাম থেকে আব্বু-আম্মু আমার বাসায় এসেছেন। আব্বু কিডনি রোগী। শরীর আবারও খারাপ হওয়ায় ঢাকায় ডাক্তার দেখাচ্ছেন। সপ্তাহে দুই বার তাঁকে ডায়ালাইসিস করতে হয়। ফলে আম্মুসহ তাঁকে নিয়মিত হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। অর্থাৎ আমাদের বাসায় সে সময় আমরা দুজন মানুষ ছিলাম যারা সরাসরি করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে পড়ি। বয়স আর নিয়মিত হাসপাতালে আসা-যাওয়া করার কারণে আম্মুও বিপদমুক্ত নয়। তাই প্রথম থেকেই আমরা বিশ্বের করোনা পরিস্থিতির দিকে অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য রাখছিলাম।

মার্চ মাসের শুরু থেকেই আমার অফিসে বৃহৎ পরিসরে করোনা মোকাবিলায় সারা দেশব্যাপি কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি শুরু হলো। অফিস বন্ধ ঘোষণা করা বিষয়ে আলোচনাও চলছিল। আমরা বুঝতে পারছিলাম যে করোনাভাইরাস আমাদের দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। চারপাশে সবার মধ্যে চাপা আতংক অনুভব করছিলাম। উবারে অফিস যেতে বেশ টেনশন হতো। অফিসের ভেতর সারাদিনে অসংখ্যবার হাত স্যানিটাইজ করতাম। সবার অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে অফিসের ওয়াসরুমগুলোর লিকুইড সাবান দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছিল। ময়লার বিনগুলো মুহূর্তেই ব্যবহৃত টিস্যু পেপারে ভরে যেত। কয়েকদিনের মধ্যে লিফটে চারজনের বেশি উঠার উপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো।

মার্চের ১৮ তারিখ বাংলাদেশে প্রথম একজন ব্যক্তি করোনায়ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ঘটনাটা বেশ শকিং ছিল বটে। পারিবারিকভাবে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে মার্চ মাসের ২২ তারিখ আমরা আমাদের কন্যা প্রমিতির স্কুল যাওয়া বন্ধ করি। এদিকে সরকার যেকোনো সময় লকডাউনের ঘোষণা দেবে বলে শোনা যাচ্ছিল। অনেকেই প্রচুর পরিমাণে জিনিসপত্র কিনছিলেন। আমরা এভাবে স্টক করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করাকে অত্যন্ত নিম্ন মানসিকতার কাজ বলে মনে করি। যে কোনো জাতীয় সংকটে শুধু নিজের সুবিধার কথা না ভেবে অন্যদের কথাও ভাবা উচিত। প্রস্তুতিমূলকভাবে আমরা তাই দুই সপ্তাহের বাজার করে রাখলাম।

এদিকে আমার তখন গর্ভধারণের তিন মাস চলছে। একটু একটু করে জামাকাপড় টাইট হচ্ছে। মার্চের ২৩ তারিখ আত্মবিশ্বাসের উপর ভর করে গর্ভধারণের কথা জানার পর প্রথমবারের মতো শপিং মলে গেলাম। বেশি হাঁটাহাটি করা তখন এমনিতেই আমার নিষেধ, তার উপর ছিল শপিংমল থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার ভয়। তারপরও গেলাম, কারণ অন্যান্য দেশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল আমাদের এখানে একবার লক ডাউন শুরু হলে কবে তা শেষ হবে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। দীর্ঘদিন হয়তো বাসা থেকে বের হতে পারবো না। তাই নিজের জন্য বাসায় এবং বাইরে পরার মতো বড় সাইজের দুই/তিনটা করে জামা কিনলাম যেন গর্ভধারণের কারণে মোটা হয়ে গেলে তখন পরতে পারি। কন্যা প্রমিতির জন্যও জামা কিনলাম। ওর বাড়ন্ত বয়স আর ছবি আঁকাআকি করতে গিয়ে কাপড় প্রচুর নষ্টও করে। মাসের পর মাস বাসায় আটকা পরলে ওরও জামার সংকট হবে। এই সিদ্ধান্তটা অত্যন্ত সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, কারণ মার্চের ২৬ তারিখ থেকে সারাদেশ জুড়ে লক ডাউন শুরু হয়েছিল। জামাগুলো কিনে না রাখলে পরবর্তী ছয় মাসে, বিশেষ করে প্রথম কয়েক মাস যখন দোকান-পাট সব বন্ধ ছিল সে সময় আমি ভীষণ বিপদে পড়তাম।

এপ্রিল মাসে দেশের পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে। হাসপাতালে তখনও করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সেই সঙ্গে রয়েছে অক্সিজেন সিলিন্ডার, পিপিই ও অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী ইত্যাদির প্রবল সংকট। শোনা যাচ্ছিল কোভিড ওয়ার্ডগুলোতে রোগীদের ফেলে রাখা হয়। ডাক্তার বা নার্সরা তাদের স্পর্শ করেন না। একদিকে জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ মাস্ক পরে না, অন্যদিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অনেক পরিবার রাস্তায় বা হাসপাতালে ফেলে রেখে চলে যাচ্ছেন। সে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি! করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে আমার আব্বুর জন্য এমন ব্যবস্থা লাগবে যেখানে তাঁর করোনা রোগের চিকিৎসা এবং ডায়ালাইসিস এক সঙ্গে চলবে, যা দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর প্রথম দিকে অসম্ভব একটা ব্যাপার ছিল। আমি এই রোগে আক্রান্ত হলে আমার কষ্ট হবে অন্য রোগীদের চেয়ে বেশি। তাছাড়া গর্ভবতী নারীর উপর করোনাভাইরাসের প্রভাবও ছিল অজানা। অন্যদিকে আব্বু বা আম্মু যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাহলে তাঁর দেখাশোনা করার জন্য প্রয়োজনীয় সার্পোট আমি দিতে পারবো না। আমার বর অমিতের পক্ষেও করোনা রোগী আর আমার দেখভাল এক সঙ্গে করা সম্ভব হবে না। আর কোনভাবে যদি অমিতের করোনা হয় তাহলেতো আমরা পুরো পরিবারই ভীষণ বিপদে পরে যাব। কারণ এটা এমন একটা রোগ, এতে আক্রান্ত হলে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন কাউকেই হয়তো স্বশরীরে পাশে পাওয়া যাবে না।

