পিতৃতন্ত্রের অন্যতম শিকার বউ-শাশুড়ি সম্পর্ক

তাসনুভা তাজিন ইভা:

আমার শাশুড়ি আমাকে খুব একটা পছন্দ করেন না। আর এই অপছন্দটা তিনি করেন আমার চেহারা দেখারও আগে থেকেই। একটা মানুষকে না চিনে, না জেনে এমনকি তার ছবি পর্যন্ত না দেখেই কেন কেউ তাকে অপছন্দ করবে? আমার ব্যাপারে শুধু একটা তথ্য জেনেই আমাকে অপছন্দ করার কারণ নিশ্চয়ই ঐ একটা তথ্যতেই আছে। আর সেই তথ্যটা হচ্ছে তাঁর ছেলে আমাকে ভালোবাসে।

আমি বরাবর জেনে এসেছি তুমি কাউকে ভালোবাসলে তার কাছের মানুষকেও তোমার ভালো লাগবে, কাছের মনে হবে। এর অন্যথা তখনই হয় যখন আমি ভয় পাই যে আমার ভালোবাসার মানুষের ভালোবাসায় অন্য একজন ভাগ বসাচ্ছে, আমার মানুষটা আর আমার থাকছে না। আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে কেউ নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু বললে যেমনটা লাগে আরকি! এরকম ঈর্ষার শিকার আমরা অনেকেই কখনও না কখনও হয়েছি। আবার কখনও কখনও আমরাই কাছের মানুষের ভালোবাসায় কাউকে ভাগ বসাতে দেখে ঈর্ষান্বিত হয়েছি। কিন্তু এই শাশুড়ি-বউ এর ব্যাপারটা কেবল ছেলে দূরে চলে যাওয়ায় কষ্ট পাওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটা বিভিন্নভাবে মানসিক অত্যাচার পর্যন্ত গড়ায় এবং চক্রাকারে চলতে থাকে। আমার দাদী শাশুড়ি হয়তো আমার শাশুড়িকে মানসিক অশান্তি দিয়েছেন, আমার শাশুড়ি হয়তো আমাকে মানসিক অশান্তি দিতেন, আমি হয়তো আমার পুত্রবধূকে মানসিক অশান্তি দেবো…এভাবে চলতে থাকবে।

অনেক পুরুষকে “মেয়েরা মেয়েদের শত্রু”, “মেয়েদের মধ্যে জেলাসি ব্যাপারটা অনেক বেশি” গোছের কথা বলতে শোনা যায়। এই ক্ষেত্রে হয়তো কথাটা একদিকে সত্যি হলেও এই যে একজন নারীকে আরেক নারীর প্রতিপক্ষ বানিয়ে রেখেছে তো পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমই। আমার শাশুড়ি তাঁর পুত্রের জীবনে অন্য নারীর আগমন মেনে নিতে না পারলেও আমার বাবা কিন্তু তাঁর জামাতাকে পেয়ে বেশ খুশি, গর্ব করে মানুষজনকে বলে বেড়ান কেমন অসাধারণ ছেলের সাথে তাঁর কন্যা ঘর বেঁধেছে। এখন কেউ হয়তো বলতে পারেন আমাকে নিয়ে গর্ব করার মতো অসাধারণ কিছু নেই, তাই শাশুড়ি আম্মা নারাজ। গর্ব করার মতো কিছু নেই, এটুকু সত্য বলে মেনে নিলেও শাশুড়ির ঘৃণার পাত্রী হওয়ার কারণ যে এটা নয় তা আমি শুরুতেই বলেছি। আমার চেহারা তাঁর কাছে অসুন্দর, বাস্তবে কিংবা ছবিতে আমার চেহারা দেখার আগ থেকেই।

