শুরুটা হোক নিজ পরিবার থেকে

রিমি রুম্মান:

নবনিতার প্রথম সন্তান কন্যা। পরিবারের সকলেই খুশি। স্বাভাবিকভাবেই যখন দ্বিতীয় সন্তানের আগমনের দিন গুনছিলেন, মনে মনে খুব করে চাচ্ছিলেন সন্তান যেন ছেলে হয়। সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে, এ নিয়ে নবনিতার স্বামীর কোন ভাবনা নেই। তিনি মনে প্রাণে সুস্থ একটি সন্তান কামনায় প্রার্থনা করছিলেন স্রষ্টার কাছে। লং আইল্যান্ড জুইস হসপিটালে নার্স ইভানগালিস্তা যখন সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া কন্যাকে নবনিতার স্বামীর কোলে তুলে দেন, সে এক অভাবনীয় দৃশ্য। তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে কেঁদেই ফেলেছেন। ভিডিও কলে দেশে স্বজনদের দেখাচ্ছিলেন। এইদিকে নবনিতার মুখ আঁধারে ছেয়ে থাকে। নার্স বুঝতে পেরে কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, মামী, মেয়েরাও ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে। বিমান চালাচ্ছে। তাহলে ছেলে মেয়েতে তফাৎটা কোথায়?

নবনিতার সঙ্গে আমার দেখা হয় কয়েক বছর আগে গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনে। আমরা দুজনেই ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। সঙ্গে তাঁর দুই কন্যা। দুইজনই নিউইয়র্কের সেরা স্কুল স্টাইভেসেন্ট হাই স্কুলের শিক্ষার্থী। উপরের কথাগুলো নবনিতার মুখ থেকেই শোনা। বললেন, নার্স ইভানগালিস্তা তাঁর মনের চোখ খুলে দিয়েছে। সত্যিই তো, মেয়ে বলে কেউ তো শিক্ষা, চাকুরি কোনো ক্ষেত্রেই বঞ্চিত কিংবা পিছিয়ে নেই।

তুমুল মেধাবী ছাত্রী ছিল আমার বন্ধু রিমঝিম। তাঁর বাবার খুব শখ ছিল মেয়ে দুটিকেই শিক্ষিত করে তুলবেন। নিজের পায়ে না দাঁড়ানো পর্যন্ত বিয়ে দিবেন না। রিমঝিমের বাবা সবসময়ই বলতেন, মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়ালে পৃথিবীর কারো সাধ্য নেই তাঁকে সমাজ সংসারে কোণঠাসা করে রাখার। মেয়েরা চাকুরি করলে তাঁর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকে, সংসারের যে কোন প্রয়োজনে বাইরে যাবার অধিকার থাকে। নইলে ছোটখাটো প্রয়োজনে স্বামীর কাছে হাত পাততে হয়, জরুরি দরকারে বাইরে গেলেও স্বামীর বাড়ির মানুষদের অনুমতি নিতে হয়। পড়াশোনা শেষে রিমঝিমের চাকুরি হয় নিকটস্থ কলেজে। বিয়ের পর সংসার সামলে শিক্ষকতার কাজটি দারুণভাবে চালিয়ে যেতে পারবে বলে বেশ উচ্ছসিত হয়েছিল। কিন্তু এই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সদ্য বিবাহিত রিমঝিমের স্বামীর চাকুরিস্থল ঢাকায়। আর তাঁর মফঃস্বলে। বাঁধ সাধেন রিমঝিমের মা। বলেন, মেয়েদের সংসারে মনোযোগী হওয়াটাই প্রধান কাজ। নইলে বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করা যাবে না। উচ্ছন্নে যাবে। সন্তানের ভবিষ্যৎ বড় নাকি তোমার চাকুরি বড়? ব্যাস বাধ্য হয়ে চাকুরিতে ইস্তেফা দিয়ে সংসার, সন্তান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠে সে। জীবনের এই মধ্য গগনে এসে দীর্ঘশ্বাসের সাথে বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়েও কিছুই করা হলো না জীবনে।