সম্ভাব্য সংকটের একটা কালো মেঘ যেন আমাদের পুরো পরিবারকে ঘিরে ধরেছিল। তবে মানসিকভাবে আমরা সবাই যথেষ্ট শক্ত। অতিরিক্ত টেনশন না করে বরং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাকেই আমরা বেশি প্রয়োজনীয় বলে মনে করলাম। টিভি, পত্রিকা বা অনলাইন মিডিয়ায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে সে বিষয়ে ধারণা নিয়ে আমরা সেই মার্চ মাস থেকে এখন পর্যন্ত বাহির থেকে বাসায় ফেরার পর গোসল করা ও কাপড় ধোয়া, ক্রয়কৃত পণ্য সঠিক পদ্ধতিতে পরিষ্কার করা, মাস্ক ও স্যানিটাইজার নিয়মিত ব্যবহার করা, একদম বাধ্য না হলে বাইরে না যাওয়া, ইত্যাদি সব রকমের নিয়ম অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পালন করে চলেছি। আর এই কাজগুলো নিশ্চিত করার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমার মা এবং অমিতের। আমার বাসার স্থায়ী গৃহসহকারী মেয়েটি পুরো সময় ধরে যে অপরিসীম পরিশ্রম করেছে তারও কোনো তুলনা নেই। খণ্ডকালিন গৃহসহকারিকে ছুটি দেওয়ায় এবং আব্বু এবং আমার শারীরিক অবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার জন্য এই তিনজন মানুষকে ঘর-বাড়ির সব সামলে আরও অনেক অতিরিক্ত কাজ করতে হয়েছে।

পর্ব ৪

এত সাবধানতা অবলম্বন করার পরও অমিত, অর্থাৎ বাড়ির অন্যতম প্রয়োজনীয় সদস্যটিকে এপ্রিল মাসেই আইসোলেশনে যেতে হলো। অমিত ক্রীড়া সাংবাদিক। টিভি চ্যানেলে কাজ করে বিধায় তার অফিস অন্য অফিসগুলোর মতো বন্ধ হয়নি। রোটেশন করে সব কর্মীকে অফিস করতে হয়। এপ্রিল মাসের শুরুতে ওর এক সহকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। অমিত সে সময় করোনার কারণে একদিন অফিসে যায়, আর পরেরদিন ওয়ার্ক ফ্রম হোম করে। অমিত ঐ সহকর্মীর সংস্পর্শে এসেছিল। তাই ওসহ ঐ সহকর্মীর সংস্পর্শে আসা সকল কর্মীকে অফিসের হায়ার ম্যানেজমেন্ট হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠায়। যদিও অমিতের কোনো সিম্পটম ছিল না, তারপরও আইসোলেশনের সব নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ও আলাদা একটি রুমে ছিল। আমরা তেমন টেনশন করিনি, তবে আমাদের আত্মীয়-স্বজন কাউকেও এ বিষয়ে কিছু জানাইনি। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর প্রথম দিক হওয়ায় সে সময় আতঙ্কের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। অযথা প্যানিক তৈরি হতো। অমিতের করোনা টেস্ট করানোর জন্য বাসায় গোপনে লোক ডেকে আনা হয়েছিল। কারণ প্রথমদিককার পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল। বাসায় করোনা টেস্ট করার জন্য কেউ এসেছে জানতে পারলে আমাদের বিল্ডিংবাসীর মনে অকারণ ভীতির সৃষ্টি হতে পারে বা প্রতিবেশীরা রিএ্যাক্ট করতে পারে এ রকম একটা সম্ভাবনা আমাদের মনে কাজ করছিল।

অমিতের করোনা টেস্টের রেজাল্ট নেগেটিভ আসে। আমরা সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছিল। প্রতিদিনই অনেক মানুষ মারা যাচ্ছিলেন। এর মধ্যে খবর পাই আমার খুবই প্রিয় একজন সহকর্মী মারিয়া আপু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ওনার অবস্থা খুব খারাপ ছিল। আইসিইউতে অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে রাখা হয়েছিল। তাঁর অসুস্থতার কথা শোনার পর আমি মনে মনে খুব মুষড়ে পরি। তবে আমার মানসিক অবস্থা কাউকে বুঝতে দেইনি। প্রাণপন চেষ্টা করে নিজেকে শান্ত রেখেছিলাম। মারিয়া আপুকে প্লাজমা দেওয়া হয়েছিল। উনি খুব ধীরে ধীরে সুস্থ্যও হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মারিয়া আপু ভালো হয়ে বাসায় ফিরতে পারেননি। শুনেছি গভীর রাতে তাঁর অক্সিজেনের সিলিন্ডার খালি হয়ে গিয়েছিল। কেউ সেটা লক্ষ্য করেনি। এখনও চোখ বন্ধ করলে কল্পনায় দেখতে পাই, মারিয়া আপু অক্সিজেনের জন্য ছটফট করছেন। সাহায্যের জন্য চিৎকার করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু তার আশেপাশে কোনো ডাক্তার বা নার্স নেই। তাঁর মৃত্যুতে আমার মনে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তা কখনও পূরণ হবার নয়। আপু সিঙ্গেল মাদার ছিলেন। তাঁর দুটো ছেলে-মেয়ে মায়ের কাছেই থাকতো। জানি না এই এতিম বাচ্চা দুটো এখন কোথায় কার কাছে আছে!

করোনাকালে আরেকজন মানুষের মৃত্যুতে আমাদের পুরো পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, লেখক এবং জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। আনিসুজ্জামান স্যার ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। আমার আব্বু আনিস স্যারের প্রিয় ছাত্র ছিলেন। তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমাদের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। স্যার আমার প্রথম বই – মননকথা ভ্রমণগাথা-এর মুখবন্ধ লিখে দিয়েছিলেন। এই কাজটির জন্য ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে কয়েকবার স্যারের বাসায় গেছি। আনিসুজ্জামান স্যার বাংলাদেশের গর্ব। অথচ উনি অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ফোনে ওনার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া ছাড়া আর কিছুই আমরা করতে পারিনি। ড. আনিসুজ্জামান মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন এটা জানার পরও হাসপাতালের করিডোর বাংলাদেশের অসংখ্য জ্ঞানীগুণি মানুষের পদচারণায় ভরে যায় নি। উনি মারা যাবার পর ওনার পরিবারের দুইজন সদস্যের উপস্থিতিতে বিশেষ ব্যবস্থায় স্যারকে কবর দেওয়া হয়। পরিবারের সব সদস্যও স্যারকে শেষবারের মতো দেখতে পায় নি। তাঁর মরদেহ শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য তাঁর প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আনা হয়নি। অথচ স্যারের শেষ বিদায় এবং জানাজায় মানুষের ঢল নামার কথা ছিল। ওনাকে নিয়ে অসংখ্য স্মরণসভা হওয়ার কথা ছিল। করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রথমদিক হওয়ায় তখন মানুষের মনে ভীতি এবং নিয়মের কড়াকড়ি এত বেশি ছিল যে এ সবকিছুই হলো না। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ একে একে আরও অনেক বরেণ্য ব্যক্তিতে হারিয়েছে। কিন্তু তাদের সবার ক্ষেত্রেই শেষবিদায় জানানোর নিয়মকানুন অনেক শিথিল ছিল। একমাত্র আমার প্রিয় আনিসুজ্জামান স্যার চলে গেলেন নিভৃত নিরবে।