আচ্ছা, এই গল্পটা তো আমার একার না। আমার বিবাহিত সব বন্ধু, চাচাতো ফুপাতো খালাতো মামাতো বোন, চাচাতো ফুপাতো খালাতো মামাতো ভাইদের বউ, চাচি, ফুপু, খালা, মামী, দাদী, নানী, মা সবার গল্প এটা। সবাই প্রথমে ঈর্ষান্বিত শাশুড়ির কটু কথার শিকার হই, এরপর সেই শিক্ষা নিজের পুত্রবধূর উপর প্রয়োগ করি। এই গল্পটা সবার জানা। এটা যে একটা খারাপ চক্র, এটাও সবাই মানি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশি শাশুড়িদের “রাক্ষসীটা আমার ছেলের মাথা খেয়েছে”, “আমার ছেলে শয়তানের পাল্লায় পড়েছে”, “আমার ছেলের তো এখনও বিয়ের বয়সও হয় নাই” গোছের উদ্ভট বাণী নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করা হয়। অথচ এটা মোটেই ঠাট্টার বিষয় না। আর যে শাশুড়ি এমন উদ্ভট কথা বলেন তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব সারকাজম দেখে নিজেকে শুধরে নেয়ার মতো চিন্তার হবেন না নিশ্চিতভাবে। কেউ কেউ এটা নিয়ে সিরিয়াসলিও কথা বলি আমরা। তবু এটা চলতেই থাকে যুগের পর যুগ। যেন একটা প্রথা।

হিন্দি ছবি কুচ কুচ হোতা হ্যায়’তে রাহুলের মা তাকে বিয়ের জন্য জোরাজুরি করার এক পর্যায়ে বলেন অন্য নারীরা তাদের পুত্রবধূর দোষত্রুটি বলে বলে গল্প করে, রাহুল বিয়ে না করায় তার মা সেটা করতে পারেন না। কী অদ্ভুত! এটাই যেন চিরায়ত নিয়ম। আর নাটক সিনেমাগুলো তো এক্ষেত্রে আরো জোরালো প্রভাবকের ভূমিকা রেখে গেছে। শাশুড়ির অত্যাচার যে মুখ বুঁজে সহ্য করে, সেই প্রকৃত সংসারী। প্রকৃত সংসারী ঘরের বউ খাবে-পরবে, উঠবে-বসবে শ্বশুরবাড়ির লোকের ইচ্ছায়; এরপর শেষ দৃশ্যে শাশুড়ি তাঁর ভুল বুঝতে পারবেন। বড় বউ, মেজো বউ, ছোট বউ কত নামে যে ভারতে বাংলা ছবি বানানো হয়েছে এই অত্যাচার সহ্যকারী সুশীল বউমাদের নিয়ে! কিন্তু কেউ যদি ভুলেও শেষ দৃশ্যের আগেই শাশুড়ির অত্যাচার আর সহ্য করতে না চায়, তার মানে শাশুড়ির কথাই সত্যি; ছেলেটা তাঁর শয়তানের পাল্লায় পড়েছে।

আমি যখন কোনো কারণ ছাড়াই বিভিন্ন কথায় আঘাতের শিকার হয়েছি, আমিও কিন্তু মাথায় কাপড় আরও একটু টেনে “জ্বি আম্মা” বলে মেনে নিয়েছি সব। আর সিনেমার লক্ষ্মী বউদের মতো বাথরুমে গিয়ে মুখ চেপে কেঁদেছি। কেন এমন নায়িকাদের মতো আচরণ করেছি আমি? কারণ যারা এসব সহ্য করে নেয় না তারা যে স্বামীর ভালোবাসা, সিম্প্যাথিটুকুও হারায়, এটা আমি শুধু নাটক সিনেমায় দেখিনি, বিয়ের আগে এসব বার বার করে আমাকে বলে দিয়েছিলো আমার শুভাকাঙ্ক্ষী সব বিবাহিত নারী; অনেক কিছু বলে, সহ্য করতে হয়। আমি কিচ্ছু করিনি, এখনও ও বাড়িতেই যাইনি, এখনই কী করে জানো তোমরা যে শাশুড়ি আমায় এতো অপছন্দ করবেন? কারণ এটাই সব সময় হয়ে এসেছে। মায়ের ভালোবাসায় বড় হওয়া ছেলে হঠাৎ অন্য নারীর ভালোবাসা নিয়ে সুখী হয়ে যাবে, এটা মেনে নিতে কষ্ট হয় অনেক মায়ের।

