যেখানে কোন পুরুষ বাথরুম নেই!

মনিজা রহমান:

আমার স্কুলে কোন পুরুষ বাথরুম নেই। মানে ‘মেন টয়লেট’! ওমেন, বয়েজ, গার্লস বাথরুম আছে! শুধু পুরুষদের জন্য কোন বাথরুম নেই! তাহলে পুরুষরা কোন বাথরুমে যায়? একটা ‘গেস্ট বাথরুম’ আছে, মানে সবার জন্য, সেখানেই যায়!

আমাদের স্কুলটা প্রকৃতই একটা নারীস্থান। পুরো স্কুলে পুরুষ বলতে একজন শুধু ইকুয়েডোরিয়ান স্টোরকিপার কাম ক্লিনার। তার মধ্যে আবার বেশ মেয়েলি ভাব আছে। বেশি বেশি নারীদের থাকার কারণে হয়তো! মিশর, মরক্কো, মেসিডোনিয়া, তুরস্ক, সার্বিয়ার কয়েকজন মুসলিম বংশোদ্ভুত নারী আছে আমার সহকর্মী। কিন্তু তারা কেউ হিজাব করে না। তারা যে আসলে মুসলমান সেটাও অবশ্য তাদের পোশাক-আশাকে বোঝা যায় না। আমিনা নামে একজন আলজেরিয়ান সহকর্মী শুধু মাথায় হিজাব পরেন। তবে স্কুলে তার দরকারও নেই। কোন পুরুষই তো নাই স্কুলে। চুল দেখালেই কী, আর না দেখালেই কী!

করোনা শুরুর আগে অবশ্য দুইজন পুরুষ থেরাপিস্ট ছিলেন। তাদের একজন ফিলিপিনো আমেরিকান জেরি, গত বছর এপ্রিলে করোনাতে আক্রান্ত হয়ে ৪২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। অন্যজনের বয়স ত্রিশের আশেপাশে। উনি চাকরী ছেড়ে দিয়েছেন। তবে সেই পুরুষ সহকর্মীর জন্য দিওয়ানা ছিল আমাদের স্কুলের অনেক নারীই। নিয়মিত তাকে দেখতাম অ্যাডাম টিজিংয়ের (ইভটিজিংয়ের বিপরীত শব্দ) শিকার হতে। অনেক নারীর কাজের জায়গায় একজন সুদর্শন পুরুষ থাকলে যা হয়!

নিউইয়র্কের শিক্ষা কার্যক্রমে পুরুষের চেয়ে নারীর উপস্থিতি সব জায়গায় বেশি। বিশেষত প্রি স্কুল আর এলিমেন্টারি স্কুলের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বেশি সত্যি। আমাদের স্কুলের যে এজেন্সির অধীনে, সেখানে ‘এডুকেশন ডিপার্টমেন্ট’ শীর্ষ পদ থেকে শুরু করে প্রায় সবাই নারী। শুধু ডেপুটি ডিরেক্টর একজন পুরুষ। নিজেকে সে ‘ম্যান ফ্রম বোস্টন’ বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসে। ভদ্রলোক অতি সুদর্শন। রীতিমত টম ক্রুজের যমজ ভাই। উচ্চতায় টম ক্রুজের চেয়েও লম্বা। ডাউনটাউন ম্যানহাটনে এজেন্সির মূল অফিসে, সবাইকে ট্রেনিং দেন তিনি স্কুলে কাজ শুরুর আগে। সম্প্রতি লংআইল্যান্ড সিটিতে, এজেন্সির এক শাখা অফিসে, দ্বিতীয় ডোজ ভ্যাকসিন নিতে গিয়ে দেখি- তিনি উপস্থিত। ম্যানহাটনে মূল অফিস থেকে কুইন্সে এসেছেন ভ্যাকসিন তত্ত্বাবধানে। ওনাকে দেখে আমার তরুণ সহকর্মীরা রীতিমতো আনন্দে আত্মহারা। ভদ্রলোক আমাদের বসের বস হলেও তরুণীদের চপলতায় কিছুটা বিব্রত। যেটা দেখতে আমার খুব মজা লাগছিল।