পরবর্তী কয়েক মাসে অনেক পরিচিত মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে খুবই কষ্টকর সময় পার করেছেন। অনেকের প্রিয়জন বিশেষ করে বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়রা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এই মহামারি সত্যিই বদলে দিয়েছে অনেকের জীবন। আমরা সবাই উপলব্ধি করছিলাম করোনাকাল শেষ হওয়ার পর আমাদের জীবন আর কখনো আগের মতো হবে না। একটু একটু করে আমরা এগিয়ে চলেছি নিউ নরমাল যুগের দিকে।

আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে
বসন্তের বাতাসটুকুর মতো
সে যে ছুঁয়ে গেল, নুয়ে গেল রে-
ফুল ফুটিয়ে গেল শত শত।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পর্ব ৫

লকডাউন শুরুর পর থেকে আমার দ্বিতীয় কন্যার জন্ম গ্রহণের আগ পর্যন্ত পুরোটা সময় বাসায় বসে অফিস করেছি, যাকে বলে ওয়ার্ক ফ্রম হোম। একদিক থেকে অফিসে না যাওয়াটা আমার জন্য ভালোই হয়েছিল। আমি অনেক রিল্যাক্স ছিলাম। যথেষ্ট পরিমাণে বিশ্রাম নিতে পারছিলাম। তবে আমার সংস্থা দেশব্যাপী করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলার কাজে নিয়োজিত ছিল তাই কাজের চাপ ছিল অনেক বেশি। ড্রইংরুমের বারান্দার পাশে আমার ওয়ার্ক স্টেশন বসিয়েছিলাম। সেখানে বসে প্রায় বিরতিহীনভাবে সারাদিন কাজ করতাম। এত কাজের প্রেসার নেওয়াটা বেশ কঠিন ছিল তবে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় কাজ করছি, এর মধ্যে এক ধরণের মানসিক প্রশান্তিও ছিল। তাছাড়া ওয়ার্কফ্রম হোম করা না লাগলে আমরা মতো কাজ পাগল মানুষের জন্য মাসের পর মাস বাসায় বসে থাকা খুবই কঠিন হতো। কাজের প্রয়োজনে সে সময় সারা দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে যে ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে সময় পার করছিলেন সে বিষয়ে নিয়মিত আপডেট পেতাম। দেশব্যাপি দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করার জন্য যে কার্যক্রমগুলো চলছিল সেগুলোরও খবর রাখতাম। ফলাফলস্বরুপ আশেপাশের মানুষ যখন নিজের এবং পরিবারের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রবল আতংকে ভুগছিল, আমার দুশ্চিন্তা তখন পরিবার পরিজনকে ছাড়িয়ে দেশের দরিদ্র এবং নিম্নবিত্ত মানুষের দুঃখ, দুর্দশায় ভারাক্রান্ত হয়ে থাকতো। একইসঙ্গে সংকটকালে মানুষ যেভাবে মানুষের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছিল, সেই ঘটনাগুলোও মুগ্ধ হয়ে অবলোকন করতাম। সাধারণ মানুষ বিশেষ করে তরুণরা যেভাবে এই সংকটকালে নানা ধরনের স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, তা সত্যিই প্রশংসাযোগ্য।

সেসময় আমাদের বাসায় মাসের পর মাস যতটুকু না খেলেই নয় ততটুকুই রান্না হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বা সৌখিন কেনাকাটা থেকে আমরা বিরত ছিলাম। এপ্রিল মাসে আমি সিদ্ধান্ত নেই প্রতিমাসে আমার বেতনের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ লকডাউনের কারণে অভাব-অনটনে আছেন এ রকম মানুষের সহায়তায় ব্যয় করবো। সেই অনুযায়ী এখন পর্যন্ত অনেক ব্যক্তি এবং সংগঠনের কাছে অর্থ দান করেছি। আমার যদি সুযোগ থাকতো তাহলে অবশ্যই আমি নিজেই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সরাসারি এ ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিতাম। কিন্তু গর্ভবতী হওয়ার কারণে তা সম্ভব হয়নি। আর্থিক সহায়তা দিয়েই আমাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। তবে এই কাজটি করতে পেরে নিজের কাছে ভীষণ ভালো লেগেছে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যতদিন পর্যন্ত সম্ভব আমি প্রতি মাসে আমার বেতনের একটি অংশ মানুষের সেবায় দান করে যাবো। শুধু আমি নই, আমার বর অমিতও বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের আর্থিক সহায়তা দান এবং অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের কন্যা প্রমিতিকেও করোনাকালের এই সংকটে অনেক মানুষ কতটা কষ্টে আছে তা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। সেও তার জমানো টাকা থেকে অনুদান দিয়েছে, যা মা হিসেবে আমার কাছে অত্যন্ত গর্বের একটি ঘটনা।

