কেন নারী দিবস আমরা পালন করি!

দিনা ফেরদৌস:

আন্তর্জাতিক নারী দিবস কেনো পালন করতে হবে, এই দিবস পালনের দরকার আছে কি, নেই, এই দিবস পালনের মাধ্যমে নিজেদের আলাদা নারী বলে মনে জাতীয় কথা প্রায়ই শোনা যায়। সেই সম্পর্কে জানার আগ্রহ থাকলে আমার লেখার নিচে উইকিপিডিয়া থেকে একটা লিংক দিলাম, পড়ে জেনে নিয়েন। আশাকরি উপকৃত হবেন।

এখন কিছু কথা বলি যা আপনারা অনেকেই বলেন, কী জন্যে নারী দিবস পালন করা দরকার! আমি খেয়াল করে দেখলাম যারা এইসব কথা বলেছেন তারা সকলেই ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’, ‘ফাদারস ডে’, ‘মাদারস ডে’, ‘চকলেট ডে’, ‘কিস ডে’, ‘রোজ ডে’, ‘হাগ ডে’ এইসব খুব উৎসাহের সঙ্গেই পালন করেন।
কোন দিবস পালন করাকেই আমি ছোট করে দেখি না। কিন্তু এইসব দিবস আমরা কেন পালন করি, বা এর মধ্য দিয়ে সমাজ কী মেসেজ পাচ্ছে, তা নিজের জন্যে হলেও জেনে রাখা ভালো। ভেড়ার পালের মতো সকলে করে, তাই আমরাও পিছনে পিছনে হাঁটি এইসব যারা ভাবেন, তাদের শুধু আনস্মার্টই নয় বেয়াক্কলও লেগে। তাই নারী দিবস পালন করলে যাদের কাছে নিজেকে আলাদা নারী বলে মনে হয়, তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবো। নিজেকে নারী নারী ভাবলে যদি আপনার খারাপ লাগে, তবে ভাবছেন কী নিজেকে? মানুষ বলবেন তো?

যদি মানুষ ভেবেই থাকেন তো সেদিন যে মেয়েটি সিগারেট খাওয়ার জন্যে সকলে বললো নারীদের সিগারেট খাওয়া দেখলে বিশ্রী লাগে। আপনি কি প্রতিবাদ করে বলেছিলেন যে, সিগারেটের গায়ে তো নারী পুরুষ বলে আলাদা কিছু লিখা নেই ,একজন মানুষই তো খাচ্ছিলেন ,এ নিয়ে বলার কি আছে । পুরুষ মানুষদের জন্যে যদি ক্ষতিকর না হয়ে থাকে, তবে নারীদের হবে কেনো? এরপর থেকে কি দেশের সব পুরুষ ধুমপান ছেড়ে দিয়েছেন? আমি জানি আপনারও সেদিন খারাপ লেগেছিল মেয়েটিকে ধুমপান করতে দেখে। কারণ পুরুষদের বহু কিছু নারীদের মানায় না বলে, আপনিও মনে মনে বিশ্বাস করেন। তো শুধু শুধু মুখে এইসব প্রগতিশীলতার বুলি আউড়ে লাভ কি ?

ভালো তো আমরা প্রতিদিনই বাসি, ভালোবাসার মানুইকে। ভালোবাসা দিবসে এতো আদিখ্যেতার দরকারই বা কি? রোজ ডে তে গোলাপ , কিংবা আমরা তো প্রতিদিনই বাবা -মাকেও ভালোবাসি, তাদের যত্ন নেই, শুধু বিশেষ ওই দিনেই কেনো তাদের নিয়ে স্ট্যাটাস দেই, তাদের ছবি শেয়ার করি? আমাদের কালচারে তো বাবা-মায়েদের বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে রাখার সিস্টেম নেই যে, বছরে একবার দেখতে যাবো ফুল, ফল নিয়ে ;আর ভালোবাসি বলে গলা জড়িয়ে ধরবো। আমাদের মা-বাবাও আঠারো বছর বয়স হতে আমাদের বাইরে বের করে দিয়ে বলেন না, এখন থেকে তোমার নিজের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। এটাই আমাদের কালচার। ভালোবাসি কথাটা আমাদের কালচারে মুখ বলা হয় না, বুঝানো হয়ে থাকে আচরণে কিংবা চোখের ভাষায়। তারপরও ওই সব দিবস আমরা পালন করি অতি উৎসাহ নিয়ে । কিন্তু নারী দিবস হচ্ছে সেই দিন, যেই দিন নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্যে নারী শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমেছিলেন। মজুরি বৈষম্য দূর ও কর্মঘণ্টা নিদিষ্ট সময়ের মধ্যে আনার উদ্দেশ্যে।

