সিজারের আগে ঈশ্বরের সঙ্গে চুক্তি!

সুচিত্রা সরকার:

খুব করে চেয়েছিলাম প্রাকৃতিকভাবেই আমার সন্তান বাবিন পৃথিবীতে আসুক! খুব নিয়ম মেনেছিলাম। নিয়মিত ব্যায়াম, যোগাসন আর হাঁটা। ঘণ্টাখানেক হাঁটতাম দশ কেজি ওজনের পেটটা নিয়ে। নরমাল ডেলিভারি হতেই হবে। কিন্তু যার কপালে লেখা কাটাছেঁড়া, তার কপাল জুড়বে, কার সাধ্যি! ডাক্তার সিদ্ধান্ত দিলেন সিজার। এটা কোনো ব্যাপারই না। শরীর মোটা হয় না সবার। তেমন কষ্ট নেই ইত্যাদি বহু শুনলাম। আর হালিতে হালিতে ডজনে ডজনে মণে মণে শহরে সিজার হচ্ছে। অতো মারাত্মক হলে এতোগুলো মা টিকে থাকতো কী করে?

করলাম সিজার। এখন বাবিন ক্রমশ আরণ্যক মেঘমল্লার হয়ে উঠছে। আর আমি? গত উনিশ মাসে যা হয়েছে শরীর আর মনের অবস্থা, বলে কতটা বোঝানো যায়! প্রতিদিন কাজ করতে কষ্ট, বাচ্চাকে কোলে নিতে কষ্ট, পরিশ্রমে যন্ত্রণা। তবু যেহেতু এবং যেহেতু আমি রাজপুত্রী নই, আঠারো উনিশ ঘণ্টা পরিশ্রম চলতেই থাকে নিত্যদিন।

তাই আরেকবার বাচ্চা নিলে সিজারের আগে ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা করতে যাবো ইন্দ্রপ্রস্থে! সঙ্গে থাকবে একটা চুক্তিনামা। ঈশ্বর সেখানে সইসাবুদ করলেই সিজার করাবো। নইলে আমার বাচ্চাটিকে প্রাকৃতিকভাবে, যাকে নরমাল প্রসব বলে, সেভাবেই এনে দিতে হবে খোলা হাওয়ায়!

চুক্তির শর্তগুলো পাঠকের জন্য এখানেই তুলে দেয়া যেতে পারে!

শর্ত নম্বর এক: সিজারের আগে যে অ্যানেসথেসিয়া দেয়া হয়, তখন ভয়ানক ব্যাথাটা লাগবে না। মেরুদণ্ডে সাঁই করে ইনজেকশান ঢুকবে, আর আমি ক্যাডবেরি খাবার আনন্দ পাবো! তারপর কোমড়ের নিচটা যখন অবশ হবে, ‘একটা নিদারুণ অবস্থায় আটকে পড়া’ অনুভূতি হবে না। তার বদলে বেলী ফুলের সুবাস পেতে থাকবো! আর যখন তলপেটের ঠিক নিচটায় প্রথম চাকুটা চালাবে, মুরগির (কল্লা) গলা কাটার পর জান বেরোনো যে অনুভূতি, সেরকম হবে না। নাকে অক্সিজেন দেবার পরও পৃথিবী থেকে বিদায়ের অনুভূতি হতে পারবে না।

দিব্য আনন্দে, বাচ্চাটাকে আদর করবো আমিই প্রথম! আর তারপর যখন পাঁচ ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরবে, বাম হাতে স্যালাইন, ডান হাতে প্যাথেড্রিন ইনজেকশানের নল, ইউরিন ব্যাগ, নল আর এতো এতো প্যাথেড্রিনকে স্রেফ উড়িয়ে দেয়া সিজার কাটার ব্যাথাটা টেরই পাবো না।

বাবিন যখন আরণ্যক হয়ে প্রথম আমার কোলে আসবে, পরম আনন্দে আমি অভিভূত হবো!

প্রথম শর্ত এতো লম্বা দেখে, ঈশ্বর মহাশয় বিরক্ত হলে, আমার কিচ্ছুটি করার নেই।

আমি দ্বিতীয় শর্ত পড়তে আরম্ভ করবো।

দুই. দ্বিতীয় দিন যখন ডাক্তার প্রচুর জল খাইয়ে ইউরিনের নল খুলে বলবে, নিজে হেঁটে টয়লেটে গিয়ে কম্মটি করুন, জগদ্দল পাহাড় মনে হবে না শরীরটাকে। তারপর নাচতে নাচতে বাচ্চা নিয়ে বাড়ি ফিরবো। আর একা একা বাচ্চা পালনের অভিজ্ঞতা থাকবে না।
মানবসমাজ টিকিয়ে রাখতে এক মহান দায়িত্ব যখন আমার কাঁধেই বর্তেছে, যেহেতু আমি একটা মানুষ, নিজের ভেতর সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখি, সুতরাং আমাকে কিছু বাড়তি সুবিধা দিতেই হবে।