করোনাভাইরাস মহামারির দিনগুলোতে অফিসের কাজের পাশাপাশি আর দুটো কাজে আমি আমরা পুরো মনোযোগ নিবদ্ধ করেছিলাম। প্রথমত, কন্যা প্রমিতিকে নানা রকম সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখা যেন তার সময় ভালো কাটে। ও যেন গ্যাজেট নির্ভর হয়ে না যায়। এই লক্ষ্যে ওকে আমরা প্রচুর পরিমাণে ছবি আঁকার সরঞ্জাম এবং রঙিন কাগজ কিনে দেই। ইউটিউব থেকে কাগজ দিয়ে ক্রাফট বা ওরিগামি বানানো শিখতে উৎসাহ দেই। চমৎকার ফলাফলও পাই। প্রমিতি আস্তে আস্তে ওরিগামি বানাতে দক্ষ হয়ে ওঠে। একটা অনলাইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্ট প্রদর্শনীতে ওরিগামি প্রদর্শনের জন্য ও সিলেকটেড হয়। তাছাড়াও প্রথমদিকে যখন দোকানপাট সব বন্ধ ছিল, তখন মানুষের পাশাপাশি পশুপাখিদেরও খাবারের অভাব দেখা দিয়েছিল। আমরা প্রমিতিকে উৎসাহ দেই প্রতিদিন আমাদের বারান্দায় পাখিদের জন্য চাল ছিটিয়ে রাখতে। এখন পর্যন্ত প্রমিতি পাখিদের খাবার দেওয়ার কাজটি করে চলেছে। আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, খাবার খেতে আসা চড়ুই বা শালিক পাখিরা এখন আমাদের একটুও ভয় পায় না। আমরা বারান্দাতে গিয়ে দাঁড়ালে তারা উড়ে যায় না, বরং হাতের কাছে থাকা সত্ত্বেও নিশ্চিন্তে খুটে খুটে চাল খেতে থাকে।

আমাদের বাসার বারান্দায় অনেক গাছ। প্রমিতিকে আমরা গাছে পানি দিতেও উৎসাহ দিতাম। তাকে ফুল চেনাতাম। গৃহবন্দি দিনগুলোতে আমার মনে প্রশান্তি এনে দিয়েছিল আমাদের বারান্দায় রাখা গাছগুলো। আমি গাছ খুব ভালোবাসি। কিন্তু বারান্দায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার মতো সময় লকডাউনের আগে কখনও মেলেনি। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি বারান্দায় রাখা ছোট টবগুলোতে কত শত ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকে। কোন এক টবের গাছে প্রথমে ছোট্ট কুঁড়ি দেখা যায়, আস্তে আস্তে সেই কুঁড়ি থেকে ফুল ফোটে। ঠিক সেই সময়ে হয়তো আরেকটি টবে নিজে নিজেই একটা নতুন চারা গজায়। প্রকৃতির এই অসাধারণ জীবনচক্র দেখলে মনে হয় অকারণেই আমরা এত যান্ত্রিক জীবনে নিজেদের শপে দিয়ে যন্ত্রে পরিণত হয়েছি। আমরা শুধু নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিয়েই চিন্তা করি। অন্যের দুঃখ-কষ্ট-বেদনায় আমাদের কিচ্ছুটি আসে যায় না। অথচ প্রকৃতিতে অন্য প্রাণীরা কী সুন্দর মিলেমিশে বসবাস করে। সে সময় আমি প্রতিদিন কিছুটা সময় বারান্দায় বসে থাকতাম, আর মনে মনে ভাবতাম আমার অনাগত সন্তানটি যেন প্রকৃতিকে আর তার সৃষ্টিকে ভালোবাসে। সে যেন ইট পাথরের সভ্যতার আরেকজন যান্ত্রিক মানুষ না হয়।

আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।
অসীম কালের যে হিল্লোলে জোয়ার-ভাঁটার ভুবন দোলে
নাড়ীতে মোর রক্তধারায় লেগেছে তার টান,
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পর্ব ৬

আমার এক্সপেকটেড ডেলিভারি ডেট ছিল সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে। তবে আগস্ট মাসের শুরুতে কিছু শারীরিক সমস্যা বাড়তে শুরু করায় বুঝতে পারছিলাম হয়তো ডাক্তার আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে রাজি হবেন না। সিজার করে ফেলবেন। ডায়বেটিস থাকায় প্রমিতির জন্মও সিজারের মাধ্যমে নির্ধারিত তারিখের ২০দিন আগে হয়েছিল।
হালকা প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। আগস্ট মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত কাজ করতে পারবো ধরে নিয়ে অফিসের কাজ গোছাতে লাগলাম। অনলাইন থেকে দুটো আনস্টিচ থ্রিপিস কিনলাম। মাঝখানে অমিত রিস্ক নিয়ে আড়ং গিয়েছিল আমার জন্য বড় সাইজের কয়েকটা জামা কিনতে। কারণ গর্ভধারণের প্রথমদিকে যে জামাগুলো কিনেছিলাম মুটিয়ে যাওয়ায় সেগুলোর মধ্যে কিছু আর গায়ে লাগছিল না। বাকিগুলো ব্যবহার করতে করতে নষ্ট হয়ে গেছিল। এতদিন অমিতের কেনা জামাগুলোই পরেছি। কিন্তু বেবির জন্মের পর একটু শুকিয়ে যাবো তাই ছোট সাইজের জামা বানাতে হবে। বাসার পাশের গলিতে একজন দর্জিকে খুঁজে বের করা হলো। ওনার কাছে মূলত নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা কাপড় বানায়। তিনি আমার জামা দুটোসহ, দুটো ম্যাক্সি আর বেবির জন্য অল্প কয়েকটা কাঁথা, জামা ও ন্যাপি বানিয়ে দিলেন। সেইসব কাপড়ের কোনটা সাইজ ঠিক হয়, কোনটার হয় না। ওনার কেনা কাপড়ের কোনটার ডিজাইন ভালো, কোনটার ভালো না। আমাদের বাসা আর ওনার মধ্যে কাপড় আনা-নেওয়ার পুরো কাজটি করলো আমাদের বাসায় কাঁচা বাজার দিয়ে যায় যে ছেলেটি, সে। আম্মু পুরো কাজটা ফোনে নির্দেশনা দিয়ে সম্পন্ন করলেন। আমরা খুব ভাগ্যবান যে আমাদের বিল্ডিং-এর গার্ড, ক্লিনার, বাসায় বাজার দিয়ে যাওয়া ছেলেটা – এরা সবাই অত্যন্ত ভালো। লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ওরাই আমাদের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে মূল সংযোগ। আমাদের সকল কেনাকাটার ৯০ ভাগ তারাই করে থাকেন।