আপনারা অনেকেই না জেনে, না বুঝে একটা বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে যে ভুল মেসেজ দেন, তাতে কিন্তু নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন বেশি। কারণ এখন মানুষ অনেক পড়াশোনা করে। আজ যারা না বুঝে এইসব লিখায় লাইক দেয়, কাল যখন তারা পড়াশোনা করে ইতিহাসটা জানবে, তখন কিন্তু আপনি গালিই খাবেন, না বুঝে ভুল মেসেজ দেয়ার জন্যে। তাই কিছু নিয়ে বলার আগে একটু পড়াশোনা করুন।
এই “নারী দিবস” নারী হয়ে উঠার জন্যেও না, পুরুষদের বিরুদ্ধে যাওয়ার জন্যেও না। এটা মজুরি বৈষম্য দূর করা ও কাজের একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দেবার লক্ষ্যে ; যা ছিল তাদের উপর অমানবিক নিষ্ঠুর এক আচরণের প্রতিবাদ ।

আজো আমরা নারীরা ঘরে সারাদিন থেকে রাত্রে ঘুমাবার আগেও বাচ্চার স্কুলের ব্যাগ থেকে শুরু করে সকালে কে কি নাস্তা করবে তাও মাথায় নিয়ে ঘুমাতে যাই, তারপরও অনেকে বলে, ঘরে যেইসব নারীরা কাজ করে, তারা বেকার। কিন্তু বাইরে কাজ করা একজন পুরুষের কাজও একটা সময় শেষ হয়, বাসায় ফিরে রেস্ট নিতে পারেন। কিন্তু একজন নারীর তা করা হয়ে উঠে না। এমনকি চাকুরিজীবী একজন নারীকে ঘরের কাজ ঠিকই করতে হয়, বাইরে পুরুষদের সমান কাজ অফিস, আদালতে করেও। কিন্তু একটু চিন্তা করলেই দেখা যায় একজন নারী সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যেইসব কাজ শুধুমাত্র ঘরের জন্যেই করেন, তার জন্যে যদি মাইনে দিয়ে কোন লোক রাখা হতো, তাহলে কি পরিমান টাকা দিতে হতো। আর নিরাপত্তা বা ভরসা করার কথা বাদই দিলাম। একজন মা বা গৃহিণী কতোটা আন্তরিকতা নিয়ে ঘরের কাজ করেন, তা আমরা জানি।

এইসব বলার উদ্দেশ্য এই নয় যে সব যোগ্যতা নিয়ে আপনি ঘরে বসে দেখিয়ে দিতে হবে, আপনি কতো লক্ষী বউ বা মা। সুযোগ থাকলে ঘর সামলানোর বিশ্বস্ত লোক বা কাছের লোকজন থাকলে আপনার ক্যারিয়ার ঘরে নষ্ট করার কোন মানে হয় না। কিন্তু যারা ঘরের কাজে সময় দিচ্ছেন, এছাড়া কোন উপায় নেই, তাদের বাইরে কাজ করার যোগ্যতা থাক বা না থাক, সেখানে তাদের যে শ্রম আছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাদের সেই কাজকে আমাদের সম্মান করা উচিৎ। বাইরে কাজ করছেন না তাদের ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। ঘর কেউ না কেউ সুন্দরভাবে সামাল দেন বলেই, এই ঘরের অন্য সদস্যরা বাইরের কাজ নিশ্চিন্তে করতে পারেন। আমাদের প্রত্যেক কাজকেই সম্মানিত করা উচিত।