কেন? কেন একজন নারী তার পুত্রসন্তানের জীবনে অন্য নারীর আগমন মেনে নিতে পারেন না? প্রথমে চিন্তা করি, পুরুষদের জামাতার প্রতি ঈর্ষান্বিত হওয়ার ঘটনা অপেক্ষাকৃত কম কেন? পুরুষদের জীবনে তার স্ত্রী-সন্তান ছাড়াও আরও হাজারটা মানুষের আনাগোনা থাকে সাধারণত। সন্তান একজন ভালো সঙ্গী খুঁজে নিয়ে ভালো থাকছে? বেশ ভালো। এ নিয়ে আর চিন্তা নেই, চিন্তা করার মতো আরো একশটা বিষয় আছে আমার। অথচ পিতৃতান্ত্রিক এই দুনিয়াটায় যে নারীর জীবনে হাজারটা মানুষ থাকে প্রথমেই সে একটা ধাপে সংসারী না হওয়ার তকমা পেয়ে যায়। এরপর যদি কোনো নারী হাজারটা মানুষের মাঝে একজনকে বেছে নিয়ে সংসার শুরুও করে, তার উপর এক্সপেকটেশনের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয় যে সে এখন তার স্বামী-সন্তান সমেত সংসারকেই গোটা জগত সংসার বানিয়ে ফেলবে। আর একটা মানুষের গোটা দুনিয়া জুড়ে যদি থাকে তার স্বামী আর সন্তান, সে কীভাবে মেনে নেবে যে তার দুনিয়ার অর্ধেকটায় এখন অন্য একজন ভাগ বসাবে? বিশেষ করে  আমাদের সমাজে এরেঞ্জড বিয়ে হওয়ার পরে কর্তার মতো আচরণ করা স্বামী যাদের, তাদের সন্তানরা কর্তা হয়ে শাসন না করে বন্ধু হয়ে ভালোবাসছে স্ত্রীকে, এটা মেনে নিতেই কষ্ট হয়ে যায় যেখানে, সেখানে শাশুড়ির মানসিক অত্যাচার, নিজের বন্ধুত্ব ছাড়া দাম্পত্য, এসবের মধ্যে একমাত্র সন্তানের ভালোবাসাকেই পুঁজি করে বেঁচে থাকা এসব নারী কী করে মেনে নেবেন যে তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ যা তিনি এতোদিন আগলে রেখেছেন, তাতে আজ অন্য কারো অধিকার আছে?

বাবারা কী সুন্দর কাজের সুবাদে সারাদিন বাইরে থেকে রাতে বাড়ি ফিরে সন্তানের আধো বোলে ছড়া শুনে খুশি হয়ে তাকে একটা লজেন্স দিয়েই তৃপ্তির ঘুম দেন। অথচ ঐ চার লাইনের ছড়াটা সন্তানকে শেখাতে মা যে দুষ্ট ছেলেটার পিছন পিছন দৌড়ে সারাটা দিন ব্যয় করে ফেলেছে, নিজের জন্য একটা মুহূর্ত সময় রাখেনি, এটা আমরা কেউ খেয়ালই করি না। এসব মায়ের জীবনে সবচেয়ে বড় কষ্ট সন্তান কথা শোনে না/খায় না/পড়ালেখা করে না। জীবনে সবচেয়ে বড় আনন্দ সন্তান পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়েছে। বন্ধু বলতে সন্তানের বন্ধুদের মায়েরা। অর্থাৎ তাঁর পুরো জীবনটাই নিয়োজিত এই সন্তানের জন্য। একটা মানুষের পুরোটা জীবন, মানসিক, কায়িক সকল প্রকার শ্রম যেখানে বিনিয়োগ করা হয়েছে, সেটায় কেন তিনি কাউকে ভাগ বসাতে দেবেন? যে এই ভাগটা বসাতে এসেছে, সে তো শয়তানই!

বেশিরভাগ এমন শাশুড়িকে দেখা যায় সন্তানের বিয়ের আগে তাঁর এই আক্রোশের কথা কাউকে বুঝতে দেন না। এমনকি শ্বশুর মশাইও তাঁর ভাবী বেয়াই-বেয়াইনের সামনে ভাবী পুত্রবধূর প্রতি কন্যার মতো স্নেহের আশ্বাস দেন। তাঁদের আসল মনোভাবটা প্রকাশ পায় বিয়ের ঠিক পরে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অন্তত তাই বলে। নিজের জীবনের বড় একটা অংশে অন্যের আগমন মেনে নিতে না পারা শাশুড়ি কিন্তু শুরু থেকেই জানতেন তাঁর ছেলে একটা ‘শয়তানের’ পাল্লায় পড়েছে। তাহলে কেন তিনি একটা মিছে মুখোশ পরে ছিলেন ও’ বাড়ির মেয়ে এ’ বাড়িতে আসার আগ পর্যন্ত?