মন বলছিল বেবি হওয়ার পর যদি কোনো কারণে প্রথম কয়েকমাস আমার অনলাইনে কেনাকাটা করার মতো অবস্থা না থাকে তাহলে অমিত আর প্রমিতির নিত্যপ্রয়োজনীয় জামাকাপড় নিয়ে সমস্যা হতে পারে। তাই আমি ওদের জন্যও কিছু কাপড়চোপড় কিনলাম। একদিন বিভিন্ন পেজে স্ক্রল করতে করতে একজোড়া ছোট বালার উপর চোখ আটকে গেলো। হঠাৎ মনে হলো শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে আমি যদি মরে যাই, তাহলে প্রমিতিকে এরকম বালা কে কিনে দিবে! সঙ্গে সঙ্গে অর্ডার প্লেস করলাম। এভাবে সশরীরে কোনো কেনাকাটা না করেও আমরা যতটুকু সম্ভব ততটুকুর মধ্যেই কিছু প্রস্তুতিমূলক কেনাকাটা করলাম। একটি শিশুকে পৃথিবীতে আনাই এখন সবচেয়ে বড় কাজ। বাকিটা পরে দেখা যাবে।

এতদিন প্রতি মাসে একবার করে ভিডিওকলে ডাক্তার দেখাচ্ছিলাম। মাঝে দুই/তিনবার আল্ট্রাসনো আর অন্যান্য টেস্ট করাতে হাসপাতালে বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছিল। যেহেতু বাসা থেকে একদমই বের হতাম না, সে সময় তাই অভ্যাস না থাকায় ভারী শরীর নিয়ে হাসপাতালে হাঁটাহাঁটি করতে কষ্ট হতো। তার উপর মুখে মাস্ক, চোখে চশমা পরা অবস্থায় দীর্ঘসময় সেখানে থাকতে দমবন্ধ লাগতো। বার বার হাত স্যানিটাইজ করতাম, বসার সময় অন্যদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করতাম। মুখ থেকে মাস্ক খুলতাম না। হাসপাতালে খুব প্রয়োজন না হলে পানি খেতাম না, টয়লেটেও যেতাম না। মোট কথা সেখানে যতক্ষণ থাকতাম সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতাম যেন কোনোভাবেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত না হই।

আগস্টের ৭ তারিখ অনলাইন কনসালটেশনের সময় আমার গাইনোকোলজিস্ট মেডিক্যাল টেস্টের রিপোর্ট দেখে জানালেন, এখন পর্যন্ত আমার শারীরিক অবস্থা মোটামুটি স্টেবল আছে, তবে সামনের দিনগুলোতে রিস্ক ফ্যাক্টর তৈরি হতে পারে। তিনি বললেন, তাঁর মতে এ রকম অবস্থা থাকতে থাকতেই বেবির ডেলিভারি করে ফেলা ভালো। তাছাড়া কোনভাবে যদি আমি কোভিড পজেটিভ হয়ে যাই তাহলে সামনের দিনগুলোতে নানা ধরনের জটিলতাও তৈরি হবে। সেক্ষেত্রে হাসপাতাল এবং ডাক্তারও বদলানোর লাগবে। আমার প্রথম সন্তান প্রমিতিও সিজারিয়ান বেবি। তাছাড়া ডায়বেটিস থাকায় এই বেবিও নরমাল ডেলিভারি হবে না তা আগেই জানতাম। তারপরও ৩৭ সপ্তাহে যে বেবি জন্ম নেবে সে একদম প্রিমেচিউর না হলেও একটু আগে আগে জন্ম নেওয়ার কারণে তার হয়ত কিছু এক্সট্রা কেয়ার লাগতে পারে। এই বিষয়টি নিয়ে আমরা একটু চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আমরা দ্রুত সিজার করতে রাজি হই।

পর্ব ৭

বেবির জন্ম নির্ধারিত সময়ের একটু আগে হতে পারে এ বিষয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু এত আগে আর এভাবে হুট করে বিনা নোটিসে তার জন্মের সময় হয়ে যাবে তা অপ্রত্যাশিত ছিল৷ দর্জিকে দিয়ে দু/একটা কাপড় সেলাই করা ছাড়া আর কোনো প্রস্তুতিই আমাদের ছিল না। অফিসের কাজ যদিও প্রায় গুছিয়ে এনেছিলাম তারপরও এত কম সময়ে কাজ হ্যান্ডওভার করাটা কঠিন ছিল। ফলে আমাদের গৃহবন্দি জীবনে অনেক মাস পর হঠাৎ করে হুড়োহুড়ি পরে গেলো। সিজার করতে হলে সবার আগে কোভিড টেস্ট করতে হবে। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়ে দেখলাম সরকারি বুথগুলোতে টেস্ট করলে রিপোর্ট হাতে পেতে কয়েকদিন লাগবে। কিন্তু ডাক্তার বলেছেন, ‘আগামীকাল টেস্ট করিয়ে পরশু আমাকে রেজাল্ট জানাবে।’ অতএব বেশি টাকা খরচ করে বেসরকারি হাসপাতালে টেস্ট করালাম। সেখানে লোকজন যেভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে টেস্ট করছিল তাতে মনে হচ্ছিল এখানে বেশিক্ষণ থাকলে আমি আর অমিত দুজনই করোনায় আক্রান্ত হয়ে যাব।
টেস্টতো করালাম। কিন্তু ডাক্তার বলেছেন কোভিড টেস্টের রিপোর্টের ভ্যালিডিটি যেদিন টেস্ট করা হয়েছে সেদিন থেকে শুরু করে চার দিন। তারমানে রেজাল্ট নেগেটিভ আসলে পরশু বা তার পরের দিন সিজার করা হবে। যেহেতু আমার করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণ নাই তাই পরশুর পরের দিন সিজার করাবো ধরে নিয়ে আমি পাগলের মতো অফিসের কাজ গুছাতে শুরু করলাম। অমিতও একদিকে অফিস করছে অন্যদিকে প্রস্তুতিমূলক কাজ করছে। দুই দিনের মধ্যে কোভিড নেগেটিভ রিপোর্ট পেয়ে তা ডাক্তারকে জানানো, তার কথা অনুযায়ি হাসপাতালে ভর্তির কাজ করা, ডায়াবেটিসের ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা, টুকটাক কেনাকাটা করা, দর্জিকে দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে বেবির বালিশের কভার, নরম রুমালসহ এটা-সেটা সেলাই করা, ইত্যাদি সব কাজ শেষ করা হলো। শেষের দিন আমার অফিসের কাজ শেষ করতে করতে রাত আটটা বাজলো। শরীরের উপর অনেক প্রেশার পরলেও ৬ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাওয়ার আগে অফিসকে কাজ বুঝিয়ে দিতে পেরেছি, এটা অনেক মানসিক স্বস্তি দিলো। একটু পর ব্যাগও গুছিয়ে ফেললাম। তেমন টেনশন হচ্ছিল না। শুধু রাতেরবেলা শুতে যাওয়ার আগে বাথরুমের আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হলো সকালে সিজার করার সময় যদি কোনো দুর্ঘটনা হয়, তাহলে আগামীকাল এ রকম সময়ে আমি এই পৃথিবীতে নাও থাকতে পারি। কথাটা ভেবে ঠিক ভয় লাগেনি, তবে বেশ অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল।