বছর কয়েক আগে ব্রঙ্কসের পার্কচেষ্টারে এক প্রবাসী বাংলাদেশির মৃত্যু নিয়ে লিখেছিলাম। প্রতিদিনকার মতো সেদিনও ভোরের আলো ফোটার আগেই কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি। রাস্তা পারাপারের সময় একটি ভ্যান গাড়ি চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই সেই প্রবাসীর মৃত্যু হয়। লাশ দেশে পাঠানো বিষয়ে আমরা যখন দেশে তাঁর পরিবারের সঙ্গে কথা বলি, তখন অনেক সত্য বেরিয়ে আসে। নিজে আমেরিকার নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ভদ্রলোক তাঁর পরিবারকে কখনও এদেশে আনেননি। মায়ের কঠোর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানকে এ দেশে আনতে পারেননি। সেদিন জানলাম, একজন নারী তাঁর স্বামীর সঙ্গে একত্রে বসবাস করে সংসার করতে পারলো না শুধুমাত্র আরেকজন নারীর কারণে। সন্তান দুটিও বাবার আদর ভালোবাসার ছায়ায় বেড়ে উঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো। এবং অবশেষে চিরতরেই বঞ্চিত হলো।

অল্প বয়সে বিধবা হয়েছিলেন বন্যা। ছোট দুটি কন্যা সন্তান নিয়ে সংগ্রামী এক জীবন যাপন করছিলেন। একদিন এক সহকর্মী তাঁর জীবনসঙ্গী হতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। ধরা যাক সহকর্মীর নাম শৈবাল। বয়সটা তো আর হুজুগে সিদ্ধান্ত নেবার নয়। তাই অনেক আলোচনা, বোঝাপড়া শেষে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে, যেহেতু দুটি সন্তান আছে, তাই বিয়ে করলেও তাঁরা নতুন করে আর সন্তান নিবেন না। নিজেদের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে বন্যা ও শৈবাল বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ দশ বছর সুখের সময় অতিবাহিত করেন। পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে শৈবালের সঙ্গে গল্প হচ্ছিল। অমায়িক একজন মানুষ। সেখানে উপস্থিত বন্যার বড় খালা গল্পচ্ছলে বলে উঠলেন, ‘ বাবা শৈবাল, আমি তোমার কষ্টটা বুঝি। মন খারাপ করো না। হাজার হোক, তোমার নিজের একটা সন্তানের হাহাকার যে আছে, তুমি না বললেও বুঝতে পারি।’ সংসার জীবনে শৈবালের মন খারাপ না হলেও তাঁকে মন খারাপ করতে বাধ্য করলেন বড় খালা।

এবার আসি আমার এক ছোটবোন রিনির প্রসঙ্গে।

বিয়ের প্রায় ছয় বছর হতে চললো, তাঁদের ঘরে কোনো সন্তানাদি আসেনি। এ নিয়ে রিনি প্রায়ই অপরাধবোধে ভোগে। হীনমন্যতা পেয়ে বসে। ডাক্তার দেখানো হয়েছে একাধিকবার। সব ডাক্তারই জানিয়েছেন, রিনির শারীরিক কোনো ত্রুটি নেই। টেনশনমুক্ত থাকতে হবে। শরীর এবং মনের উপর বাড়তি চাপ নেয়া যাবে না। সন্তানের জন্যে তীব্র হাহাকার রিনিকে কুঁড়ে কুঁড়ে শেষ করে দিচ্ছিল। বিধায় শরীরের উপর চাপ কমাতে সে বড় মাইনে পাওয়া চাকুরিটিও ছেড়ে দেয়। যদিও সন্তানাদি হওয়া না হওয়া নিয়ে রিনির স্বামীর কোনো অভিযোগ অনুযোগ ছিল না। কিন্তু বাঁধ সাধেন শাশুড়ি। বাঁজা পুত্রবধুর দ্বারা নাতি-নাতনির মুখ দেখা হবে না। বংশ রক্ষা হবে না। পুত্রকে আবার বিয়ে দিতে চান। পুত্রের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও পাত্রী দেখা শুরু করেছেন। মায়ের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে শেষ চেষ্টা হিসেবে রিনির স্বামী রিনিকে নিয়ে পাশের দেশ ভারতে পাড়ি জমায় চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে আসে অন্যরকম এক দুঃসংবাদ নিয়ে। ডাক্তারের রিপোর্টের মতে সমস্যা রিনির নয়, তাঁর স্বামীর। অবশেষে রিনির শাশুড়ির পাত্রী দেখার তোড়জোড় থেমেছে। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, তাঁর নিজেরই বিয়ের চৌদ্দ বছর পর একমাত্র পুত্রের জন্ম হয়েছিল।