নারী জাতি মায়ের জাত, মমতাময়ী, নরম মনের অধিকারী ইত্যাদি বলে তাদের প্রতি সম্মান নয়, বরং ইমোশনালী তাদের আমরা ব্ল্যাকমেইল করি। আমরা মাকে কল্পনা করি, ভাত খেয়ে তার আঁচলে মুখ মুছবো, আমাদের সব দোষ মায়েরা নিজের ঘাড়ে নেবেন। কিছু হলে পরিবার, সমাজ, মা তোলে গালি দেবে। আমরা বলবো, যা ইচ্ছে আমাকে বলো, মা তোলে গালি দেবে না সুশীল সমাজ এই সবে একধাপ এগিয়ে এখন, (এই লেখার নিচের কমেন্ট দেখেই বুঝবেন, সুশীল সমাজ বলতে কাদের বুঝিয়েছি, নুরানি চেহারা ওয়ালাদের কমেন্ট দেখলেই বুঝবেন আশাকরি)। আমরা আমাদের মায়েদের এর থেকে বেশি কিছু কি দেখি? নিজেকে এই মুহূর্তে একবার প্রশ্ন করেই দেখেন’না অনেস্টলি। আমরা কি কখনও ভাবতে পারি আমাদের মাও আলাদা কোন মানুষ, তিনি আলাদা একজন নারী, তার প্রেম, কাম থাকতে পারে, তার নিজস্ব কিছু স্বপ্ন থাকতে পারে একান্ত নিজেকে নিয়ে? তারও স্বাধীনভাবে ভাবতে ইচ্ছে করে আমাদের মতো? এখন বেশিরভাগই বলবেন, ওটাই নারীদের বা মায়েদের ধর্ম। তো, এখন প্রশ্ন আসবে নারীদের এই বিশেষ ধর্ম বানিয়েছে কে? পুরুষদের জন্যে কেনো নেই এই বিশেষ ধর্ম ( এইখানে ধর্ম বলতে মুসলিম, হিন্দু , বৌদ্ধ এইসব কোন ধর্ম বোঝানো হয়নি, নিয়ম অর্থে বোঝানো হয়েছে )? একটু ভেবে দেখুন কেউ বানায়নি, আমরাই চাপিয়ে দিয়ে রেখেছি। আমরাই নিজেদের সুবিধার জন্যে তাদের বিভিন্ন ফ্রেমে আটকে রেখেছি। শুধু নারী বলে তাদের কী কী করা যাবে না তার একটি তালিকা ধরিয়ে দিয়েছি, কখনও মায়ের পরিচয় দিয়ে, তো কখনো নারী পরিচয় দিয়ে।

আমরা বেশিরভাগ নারীরা জানিই না নিজেদের অধিকার কী বা কতটুকু। আমাদের তাই করতে হয় বলে জানি , যা আমাদের নিষেধ করা হয়নি। তারমানে আমরা যে শুধু জানি না নিজেদের অধিকার কী তা নয়, আমরা তাই করি; যা আমাদের দিয়ে করানো হয়। এই অবস্থায় থেকে নারী অধিকার নিয়ে আলাপ করতে গেলে কথা শুনতে হবে ধরে নিয়েই আমরা বলি।

আজ নারীরা কাজে কর্মে, চিন্তায় চেতনায় সবদিক দিয়েই এগিয়ে। তারপরও প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই নারী নির্যাতনের ঘটনা দেখা যায়। ফলে যতো কথাই বলা হয়ে থাকে না কেনো, নারীরা এখনো একটা নির্দিষ্ট জায়গায় বন্দী, সেটা সামাজিক দিক থেকে যেমন বলা যায়, তেমনি চিন্তার দিক থেকেও।
আমাদের কাজ এখন এই জায়গাতেই করতে হবে। আগে নিজেদের চিন্তার জায়গাটায় স্বাধীন থাকতে হবে। প্রত্যেকের অবস্থান থেকে নিজের ফাইট করার জায়গাটা আলাদা। সেটা উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত যেকোন নারীর বেলায় হতে পারে। আমি একজন নারীকে চিনি, যিনি নিজেকে খুব প্রগতিশীল মনে করেন, আলাদা নারী ভাবতে নারাজ, কিন্তু স্বামী ডিভোর্স দেয়ায় কান্নাকাটি করে পারলে দুনিয়া এক করেন। দিনরাত সবাইকে বলে বেড়ান স্বামীর চরিত্র খারাপ। কিন্তু সেই খারাপ স্বামীকে না ছাড়ার জন্যে বহু লোকের কাছে গেছেন। তো দাঁড়ালোটা কী? তোমার নিজের চলার যোগ্যতা নেই। স্বামী ছেড়ে দিলে নিজেকে অসহায় লাগে। কিন্তু তুমি নিজেকে নারী ভাবতে পারছো না। তুমি মানুষের সম্মান চাও। আমি তো বলি, কারও কাছ থেকে মানুষের সম্মান চাওয়ার আগে তুমি নিজেকে মানুষ ভাবতে শেখো। কী কারণে ওই চরিত্রহীন স্বামীর সঙ্গে থাকার জন্যে তোমার এতো আকুলতা? তোমারই উচিৎ ছিল এই লোকটা তোমাকে ডিভোর্স দেয়ার আগে, তোমার তাকে ডিভোর্স দেয়া, নিজের সম্মানের কথা ভেবে।