সকালে হাসপাতালে যাওয়ার পর ওরা সরাসরি অপারেশন থিয়েটারের পোস্ট অপারেটিভ রুমে নিয়ে গেলো। ঐ হাসপাতালের নিয়ম এখানেই সিজারের আগের প্রাইমারি চেকআপ করা, মাকে হাসপাতালের পোশাক পরানো ইত্যাদি কাজ করা হবে। আমার সঙ্গে সেখানে অমিত ছিল। আম্মুও আমাদের সঙ্গে গিয়েছিল। তবে ঐ একই সময়ে ঐ হাসপাতালে আব্বুর ডায়ালাইসিস হচ্ছিল। এটাও অনেক বড় একটা কাজ। রোগীর এ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে কাউকে না কাউকে থাকতে হয়। আম্মু তাই দু’জায়গাতে যাওয়া-আসা করছিল। আমি মানসিকভাবে বেশ শক্তই ছিলাম। পোস্ট অপারেটিভ রুম হওয়ায় কিছুক্ষণ পরেই উল্টাদিকের বেডে অপেক্ষমান এক বাবার কাছে একজন নার্স প্রথমে একটা বেবিকে হ্যান্ডওভার করলো। আধ ঘন্টা পর সদ্য সিজার হওয়া মাকেও এনে বিছানায় শুইয়ে দিলো। অপারেশন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন নতুন মা আর সদ্যজাত বেবি তার পরিবারের সান্নিধ্য পাচ্ছে, বিষয়টা আমার ভালোই লাগলো। অন্য এক হাসপাতালে বড় কন্যা প্রমিতির জন্মের পর আমাকে সারারাত পোস্ট অপারেটিভ সেকশনে রেখেছিল। সেখানে কোনো আত্মীয়ের ঢোকা নিষেধ। এত বড় একটা অপারেশনের পর স্বাভাবিকভাবেই আমি মানসিকভাবে অনেক ডাউন ছিলাম, ব্যথায় খুব কষ্ট হচ্ছিল। শুধু মনে হচ্ছিল অমিতের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারলে ভালো লাগবে। কিন্তু বহুবার অনুরোধ করার পরও নার্সরা ওকে ডেকে দেননি। এটা ঐ হাসপাতাল বিষয়ে আমার একমাত্র অভিযোগ! প্রবল অভিমান নিয়ে সেই কথা আমি এখনও মনে রেখেছি।

এক সময় ডাক্তাররা আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। কিন্তু ওটি শুরু হলো আরও দুই ঘন্টা পর। পরে শুনেছি হাসপাতালে ভর্তি একজন রোগী সেদিন অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে নিয়ে যমে মানুষে টানাটানি শুরু হয়ে গিয়েছিল। তাঁকে নিয়েই আমার ডাক্তার খুব ব্যস্ত ছিলেন। ডাক্তার ওটিতে ঢোকার আগে আগে আমাকে এ্যানেস্থেসিয়া দেওয়া হয়। প্রমিতির সময় সিজারের জন্য যখন আমাকে এ্যানেস্থেসিয়া দেয়, তখন খুব কষ্ট হয়েছিল। এবার তেমন কোনো কষ্ট হলো না। কিন্তু ডাক্তার ম্যাডাম ওটিতে ঢুকেই এটা-সেটা নিয়ে অন্যান্য ডাক্তার, নার্সদের ভীষণ বকাবকি করতে শুরু করলেন। আমি প্রমাদ গুনলাম। এত মেজাজ নিয়ে উনি অপারেশন করবেন কীভাবে! পরে ধারণা করেছি ঐ ক্রিটিক্যাল রোগীর চিন্তায় হয়তো উনি সেই মুহূর্তে মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিলেন।

অপারেশন ভালোভাবেই শুরু হলো। লোকাল এ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ায় সবকিছুই টের পাচ্ছিলাম। শরীরে অনেক চাপ অনুভব করছিলাম, কিন্তু ব্যথা পাচ্ছিলাম না। আমার ডাক্তারও ঠাণ্ডা মেজাজে কাজ করছিলেন। আমার স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের উপর অফিস থেকে পাওয়া সাইকোসোশ্যাল ট্রেনিং-এর কথা মনে পড়লো। আমি চোখ বন্ধ করে একমনে কল্পনা করতে লাগলাম আমি আবারও ভারতের মেঘালয়ে সেভেন সিস্টার ফলসে বেড়াতে গেছি। কল্পনায় আমি অপূর্ব সুন্দর সাতটি ঝর্ণা, সারি সারি পাহাড়, কয়েকশো ফুট নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী, বহুদূরে বাংলাদেশের সমতল ভূমি – এ সবই পরিস্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। ডাক্তাররা যখন আমার শরীর কেটে একটা মানবশিশুকে পৃথিবীতে আনার কঠিন কাজটি করছেন, তখন কিছুটা অস্বস্তির মধ্যেও (যেহেতু ব্যথা অনুভূত না হলেও ডাক্তাররা যা করছেন তার সবই টের পাওয়া যায়) আমি দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছি সেভেন সিস্টার ফলস এলাকায়। আমার মনে তেমন কোনো টেনশন নেই, শরীরে ব্যথা নেই। মেজাজ বেশ ফুরফুরে। হঠাৎ তীব্র চিৎকারের শব্দে বাস্তব পৃথিবীতে ফিরে এলাম। বুঝতে পারছিলাম ডাক্তারদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। ডাক্তার ম্যাডাম হাসিমুখে একটা ছোট্ট পুতুল আমার কাছে নিয়ে এলেন। তোয়ালে প্যাঁচানো পুতুলের চোখ বন্ধ, মুখে তখনও সাদা সাদা আঠালো কী যেন লেগে আছে। আমি মুগ্ধ চোখে আমাদের জীবনে আকাশ থেকে নেমে আসা অপ্রত্যাশিত উপহারের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে আমাদের দ্বিতীয় কন্যা, নাম তার ‘নকশি মেঘা’।