আমার আগের ক্লাসের আইরিশ আমেরিকান টিচার খুব মাচো ম্যানদের পছন্দ করে। ঘন ঘন সে বয়ফ্রেন্ড পাল্টায়। আসলে সে খুব মেজাজী, যে কারণে কারও সঙ্গে বেশিদিন সম্পর্ক টেকে না। আমাকে সব সময় নতুন নতুন বয়ফ্রেন্ডের ছবি দেখাতো। যারা শিক্ষা-দীক্ষায় তেমন অগ্রসর নয় না। হয়তো সারাদিন জিমেই কাটায়। অথচ আমার টিচারের তাদেরই ভালো লাগতো। টিচারকে নতুন নতুন পুরুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার ব্যাপারে অগ্রসর ছিল স্কুলের অফিস সেক্রেটারি। গরমকাল এলে ওর পোশাক এতো সংক্ষিপ্ত হয়ে যায় যে নিজেরই লজ্জা লাগে। যেদিন আমি শুনলাম ওর বয়স ৪৩ বছর, রীতিমতো আকাশ থেকে পড়লাম। আমি ভেবেছিলাম ২৫/২৬ বছর হবে। এক সপ্তাহ আগে আমার স্কুলের প্রিন্সিপাল, নোটিশ বোর্ডে লিখে রেখেছেন- ‘আমাদের স্কুলের একজন গ্র্যান্ডমা হতে যাচ্ছে, কে বলতে পারবে কে সে?’ অনেক জল্পনা-কল্পনার পরে জানলাম- আমাদের সেই স্কুল সেক্রেটারি। চোখ কপালে তুলে বললাম- ‘জীবনে এতো সেক্সি গ্র্যান্ড মা দেখিনি!’

আমেরিকায় পুরুষদের মতোই নারীরা প্রেম, বিয়ে, যৌনজীবন সব ব্যাপারে সমান অবস্থানে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নারীদেরই বেশি অগ্রসর মনে হয়। অন্তত শ্বেতাঙ্গ, কৃ্ষ্ণাঙ্গ আর হিসপ্যানিকদের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ কোন কোন পার্থক্য দেখি না। এশিয়ানরা অবশ্য এখনও অনেক পিছিয়ে। তবে ইহুদিদের কথা কিছুটা ভিন্ন। আমার বর্তমান ক্লাসের ইহুদি ধর্মালম্বী শিক্ষক তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে লিভ টুগেদার করে, ডেটিং সাইটে তাদের পরিচয়। বয়ফ্রেন্ড একজন আইস হকি খেলোয়াড়। অথচ আমার শিক্ষকের আপন বড় বোনের স্বামী অর্থোডক্স ইহুদি, কালো লম্বা আলখাল্লা আর হ্যাট পরে থাকেন সব সময়। এই যুগে বাস করেও ইন্টারনেট ব্যবহার করে না। স্বামীর আদেশের কারণে বোনকে মাথায় উইগ (এক ধরনের হিজাব) পরতে হয়। পরিবার পরিকল্পনাও করে না তারা। দশ বছরের বিবাহিত জীবনে তাদের সাতজন ছেলেমেয়ে।

শেষ করার আগে বাথরুমের প্রসঙ্গ কেন আনলাম সেটা বলি! বাংলাদেশে যখন ক্রীড়া সাংবাদিকতা করতাম, দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ফুটবল প্রেসবক্সে কাজ করেছি। শুরুর দিকে নারী সাংবাদিক তেমন ছিল না। দেখা যেত পুরো স্টেডিয়ামের গ্যালারি জুড়ে পুরুষ দর্শক। মাঠে খেলছে পুরুষরা। প্রেসবক্সেও সব সাংবাদিক পুরুষ। বিরুদ্ধ স্রোতের দাঁড়িয়ে আমি একজন নারী। আমার একার জন্য কোন বাথরুমও ছিল না। অর্থাৎ স্টেডিয়ামে কোন ওমেন টয়লেট ছিল না। খুব প্রয়োজন হলে কিছুদূর হেঁটে গিয়ে ক্রীড়া সাংবাদিক সংগঠনের অফিসের বাথরুম ব্যবহার করতে হতো! এখন আমার বর্তমান কাজের জায়গায় কোন মেন টয়লেট নেই। একেই কি বলে জীবনের বৈপরীত্য! নাকি যুগের পরিবর্তন!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.