সন্তানের জীবনে আসা শয়তানকে মা কিছুটা হলেও মেনে নিতে পারেন যদি তার উপর কর্তৃত্ব বজায় রাখা যায়, তাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। আর এই কাজে সাহায্য করার কথা পুত্রেরস্ত্রীকে বশে রাখা তো পৌরুষত্বের প্রধানতম লক্ষণ। মা’দের স্বামীরাও নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলো নিজ নিজ স্ত্রীদের। পূর্বপুরুষদের এই পরম্পরা ধরে রাখবে সন্তানএটুকু তো আশা করাই যায়। কিন্তু আমার শাশুড়ির পুত্র এক্ষেত্রে মোটেই সহযোগী ছিলো না মায়ের প্রতি।

আমি যে বাড়িতে বউ হয়ে গিয়েছিলাম সে বাড়িতে আমার আগে আরও একজন বউ হয়ে এসেছিলেন। তাঁর প্রতি যথাযথ সম্মান জানানো, তাঁর উপলক্ষে সব প্রথা পালন কিন্তু হয়েছিল। কেবল আমার ক্ষেত্রেই সব প্রথা একপাক্ষিক ছিলো; আমাকে মাথা নিচু করে সম্মান জানাতে হবে, কিন্তু আমার প্রতি সম্মান না জানালেও চলবে। কেন? কারণ আমার বিয়ের সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছিলাম। কোনো কর্তা আমাকে বিয়ে দেয়নি, আমি স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছি। আর যে মানুষটা স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছে, নিজের বর নিজে বেছে নিয়েছে, তার ওপর কর্তৃত্ব খাটানো একটু কঠিনই বৈকি। তাই শাশুড়ির কর্তৃত্ববাদী মানসিকতাকে সঙ্কটে ফেলা এমন বউ-এর প্রতি ক্ষোভটাও একটু বেশি। তাহলে ক্ষোভটা বিয়ের ঠিক পরেই কেন প্রকাশিত হলো?

ও’ বাড়ির মেয়ে যে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয় এবং তার বাবা-মা এ ব্যাপারে পূর্ণ সমর্থন দেয়, তার উপর কর্তৃত্ব তখনই খাটানো সম্ভব যখন সে এ’ বাড়ির বউ হয়ে যাবে। কারণ যত প্রগতিশীলই হোক, একবার বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেলে তার তো এই সম্পর্কেই বাঁধা পড়ে থাকতে হবে। কেননা একটা কুড়ি বছর বয়সী কুমারীকে আপনারা কিছুটা হলেও হয়তো বাঁচতে দেন, কিন্তু বিয়ের পরে সম্পর্ক ধরে রাখতে না পারা ব্যর্থ মেয়ের তো কোনো অধিকার নেই এই সমাজে থাকার। এটাই আমাদের সমাজের চিরন্তন প্রক্রিয়া। তাই একবার বিয়েটা হয়ে যাক, এরপর থলের বেড়াল একটা একটা করে বের করা যাবে। সন্তানের জীবন গড়ায় ঢেলে দেয়া অর্ধেকটা জীবনের বাকিটুকু তো আছে সন্তানের জীবন দুঃসহ করার জন্যই।

নিজের একটা জীবন নেই বলেবন্ধুত্বপূর্ণ দাম্পত্য নেই বলে সন্তানের জীবন কঠিন করে দেয়া সব নারীর প্রতি রাগ হয় না, তাদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধাও আসে না, কেবল ভয় হয় যে এভাবে নিজের জীবন অবলীলায় অন্যের পিছনে ঢেলে দিতে যে পারে, সে সেটা ধরে রাখতে আরো কত অবিশ্বাস্য কাজই না করতে পারে!

আমি নিশ্চিত যে নারীর নিজের একটা স্বাধীন স্বকীয় সুন্দর জীবন আছে, সন্তানের সুন্দর জীবন দেখে তিনি কখনও ঈর্ষান্বিত হবেন না। সুতরাং আমাকে হতে দিন একটা স্বাধীন রাক্ষসী কিংবা শয়তান, তাহলেই আর আমার পুত্রবধূকে এর কোনোটা হতে হবে না।

শেয়ার করুন:
  • 647
  •  
  •  
  •  
  •  
    647
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.