পর্ব ৮

সার্জারি শেষে আমাকে পোস্ট অপারেটিভ রুমে আমার বেডটাতে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে অমিতকে দেখলাম। একপাশে রাখা একটা ট্রের মতো পাত্রের ভেতর ছোট্ট নকশি মেঘা চিৎকার করে কাঁদছে। আমাকে বিছানায় শোয়ানোর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমার পুরো শরীর খিঁচুনি দিয়ে থরথর করে কাঁপতে শুরু করলো। আমি সব বুঝতে পারছি, কথা বলতে পারছি, কিন্তু শরীরকে থামাতে পারছি না। আমার অবস্থা দেখে অমিত খুব ভয় পেয়ে গেলো। এদিকে অমিতকে ‘ওনার মাথা চেপে ধরে রাখেন” – শুধু এ কথাটি বলেই নার্স চলে গেলেন। আমার মনে হচ্ছিল খিঁচুনির চোটে যে কোনো সময় আমার মাথার নার্ভ ছিঁড়ে যাবে। অমিত আমার মাথা চেপে ধরে রাখলো। সে কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। এমনিতেও আমাকে আনার কিছুক্ষণ আগে একজন নার্স এসে নকশিকে ট্রেতে রেখে চলে গেছেন। সে প্রচণ্ড কাঁদছে। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি অমিতকে কোনো রকমের ইন্সট্রাকশন দেননি। এমনি কী, ‘এটা আপনার বেবি’ – এই কথাটিও বলেনি। তখন থেকেই ও লস্ট অবস্থায় আছে।

কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর আমার খিঁচুনি নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে গেলো। নকশিও তখন কিছুটা শান্ত। পরে শুনেছি সিজার করার পর এ রকম শক নাকি অনেকেরই হয়। এই সময় আম্মু আব্বুকে নিয়ে এলো আমাদেরকে দেখাতে। আমার চিন্তায় ডায়লাইসিস চলা অবস্থাতে উনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। পরিস্থিতি তখন মোটামুটি স্থিতিশীল। সবার মাথা থেকে টেনশন নেমে যেতে শুরু করেছে। আত্মীয়-স্বজনদের ফোন করে নকশির কথা জানানো হলো। আমাদের ভাইবোনরা ভিডিও কলে পরিবারের নতুন অতিথিকে স্বাগত জানালো। সবার মুখে হাসি। তারপরও আমাদের বুকের এককোণে একটা চাপা ব্যথা ছিল। প্রমিতির জন্মের সময় হাসপাতাল ভরে গেছিল আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবে। ওকে দেখার পর সবার কত আনন্দ, মিষ্টি খাওয়া-খাওয়ি। অথচ এবার কেউ আসতে পারেনি। করোনা আমাদেরকে আমাদের প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সামনাসামনি আনন্দ ভাগাভাগি করতে দিলো না।

পোস্ট অপারেটিভ রুম থেকে খুব দ্রুতই আমাদের রুমে দিয়ে দেওয়া হলো। প্রথম রাতটা আমাদের জন্য বিশেষ করে অমিতের জন্য খুব কঠিন ছিল। নকশি ঠিকমতো মায়ের দুধ পাচ্ছিল না। শুধু কান্নাকাটি করছিল। অপারেশনের ফলে সৃষ্ট ব্যথা আর প্রচণ্ড ক্লান্তিতে আমিও দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। প্রায় পুরো রাতই অমিত নকশিকে কোলে নিয়ে হাঁটলো। আমার টেককেয়ারও করলো। আমরা মোট তিনদিন হাসপাতালে ছিলাম। সিজারিয়ান ডেলিভারি আসলেই খুব কষ্টকর। ব্যথার ইনজেকশন বা ওষুধের প্রভাব কমে আসতে শুরু করলে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হতো। এর মাঝেই আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে লাগলাম হাঁটাচলা করার, যেন যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি যেতে পারি। এক হাতে নকশি আর আমার সেবা করা অমিতের জন্য কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। আম্মু হাসপাতালে আসতো, তবে তাঁকে বাসায় আব্বুরও দেখাশোনা করা লাগতো। করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রমিতিকে হাসপাতালে আনা হয়নি। বাসায় প্রমিতির ফুপু এসেছে, তাকেও আমরা আসতে মানা করেছি। ওরা দুজন নকশিকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল।

নকশিকে নিয়ে যখন বাসায় ঢুকি তখন সেখানে আমাদের জন্য অনেক সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিল। ওর গৃহপ্রবেশ উপলক্ষে নানা-নানুর তত্ত্বাবধানে প্রমিতি এবং তার ফুপু রঙিন কাগজ কেটে ফুল, প্রজাপতি, নকশা ইত্যাদি বানিয়ে পুরো ঘর সাজিয়েছিল। একটা সুন্দর পোস্টার বানিয়েছিল, যেখানে নকশিকে স্বাগত জানিয়ে আমার আব্বুর লেখা একটা কবিতাও ছিল। তাছাড়া আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে নকশির জন্য শুভেচ্ছা বাণী সংগ্রহ করে সেগুলো হাতে লিখে এবং হাতেই বাইন্ডিং করে চমৎকার একটা বই বানানো হয়েছিল। আরও ছিল কেক কাটার আয়োজন। নবজাতককে নিয়ে বাসায় ফেরা এমনিতেই যেকোনো স্বামী-স্ত্রীর জন্যই অনেক আনন্দের একটা ঘটনা। প্রমিতিদের এত আয়োজন আমাদের আনন্দের মাত্রাকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল।

হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই নকশির জন্ডিসের ভাব ছিল। শিশু বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন নিয়মিত রোদে রাখতে আর দুইদিন পর জন্ডিস টেস্ট করে ওনাকে রেজাল্ট জানাতে। বাসায় আনার পরও নকশি অনেক কান্না-কাটি করতো, রাতে ঘুমাতো না। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম নতুন পরিবেশ আর মায়ের দুধ এখনও যথেষ্ট পরিমাণে না পাওয়ায় এমনটা হচ্ছে। তাছাড়া ও নির্ধারিত সময়ের একটু আগে জন্মেছে। তাই একটু ইনম্যাচিউরড ভাব এমনিতেই ওর মধ্যে ছিল। আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়তে চাইতো না। যাই হোক নির্ধারিত দিনে আমরা অনেক ভয়ে ভয়ে (করোনার কারণে) জন্ডিসের টেস্ট করতে নকশিকে আবার হাসপাতালে নিয়ে যাই। বাসায় ফেরার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই হাসপাতাল থেকে আমাদের কল করে জানানো হয় নকশির শরীরে জন্ডিসের মাত্রা অনেক বেশি। এক মুহূর্তও দেরি না করে ওকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।