এখানে ফুট কাটতে বলে রাখি, আরণ্যক প্রথম তিন মাসে, আধ ঘণ্টা ঘুমাতো। আধঘণ্টা খেতো। আমার ঘুমের বালাই ছিল না। আর আগের নয় মাসের নির্ঘুম দিনরাতে আমি ততদিনে ক্লান্ত। তো, একবার ও খেতে খেতে ঘুম। আমিও বসেই ঘুম। আধঘণ্টা পর ও জেগে গেল। আমি ঘুমের মধ্যেই খাওয়াচ্ছি। তারপর কেমন হেলুসিনেশান হলো। দেখলাম আরণ্যকের পাঁচটা ছয়টা মুখ। একেক পর এক মুখ, ব্রেস্টফিড করছে।

আরেকদিন হাতের উপরেই ঘুম। আমি ঘুম থেকেই উঠে দেখি, ওর গলাটা উল্টে ভূমির দিকে। আরেকটু হলে ঘাড়টা ভাঙতো!
আরেকদিন, ও সোজা আছে ভেবে, মাথাটা বুক বরাবর এনে দেখি, ও উল্টে আছে। মানে যেটাকে ওর বুক ভেবেছি, সেটা পিঠ। আর মাথায় যেখানে চোখ মুখ থাকার কথা, সেখানে পেছনের চুল। তখনও মটকায়নি।

এ সবকিছুর কারণ, একা একা নবজাতকের দায়িত্ব। হ্যাঁ, ওর বাবা করেছে। আমার মা-ও। তবে অসুস্থ মা, নাতির জন্মের সঙ্গে সঙ্গে অটো সুস্থ হয়ে যাননি। বা ওর বাবাও অফিস থেকে বাচ্চা জন্মের জন্য সপ্তাহের বেশি ছুটি পাননি।

তাই ঈশ্বরকে শর্ত দেবো, বাচ্চা হবার পর যেন পরিবারের প্রত্যেকে একইরকম যত্ন বাচ্চার করতে পারে, সেরকম অটো সিস্টেম চালু করা।

তিন. বাচ্চা পালতে পালতে রান্না, বাজার সংসার দেখা— সব একসঙ্গে করতে আমি পারবো না। এবার আমার একটা ক্লোন বানান মহান ঈশ্বর। ক্লোনটি বাদবাকি সংসার সামলাক। আমি এখন মা!

চার. দেশে মাতৃকালীন ছুটি ছয় মাস। সেটা পিতৃকালীনও করা হোক। এবং কোনো শর্ত, নিয়ম ছাড়াই প্রত্যেকটা মেয়ে এই ছুটিটা পাক। তাহলে আমাকে আর দু মাসের বাচ্চা, স্ট্রলার, ব্রেস্ট পাম্প, ডায়পার নিয়ে অফিস, বাড়ি করতে হবে না। অন্তত দুই মাস থেকে তো নয়ই।

পাঁচ. হে মহান ঈশ্বর, বাবিন হবার পর পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের যে টানাপোড়েনে আমরা মাতা-পুত্র সাফার করেছি, তা নি:শেষ হোক দ্বিতীয় বারে।

ছয়. বাচ্চাকে বাসায় রেখে আমি শাহবাগ, আজিজ, ধানমন্ডি লেক, নাটক, সেমিনারে যাবো হরদম। ঈশ্বর, তখন আপনি অন্য ব্যবস্থা দেখে নিন।

সাত. বাচ্চাকে নিয়ে বাইরে বের হলে, কোথায় তাকে দুধ খাওয়াবো, তার জন্য হন্যে হয়ে যেন জায়গা খুঁজতে না হয়। রাস্তার মোড়ে, শপিং সেন্টার, থিয়েটার হলের পাশে, যেখানে যেখানে আমি যেতে চাই, সব জায়গায় ব্রেস্ট ফিড সেন্টার খুলে দিন।

আট. বাচ্চার বাবা যখন বাচ্চার যত্ন করে, সমাজের শুভানুধ্যায়ীরা বাবাকে বলে, যন্ত্রেরও বিশ্রামের দরকার আছে। আপনি কিছুদিনের জন্য ঘুরে আসুন। হে ঈশ্বর, আমাকেও যেন ওরা একই কথা বলে। আমি তো রোবট না, কী বলেন!