নারী অধিকার মুখের কথায় পাওয়া যায় না। তুমি যখন নিজের প্রতি সম্মান অনুভব করবে, তখনই তুমি অধিকার সচেতন হবে। সেই অধিকার আদায়ের জন্যে তুমি ফাইট করবে তোমার অবস্থান থেকে। শুধু মুখে বড় বড় কথা বললেই হয় না যে, আলাদা করে নারী দিবস পালন করলে নারী নারী লাগে। এই কথার মধ্যে নিজের প্রতি অসম্মানই ফোটে উঠে। এই কথার অর্থ দাঁড়ায় নারী মানে দূর্বল কিছু। নিজেকে নারী ভাবতেই দুর্বল লাগে। শুধু নিজেকে নারী ভাবার কারণে যদি তোমার নিজেকে ছোট লাগে, তো বুঝে নিও তুমি দুর্বলই। তাই ফাইট করে অধিকার আদায়ের কথা শুনলে বাহানা বের করতে ইচ্ছে হয়, নিজেকে মানুষ ভাবতে ইচ্ছে হয়। তার মানে দাঁড়ায় নারীরা মানুষ না। আগে নিজেকে মানুষ ভাবতে হবে, তারপর নারী থেকে মানুষ হয়ে উঠতে হবে।

আপনি নিজেকে কী ভাবেন বা ভাবেন না তাতে এই সমাজ ব্যবস্থার তৈরি করা কোন নিয়মই হুট করে ভেঙে যাবে না। তোমার নারী হয়েই নিজের জায়গা তৈরি করে নিতে হবে, মানুষ হিসেবে। আর নারী দিবস পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, নারীদের উন্নতি অগ্রগতির জন্যে যেইসব কর্মসূচি নেয়া হয়, তা কতটুকু ফলপ্রসূ হলো, আরও কী কী কাজ করে যেতে হবে, এই দিবস পালনের মাধ্যমে সেইসব বিষয় সামনে চলে আসে, কোন কাজ সময়োপযোগী, সেইসব দিকে খেয়াল রেখে নতুন নতুন প্ল্যান করা হয়। যা নারীদের জীবনের মান উন্নয়নে সহায়তা করে। প্রতি বছর এই নারী দিবস পালনের মাধ্যমে সারা বছরের একটা সামারি সামনে চলে আসে। এই দিবস পালন না হলে কারোই কোন তাগিদ থাকতো না, নারীদের উন্নতির জন্যে কাজ করার। এই নারী দিবস আছে বলেই নারীরা নিজেদের অধিকার নিয়ে বলতে পারেন।

তাই এতোদিন যারা বলে আসছেন নারী দিবস পালনের দরকার কি বা এই দিবস পালন করলে নিজেকে আলাদা নারী নারী মনে হয়, তারা আশাকরি ব্যাপারটা কিছু হলেও বুঝতে পারবেন। আর বিস্তারিত বুঝতে হলে একটু পড়াশোনা করুন, ইতিহাসটা জানুন । আর পড়াশোনা না থাকলে, মনগড়া কথা বলা থেকে বিরত থাকুন।

https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%95_%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%80_%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%B8

শেয়ার করুন:
  • 50
  •  
  •  
  •  
  •  
    50
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.