আমাদের মাথায় যেন বাজ পড়লো। জানি নবজাতকদের এ রকম জন্ডিস হওয়াটা খুব কমন। ইনকিউবিটরে রাখলেই সাধারণত ঠিক হয়ে যায়। তারপরও মাত্র পাঁচ দিন বয়সী শিশু সন্তানকে ডাক্তারদের তত্ত্বাবধানে ছেড়ে দিতে হবে এটা ভেবে আমার মন ভেঙ্গে যাচ্ছিল। হাসপাতালে প্রথমে আমাদের যেতে হলো ইমার্জেন্সিতে। সেখানে অনেক কোভিড রোগী। ইমার্জেন্সির ডাক্তাররাই আমাকে বললেন, ‘আপনি বেবিকে নিয়ে একপাশে দাঁড়ান। হাঁটাহাটি করবেন না।’ সেখানকার কাজ যতটা সম্ভব দ্রুত শেষ করে আমরা পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে গেলাম। সেখানে ভর্তির সব প্রসিডিউর শেষ হলো, কিন্তু নার্সরা নকশিকে কোনোমতেই ইনকিউবিটরে রাখতে পারছিল না৷ আমি কোল থেকে নামালেই সে প্রচণ্ড কান্নাকাটি করে। এদিকে ডাক্তাররা পরীক্ষা করে জন্ডিস ছাড়াও আরও কিছু মাইনর সমস্যা খুঁজে পেলেন, যার কারণে নকশি ভালো নেই। এ কারণেই সবসময় ও এত কান্নাকাটি করছে। ওনারা সিদ্ধান্ত নিলেন নকশিকে এনআইসিইউ-তে স্পেশাল ইনকিউবিটরে রাখাবেন। ওনারা অবশ্য বলছিলেন হয়তো এক রাতের বেশি রাখা লাগবে না। তারপরও এতটুকু বাচ্চা কেমন করে মাকে ছাড়া থাকবে সেই চিন্তায় আমি ভেঙ্গে পড়েছিলাম। তার উপর এনআইসিইউ-এর কথা শুনে আরও ভয় পেয়ে গেলাম।

যিনি জীবনে একবার এনআইসিইউ-তে গিয়েছেন তিনিই শুধু বলতে পারবেন ছোট ছোট বেড আর আর ইনকিউবিটরের মধ্যে রাখা সদ্যজাত বেবিগুলোকে দেখলে কতটা কষ্ট লাগে। আর এক একটি বেবির বাবা-মা যখন ওদের দেখতে আসেন, ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেন তখন ওনাদের কষ্টগুলো যে কাউকে ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। এনআইসিইউতে গিয়ে আমাদের খারাপ মন তাই আরও খারাপ হলো। নকশিকে ওনারা ভেতরে নিয়ে গেলন আর বললেন, প্রতি চার ঘন্টা পর পর আমাকে ওকে খাওয়াতে হবে।

আমি সেদিন সকাল থেকে সদ্য সিজার হওয়া সেলাই না শুকানো পেট নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে নকশিকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় হেঁটেছিলাম। আম্মু আর অমিত আমাকে বার বার রেস্ট নিতে বলছিল। কিন্তু মায়ের মন কি আর এসব মানে? অনেক কষ্ট হচ্ছিল, তারপরও ঠিক করলাম আমরা হাসপাতালেই থাকবো। এক রাত থাকার জন্য একটা কেবিন ভাড়া করা হলো। আমি আর অমিত কেমন করে সেই রাত পার করেছি সেটা শুধু আমরাই জানি। সেইদিন বিকেল থেকে শুরু করে পরেরদিন দুপুর পর্যন্ত আমরা নির্দিষ্ট সময় পর পর এনআইসিইউতে গেছি নকশিকে দুধ খাওয়াতে, ওকে একটু দেখতে। শেষ রাত থেকে আমি আর কাটা পেট নিয়ে হাঁটতে পারছিলাম না। তখন অমিত আমাকে হুইল চেয়ারে করে নকশির কাছে নিয়ে গেছে। এনআইসিইউতে আমার আরেকজন মায়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। ওনার গর্ভধারণের ছয় মাস চলাকালে ওয়াটার বটল ফেটে গিয়ে ওনাদের বেবিটার জন্ম হয়েছে। গত দুই মাস ধরে বেবিটা এনআইসিইউতে আছে। সে নানান রকম শারীরিক জটিলতায় ভুগছে। ঐ বেবিটার মা আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনার বেবিকে নিয়ে চিন্তা করবেন না, ও একদিনেই সুস্থ হয়ে যাবে। কত বেবিকে ভালো হয়ে বাসায় চলে যেতে দেখলাম।’ কথাগুলো বলার সময় ওনার চোখে নিজ সন্তানের জন্য যে প্রবল কষ্ট ফুটে উঠেছিল, তা আমার মনে গভীর দাগ ফেলেছে।

নকশিকে সত্যি সত্যি ওরা পরের দিন হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়ে দেয়। জন্ডিসের পাশাপাশি ওর কান্নাকাটিও তখন কমে গেছে। জন্মের ছয়দিন পর আমার এই কন্যাটি প্রথমবারের মতো হাসে। যেন ও আমাদের বুঝিয়ে দেয়, ‘আমি ভালো আছি। আর কোনো ভয় নেই।’ আমাদের জীবনে স্বস্তি ফিরে আসে। আমরা অনুভব করি করোনাকালে একটি সুস্থ শিশু জন্ম দেওয়ার দুরূহ কাজটি আমরা অবশেষে সম্পন্ন করতে পেরেছি। আমাদের মনে হলো করোনাকে আমরা এখন আর ভয় পাই না।
সবচেয়ে কঠিন সময়টুকু আমরা পরিবারের সব সদস্য একসঙ্গে পার করে ফেলেছি। এখন নকশি মেঘা এসে গেছে। আমাদের আর কোনো ভয় নেই। টেনশন নেই। এখন যদি করোনা আমাদের ঘরে প্রবেশও করে তার বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত আমরা লড়াই করে যাবো। হয়তো ভাঙ্গবো কিন্তু মচকাবো না। কোনোভাবেই না।

উন্নয়ন পেশাজীবী এবং কলাম লেখক

শেয়ার করুন:
  • 148
  •  
  •  
  •  
  •  
    148
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.