শিক্ষকের হাতে শিশু নির্যাতন: বাবা-মায়েরাও কম দায়ী নন

উপমা মাহবুব:

একটি দশ বছরের শিশুকে নৃশংসভাবে পিটিয়েছেন তার মাদ্রাসার শিক্ষক। ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিও নিয়ে গতকাল থেকে চলছে তুমুল আলোচনা। মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। কিন্তু ঘটনাটিকে ছাপিয়ে গতকাল আলোচনার মূল বিষয় হয়ে উঠেছিল আরেকটি ইস্যু। শিশুটির বাবা-মাকে অনেক অনুরোধ করেও কোনোভাবেই ঐ শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করাতে রাজি করানো যাচ্ছিল না। আইনের কিছু নিয়মের কারণে স্বপ্রণোদিতভাবে পুলিশ ঐ শিক্ষককে গ্রেপ্তারও করতে পারছিল না। এই নিয়ে মানুষজন ছেলেটার বাবা-মাকে সোশ্যাল মিডিয়াতে মোটামুটি ধুয়ে দিচ্ছে। সর্বশেষ রাতের বেলায় জানা যায় অনেক বোঝানোর পর শিশুটির বাবা-মা মামলা করেছেন এবং ঐ শিক্ষক গ্রেপ্তার হয়েছেন।

শিক্ষক পরিচয়ের অত্যন্ত নির্মম এই মানুষটি গ্রেপ্তার হওয়ায় আরও অসংখ্য মানুষের মতো আমিও অত্যন্ত আনন্দিত। আমি তার কঠিন শাস্তি দাবি করছি এবং একই সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় যে ভয়াবহ শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, তা বন্ধে রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তবে একই সঙ্গে আমি বাংলাদেশের সেই সকল মানুষ যারা – ‘এ কেমন বাপ-মা! ছেলেকে এভাবে মারলো তাও বিচার চায় না’ এই কথা বলে ফেসবুক কাঁপিয়েছেন তাদের কাছে কিছু বিষয় উত্থাপন করতে চাই।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা, বাংলাদেশের ভুরি ভুরি বাবা-মা আছেন যারা চান না তাদের পুত্র বা কন্যাকে পেটানো শিক্ষকের বিচার হোক। শুনে অবাক লাগছে? আকাশ থেকে পড়লেন? কেন বলুন তো? আপনি নিজে বা আপনার আশেপাশের দশজন মানুষ যখন বলেন – ‘আমার শিক্ষকরা আমাকে পিটায় মানুষ করেছে।’ তখন তো এরকম সাত আসমান থেকে ধপাস করে পড়েন না। তখন তো পেটানোকে ঠিকই জাস্টিফাই করেন। আমি, আপনি – আমরা সবাই কি – ‘বাচ্চা আমার, চামড়া আর মাংস আপনার’ এই কথা কাউকে কোন শিক্ষককে বলতে শুনিনি? সবাই কমবেশি শুনেছি। অতএব বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের পেটানোর ইতিহাস অনেক পুরনো। আমরা এই ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্তও বটে।

বাংলাদেশের বাবা-মায়েদের বড় অংশ শিক্ষকরা বাচ্চাদের পেটাবে এটাই পছন্দ করেন। আমার অবাক লাগে এটা ভেবে যে, বাঙালী জাতি দেশটাকে চুরিচামারি, দুর্নীতি করে রসাতলে নিয়ে গেল। তারপরও এখনও তারা শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি বুঝতে পারলো না। এখনও তারা মনে করে শিশুদের পিটিয়েই মানুষ করতে হয়। এখন প্লিজ বলবেন না, ‘সবাইতো আর দুর্নীতি করে না। কই আমিতো দুর্নীতিবাজ নই।’ আমি বলি, আপনি যদি জীবনে একদিনও ট্রাফিক নিয়ম না মেনে থাকেন, লাইন ভেঙ্গে সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কাজ আদায় করে নেন অথবা নিষেধ জেনেও পাবলিক প্লেসে ধুমপান করেন তাহলে আপনি অবশ্যই দুর্নীতিবাজ। আপনার শিক্ষক আপনাকে পিটিয়ে পড়া মুখস্ত করিয়েছেন, কিন্তু নৈতিকতাটাই শেখাননি।