নয়. এই শর্ত বলার আগে শারীরিক সক্ষমতার বয়ান দেই— আমি দুর্দান্ত একটিভ একটা মানুষ ছিলাম। আঠারো ঘণ্টা পরিশ্রম দিনের পর দিন করতে আমার ক্লান্তি লাগতো না। কয়েকটা গান আর খোলা হাওয়াই ছিল আমার ফুয়েল। আর এখন? ঘর মোছার চেষ্টা করেছিলাম। সিজারের সেলাই যেখানে, টানা তিন দিন অসহ্য যন্ত্রণা। এবং ভেতরে জ্বলুনি। পরে জানলাম, উপরে যেমন একটা কাটা, ভেতরে এমন আরো দুটো আড়াআড়ি। উপরেরটা শুকালেও, ভেতরের সেলাই ও নাড়ি শুকাতে দু বছর লাগে। আর ব্যথা সারাজীবন।

সুতরাং মোছা বন্ধ। বদলে দশ দিনের পেইনকিলার।

আগের দিন একটু পরিশ্রম হলে (পিরিয়ডের সাত দিন কী, বলার অপেক্ষা রাখে না) তো পরের দিন সকালে কোমড় তুলতে পারি না। জাস্ট স্টিফ হয়ে যায়। কোমড় থেকে নিচ পর্যন্ত একদম অবশ। তখন বরকে ডেকে তুলি। সে কোমড়টা ধরে একপাশ থেকে আরেকপাশে নেয়, বা সোজা শোয়া হলে এক পাশে করে দেয়। তার মিনিট দশেক পরে, অবশ ভাবটা কাটে। এটা অ্যানেসথেসিয়ার কারণে।

সুতরাং হে মহান ঈশ্বর, নয় নম্বরটা একটু কঠিন আপনার জন্য। আমার পাশে বর হোক বা যে কেউ, একজনকে রাখুন সারাজীবন। যে অবশ কোমড়টা ধরে তুলবে। অথবা আপনি নিজেই আমার শিয়রের কাছে অপেক্ষা করুন!

দশ. সিজারের দায় শুধু মায়ের নয়। দায় বাবারও (আমি এদিক থেকে ভাগ্যবান) তাই সিজার হলেই, বাচ্চার বাবা সারাজীবন সে দায় যেন মাথা পেতে নেয়। কোনো পরিবেশেই যেন সে দায়ের কিঞ্চিত ব্যত্যয় না ঘটে।

এগারো. সর্বোপরি বাচ্চা পালন একা মায়ের দায়িত্ব আর সন্তানটির স্বত্ত্ব সকলের, এটা বন্ধ করুন। ঈশ্বর মহাশয়, মা জাতি কি মুচলেকা দিয়েছিল আপনার কাছে, জন্ম দিয়েছে বলে খাওয়ানো ইত্যকার নিত্যকর্মের সকল দায় তার? আর পুরো সমাজ একটি মানবশিশুর অংশবিশেষ হিসেবে জাস্ট পরিচয় বহন করবে?

প্লিজ, এসব বন্ধ করুন। একটা আইন আনুন, বাচ্চাকে যেন প্রত্যেকেই একইরকমভাবে পালন করে।

এক কাজ করুন, অনেকদিন তো একই নিয়ম চালালেন। এবার প্রথম পাঁচ মাস মায়ের পেটে রেখে, পরের চার মাস বাবার পেটে ট্রান্সফার করে দিন। ডেলিভারিটা সেখান থেকেই হোক। আর ব্র্রেস্ট ফিডিং যাতে পালা করে দুজনেই করতে পারে, তার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। আর বাচ্চার সঙ্গে ব্লাড কানেকশান যাদের আছে, প্রত্যেককেই কিছু কিছু দায়িত্ব বুঝিয়ে দিন। এই তালিকায় স্কুলে নেয়া, পড়ালেখা সব রাখবেন।

আর তখন নেপোলিয়ন মহামতিকে তলব করবেন, তাকে বলবেন , ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেব’ — এই উদ্ধৃতিখানার খানিক পরিবর্তন করুক! মা’ জাতিকে সন্তানকে প্রপার মানুষ করার ব্লেমগেমে না ঢেলে তিনি পুরো সমাজের ঘাড়ে সেটি ফেলে দিক!
“আমাকে একটি শিক্ষিত সমাজ দাও…!

হে প্রিয় ঈশ্বর, পাইলট পেনে আপনি সইখানা সেরে রাখুন। আমি স্বর্গের ঈশ্বরীদের নারী দিবসের শুভেচ্ছাটা জানিয়ে আসি।

শেয়ার করুন:
  • 100
  •  
  •  
  •  
  •  
    100
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.