উপরের ঘটনাগুলো আমাদের চারপাশের হাজারও পরিবারের গল্প। এর মাধ্যমে এইটুকু অন্তত প্রতীয়মান হয় যে, অনেকক্ষেত্রে একজন নারীই নারীর উন্নতিতে প্রতিবন্ধক। সংসারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন নারী আরেকজন নারীর ভালো থাকায় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। কিংবা পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধিত্বকারী। একজন মা-ই কন্যা সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে মনখারাপ করেন। কন্যা সন্তানকে এটা করতে নেই, এভাবে বসতে নেই, ওভাবে কথা বলতে নেই, সশব্দে হাসতে নেই বলে দমিয়ে রাখেন। পড়াশোনা শেষে বিয়ের জন্যে পাত্র পেতে দেরি হলে মায়েরাই বিরক্তির সাথে বলে উঠেন, কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দিলে এখন এত টেনশনে পড়তে হতো না। বেশি পড়িয়ে বরং ভুলই করেছি। এই যদি হয় মায়েদের অবস্থা, নারী যদি নিজেই নিজের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়, তবে পুরুষতন্ত্রের দোষ দিয়ে কি লাভ?

আবার বিপরীত উদাহরণও আছে।

আমি যখন আমার ছোট সন্তানকে নিয়ে গ্রীষ্মে রোজ নিকটস্থ পার্কে যেতাম, সেখানে আমার সাথে পরিচয় হয় একজন বাংলাদেশি নারীর সঙ্গে। তিনিও তার শিশু সন্তানকে নিয়ে একই পার্কে আসতেন। দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে চাকুরি করতেন। পাশাপাশি নারী অধিকার নিয়ে কাজ করতেন। নতুন দেশেও দ্রুততম সময়ে চাকুরি যোগাড় করে নিয়েছেন নিজ যোগ্যতা আর বুদ্ধিমত্তার গুণে। সংসারে নারীদের নানান প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কথা বলতেন। এ থেকে উত্তরণে করণীয় নিয়ে চমৎকার ব্যাখ্যা দিতেন। শেষ বিকেলের রক্তিম আলোয় আমরা কয়জন মুগ্ধ হয়ে তাঁর কথা শুনতাম। এক বিকেলে তাঁর কপালে হাতে আঁচড়ের দাগ দেখে জানতে চাইলে হুহু করে কেঁদে উঠেন। দেশে টাকা পাঠানো নিয়ে স্বামী-স্ত্রীতে কথা কাটাকাটি থেকে হাতাহাতিতে গড়ায়। তবুও তিনি দমবার পাত্রী নন। বললেন, স্বামী যদি তাঁর বাবা-মা ভাইবোনের প্রতি দায়িত্ব পালনের অধিকার রাখেন, তবে আমি কেন নই? আমাকেও তো বাবা-মা লেখাপড়া শিখিয়ে কষ্ট করে মানুষ করেছেন। কথা কিন্তু মিথ্যে নয়।

এই যে নারী দিবস এলে চারিদিকে হুলুস্থুল সভা সমিতি হয়, সমাজের প্রতিষ্ঠিত নারীরা উচ্চ কণ্ঠে সোচ্চার হন, কিন্তু দিন শেষে বাড়ি ফিরে সে নিজেও বা কতোটুকু অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন তাঁর নিজ ঘরে? সেখানেও সে বৈষম্যের শিকার অনেকাংশে। নারীর মেধা এবং যোগ্যতাকে কুর্নিশ জানানোর শুরুটা হোক নিজ পরিবার থেকে। সংসারে একজন মায়ের আত্মত্যাগ এবং সুশিক্ষা একজন কন্যাকে অনেক দূর এগিয়ে দিবে। তাঁকে স্বাধীন চিন্তা-চেতনা এবং স্বকীয়তায় বেড়ে উঠতে সাহায্য করবে। আত্মপ্রত্যয়ী হতে শেখাবে। স্বনির্ভর হতে শেখাবে। সবশেষে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উক্তি দিয়ে শেষ করছি, তুমি আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দিবো।

রিমি রুম্মান
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.