আমি বলছি না সব শিক্ষকই শিশুদের মারেন। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসেন, স্নেহ করেন এমন অগনিত শিক্ষক রয়েছেন। ভালোবাসেন আবার মারেনও এ রকম শিক্ষকের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। তবে শিশুদের একটা/দুটো চড়থাপ্পড় দেয়া আর গতকালকের ঘটনার মতো নির্মমভাবে পেটানোর মধ্যে আমি তেমন কোনো পার্থক্য দেখি না। মার দেয়া মানে মার দেয়া। কম হোক বা বেশি হোক দুটোই খারাপ। দয়া করে বলবেন না, ‘বাচ্চাদের হালকাপাতলা পেটালে কিছু হয় না। ভয় পেলে ওরা খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে।’ কই দেশটা চোরবাটপারে ভরে গেলো, বড় বড় পজিশনের মানুষেরা পুকুর চুরি করছে। এই বুড়ো বুড়ো বদমাশদের তো কেউ মারতে যায় না। শুধু শিশুদের ভয় দেখিয়ে খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখার জন্য কেন হাত নিশপিশ করে? এর একটাই কারণ। বড়রা শক্তিশালী, ক্ষমতাধর। তাদের গায়ে হাত তোলা যায় না। শিশুরা অসহায়। তারা প্রতিবাদ করতে পারে না। তাই তাদের পিটিয়ে বেশ একটা শিক্ষা দিলাম টাইপ আনন্দ পাওয়া যায়। শুধু গতকাল ঐ শিশুটিকে পেটানো শিক্ষকটি নয় বরং আপনারা যারা শিশুদের বেশি বা কম যে রকম পেটানোকেই সঠিক কাজ বলে মনে করেন আপনারাও নিষ্ঠুর, নিমর্ম। দুর্বলের উপর সবলের এই অত্যাচার কখনোই সঠিক নয়৷

‘বাংলাদেশে স্কুলে শিশুদের গায়ে হাত দেয়া যাবে না’ – এই আইন চালু হওয়ার পর আমি অসংখ্য মানুষকে বলতে শুনেছি ‘বাচ্চাদের একটু পিটা না দিলে ওরা মানুষ হয় না’। সেই সব ব্যক্তিদের অনেককেই আবার গতকাল দেখলাম কেন ছেলেটির বাবা-মা ঐ শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করছে না সেই নিয়ে ভীষণ রাগান্বিত। অদ্ভুত ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আপনাদের। আগে নিজে ঠিক করেন আপনি স্কুলে শিশুদের পেটানোর পক্ষে না বিপক্ষে। তারপর ঐ বাচ্চার বাপ-মা কেন মামলা করছিল না তা নিয়ে ছিঃ ছিঃ করেন।

উপমা মাহবুব

বছরের পর বছর ধরে আমরা পড়ালেখা ঠিকমতো করার দোহাই দিয়ে কোমলমতি শিশুদের নানা রকম শারীরিক শাস্তি দিয়ে আসছি। স্কুল বা মাদ্রাসাগুলোতে শিশুদের পেটানো হয় এটা জেনেও চুপ করে থাকার ফলেই আজকে মাদ্রাসাগুলোর অবস্থা এতটা ভয়াবহ। এটা ঠিক যে আমাদের শিক্ষকদের চাইল্ড সাইকোলজির উপর কোনো প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না। শিক্ষা ব্যবস্থা এবং স্কুল ব্যবস্থার নানা রকম ত্রুটি থাকায় তাদের মানসিক শান্তি কম কিন্তু আবার অনেক শিশুকে একসঙ্গে সামলাতে হয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাদের মধ্যে কেউ কেউ পিটিয়ে শিক্ষার্থীদের সামলানোর চেষ্টা করবেন। দুষ্টু ছেলেকে ভয় দেখিয়ে কখনই সঠিক পথে আনা যায় না। আমরা যে শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করতাম ওনারা শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে ‘ছেলেমেয়েরা চুপ করো’ এই কথাটা বললেই পুরো ক্লাস নিরব হয়ে যেতো। ওনাদের মারাতো দূরের কথা, জোরো শব্দ করে বকাও দেয়া লাগতো না। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে বাঙালি জাতির একটা বড় অংশ পেটানোর ভয়ে মুখস্ত করা পড়া সারা জীবন মনে রেখেও অনেকেই ‘নৈতিকতা’ ‘সততা’, ‘মানবতা’ নামক আসল শিক্ষাগুলোই স্কুল, কলেজ থেকে শেখেনি।

সবশেষে এতোটুকুই বলবো, শিক্ষককে কখনোই এ্যালাউ করবেন না আপনার সন্তানকে পেটাতে। তিনি সেটা করে থাকলে প্রতিবাদ করুন। শিশুদের আদর, স্নেহ দিয়ে যেকোনো বিষয় ভালোভাবে বুঝিয়ে বললেই তারা বোঝে। আর যে শিক্ষক তাদের ভালোবাসেন তারা তার কথা শোনে। তাকে সারাজীবন শ্রদ্ধা করে। শিশুদের তাদের মতো করে বড় হতে দিন। পিটিয়ে বা জোর করে আপনার নিজের বা স্কুলের শিক্ষক যেমন চান, সেভাবে বড় করার চেষ্টা করবেন না। এতে ঐ শিশুটির ভেতরের মানুষ সত্ত্বাটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিশুরা বাবা-মা বা শিক্ষকের ইচ্ছার দাস নয়। তাই ওরা ওদের মতো করে বড় হবে, এটাই আমাদের সবার কাম্য হওয়া উচিত।

লেখক: উন্নয়নকর্মী

শেয়ার করুন:
  • 187
  •  
  •  
  •  
  •  
    187
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.